Home » বিশেষ নিবন্ধ » সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী – নোঙরের মানুষ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী – নোঙরের মানুষ

২৩ জুন শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাতাত্তরতম জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁর প্রতি আমাদের বুধবারএর পক্ষ থেকে জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

ফারুক ওয়াসিফ

SIC sirসেবার খুব বন্যা হয়েছিল, সম্ভবত ১৯৯৮ সাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যাকাশে উড়ছি আর গোত্তা খেয়ে পড়ছি। সেরকম এক দিনে, বলা ভাল বিকাল বেলায়, ঢাকা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরতে ফিরতে পড়ছিলাম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘আমার পিতার মুখ’। আরিচা সড়ক ডুবে গিয়েছিল বলে বাস চলছিল আশুলিয়া দিয়ে। বন্যার পানিতে সেই রাস্তাও ডুবুডুবু। সম্ভবত, ওখানেই বইটা পড়া শেষ হয়। আর রেখে যায় বুকচাপা বিষণ্নতা। বাইরের জলাশয়ের ঢেউছলছল পানি, আর নীলক্ষেত থেকে কেনা মলিন পুরনো বইটা থেকে উপচানো কান্না একাকার হয়ে যেতে চাইছিল। অনেকটা ব্যক্তিগত আলেখ্যের ঢঙে লেখা বলেই হয়তো, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মনের সকল আর্দ্রতা তাঁর গদ্যভাষাকেও ভিজিয়ে রেখেছিল। এই লেখক তেমন একজন, যাঁকে শনাক্ত করতে হয় তাঁর ভাষা আর তার মধ্যে মিশিয়ে রাখা সংবেদনশীল মন দিয়ে।

প্রথম তারুণ্যে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। মফস্বলে বসে সেই বেকনের মৌমাছিরা, সেই বৃত্তের ভাঙ্গাগড়া, সেই নিরাশ্রয়ী গৃহ, সেই কুমুর বন্ধন পড়বার রোমাঞ্চিত দিনগুলি মনে পড়ছে। সেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাতাত্তরে পড়লেন গত রোববার। সেই জগতের মানুষ তিনি, যে জগতে স্বপ্ন ছিল, ইতিহাসে মুক্তির প্রতিশ্রুতি জনসমাজে প্রতিধ্বনি তুলতো। বর্তমানের থেকে আরো মানবিক আরো উচ্চতর সামাজিক অস্তিত্বের সম্ভাবনায় ভরসা ছিল। সমাজতন্ত্র তখনও কল্যাণের ইউটোপিয়া হিসেবে হলেও দারুণ সক্রিয় ও সবল ছিল। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর যাবতীয় কাজকর্ম সেই স্বপ্নের মধ্যাকর্ষণে বাঁধা ছিল।

আজকের পৃথিবী চলছে ‘উইদাউট এনি অলটারনেটিভ’। এরকম সময়ে বিদ্বান, বুদ্ধিজীবী, লেখকের একদিকে ক্ষমতা অন্যদিকে জনতা এবং বিশেষজ্ঞের বেশে তাঁদের বেশি পাওয়া যায় ক্ষমতার ঝালরের তলেই। সামাজিক সম্পর্ক ও পাবলিক পরিসর বলতে যখন কিছু নেই, তখন বুদ্ধিজীবী তো ‘বাহিরের লোক’। এডওয়ার্ড সাঈদ নিজেকে সবসময় ‘নির্বাসিত’ মনে করতেন। তাঁর কাছে বুদ্ধিজীবী তিনি, যিনি মানুষের মুক্তি ও জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যান। আর এজন্য তাঁকে প্রায়শই সমাজ ও তার প্রতিষ্ঠানের বাইরে দাঁড়িয়ে সক্রিয়ভাবে কায়েমি ব্যবস্থাকে জ্বালাতন করতে হয়। সাঈদের বুদ্ধিজীবী একইসঙ্গে সমাজের অংশ এবং তাঁর কাজ হলো যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা।

দীর্ঘসময় ‘সংবাদ’ পত্রিকায় ‘গাছপাথর’ কলামের মাধ্যমে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কেবল ক্ষমতাকেই প্রশ্ন করে যাননি, গড়পরতা পাঠকের চিন্তাশীলতার শুশ্রুষাও করে গেছেন। শিক্ষক হিসেবে, গবেষক হিসেবে, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, সম্পাদক, অনুবাদ এবং সমাজসংগঠক হিসেবে এই কাজই করে গেছেন গত চার দশক ধরে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ যে ক’জন মৌলিক চিন্তক পেয়েছে তিনি তাঁদের সামনের সারির একজন। কিন্তু দরবারি ডাঁট আর ক্ষমতার ঠাঁটবাটের সঙ্গে তিনি কদাচ যান না। যে প্রতিবাদী মূল্যবোধ তাঁর গদ্যে ও প্রতিবাদী তৎপরতায় জাহির হয়ে আছে, তাঁর সঙ্গে জড়িত ছিল একটি সিদ্ধান্ত। ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেও তিনি যে, বাংলাকেই লিখবারবলবার মাধ্যম করলেন, সেটা অবশ্যই তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। তাঁর গদ্যের স্থিতিস্থাপক পেশী আর কোমল সংবেদন দিয়ে তিনি বুদ্ধিবৃত্তির মানবিকায়ন ঘটান। এর আস্বাদন সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতার সমান। তাঁর এই শিল্পী মনের গহনপুরের খোঁজ মেলে তাঁর কথাসাহিত্যে। হয়তো প্রাবন্ধিকের ছদ্মবেশে তিনি একজন শিল্পীই, অথবা শিল্পীর সমান্তরালে একজন সমাজতাত্ত্বিক।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কখনো ভোলেননি যে, তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একজন। তাঁর আজীবনের কাজও প্রমাণ করে, চিন্তায় ও কাজে তিনি এই শ্রেণীটিকে কখনো পরিত্যাগও করেননি, কখনো ছাড়ও দেননি। এই বাঙালি মধ্যবিত্তের জগতকে তিনি যেভাবে ছিঁড়েকুটে দেখেছেন, দেখেছেন তার সীমা ও সংকট; তাতে তিনি নিজেই পরিণত হন এই শ্রেণীর অন্তর্যামী সমালোচক। ‘ঊনিশ শতকে বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যকরণ’ বা ‘শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ’ নামক অভিসন্দর্ভে তিনি এই শ্রেণীটির মানসব্যকরণের সাংস্কৃতিক সুলুকসন্ধান করেন। যে মহিমা ও আত্মতুষ্টির বলয়ে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক মহাশয় নিজেকে বহুগুণে বিম্বিত করে দেখায় আরাম পায়, সেই বলয় ছিন্ন করা ছাড়া মধ্যবিত্তের ঔপনিবেশিক নাড়িবন্ধন কাটা যেত না। বিনয় ঘোষ ও বদরুদ্দীন উমরের ধারাবাহিকতায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই কাজ একটানা করে গিয়েছেন এবং যাচ্ছেন। তাঁর সর্বশেষ বাঙালি জাতীয়তাবাদ গ্রন্থটি তারই আরেক দলিল। বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলোর বিশ্লেষণ, ঊনিশশতকীয় মহাপুরুষদের মানসকীর্তির পর্যালোচনা, কিংবা বহুল কথিত বঙ্গীয় রেঁনেসার অন্তর্গত পরজীবিতার উন্মোচন; খেয়াল করলে দেখা যায় সবই এক লক্ষ্যের দিকে ধাবিত। তা হলো চেতনার বিউপনিবেশীকরণ। দীর্ঘ পরাধীনতা ও উপনিবেশিকতার এই সাংস্কৃতিক নির্মাণকে ফ্যানো’র ভাষায় ‘আনলার্ন’ করা ছাড়া যে কি বাঙালি মধ্যবিত্ত কি বিপ্লবী জনশক্তি, কারুরই চিত্তের স্বাধীনতা আসবে না, আজীবনের কাজে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই জরুরতই জানিয়ে গেছেন। তুলনায় নয়, গুণে তিনি বাংলা ভাষিক জগতে সেই কর্ম সাধন করেছেন, এডওয়ার্ড সাঈদ যা করেছেন প্রাচ্যতত্ত্বের পর্যালোচনায়।

বিদ্বানের নিঃসঙ্গ নির্জনতা ও বুদ্ধিজীবীর সরব বলালেখা যদি কোথাও মিলে থাকে, তবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই বিরলতমদের একজন। হারানো মানবিকতার সন্ধান আর মানবের আত্মার নবায়ন যেখানে বিপ্লবী দায়িত্ব, সেখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মধ্যে প্রেরণার ঐকতান লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু যে জগত নিরন্তর বদলে যাচ্ছে, যখন মানুষ আরো বেশি উন্মূল ও ছিন্নমস্তিষ্ক বনে যাচ্ছে, যখন ব্যক্তিস্বার্থ সমষ্ঠি স্বার্থকে ঝেঁটিয়ে সরাচ্ছে, সেরকম এক সময়ে ইতিহাসের শেকড় সন্ধান, ভাষার মধ্যে মানবিকতার প্রতিষ্ঠা, জনগণের সংগ্রামের মধ্যে ইতিহাসের আশাবাদ খুঁজে দেখার সাধনা করা দুরূহ বৈকি। হয়তো এরকম বদলের সময়ে অবিকল থাকবার জেদ, আজীবন লালিত নীতিই হতে পারে বাস্তবতায় গাঁথা নোঙর। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই আপসহীনতার নোঙর আঁকড়ে আছেন, সেটা এই তরল সময়ে এক কঠিন উদাহরণ বটে।

আজীবন জনগণের সংগ্রামের সাথী থেকেছেন, জরুরি হয়ে পড়া প্রতিবাদে পিছপা হননি। ওসমানি উদ্যান রক্ষার আন্দোলন থেকে শুরু করে আড়িয়ল বিল রক্ষা আন্দোলনে সংগ্রামী বুদ্ধিজীবীতার আদলকে তিনি জীবন্ত রেখেছেন। তাঁর স্বাদু ও চিন্তাশীল গদ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মনে হারানো মানবিকতার পুনরুদ্ধারের ব্রত বুনে দিয়েছেন।

সময়ের সীমান্তে দাঁড়িয়ে, বৃত্তের পর বৃত্তের ভাঙ্গাগড়ার সাক্ষি হয়ে এখনো তিনি লিখে চলেছেন। তিনি এবং তাঁর মতো আরো ক’জন মিলে বাঁচিয়ে রেখেছেন ক্ষমতার দরবারের বাইরে জনতার হয়ে সওয়ালজবাব। কলাম ও টকশোগুলো যখন পাবলিক পরিসরকে ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে, তখনো সিরাজ স্যার পাবলিক বুদ্ধিজীবিতা আর বিদ্বানের মনীষা নিয়ে সজাগ আছেন; এটাই প্রেরণা। মার্কিন কবি এমারসন মনে করতেন, বুদ্ধিজীবী সর্বোপরি একজন পূর্ণ মানুষ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জীবনে সেই পূর্ণতার বিনয়ী প্রকাশ নাদেখার কথা নয়।

অনেকেই যখন ডানপিটে ডানপন্থি, তখন একজন পিতৃপ্রতিম বামের পথে অমোচনীয় মানবিকতার চলাচল জারি রেখেছেন; জন্মদিবসে তাঁকে অভিবাদন।।