Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – ড. বদিউল আলম মজুমদার

সাক্ষাৎকার – ড. বদিউল আলম মজুমদার

জনগণ যে সব গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন তা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর জন্যই কি অশ্লীল কথাবার্তা বলা হচ্ছে?

Badiul Alam Majumdar. বদিউল আলম মজুমদার, নাগরিকদের সক্রিয়বাদী সংগঠন ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’-এর মহাসচিব এবং একজন সক্রিয়বাদী। জাতীয় সংসদে অশ্লীল শব্দমালা ব্যবহার, গণতন্ত্রের উপরে এর প্রতিক্রিয়াসহ এ সম্পর্কিত বিষয়ে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: বর্তমানে জাতীয় সংসদে যে সব শব্দাবলী ব্যবহৃত হচ্ছে তাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

বদিউল আলম মজুমদার: জাতীয় সংসদ একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটা কার্যকর নয়। যখন বিরোধী দল সংসদে অংশ নেয় তখনো তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। সরকারি দলও রাবার স্ট্যাম্প প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংসদকে পরিণত করেছে। জাতীয় সংসদ কার্যকর না থাকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অশ্লীল কথাবার্তা, অশ্লীল বক্তব্য। সরকারি এবং বিরোধী দল উভয়ের পক্ষ থেকে এটা করা হচ্ছে। আর যে সব ভাষা তারা ব্যবহার করেন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তা ভাবতেও লজ্জা লাগে। আমাদের সংসদ সদস্যরা, যারা জনগণের প্রতিনিধি, তারা এমন অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করতে পারেন এবং এর মাধ্যমে তাদের সহকর্মীদের ঘায়েল করার চেষ্টা করতে পারেন, তা অকল্পনীয়, অচিন্তনীয়। এটা আমরা কখনো ভাবিনি, ভাবতেও পারি না। তাদের বক্তব্য যখন শুনি, তখন আমাদের মাথা লজ্জায় নুয়ে যায়।

আমাদের বুধবার: কিন্তু সংসদে তো আইন প্রণয়ন, জনসম্পৃক্ত বিষয়সহ ওই সব বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা

বদিউল আলম মজুমদার: সংসদের কতোগুলো সুস্পষ্ট দায়িত্ব আছে, কতোগুলো করণীয় আছে। একটি দায়িত্ব হচ্ছে, আইন প্রণয়ন, আইন পাস, পরিবর্তন এবং এর পরিবর্ধন করা। অন্য দায়িত্ব হচ্ছে, সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা নীতিনির্ধারণ করবেন, আলাপআলোচনা করবেন, যুক্তি তর্কের মাধ্যমে এসব বিষয় নির্ধারণ করা তাদের কাজ, অশ্লীল বিষয় বা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। এছাড়া সরকারের আয়ব্যয়, বাজেট অনুমোদন করাও সংসদের দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে মূল দায়িত্বে মনোনিবেশ না করে তারা কেন এ ধরণের কাজে নামলেন, অশ্লীল কথাবার্তায় লিপ্ত থাকছেন তা আমাদের জানা নেই। জনগণ যে সব গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন তা থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর জন্যই কি অশ্লীল কথাবার্তা বলা হচ্ছে? সংসদে যা হচ্ছে, তা চরমভাবে নিন্দনীয়।

আমাদের বুধবার: শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দও এ ধরণের বক্তব্য দিচ্ছেন। এতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় সংসদ জনগণের আস্থা কতোটা হারাচ্ছে?

বদিউল আলম মজুমদার: দুঃখজনক বিষয়টি হচ্ছে, এসব বক্তব্য দেয়া হচ্ছে সংসদ নেত্রী, উভয় দলের ঊর্ধ্বতন নেতা, হুইপসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সংসদে উপস্থিত থাকাকালীন সময়ে। আবার তারা নিজেরাও কেউ কেউ এমন বক্তব্য দিয়ে থাকেন। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হচ্ছে, যখন সরকারি দলের কেউ এ ধরণের বক্তব্য দেন বা বিরোধী দলের কেউ বক্তব্য রাখেন তখন আপন আপন দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে তাদের উৎসাহিত করেন। জাতীয় সংসদে অশ্লীলতার নামে যা হচ্ছে তা কোনো ভদ্র সমাজের আচরণ বলে মনে হয় না। এটা একটা চরম অপরাধ। কারণ সংসদে প্রিভিলেজ কমিটি বা বিশেষ অধিকার কমিটি বলে একটি কমিটি আছে। সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অধিকার রক্ষা এবং অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যেই এই কমিটি। এই কমিটির দায়িত্ব হলো কেউ যদি সংসদ বা সংসদ সদস্যদের অবমাননা করেন বা সংসদের অবমাননা হয় এমন কোনো আচরণ যদি কেউ করেন তাহলে তারা বিরুদ্ধে বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। যে ধরণের বক্তব্য দেয়া হচ্ছে, তার মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অবমাননা করছেন। সংসদের মর্যাদা জনগণের সামনে হেয় করা হচ্ছে, ভুুলুণ্ঠিত করা হচ্ছে। আমি মনে করি, বিশেষ অধিকার কমিটি এবং স্পিকার তাদের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। কার্যপ্রণালী বিধিতে এর বিধান রয়েছে। তাদের বহিষ্কারও করা যায়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ধরণের অনেক নজির আছে। একবার এক সঙ্গে ১১ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে কোটারী স্বার্থে তারা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। অশ্লীল বক্তব্যের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। কারণ নিজেদের বিরুদ্ধে তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে চান না। আমি মনে করি, কোনো কোনো সংসদ সদস্য জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা হারিয়েছে, তাদের আচরণের মাধ্যমে। তাদের বিরুদ্ধে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। জনগণের প্রতিনিধি হলে জনগণেরই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা যদি ক্ষুন্ন করা হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এখন সরকারি এবং বিরোধী উভয় পক্ষ থেকেই এই অপকর্মটি করা হচ্ছে।

আমাদের বুধবার: এখানে সরকারি দলের দায়িত্ব তো সবচেয়ে বেশি

বদিউল আলম মজুমদার: নিঃসন্দেহে। সংসদ নেতা এবং সরকারি দল সংসদ সদস্যদের চারপঞ্চমাংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। অবশ্যই তাদের দায়িত্ব বেশি। তবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সরকারি দলের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

আমাদের বুধবার: এতে গণতন্ত্র কতোটা সঙ্কটাপন্ন হচ্ছে?

বদিউল আলম মজুমদার: সংসদ হলো সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। সংসদ অকার্যকর কিন্তু এরপরও যদি এ ধরণের অশ্লীল বক্তব্য ও কথামালা ব্যবহৃত হয়, পুরো জাতির মুখে যদি কলঙ্ক লেপন করা হয় তা কোনোক্রমেই গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়, শুভ নয়, বরং এটা গণতন্ত্রের জন্য চরমভাবে ক্ষতিকর। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার ক্ষেত্রে এসব ঘটনা বড় ভূমিকা রাখছে।

আমাদের বুধবার: সংসদ সদস্যদের আচরণ কি অগণতান্ত্রিক শক্তিকে উসকানি দিতে পারে?

বদিউল আলম মজুমদার: প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষ যদি আস্থা হারিয়ে ফেলে, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকে অর্থাৎ খুটিগুলোর উপর যদি মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়, তাহলে খুটিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে। সে অবস্থায় অবশ্যই অগণতান্ত্রিক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উপরে মানুষকে আস্থাশীল করতে হবে। কিন্তু অশ্লীলতা, ব্যক্তি আক্রমণের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে যা চলছে, নিঃসন্দেহে তা মানুষের আস্থাহীনতার সৃষ্টি করছে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।