Home » মতামত » সংসদের পাশের রাস্তা দিয়েও যেতে চাই না

সংসদের পাশের রাস্তা দিয়েও যেতে চাই না

আবীর হাসান

parliamentহাঁটি। প্রায় প্রতিদিনই হাঁটি। প্রথমে পশ্চিম থেকে পূর্বে তারপর পূর্ব থেকে পশ্চিমে, প্রশস্ত মানিক মিয়া এভিনিউতে মন ভড়িয়ে দেয়। সংসদ ভবনকেও মনে হয় মহাত্মর স্থাপত্য! কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে আর যাচ্ছি না ওই পথে, আসলে যেতে পারছি না। মন সায় দিচ্ছে না বিচার, বিবেক, বুদ্ধি বলছে, না এটা ঠিক জায়গা নয়। বিবীমিষা জাগছে। মনে হচ্ছে, এতদিনের প্রশান্তির বোধ ভুল ছিল! ভুল ছিল বিশ্বাস! ভুল ছিল আস্থা!

এখন বুঝি এই পথটি জড়, ওই ভবনটি জড়। ওরা কিছু বলতে পারে না, করতে পারে না। যা করার তো আমরাই করি এই মানুষরাই ওই পথে আমার না হাঁটার শপথ তো ওই মানুষদের জন্যই। যারা বিবেকবিবেচনা তুলে রেখে মুখ ভেংচে গলা ফাটিয়ে খিস্তি করতে পারেন। আমরা টেলিভিশনে দেখেছি, শুনেছি হয়তো আমার ব্যর্থতা আমি ওভাবে বসতে পারি না স্থানকালপাত্র আর নিজের সংশ্রব কিংবা অহমিকাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই যেমন এখনো আমি ওই সব শব্দ লিখতে পারছি না আসলে বিশ্বাসই করতে কষ্ট হয়। এমন ভাষায় গালাগাল করা হয়েছে, গ্রাম্য ছড়া কাটা হয়। আরো কতোকিছু।

নিজেকে আমার ভিতু ভাবতে ভালো লাগে না আমি যুদ্ধের মধ্যে যুক্তি খুঁজি না কারণ একাধিক যুদ্ধ আমাকে করতে হয়েছে। কিন্তু যোদ্ধারা উলঙ্গ হন না, অশ্লীল ভঙ্গি করেন না এটাকে তাই আমার মনে হচ্ছে যুদ্ধের চেয়ে যুক্তিহীন অমানবিক। অশ্লীল শুধু নয়, মাত্রাজ্ঞানহীন অর্বাচিন প্রলাপ। এটাও আসলে আমার ধরে নেয়া বিবেচনা। সবাই জানেন যারা ওই সব কথা বলেছেন, তারা তৈরি হয়েই বলেছেন খিস্তির নোট নিয়ে বলেছেন। তারা জনপ্রতিনিধি। অন্য পরিচয়ও তাদের আছে, কেউ অধ্যাপক, কেউ আইনজীবী। আবারও প্রশ্ন করছি কি করে এসব করতে পারলেন তারা? আমি মানতে পারি না পারছি না। আর যেতে পারছি না ওই সংসদের পথেকেমন করে পারব? যন্ত্রণায় আমার বুক মুচড়ে আসে আমার হৃদস্পন্দন দ্রুততর হয়। কতো বছর, কতো বছর ধরে হেটেছি এই পথে? ত্রিশ বছর? না তারও বেশি। এতদিনে কতো কিছুই তো হয়েছে সংসদে! আবার অনেক কিছু হয়ওনি হতে পারত কিন্তু হয়নি। সেই সব দুঃখের খচখচানি বুকে বেজেছে সময়ে সময়ে। আর আজ গোল বেধেছে। কেন বিধবে না? এই সংসদ বসানোর জন্য কি আমার রক্ত ঝরেনি! টিয়ার শেলের ঝাঁঝে কি চোখ জ্বলেনি? স্বৈরাচারের পুলিশি তাড়ায় কি আমার হাত পা ক্ষতবিক্ষত হয়নি? তাও কতোবার। একবার গুলিতে খুলি ফাটা এক কিশোরের রক্তে মগজে সারা শরীর ভরে গিয়েছিল অলৌকিক সে বেঁচে যাওয়া। যাবজ্জীবনে সে স্মৃতি ধূসর হওয়ার নয়।

সেই সংসদে আজ একি? খোদ সংসদ নেত্রীই তো শুরু করলেন ‘কবর রহস্য দিয়ে।’ ‘ডিএনএ টেস্ট’ সন্তানের জন্মবৃত্তান্ত কি না বলেছেন! তিনি বাইরে বলেছেন চা বাগানের গল্প ভেতরে তার সহকর্মীরা। নামাজ পড়া না পড়া নিয়েও রাজনীতির বিতর্ক হতে পারে আগে তা জানা ছিল না। স্বৈরাচারের ‘রাবারস্ট্যাম্প’, পার্লামেন্টেও ‘বাথরুম’ নিয়ে কথা হয়নি। গুপ্তবাবু হয়তো ঠিকই বলেছেন, ওপর থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে তা দু’পক্ষেই।

জাতি কি তামাশা দেখছে? অনেকেই দেখছেন। মনের মধ্যের সমস্ত অশ্লীল চিন্তাভাবনা এবং শব্দমালায় এখন মাতোয়ারা হয়ে আছে সংসেেদর বাজেট অধিবেশন। নতুন স্পিকার বিস্ময় চাপা দিতে পারছেন না তার অভিব্যক্তি, বিস্ফোরিত বিস্ময়ের। গুপ্তবাবুরা খামোশ মেরে যাচ্ছেন, বিরোধী দলের ভারপ্রাপ্ত চিফ হুইপ তরুণ হলেও সংযত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। কিন্তু কেউ তো শুনছে না কারো সাধু বাক্য!

আমার বিচার বুদ্ধি আমাকে কেবল ওই মানিক মিয়া এভিনিউ বা রোকেয়া সরণি দিয়ে হাটতেই নিষেধ করছে না আরও ভাবাচ্ছে

এই সব বাক্য, শব্দ, আচরণ যে নতুন প্রজন্মে যাতে শিশুরা এখন যদি তাদের বাবা মার কাছে তাদের জন্ম বৃত্তান্ত জানতে চায়! যদি ওইসব ‘সংসদীয় শব্দ’ ব্যবহার করে! কিছুদিন আগে একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক একটি টকশোতে বলেছিলেন, ‘আমি চাই না আমার সন্তান সংসদ নেতার ভাষায় কথা বলুক’। তিনি এখন টকশোর জন্য অবাঞ্ছিত, কালো তালিকাভুক্ত। এই সব কালো কালিমাময় বিষয়গুলোর আমাকে ত্যক্তবিরক্ত করে তোলে। বিষন্নতার বদলে আমাকে বিচলিত, উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত করে ফেলে।

হতাশ হতে পারলে হয়তো ভালো হতো। ভালো হতো নিজেকে কেটে ছিঁড়ে রক্তাক্ত করে ফেলতে পারলে। কিন্তু আমি তো আত্মপীড়নে বিশ্বাসী নই। আমি আলো দেখতে চাই, সুস্থ সুন্দর মানুষ দেখতে চাই, আমি সুশোভন ভাষার বাগ্মীতা শুনতে চাই, আমি চাই জনগণকে রক্ষা করুক এই সংসদ। সংসদ নেত্রী থেকে সবাইকে অনুরোধ, দয়া করে কোথাও একটু থামুন। নিজেদের গায়ে নানা রঙের লেবেল লাগাবেন না। হয়তো আমার এ কথা শুনবেন না না শুনুন। আমি অলিগলিতেই হাটবো। তবুও ওই সংসদের পথে আর না।।

abir59@gmail.com