Home » আন্তর্জাতিক » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ১)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ১)

আনু মুহাম্মদ

60's১৯৬০ দশক নিয়ে ঐ দশকের পাকিস্তানের প্রবাসী ছাত্রনেতা তারিক আলী একটা বই লিখেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন – ‘স্ট্রীট ফাইটিং ইয়ারস’। আসলেই ঠিক। ঐ দশককে এক নামে অভিহিত করতে গেলে এই নামটি যথার্থ। বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের অংশ, পূর্ব পাকিস্তান। সেই পাকিস্তানেও পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মতো এরকম অবস্থাই ছিল। ৬০ দশক একদিকে ছিল দেশে দেশে সামরিক শাসন জারীর মাধ্যমে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্রের আধিপত্য বিস্তারের সময়। সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর অনেকগুলোই তখন নতুন শৃঙ্খলে বন্দী হবার পথে, তারই একটি প্রকাশ ছিল মার্কিনপন্থী সামরিক অভ্যুত্থান। আবার একই সময়কাল ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও সামরিক বা অন্যধরণের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের বিস্তারেরও সময়।

বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিত নতুন দখল ও বিদ্রোহ

কোরিয়ায় পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে তার ধ্বংস ও আগ্রাসনের সর্বশক্তি নিয়োগ করে। লক্ষ লক্ষ মার্কিন সৈন্য ভিয়েতনামে নিয়ে যাওয়া হয়, সর্বাধুনিক মানব ও পরিবেশ বিধ্বংসী অস্ত্র প্রয়োগ করা হতে থাকে। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় ভিয়েতনাম, লক্ষ লক্ষ নারীপুরুষ শিশু বৃদ্ধ নিহত হন, বিষাক্ত বোমায় পুরো দেশ যেভাবে ক্ষতবিক্ষত হয় যেভাবে মাটি পানি বৃক্ষরাজি বিষাক্ত হয় তার চিহ্ন এখনও আছে। এখনও অনেকের শরীরে এমনকি পরের প্রজন্মের অনেক মানুষও সেই আক্রমণের ক্ষত বহন করে চলেছেন। কিন্তু সারা দুনিয়ার মানুষের মাথা উঁচু করে দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম, সবচাইতে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মাসের পর মাস বছরের পর বছর লড়াই করে গেছেন ভিয়েতনামের মানুষ। সেই লড়াই এতই তাপ সৃষ্টি করেছিল যে সারা দুনিয়ায় মার্কিন বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামও অনেক বেড়ে যায়। তা বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক বিপ্লবী আন্দোলনকেই সমৃদ্ধ করে। ভিয়েতনামের জনগণের প্রতিরোধের মুখে বহু মার্কিন সৈন্য নিহত হবার ফলে যুক্তরাষ্ট্রেও অভূতপূর্ব সর্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন সৃষ্টি হয়।

পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্র দেশগুলির তরুণদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও কর্মসূচি বিরোধী চেতনা ও সক্রিয়তা অনেকগুণে বেড়ে যায় এই দশকে। এই চেতনা ও সক্রিয়তা আরও সমৃদ্ধ হয় এসব দেশের মধ্যেকার নানা বৈষম্য ও নিপীড়ন বিরোধী উপাদান এর মধ্যে যুক্ত হওয়ায়। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা সেসময়ের ইউরোপ উত্তর আমেরিকার তরুণদের মধ্যেও প্রধান প্রবণতা হয়ে ওঠে। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রে বিরাট বিরাট ছাত্র আন্দোলনের জন্ম হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ‘হিপ্পি প্রজন্ম’ও যুদ্ধ বিরোধিতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠে। ৬০ দশকে যুক্তরাষ্ট্রে একদিকে যুদ্ধ বিরোধিতা অন্যদিকে দেশের ভেতর বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন বিস্তারের সঙ্গে সমাজে ক্রমাগত বিপ্লবী চিন্তাচেতনা ও সংগঠন শক্তিশালী হওয়ার সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। বিপ্লবী আন্দোলন আর তার মতাদর্শ সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা প্রকাশনা বিতর্ক ইত্যাদিও ক্রমে জোরদার হচ্ছিল তখন।

সেসময় যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা পশ্চিম ইউরোপের এমন কোন বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল যেখানে কোন না কোন মাত্রায় বিপ্লবী সংগঠন বা তৎপরতা ছিল না। তরুণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, লেখক, শিল্পীদের মধ্যে এর প্রভাব ছিল খুবই স্পষ্ট। শিল্প সাহিত্য সঙ্গীত চলচ্চিত্রে নতুন সৃষ্টিশীলতার ঢেউ তৈরি হয়েছে। একটি বিপ্লবী রূপান্তরের সংগ্রাম অত্যাবশ্যক এবং এতে অংশগ্রহণ করতে হবে এই তাগিদ নিয়ে তরুণ সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তখন অস্থির। যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে এই আকাঙ্খা আর সক্রিয়তা এত বেড়েছিল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রেসিডেন্টকে শুধুমাত্র সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতেও নিষেধ করেছিল।

এই ৬০ দশকে রাষ্ট্র পর্যায়েও তখন মার্কিন বিরোধী বিভিন্ন জোট গড়ে উঠছিল। সমাজতান্ত্রিক জোটের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে জোট নিরপেক্ষ জোট। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান নিয়ে মিশরের জামাল আবদেল নাসের, আলজিরিয়িার হুয়ারি বুমেদিন, ইন্দোনেশিয়ার সুকার্ণো, লিবিয়ার গাদ্দাফির পাশাপাশি বিপ্লবী নেতা হিসেবে চীনের মাও সে তুং, ভিয়েতনামের হো চি মিন, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, তানজানিয়ার জুলিয়াস নায়ারেরে বিশ্বের বিপ্লবীদের কাছে শুধু নয় সাধারণভাবে তরুণদের কাছে একেকজন নায়ক। দিকে দিকে স্বাধীনতা যুদ্ধ, সমাজ বদলের সংগ্রাম ইত্যাদিতে তাঁদের নাম উচ্চারিত হয়।

কিউবার নাম এক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিপ্লবী দুনিয়ায় নতুন এক শক্তি হিসেবে কিউবা তখন যুক্তরাষ্ট্রের উঠানে হাজির, মোকাবিলা করছে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক হুমকি, সামরিক অর্থনৈতিক অবরোধ। এশিয়া আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকা তখন একনামে উচ্চারিত হয়বিপ্লবের ক্ষেত্র হিসেবে। অনেকে তাই এই দশককে যখন বলেন ‘লাল দশক’ তখন তা সময়ের ধার ধারণ করেই বলেন। এই দশকেই তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে কৃষিতে বহুজাতিক সংস্থার দখল অভিযান শুরু হয় যে কর্মসূচি দিয়ে তাকে ‘সবুজ বিপ্লব’ নাম দেয়া তাই কোন নিরীহ ব্যাপার ছিল না। জনগণের লাল বিপ্লবের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছিল শাসকদের সাম্রাজ্যবাদীদের তথাকথিত সবুজ বিপ্লব।

বাংলাদেশ বা সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানও তখন প্রত্যক্ষ করেছে চিন্তা, বৃদ্ধিবৃত্তি, সংগঠন, মুক্ত সমাজের স্বপ্ন ও লড়াই এর এক সজীব দশক। পুরো পাকিস্তানই এই দশকে টালমাটাল ছিল, পথ খুঁজেছে নানাদিকে। একদিকে বিপ্লবীরা কাজ করেছেন বিপ্লবী আন্দোলন বিস্তারের, অন্যদিকে সেই সময়েই জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এই দুই কখনো এক সঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে কখনো বিরোধিতায় পতিত হয়েছে। সবশেষে জাতীয়তাবাদী স্রোতই শক্তিশালী হয়েছে। কীভাবে হয়েছে এবং কীভাবে শ্রেণী আন্দোলন ও নতুন সমাজের আকাঙ্খা বা বিপ্লবী তৎপরতাও বাঙালী মালিকদের প্রভাবিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়লো তার এক অসাধারণ বিশ্লেষণ পাওয়া যায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ এ।।

(চলবে…)