Home » রাজনীতি » তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা যেদিন ঘোষিত হয়

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা যেদিন ঘোষিত হয়

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Hasina-Nizami২৭ জুন বৃহস্পতিবারবাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৯৪ সালের এই দিনে বর্তমান ক্ষমাসীন আওয়ামী লীগ তাদের তৎকালীণ রাজনৈতিক সহযোগী জামায়াতেই ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ ও আরো কয়েকটি দলের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা করে। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রথবারের মতো সামনে নিয়ে আসেন ১৯৯৩ সালের শেষ দিকে। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি ও জামায়াত এ দাবিতে আন্দোলন শুরু করে এবং তত্ত্ববধায়ক সরকারের অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা করে। বিএনপি চেয়ারপারসন এবং প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দল সমূহের এ দাবিকে নানাভাবে সমালোচনা করলেও তিনি বরাবরই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দল সমূহকে সংসদে এসে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বাণ জানান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য জনসভায় দাবি তোলেন ১৯৯৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ‘স্বৈরাচারের পতন ও গণতন্ত্র দিবস’ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায়। এদিন তিনি বলেন, তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধীন বিল আনবে। বিএনপি যাতে এই বিল পাশ করতে বাধ্য হয় এ জন্য তিনি আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বাণ জানান।

এরপর আওয়ামী লীগ তত্ত্ববধায়ক সরাকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণে সংসদের সকল বিরোধী সঙ্গে অনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। ১৯৯৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনার আহ্বানে সংসদের সকল বিরোধীদল ও গ্রুপের নেতৃবৃন্দ এক যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছর ২৬ এপ্রিল থেকে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী যৌথভাবে তত্ত্ববধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে হরতাল, অবরোধ, মশাল মিছিল, পদযাত্রা, সহ নানা কর্মসূচি পালন করে। ৯৪ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ, জাপা এবং জামায়াতে ইসলামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিন্ন রূপরেখা ঘোষনা করে এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে তত্ত্ববধায়ক সরকারে অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১৯৯৪ সালে ২৮ ডিসেম্বর পঞ্চম জাতীয় সংসদের ১৪৭ জন বিরোধী দলীয় সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। এদিন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও এনডিপি’র সদস্যরা স্পীকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিন্ন রুপরেখা ঘোষনা খবরটি ওই সময়ের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। ওই সময় দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো:

(দৈনিক বাংলা: ২৮ জুন, ১৯৯৪)

আওয়ামী লীগ জাপা জামায়াতের প্রেস ব্রিফিং

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা

স্টাফ রিপোর্টার

আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ সংসদের পাঁচটি বিরোধী দল সোমবার সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেত্রীর সম্মেলন কক্ষে রাত পৌনে দশটায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই রূপ রেখায় বলা হয়েছে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। রাষ্ট্রপতি এই অন্তর্বতীকালিন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিচালনার জন্য জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলসমূহের পরামর্শক্রমে একজন নির্দলীয় গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিজে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবে না এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এবং নির্বাচনের প্রার্থী হবে না এমন ব্যাক্তিদের নিয়ে একটি মন্ত্রীসভা গঠন করবেন। নির্বাচনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বতীকালীণ সরকার অবলুপ্ত হবে। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করার কথা রূপরেখায় বলা হয়।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এক প্রেসব্রিফিংয়ে এই রূপরেখা ঘোষণা করেন। এ সময় সংসদে তিনটি বিরোধী দলের সঙ্গে গণতন্ত্রী পার্টি এবং এনডিপি উপস্থিত ছিল। গণফোরাম, ওয়ার্কার্স পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটের কোনো প্রতিনিধি এতে উপস্থিত ছিলেন না। এই রূপরেখা ঘোষণার সময় দাবি করা হয়েছে রূপ রেখা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সকল বিরোধীদল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। এই রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য বৃহত্তর আন্দোলন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রেসব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদীয় দলের নেতা মওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে এই প্রথম উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণাকালে শেখ হাসিনা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করা। এ লক্ষ্য অর্জন করার জন্য দেশের আপামর জনসাধারণ বার বার বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলন করে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হলো অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক একটি সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আমাদের দেশে গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক চর্চা যেহেতু এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েয়ে সেহেতু গণতন্ত্রকে সুসংহত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রণয়ণ করার তাগিদ এখন একটি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে।

এই লক্ষ্যে অর্জনে বিরোধী দলসমূহ সংসদে তিনটি বিলও পেশ করেন এবং ঐ বিল সমূহ আলোচনার জন্য দাবি জানান। কিন্তু সরকার তাতে কোনো সাড়া দেননি। এরপর বিরোধীদল সমূহ ২৬ জুনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকল্পে সংবিধান সংশোধনীর একটি বিল আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বাণ জানিয়ে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু সরকার সেই বিল না এনে সংসদকে আরে অর্কাযকর করে দেন এবং অগণতান্ত্রিক ও একগুয়েমী মনোভাব নিয়ে আজ জাতিকে গভীর সংকটে নিমজ্জিত করেছেন। উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে জাতির এই কান্তিলগ্নে গণতন্ত্রকে সুসংহত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার স্বার্থে আমাদের বাস্তবিক রূপরেখা নিুরূপ:

একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেয়ার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন।

রাষ্ট্রপতি এই অন্তবর্তীকালীণ সরকার পরিচালনা করার জন্য জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বাকারী আন্দোলনরত রাজনৈতিক রাজনৈতিক দলসমূহের পরামর্শক্রমে একজন নির্দলীয়, গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন এবং সেই প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তার কার্য পরিচালনা করবেন। অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিজে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবে না এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন এবং নির্বাচনে প্রার্থী হবে না এমন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি মন্ত্রীসভা গঠন করবেন। অন্তর্বতীকালীণ সরকারের মূল দায়িত্ব হবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং সংবিধানে প্রদত্ত সাধারণ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন ছাড়া শুধুমাত্র জরুরি রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংসদ ভেঙে দেয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ নির্বাচনের পর সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করার সাথে সাথে অন্তবর্তীকালীন সরকার অবলুপ্ত হবে।

এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নিন্মোক্ত পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠিত করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশন যাতে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। একটি স্বয়ংসম্পূর্ন আচরণবিধি প্রণয়নও নিশ্চিত করতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন এই রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় সংসদের সকল বিরোধীদল আজ ঐক্যবদ্ধ। সরকার যেহেতু সংবিধান সংশোধনী বিল আনতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সকল বিরোধীদলকেত সংসদের বাইরে আসতে বাধ্য করেছেন সেহেতু আজকে এই রূপরেখা বাস্তবায়ন করার জন্য একটি বৃহত্তর গণআন্দোলন ছাড়া অন্যকোনো বিকল্প নেই। একটি নিরপেক্ষ তত্ত্ববধায়ক সরকার ছাড়া কোনো দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে আমাদের অংশগ্রহন করা সম্ভব হবে না এবং এই রূপরেখা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত জনগণের এ আন্দোলন চলবে। আজ আমরা সকল রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন, শ্রমিক, ছাত্র এবং সকল শ্রেণীর জনগণকে এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ইতিহাসেই এই প্রথম সকল বিরোধী দল এক হয়েছে। তিনি বিরোধীদল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়েছে।

মওলানা মতিউর রহমান নিজামী বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছুই নেই। তিনি বলেন, কেয়ারটেকার বিল পাশের ব্যাপারে সরকার এখনও উদ্যোগ নিলে এতে জাতির উপকার হবে।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে অনুরূপভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকরের বিল পাশের জন্য এবারের আন্দোলন শুরু হয়েছে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এই রূপরেখাকে ‘দুর্লভ ও অনন্য অবিহিত করে বলেন, এই রূপরেখার জন্য জাতি অপেক্ষা করছিল। প্রেসব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কোনো রকম প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়া হয়নি।।