Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ

সাক্ষাৎকার – সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ

শুধু বক্তৃতা দিয়ে অন্যকে দায়ী করা ও রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করে জিএসপি সমস্যার সমাধান হবে না

Sultan-Uddin-Ahmedসৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের সহকারী নির্বাহী পরিচালক এবং গার্মেন্টস শিল্প বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সে দেশের বাজারে জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার কারণ, এর প্রতিক্রিয়া বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পের নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের জন্য সে দেশের বাজারে জিএসপি বা অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা স্থগিত করেছে। এই স্থগিতাদেশ দেয়ার বিষয়টিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ণ করেন?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: সার্বিক পরিস্থিতিতে বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই যে, জিএসপি সুবিধা স্থগিত সার্বিকভাবে বাংলাদেশের জন্য একটি দুঃসংবাদ। দুঃসংবাদ শুধু ব্যবসায়িক কারণে বা অর্থনৈতিক লোকসানের বিবেচনায় নয়, এটি এ জন্যও দুঃসংবাদ যে, নিজেদের নাগরিকদের প্রতি বিশেষ করে শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য আমাদের যে অবহেলা, সে বিষয়ে অন্য দেশের সরকার এবং অন্য দেশের নাগরিকরা আমাদেরই সতর্ক করে দিচ্ছে। তারা আমাদের দায়িত্বহীনতা এবং ব্যর্থতার বিষয়টি আমাদেরই মনে করিয়ে দিচ্ছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত করা বাংলাদেশের জন্য লজ্জা, অপমানের এবং অমর্যাদাকর একটি বিষয়। কারণ দেশের আইন ও সংবিধান অনুযায়ী শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও অধিকার যদি নিশ্চিত করা যেতো তাহলে আমরা নিজেদের মাটিতে দাঁড়িয়েই দরকষাকষি করতে পারতাম। কিন্তু অবহেলা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আমরা কোনো কথাই বলতে পারছি না।

আমাদের বুধবার: এর জন্য দায়ী কে?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: এর জন্য সরকারই প্রথমত দায়ী। রাষ্ট্রের ভালো মন্দ সব কিছুর জন্যই কিন্তু সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয় এবং এক্ষেত্রেও হবে। কারণ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের চূড়ান্ত দায়িত্ব সরকারের। মালিকরা ঠিক মতো আইন মেনে চলছে কিনা, বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করার দায়দায়িত্ব সরকারের। এটা কোনো দলের বিষয় নয়। এ অবস্থা যে এই সরকারের সময়েই সৃষ্টি হয়েছে তা নয়, প্রায় ২০/২৫ বছর ধরে এই অবহেলা, দায়িত্বহীনতার পরিস্থিতি চলে আসছে। ১৯৯০ সালে যখন সারাকা গার্মেন্টেসে আগুন লাগে, তারপরে একই কারণে আর মৃত্যুর ঘটনা ঘটার কথা ছিল না। স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসে পড়ার পরে কিন্তু আর ধসের ঘটনা ঘটা উচিত ছিল না। অতএব সব শ্রমিকই বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতি অবজ্ঞা, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, নিষ্ঠুরতা চলে আসছে তারই একটি বহিঃপ্রকাশ জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়া।

আমাদের বুধবার: এই পরিস্থিতির সুযোগ তৈরি হলো কেন?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেছে এই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বিষয়টি তা নয়। আমি মনে করি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিকদের বাধ্যবাধকতা এবং তা বাস্তবায়ন হলো কিনা তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দেশ হিসেবে না দেখে যদি আমাদের ক্রেতা হিসেবে দেখি, তাহলে প্রত্যক ক্রেতারই অধিকার আছে, তারা যেখান থেকে সেবা বা পণ্য নেবে তাদের ব্যাপারে কথা বলার, মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।

আমাদের বুধবার: কিন্তু সরকার এটা নিশ্চিত করতে পারছে না কেন?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: সরকার গুরুত্ব দেয়নি। মনে করেছে এভাবেই চলবে। এ ধরণের একটি ধারণা কিন্তু এখনো তাদের মধ্যে আছে। এখনও দেখবেন যে, পুরো বিতর্ক হচ্ছে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক। অনেকে বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো বেশি জিএসপি সুবিধা দেয় না। কাজেই অসুবিধা হবে না। জিএসপি স্থগিতের কারণে দেশ হিসেবে আমাদের মর্যাদার, সুনাম সর্বোপরি ভাবমূর্তির উপরে মারাত্মক আঘাত পড়েছে। জিএসপিকে স্থগিত করাকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা হবে চূড়ান্ত পর্যায়ের ভুল। এটি হচ্ছে কর্মপরিবেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন। এ দেশের নাগরিকদের প্রতি ভিন দেশী একটি সরকার বা নাগরিকদের দায়িত্ববোধের বিষয়। এটাকে হালকাভাবে নেয়া উচিত হবে না।

আমাদের বুধবার: জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার কারণ হিসেবে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ থেকে নানা কথা বলা হচ্ছে

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি স্থগিতের যে শর্তগুলো দিয়েছে, তার মধ্যে তো কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই। তারা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, আমাদের কি কি করতে হবে এবং আমাদের দায়িত্ব কি। এখন যে সব কথা সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে, অর্থাৎ কে কি বলেছে, কে কি করেছে তার বহু আগেই কিন্তু তারা শর্তগুলো দিয়েছিল। কয়েক বছর আগে থেকেই বলা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার প্রতিনিধি দলও গিয়েছে। কাজেই প্রশ্নটি হচ্ছে, পরিস্থিতির কতোটা উন্নয়ন ঘটাতে পারলেন তার ওপর, এটা দোষারোপের বিষয় নয়।

আমাদের বুধবার: জিএসপি সুবিধা স্থগিতের ফলে সামগ্রিকভাবে কি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে বলে আপনি মনে করেন?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: জিএসপি সুবিধা স্থগিতকরণে ভাবমূর্তির সঙ্কটই প্রকট হবে, আর আর্থিক ক্ষতি তো হেেবই। ভাবমূর্তির সঙ্কট অর্থনৈতিক সঙ্কটের চেয়েও মারাত্মক। তাছাড়া আমাদের জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে, কর্মপরিবেশের উন্নয়নের জন্য অন্য কোনো দেশ চাপ দেবে তা আমাদের জন্যই ভীষণভাবে লজ্জার বিষয়। তারপরেও বলা হচ্ছে, জিএসপি সুবিধায় আমরা মাত্র এক শতাংশ সুবিধা পায়। কিন্তু সে পরিমাণও তো কম নয়। গত পাঁচ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্মপরিবেশের উন্নয়নের কথা বলে আসছে। কিন্তু আমরা যদি কর্মপরিবেশের উন্নয়নসহ সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারতাম, তাহলে জিএসপি সুবিধা বাড়ানো যেতো।

আমাদের বুধবার: সামগ্রিকভাবে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য কতোটা ক্ষতির কারণ হবে?

সুলতান উদ্দিন আহমেদ: যদিও গার্মেন্টস খাতের বিষয় এখানে কম, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু সামনে নিয়ে এসেছে সে গার্মেন্টস শিল্পের পরিস্থিতিকেই। আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এটি কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক একটি শিল্প। এখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে এটা ভুলে গেলে চলবে না। রানা প্লাজা, তাজরিন ফ্যাশনসসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনাগুলো ঘটলো আর সে সব ক্ষেত্রে কিন্তু কর্মপরিবেশের একটি বিরূপ চিত্র উঠে এসেছে। ভাবমূর্তির সঙ্কট কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক শিল্পের জন্য ভয়াবহ একটি ক্ষতির কারণ। জিএসপি স্থগিত নিয়ে হেলাফেলা, দোষারোপ বা কাঁদা ছোড়াছুড়ি করলে বিপদ আরো বাড়বে। আমাদের খুবই দ্রুতগতিতে পরিস্থিতির উন্নয়ন করে, তার পরে একটি জবাব দিতে হবে। কিন্তু ভিন্ন কোনো পথে গেলে হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেখতে চায়, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ শুরু হয়েছে কিনা। শেষ করা হলো কিনা তা এখনই তারা দেখতে চায় না। কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে তা অব্যাহত রাখার প্রশ্নটিই বড় বিষয়। ছয় মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতেই হবে। শুধু বক্তৃতা দিয়ে, চিঠি দিয়ে অন্যকে দায়ী করার জন্য রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করে জিএসপি সমস্যার সমাধান হবে না। কোনো বক্তৃতায় কাজ হবে না। পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ সবাই জেনে গেছে, আমরা বেশি কথা বলি, কথায় কথায় প্রতিশ্রুতি দেই। কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সামগ্রিক ভাবমূর্তির সঙ্কট থেকেই যাবে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।