Home » আন্তর্জাতিক » ব্রাজিল-তুরস্কের আন্দোলন – শুনতে কি পাও?

ব্রাজিল-তুরস্কের আন্দোলন – শুনতে কি পাও?

আমাদের বুধবার বিশ্লেষণ

brazilবাংলা ভাষাভাষী মাত্র বিলক্ষণ বোঝেন তিল থেকে তাল হওয়া কাকে বলে। এর জন্য খুব একটা আকলমন্দির দরকার পড়ে না। তবে বিষয়টার রাজনীতিকরণ যখন হয় তখন একটু বুদ্ধিস্মৃতি এই সব খাটাতে হয়। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা বিশ্বের চলমান ঘটনা নিয়েও অনেকে ভাবেন। মানুষ যখন সরকারের দুঃশাসন আর অপশাসনের বিরুদ্ধে ত্যক্তবিরক্ত ও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, তখন যে কোনো ছোটখাটো ইস্যুও হয়ে উঠতে পারে জাতীয় ইস্যুতে, সরকার পতনের আন্দোলনে। সর্ব সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি দেশে এমন ঘটনা ঘটেছে। যাকে অতি সামান্য ইস্যু বা ছোট কারণ বলে মনে হতে পারে, তা পরিণত হয়েছে সরকার বিরোধী আন্দোলনে। ব্রাজিলে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির আন্দোলন রূপ নিয়েছে সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে। ভাড়া কমানো হলেও কোনো কাজ হয়নি। ‘সামান্য’ গাছ কাটার মতো আন্দোলন তেমনই উত্তাল আন্দোলনে পরিণত হয় তুরস্কে। এই গাছ কাটা আর গণ পরিবহন আসলে অছিলা মাত্র। গোটা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টি এখন ওই দিকে। ঢাকার একটি সংবাদপত্রে প্রথম পৃষ্ঠায় প্রধান খবর হিসেবে ব্রাজিলের ওই উত্তাল আন্দোলনের খবরটি বড় করে ছাপা হয়েছে। সঙ্গে ছাপা হয়েছে বড় ছবি। সংবাদপত্রটি কি ইঙ্গিত দিতে চাইছে? জনগণের ক্রোধ, গণমানুষের বিক্ষোভের কারণে।

তিল কি করে তাল’ হয় ভাই রোমানের জন্য এটা করা হয়েছে। সংবাদটিতে কোনো মন্তব্য নেই কিন্তু পাঠকমাত্রেরই ‘সাধু সাবধান’ ধরণের একটা প্রতিক্রিয়া হবেই শিরোনামটা দেখামাত্র।

কদিন আগে এ রকম রাজনৈতিক ছোট একটি অরাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে যে বড় ঘটনা হয়ে উঠতে পারে তাও ঘটেছিল তুরস্কে। ইস্তাম্বুলের তাকসিম স্কোয়ারের নয়নাভিরাম উদ্যানের কিছু অংশের গাছ কেটে সেখানে বিপনিবিতান নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল সরকার। কিন্তু কিছু তরুণ বিক্ষোভ শুরু করে ৩১ মে থেকে। সেই বিক্ষোভ ইস্তাম্বুল ছাড়িয়ে রাজধানী আঙ্কারাতেও ছড়িয়ে পড়ে। আর বিক্ষোভের ইস্যু হয়ে ওঠে সরকারের বিরোধিতা বা পদত্যাগ। বিক্ষোভের চারদিনের মাথায় তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েবা এরদোয়ান আপসরফার পক্ষ বেছে নেন বিক্ষোভ দমনের। হুমকি দিয়েও ২ জুন সরিয়ে নেন পুলিশ।

ব্রাজিলেও প্রধানমন্ত্রী দিলমা রৌসেফ গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি না করা এবং তেল ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা করার আশ্বাস দিয়ে (২১ জুন) আপাতত পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গণবিক্ষোভ তো বলছে অন্য কথা অর্থাৎ সাধারণ মানুষ দিচ্ছে অন্য স্লোগান উন্নয়নের নামে দুর্নীতি আর দলীয় চাপাচাপির বিরুদ্ধে তারা রুখে উঠেছে। কেবল আমাদের দেশেই নয়, উন্নত বা উন্নয়নশীল অনেক দেশেই গণতান্ত্রিক নামধারী ক্ষমতাসীনদের অতিরিক্ত বা মাত্রাতিরিক্ত কখনো দুর্নীত, কখনো দুঃশাসন ও অপশাসনের কারণে জনসাধারণ ক্ষুব্ধ হয়ে পরিবর্তন চেয়ে বসে। কিছুদিন আগে ফ্রান্সের সারকোজি পর্বের শেষটা কিংবা ইতালির বার্লুসকনি আমলের কথা স্মরণ করে দেখতে পারেন পাঠক।

এর জন্য অতিরিক্ত কাণ্ডজ্ঞানের বা রাজনীতি বিদ্যার প্রয়োজন পড়ে না। যে মাটি দেশের ঘটনা দিয়েও এ লেখার শুরু তাদের কথাই বলি দুটি দেশের সরকারের চরিত্র (!) দু’ধরণের। ব্রাজিলেরটা সোস্যাল ডেমোক্রেট আর তুরস্কেরটা ইসলামিক জাস্টিস পার্টি। ওই যে আগের বাক্যে চরিত্রের পাশে ব্যালেটে বিস্ময়ের চিহৃ লাগিয়েছিলাম এ কারণে যে রাষ্ট্রের নির্বাচিত শাসকরাও যদি সুশাসনের পথে না যান, তাহলে টেস্টটিউবের মধ্যে সোস্যালিস্ট আর ইসলামিক সবারই বৈশিষ্ট্য বদলে দুর্নীতি পরায়ণ হয়ে উঠে। ব্রাজিলের পথেঘাটে বাজারে তো নয়ই, কলকারখানাগুলোতে কৃষি খাতে সাম্যের ধোয়ার ছিটেফোটাও নেই। কেবল চলছে টেন্ডারবাজি। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে আর ক্ষমতাসীন দলের লোকজনও দেদারছে চালাচ্ছে লুটপাট।

তুরস্কেও ইসলামিক জাস্টিস পার্টি এই স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল যে, তারা ইসলামি ন্যায্যতার ভিত্তিতে ইউরোপের মতো উন্নয়ন ঘটাবে। কিন্তু কি হলো শেষ পর্যন্ত? ন্যায়ন্যায্যতা কবে ভেস্তে গেছে, উন্নয়নের নামে কোনো নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে আর চলছে টেন্ডারবাজি। দলীয় লোকজন লাভবান হচ্ছে জনসাধারণ আবার হ্যাঁ করে আর কতোদিন দেখবে? এ জন্যই সুযোগ পাওয়া মাত্রই তারা ফুঁসে উঠেছে। গাছ কাটা আসলে উপলক্ষ মাত্র। সরকার বলছে, ইউরোপীয়দের ষড়যন্ত্র কারণ তারা চায় না ইসলামি শক্তি ক্ষমতায় থাকুক। ব্রাজিল সরকারও বলছে: সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র। কিন্তু এটাও তো সত্যি যে, সোসাল ডেমোক্র্যাটরা গণতান্ত্রিক ক্ষমতা ভোগ করছে প্রায় এক যুগ ধরে। আগে লুলা ডি সিলভাও যা ছিলেন হরে দরে দিলমা রৌসেফও তাই। একই দল, একই পরিকল্পনা আর একই দাপট যা ক্রমাগত বাড়ছে। ব্রাজিলিয়ানরাও সুযোগ খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেছে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি এ তো এক উপলক্ষ মাত্র। এখন তারা তুর্কিদের মতোই পরিবর্তন চাচ্ছে।

ক্ষমতাসীনরা বোঝাচ্ছেন, পরিবর্তন হলে ভালো হবে না ভয়ও দেখাচ্ছেন। অনেক উদাহরণই তুলে ধরা হচ্ছে বলা হচ্ছে, আরব বসন্তের কথা। কী হলো মিসরে, লিবিয়ায়, তিউনিসিয়া ও ইয়েমেনে? ইউরোপেই বা কি হচ্ছে? গ্রিসের সাম্প্রতিক ঘটনা দেখুন বিক্ষোভের মুখে ত্যক্তবিরক্ত ক্ষমতাসীনরা বন্ধ করেদিয়েছিল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনই।

এ রকম জনসাধারণের উপর ক্ষেপে যাওয়া অনেক ক্ষমতাসীন দলের নেতারই দেখা মিলবে, বিশ্বের অনেক দেশে। যাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হবে, তারা ভয়ের সংস্কৃতি কিংবা প্যারানায়ায় আক্রান্ত। জনবিচ্ছিন্ন আর দিশেহারা। মমতা ব্যানার্জি স্বল্পকালীন ক্ষমতায় এলেও ইতোমধ্যে হয়ে উঠেছেন, এরই একটা মিনিয়েচার মডেল হিসেবে। পাঠক আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণে এলে নির্দ্ধিধায় দেখতে পাবেন এ দেশ ও দেশ বহু দেশে এ ধরণের শাসকদের নানা কার্যক্রম। মানুষ ত্যক্তবিরক্ত হয়ে অপেক্ষায় থাকে সুযোগের, তারা তা জানে না।

এক সময় বিপুল ভোটে নির্বাচিত কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অজনপ্রিয় বা জনপ্রিয়তা হারানোকে সৎ সাহস দিয়ে মেনে নেয়াটা কিংবা এই জনপ্রিয়তা হারানোর কারণ খুঁজে বের করার দৃঢ়তা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় ওই সব শাসকদের জন্য। তিল থেকে তাল হয়ে গেলে তারা প্রথমে বিরোধী পক্ষ, পরে বিদেশি, তারপর যাদের পেছনে তারা লেগেছিল তাদের ষড়যন্ত্রের দোষ খুজতে থাকে, চূড়ান্ত পরিনতিতে ক্ষেপে উঠে সেই জনগণের উপরই যারা তাদের নির্বাচিত করেছিল। ক্ষেপে উঠে সে সংবিধানের উপর যে সংবিধানের বদৌলতে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা গঠন করেছে। আরো ক্ষেপে যায়, সংবিধান নির্ধারিত শাসনের সময়সীমার বিরুদ্ধে। চার বা পাঁচ বছরের সময়সীমাটা তাদের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। ওই স্বৈরাচারী সরকারের একটিই ক্ষোভ ক্ষমতা কেন চিরস্থায়ী নয়। এই জ্বালা আর ক্ষোভ গিয়ে পড়ে খোদ গণতন্ত্রের উপর। মুখে গণতন্ত্রের বিরোধী করতে না পেরে নিজেদের আচরণই পাল্টে ফেলে তারা হয়ে উঠে চরম স্বৈরাচার। একজন গণতান্ত্রিক ক্ষমতা ভোগকারী কতোদিনে স্বৈরাচারী হয়ে উঠে।

এই প্রশ্নের উত্তর সেই রাষ্ট্র বা স্টেট নামক সংস্থা উদ্ভাবনকারীরা। একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে সরকারের মেয়াদ কতোদিন হতে পারে বা হওয়া উচিত এ জন্য তারা নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছেন। তারা এটা বলেছেন, একজন জনপ্রতিনিধি ঈশ্বর নির্ধারিত শাসক নয়। আর মজার তথ্য আছে। অনেক রাষ্ট্র বিজ্ঞানী বলেছেন, রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রথম প্রজন্মের হাত থেকে দ্বিতীয় প্রজন্মে গেলে তা হয়ে উঠে মধ্যম স্বৈরতন্ত্রী আর তৃতীয় কালে এসে হয়ে উঠে চরম স্বৈরাচারী। তারা জনসাধারণকে ভয় পায় আর সেই ভিত থেকেই শুরু হয় দমনপীড়ন।

জনসাধারণ তখন কি আর চুপ করে বসে থাকে? মোটেও না। অছিলা বা তিল খুজতে থাকে, তা সে গাছ কাটাই হোক বা গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধিই হোক। চেতনাকে উজ্জীবিত করার হাতিয়ার বা মাধ্যম এখন কম নেই। ‘আরব বসন্তে’ গণমাধ্যমের বিকল্প হয়ে উঠেছিল ফেসবুকটুইটার। এখন সব দেশেই এসব চলছে আর প্রতিটি সচেতন মানুষই এখন আসলে এক একটি গণমাধ্যম। সে কারণে তিল থেকে তাল হয়ে উঠতে বা ক্ষমতাসীনদের অপশাসনের বিরুদ্ধে সুযোগ খুঁজতে যেমন সময় লাগে না, তেমনি ক্ষমতাকে অপব্যবহার করলে তাদের সময়সীমাও হয়ে পড়ে সঙ্কুচিত।

এটা শাসকদের মনে রাখা দরকার ভয়ভীতি, দমনপীড়ননির্যাতন, বড় বড় বক্তৃতাবিবৃতি ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক নয়। আসলে মূল নিয়ন্ত্রক সাধারণ মানুষ। ক্ষিপ্ত শাসক নয়, কিন্তু ওরা তা বোঝে না।।

১টি মন্তব্য

  1. CHOR NA SUNE DHORMER KHANI,SK SAHEB KENO 12TK DAMER LUNGI PORTO,ZIA BHAI KENO 220TK DAMER SAFARE PORTO,HAY MUKTIBAHANE, JOYBANGLA.  FREIENOHL GERMANY.