Home » শিল্প-সংস্কৃতি » সমকামিতার বিপ্লব না বিপর্যয়?

সমকামিতার বিপ্লব না বিপর্যয়?

ফ্লোরা সরকার

blueশিল্ডারস লিস্ট’ খ্যাত চলচ্চিত্রকার স্টিভেন স্পিলবার্গ এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে যিনি জুরিবোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলেন উৎসব প্রাঙ্গণে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করলেন – “কোন ধরণের রাজনৈতিক আলোচনা আমাদের মাঝে হতে দেয়া হয়নি, কোন ধরণের রাজনীতি আমাদের এই ঘরটিতে (জুরি বোর্ড) নেই।” যদিও বিশ্ব জুড়ে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে রাজনীতির ঝোড়ো হাওয়া সেই সময়ে বয়ে চলছে। এমনকি খোদ ফ্রান্সে ঠিক গোল্ডেন পাম ঘোষণার দিন উৎসব কেন্দ্রের বাইরে সদ্য পাশকৃত সেই দেশেরই একটি আইনের বিরুদ্ধে মানুষ জড়ো হয়ে প্রতিবাদ করছিল। আইনটি কি এবং প্রতিবাদই বা কেনো? ফ্রান্সের অভ্যন্তরে সমকামী বিবাহকে কিছুদিন আগে আইনানুগভাবে বৈধতা প্রদান করায় তার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ। এবং বলাই বাহুল্য এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ব্লু ইজ দ্যা ওয়ার্মেস্ট কালার’ ছবিটিকে উৎসবের সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড সেই গোল্ডেন পাম’এ ভূষিত করে হয়তো সেই প্রতিবারের মুখে আরো একটু দাহ্য পদার্থ ঢেলে তাকে প্রজ্বলিততর করা হলো। কেননা যে আইনের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ সেই আইনের স্বপক্ষে ছবিটি নির্মিত। ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডে প্রথম সমলিঙ্গের বিয়েকে আইনগত বৈধতা দানের পর থেকে ধীরে ধীরে আরো দশটি দেশ সেই পথ অনুসরণ শুরু করে। গত বছর পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই আইনানুগ বৈধতা প্রদান করা হয়। বিশ্বচলচ্চিত্রের প্রাঙ্গণে বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে তাই অন্যসব বিষয়ের চলচ্চিত্রকে ডিঙ্গিয়ে ‘ব্লু ইজ দ্যা ওয়ার্মেস্ট কালার’ যে গোল্ডেন পাম’ জিতে নিবে তা খুব স্বাভাবিক ভাবেই অনুমান করা যায়। জুরি বোর্ডে তাই স্পিলবার্গ রাজনীতির স্পর্শ লাগেনি বলে বেশ অহংকারের সঙ্গে ঘোষণা করতে পারলেন। গত ১ জুন প্রকাশিত ‘দ্য ইকনমিস্ট’ পত্রিকায় তাই ছবিটি প্রসঙ্গে মন্তব্য করা হয় – “…বিগত বছরগুলোর জুরিবৃন্দ ক্ষতিকর রাজনৈতিক ছবিগুলো পরমানন্দের সঙ্গে বাছাই করে নিতেন। ২০০৪ সালে মাইকেল মুর তার অ্যান্টিবুশ নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র “ফারহেনহাইট ৯/১১” যখন আওয়ার্ড পেলো, তখন মাত্র বিশ মিনিটের জন্যে জয়োধ্বনি করতে দেখা গিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেই জয়োধ্বনির ধ্বনি স্থানান্তরিত হয়েছে কিছু উত্তেজক ছবির ক্ষেত্রে, যেমন ক্রিশ্চান মুংলুর ‘ফোর মান্তস্, থ্রি উইক্স অ্যান্ড টু ডেস্’ (অ্যাবরশান) অথবা কেন লোয়াচ নির্মিত ‘দ্যা উইন্ড দ্যাট শেকস্ দ্যা বালি ’ ইত্যাদি।” কাজেই বোঝা যাচ্ছে কোন গ্রান্ড ন্যারেটিভ রাজনৈতিক বিষয়ের চাইতে মেটা ন্যারেটিভ উত্তেজক ছবিই বর্তমান বিশ্বচলচ্চিত্রে ক্রমে ক্রমে স্থান করে নিচ্ছে।

তিউনিসিয়ার বংশোদ্ভূত চিত্রপরিচালক আব্দেল লাতিফ কেশিশে ছবিটি নির্মাণ করেন ফ্রান্সে এবং ফ্রান্সের অভিনেত্রীদের দিয়ে। ছবিটি তিনি ফ্রান্সের তরুণ সমাজ এবং তিউনিসিয়ার সদ্য সমাপ্ত বিপ্লবীদের (যা ‘আরব বসন্ত’ নামে খ্যাত) উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। তার ভাষ্যমতে, তারা (তিউনিসিয়ার জনগণ) পূর্ণ স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যে ব্যাকুল বাসনা কামনা করেন, আর সেই সঙ্গে সেই স্বাধীনতা যেখানে ভালোবাসার পূর্ণ অধিকার আদায় করতে পারেন – (দ্য গার্ডিয়ান, ২৬ মে, ২০১৩)। যদিও তিউনিসিয়ার বিপ্লবযা গত ১৮ ডিসেম্বর ২০১০ থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত, মোট তিন সপ্তাহ ছয়দিন স্থায়ী হয়েছিল, যেখানে মূল ইস্যুগুলো ছিল প্রধানত সরকারি দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক দমনপীড়নকে কেন্দ্র করে। হতে পারে মত প্রকাশের তথা স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে আরও বৃদ্ধি ঘটাবার লক্ষ্যে তার এই উৎসর্গ। কিন্তু বিপ্লবের উদ্দেশ্য এবং কেশিশির উৎসর্গের মধ্যে বিভাজনের একটা সরু রেখা বিরাজ করে। কেননা আওয়ার্ড পাবার পর সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি যখন বলেন – “ফ্রান্সের তরুণ সমাজ আমাদেরই অগ্রগামী চিন্তা ধারার তরুণ সমাজ, যারা পৃথিবীর কাছে উন্মুক্ত হয়ে থাকতে চান। তিউনিসিয়ার তরুণ সমাজও তাই এবং সেই কারণেই সেই বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল। কিন্তু বৃদ্ধরা তখন সেই বিপ্লবে কর্ণপাত করেননি (দ্য গার্ডিয়ান, ২৬ মে, ২০১৩)।”

এখানে পাঠকদের উদ্দেশ্যে একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ১৮৮১ সালে বাড়ডো চুক্তির মাধ্যমে তিউনিসিয়া ফ্রান্সের উপনিবেশের অধীনে চলে আসে যা ১৯৫৬ পর্যন্ত তিউনিসিয়ার স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত বহাল ছিল। উপনিবেশ স্থাপনকারী একটি দেশ এবং উপনিবেশিত দেশের তরুণ সমাজ তথা বৃহত্তর জনগোষ্ঠির মনোজগত কখনই এক ভাবে গড়ে উঠে না। সেখানে প্রভু ভৃত্তের একটি অলিখিত চুক্তি সর্বদা বিরজা করে। উত্তর উপনিবেশিক দেশগুলোর সব থেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো যে দেশের অধীনে তারা উপনিবেশিত থাকে স্বাধীনতা পাবার পরেও সেই দেশেরই পরোক্ষ উপনিবেশে পরিণতি লাভ করে। তিউনিসিয়ায় আরবি ভাষা অফিসিয়াল ভাষা হলেও সেখানে তিনটি ভাষা আরবি, ফরাসি এবং বারবার (তিউনিসিয়ার আদি ভাষা) জনপ্রচলিত ভাষা। ভাষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকে উপনিবেশিত দেশগুলোতে সে সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবগত। কেশিশির ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেছে কিনা তা ভিন্ন আলোচনার দাবি রাখে। তবে ছবিটি এখনো খোদ তিউনিসিয়ায় মুক্তির মুখ দেখেনি তা বলাই বাহুল্য। এবারে আমরা ছবিটির দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক।

জুলি মারোর ফরাসি গ্র্যাফিক নভেল (যার মূল ফরাসি নাম – ‘লা ভি দা’আদেলে’ বা ‘আদেলের জীবন’) এর কাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ‘ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার’। ঊনিশ বছর বয়সী তরুণী আদেলে, যে কিনা ভবিষ্যতে একজন স্কুলশিক্ষক হবার বাসনা রাখে, সে একটি মিশ্রসংস্কৃতির স্কুল লিলেতে পড়াশোনা করে। কাহিনীর গতির সঙ্গে সঙ্গে তার মনোজগতের যা একান্তই নারীর জগত, তার রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে। প্রথমে সে ছত্রভঙ্গ হয়, তারপর ভাবাবেগের পরম উচ্ছাস ঘটে এবং সব শেষে বিষাদময়তার ভালোবাসায় যার পরিণতি রূপ লাভ করে। এমা নামের আরেক তরুণী, যে আর্টস্কুলে পড়াশোনা করে, তার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই এমার নীল চুলের প্রতি আদেলে আকৃষ্ট হয় এবং গভীর প্রেমে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। পুরো কাহিনী জুড়ে নারীসুলভ ভাবালুতামুক্ত আবেগ, গভীর প্রণয় বা আসক্তি, ক্রোধ আর আত্মসমর্পণহীন ভালোবাসার নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। সমলিঙ্গের ক্ষেত্রে পরিচালক কেশিশে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে নারীসমকামীতা তথা লেসবিয়ানদের সামনে এনে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যে জন্যে তিনি হয়তো বেছে বেছে ঠিক সেই ধরণের একটি গল্প বেছে নিয়েছেন যেখানে পুরুষের সমকামীতার পরিবর্তে নারীর সমকামীতাকে দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। শুধু তাই নয়, পূর্ণ স্বাধীনতার প্রশ্নে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী হিসেবে তিনি এমন কয়েকজনকে বেছে নিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে দর্শকদের কোন দ্বিমত রাখার অবকাশ থাকবে না। যেহেতু পূর্ণাঙ্গ ছবিটি এখনো এখানে আসেনি তবে ওয়েবসাইটে ছবির একটি প্রমোতে আদেলে আর এমার কয়েকটি সংলাপ থেকে আমরা তা থেকে ধরার চেষ্টা করছি

আদেলে ওসব আমার কাছে কোন বিষয় না। সমগ্র মানবজাতির জন্যে উনি একটা বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন তোমরা তোমাদের জীবন কোন উন্নততর নৈতিকতা ছাড়াই বেছে নিতে পারো। হাইস্কুলে পড়ার সময়ে আমি সার্ত্র (জঁ পল সার্ত্র) এর খুব ভক্ত ছিলাম। তার দৃঢ়তা, স্বাধীনচেতা মনোভাব আর তার মূল্যবোধ এসব আমার অনেক উৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি একাগ্রতা। —-

এমা অনেকটা বব মার্লির মতো?

আদেলে কি জানি হতে পারে। —-

এমা বব মার্লিও সার্ত্রের মতো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। একজন ঈশ্বর প্রেরিত পুরুষ আর দার্শনিকের মাঝে আমি কোন তফাৎ দেখি না ।”

বুঝতে অসুবিধা হয়না বেশ সাহসী সংলাপ দুটো চরিত্রের মাঝে আমরা দেখতে পাই। জঁ পল সার্ত্র এবং বব মার্লি দুজনই ষাটের দশকে বিখ্যাত দুই ব্যক্তিত্ব, একজন দর্শনের জগতে আরেকজন সঙ্গীতের জগতে। তবে সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দর্শন স্বাধীনতার প্রশ্নে সমকামীতাকে কতটুকু প্রশ্রয় দিয়েছেন সেটা বিতর্কের দাবী রাখে। আর বব মার্লি পপ সুপার স্টার হলেও রাস্তাফারি আন্দোলন অর্থাৎ আফ্রিকান ভিত্তিক আধ্যাত্মবাদী ভাবাদর্শিক আন্দোলনের সঙ্গে শুধু জড়িতই ছিলেন না, আন্দোলকে এগিয়ে নেয়ার জন্যে সেই সময়ে পৃথিবীময় আলোড়ন তুলেছিলেন পর্যন্ত। তাদের প্রসঙ্গে ধর্ম আর দর্শনকে এক করে ফেলাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত তাও বিতর্কের দাবি রাখে। তাছাড়া কোন ধর্মে সমকামীতার কোন স্থান আছে বলে অন্তত আমাদের জানা নেই। এই সবই আরো বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তা সম্ভব নয়। তবে যে বিষয়টি সব থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা হলো সমকামীদের উদ্দেশ্যে ছবিটি নির্মিত হলেও তার মূল কেন্দ্রে ছিল মানব প্রেম। কিন্তু সেই প্রেম বিষয়টি যখন শুধু ভিন্ন নয় বিকৃত ভাবে উপস্থাপিত হয় তখন তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন জাগে। বিষয়টি আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে পরিস্ফুট হবে।

আদেলে আর এমার প্রেম কাহিনীর মধ্যে দিয়ে পরিচালক প্রেমের চিরন্তরতার বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছেন। যা অত্যন্ত সৎ একটি প্রচেষ্টা। শুধু তাই নয়, সেই প্রেমের মাহাত্য তিনি সমকামী প্রেমিক যুগলের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। যাতে সমাজে সমকামীদের প্রতি সহানুভূতির উদ্রেগ ঘটে। কিন্তু তাদের ভালোবাসার বিষয়টিকে উন্মোচিত করতে যেয়ে পরিচালক এতোটাই উন্মোচন করে ফেলেন যে সমকামীদ্বয়ের যৌনদৃশ্যের বেশকয়েকটির মধ্যে একটি দৃশ্যের স্থায়িত্ব প্রায় দশ মিনিট কাল ব্যাপী দেখানো হয়। ছবিতে সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান অধিকার করে থাকে। সেখানে নারীপুরুষের সাধারণ যৌনতার দৃশ্য সামান্য বেশি সময় হলেই তা কাহিনী রেখে সেই দিকেই দর্শকের মনোযোগ অধিকতর আকর্ষিত হতে থাকে। সেখানে দুজন লেসবিয়ানের যৌনতার দৃশ্য (নান্দনিক উপস্থাপন হলে ভিন্ন কথা) যদি নান্দনিকতার বাইরে যেয়ে বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন ছবির কাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠে। ঠিক যে প্রশ্নটি জুলি মারো উত্থাপন করেছেন (লেসবিয়ানদ্বয়ের যৌন দৃশ্যগুলি সম্পর্কে) একটি ব্লগে তার লিখিত বক্তব্য গত ৩০ মে দ্য গার্ডিয়ান এ সে সম্পর্কে লেখা হয় – “জুলি মারো তার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবি, ‘ব্লু ইজ দ্যা ওয়ার্মেস্ট কালার’ নিয়ে খুবই বিব্রত বোধ করছেন। একটি ব্লগে তিনি জানান – ‘ছবির কিছু কিছু জায়গা বাদ দিলে যৌন দৃশ্যগুলো অত্যন্ত বর্বর এবং শল্যচিকিৎসামূলক প্রদর্শনের মতো মনে হয়েছে, অসংযত এবং অমিতাচার সদৃশ এবং যা শেষ পর্যন্ত পর্নো ছবিতে রূপান্তিত হয়েছে। বিশেষ করে ছবির মধ্য পর্যায়ে দর্শক রীতিমতো মুখ চেপে হাসছিল। যারা প্রচলিত যৌনাচারে বিশ্বাসী তারা হাসছিলেন অনেকটা না বোঝার কারণে এবং দৃশ্যগুলো তাদের কাছে অনেকটা হাস্যস্পদ মনে হবার কারণে। সমকামী এবং কিছুটা সন্দেহপ্রবণ দর্শক হাসছিলেন, কারণ দৃশ্যগুলো তাদের যৌনকর্মটিকে সন্দীহান করে তুলছিল এবং একইসঙ্গে হাস্যস্পদ। সবশেষে কিছু দর্শক যাদের হাসতে দেখা যায়নি সেই গুটিকয়েক সমকামীদল পর্দায় অন্য সমকামীর শরীরী উপস্থিতিকে নিজেদের জায়গায় বসিয়ে একটা কল্পনার রাজ্যে চলে যাচ্ছিলো। একজন নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে সেসব দৃশ্য কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। তবে সব নারীর ক্ষেত্রে তেমনটা নাও ঘটতে পারে। এটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা জানালাম।” এভাবেই জুলি মারো ‘ব্লু ইজ দ্যা ওয়ার্মেস্ট কালার’ এর লেখিকা তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। যদিও অনেকে তার সঙ্গে সহমত পোষণ নাও করতে পারেন। তবে সমকামীদের ভালোবাসার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা যে উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে ছবির কাহিনী আবর্তিত সেটাই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে সমাজে সবার কাছে সমকামীদের গ্রহণযোগ্য করে তোলাটা শুধু কঠিনতর হবে তাই নয়, সেই সঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

শুধু তাই না, যেই বিপ্লবীদের সম্মানে ছবিটি উৎসর্গ করা হয়েছে তিউনিসিয়ার সেই তরুণ প্রজন্ম সহ বিশ্বের অন্য সব দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্যেও ছবিটি বিপ্লবের পরিবর্তে বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসাটাও অসম্ভব কিছু নয়। সমকামের বিষয়টি পৃথিবীতে অনেক আগেই থেকেই বিরাজিত ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে। তাদের প্রতি সমাজের সদয় দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র অন্যতম একটি মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু সেই চলচ্চিত্র যদি এমন ভাবে চিত্রায়িত হয় যেখানে ধর্ম আর দর্শন একাকার হয়ে যায়, সমকামীদের প্রতি সহানুভূতি দূরে থাক তাদের হাস্যস্পদ করে তোলা হয়, ভালোবাসার পরিবর্তে যৌনতা প্রদর্শন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, সমকামীদের সমকামের দিকে উদ্বুদ্ধ বা প্রলুব্ধ করে তোলা হয় তাহলে তা অবশ্যই বিপ্লব না ঘটিয়ে বিপর্যই ডেকে নিয়ে আসবে। এ যেন মানবতাবাদী দার্শনিকদের ব্যবহার করে মানবতার বিরুদ্ধেই মস্করা করার সামিল। স্পিলবার্গের কাছে হয়তো তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক বিপ্লবের থেকে সমকামীদের বিপ্লব অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। তাই জুরিবোর্ডে বেশ সহাস্যবদনে বলে ওঠেন “এখানে কোন রাজনীতি নেই”। স্পিলবার্গের মতো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের চিত্রপরিচালক ও জুরিরা উত্তরউপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন প্রয়োজন বোধ করেন না। অথচ তিউনিসিয়ার সেই বিপ্লবের সম্মানে একটি যথার্থ রাজনৈতিক ছবিরই প্রয়োজন ছিল। যে বিপ্লবের ছবি অন্যান্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীল দেশগুলোকে বিপ্লবে উৎসাহিত করতো এবং সমকামীতার চেয়ে আরো গুরুতর অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতো।।