Home » প্রচ্ছদ কথা » ইমেজ সঙ্কটে বাংলাদেশ – বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া

ইমেজ সঙ্কটে বাংলাদেশ – বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

garment 3মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত করায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে দেশেবিদেশে। রফতানিসহ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কি প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে এ প্রশ্নে মতামত দিয়েছেন দেশের কয়েকজন খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র্রের জিএসপি স্থগিতের ফলে আন্তর্জাতিক ইমেজসংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে জিএসপি পাওয়া অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, জিএসপি স্থগিত দেশের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সাময়িকভাবে এর প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে না পড়লেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব অবশ্যই পড়বে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং কানাডার মতো দেশে জিএসপি অব্যহত রাখতে হলে অবশ্যই আমাদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে হবে। সরকারকে কাজের মধ্যে প্রমাণ করতে হবে যে, এ ধরণের দুর্ঘটনা আর ঘটবে না।

অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের জিএসপি সুবিধা বাতিল হলেও রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কারণ এই বাজারে আমাদের রফতানি পণ্যের প্রত্যক্ষ প্রভাব খুব বেশি নেই। যে পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়, তার মাত্র ২ শতাংশেরও নিচে রয়েছে জিএসপি সুবিধার আওতা। এছাড়া অবাধ শুল্ক সুবিধা বাতিল হলেও বাংলাদেশ এখনও শুল্ক দিয়ে সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি চালাতে পারবে। তবে শঙ্কার কারণ তখনই হবে যখন এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে যদি ইউরোপের বাজারেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো সিদ্ধান্ত নিতে যায়। কেন জিএসপি সুবিধা বাতিল হল এবং এর জন্য কারা মূলত দায়ী এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা আজিজুল ইসলাম জানান, মালিকপক্ষ এবং সরকার কোনো পক্ষই এর দায় এড়াতে পারেন না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যে ইস্যুতে জিএসপি সুবিধা বাতিলের কথা বলেছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ যথেষ্ট কাজ করছে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হল আমরা হোঁচট খেয়ে সব কিছু করি। এখন যা করা হচ্ছে তা আগে থেকেই করা যেত। কিন্তু এসব বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মনিটরিং সেলও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং মালিক পক্ষও সময় থাকতে শ্রমিক কল্যাণ, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন কিংবা শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য মনোযোগী ছিল না। এরই খেসারত জিএসপি বাতিলের উদ্যোগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জিএসপি সুবিধা স্থগিত করা দুঃখজনক মন্তব্য করে বলেন, সরকার ও মালিক পক্ষ আরও সচেষ্ট হলে এ ধরণের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া এড়ানো যেত। কারণ জিএসপি সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়ে শ্রম ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে চাপ ছিল, বাংলাদেশের ওপর সেটি এই দুই পক্ষের জোরালো তৎপরতায় কাটিয়ে উঠা সম্ভব ছিল। কারণ আজ হোক কিংবা কাল হোক আমাদের তো এ সব কমপ্লায়েন্স পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতেই হতো। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রেরও একটু ছাড় দেয়া উচিত ছিল। কারণ কমপ্লায়েন্স ইস্যুগুলো তো বাংলাদেশ প্রতিপালনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। বেশ অগ্রগতিও হয়েছে এতে। আরও কিছুদিন সময় দেয়া যেত। তবে সেটি যেহেতু হয়নি, তাই আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বজায় রাখার স্বার্থেই সব ধরণের কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে দৃশ্যমান উন্নয়ন ও অগ্রগতি দেখাতে হবে। তা যত দ্রুত সম্ভব ততই মঙ্গল। তিনি আরও মনে করেন, এ নিয়ে দুশ্চিন্তার খুব একটা কারণ আছে বলে মনে করি না। রফতানিতেও তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। তবে ইমেজ সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণ করে ইউরোপের বাজারগুলো থেকেও যাতে বাংলাদেশ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়ে পড়ে সেদিকে সরকারকে এখনই নজর দেয়া উচিত।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের জিএসপি স্থগিতের কারণে প্রত্যক্ষ ক্ষতির চেয়ে পরোক্ষ ক্ষতি হবে বেশি। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশ জিএসপি প্রত্যাহার করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক জিএসপি সুবিধা পায়। তারা এরই মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার কাজের পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আলোচনাও হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তারা জিএসপি সুবিধা বাতিল করতে পারে। দেশের ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি এবং বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের জিএসপি স্থগিত হওয়াটা আমাদের জন্য যুগপৎভাবে দুঃখজনক ঘটনা ও একটি মনে করি বড় ধরণের ধাক্কা। এর ফলে বাংলাদেশের জন্য নানাবিধ চাপ তৈরি হবে। প্রথমত, মার্কিন ক্রেতারা শ্রমিক সংগঠনসহ মানবাধিকার ও ক্রেতার স্বার্থ সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়বে। এ সংগঠনগুলো মার্কিন ক্রেতাদের বাংলাদেশ থেকে পণ্য না কিনতে চাপ দিতে পারে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিযোগীরাও পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইবে। এই প্রেক্ষাপটে দেখলে যুক্তরাষ্ট্রে এভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাশের দেশ কানাডা মার্কিন নীতি ও সিদ্ধান্তের কারণে প্রভাবিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত কানাডাকে প্রভাবিত করলে আমাদের জন্য সুখকর হবে না। কারণ, কানাডার বাজারে আমাদের তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত যদি আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রভাব ফেলে, তবে সেটি হবে আমাদের কফিনে শেষ পেরেক। সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি স্থগিতকে কেন্দ্র করে আতঙ্কিত হওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি উত্তরণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাতিল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ দুই জায়গায়ই বাংলাদেশের পোশাক রফতানি সংকটে পড়বে। কারণ এ দুই এলাকায়ই ৯০ ভাগ পোশাক রফতানি হয়। যুক্তরাষ্ট্র পোশাকে জিএসপি সুবিধা না দিলেও অন্যান্য পণ্যে বাতিল হওয়াতে এর প্রভাব পড়বে তৈরি পোশাকে।।