Home » রাজনীতি » সামনে ভোটের সরকার নাকি জাতীয় সরকার?

সামনে ভোটের সরকার নাকি জাতীয় সরকার?

পীর হাবিবুর রহমান

elections-cartoonরাজনীতির আকাশে ঘুড়ি উড়ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের ঘুড়ি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বর্তমান নির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপি’র পক্ষে গণরায় প্রতিফলিত হওয়ায় বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বহুদিন পর সদস্যপদ রক্ষার সংসদে এলেও বাজেট বক্তৃতায় সরকারকে একহাত নিতে ভুল করেননি। এমনকি সিটি নির্বাচন উত্তর শক্ত মাটির ওপর দাড়িয়ে সংসদে সরকারকে সাফ জানিয়ে দিলেন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি মানতে বাধ্য হবেন। মনে হচ্ছে সামনে আন্দোলনের জোর প্রস্তুতি চলছে। তিনি সংসদের বাইরে আরো বলেছেন, এই দাবি থেকে কখনও একচুলও নড়বেন না। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বহুদিন পর সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় ছিলেন উৎফুল্ল। তার বক্তৃতার সময় বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাইরে চলে যাননি। হাসিমুখেই সংসদ নেতার খোচাখুচি ভাষনখানি শুনেছেন, সয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলে দিয়েছেন, অনির্বাচিত সরকার নয়, অসাংবিধানিক সরকার আর নয়, নির্বাচনে আসুন, তা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।

জাতীয় নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে মেয়াদ পূর্তির আগেই রাজনীতির আকাশে বিরোধী দলের ঘুড়ি কেটে দিতে সরকারের হাতে নাটাই এতটাই খেলেছে যে, চার চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়াদ পূর্তির তিন মাস আগেই দলের চার কান্ডারি শক্তিকে যোগ্যতার বিচারে উচুতে থাকলেও পরাজিত করে দুনিয়াকে দেখিয়ে দিয়েছে এই সরকার অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য পরাজয় মানতে দ্বিধা করে না। অন্যদিকে, বিরোধী দল এই বিজয়কে তাদের সঙ্গে জনগণের সমর্থন রয়েছে এই শক্তিতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের নতুন শক্তি যোগ হয়েছে বলে মনে করছে। দুই পক্ষই যার যার অবস্থান থেকে অনঢ়। গণতান্ত্রিক দুনিয়ার একটি অংশ নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ফাংশনাল করে কর্তৃত্ব নির্বাচন কমিশন বা অন্য কারো হাতে দিয়ে সংবিধানের আওতায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ফর্মূলা খুজছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি জোট শেষ মূহুর্তে সমঝোতায় এসে ব্যালট বিপ্লবে অবতীর্ণ হবেন। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অন্তর্বর্তী সরকারকেই মেনে নিতে হবে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার। কিন্তু, সেই বিশ্বাস ও আস্থার জায়গায় খালেদা জিয়া নেই। এখানেই কেউ ভরসা করতে পারছেন না। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীনদের ভরাডুবি যে নিশ্চিত চার সিটির ফলাফলে সেই বার্তাই এসেছে দেশিবিদেশি সব মহলের কাছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে জনমত রক্ষার পরীক্ষায় এখন সরকার ও বিরোধী দল মরিয়া।

যদি শেষ মূহুর্তে সমঝোতা হয় নাটকীয়ভাবে,তাহলে জয়পরাজয় যাই হোক, দেশের রাজনীতি দুই নেত্রী ও দুই দলের নিয়ন্ত্রনেই থাকবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ বিএনপি বা আওয়ামী লীগ জোটকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেবে। এক্ষেত্রে নির্বাচন উত্তর সরকার পক্ষ বিরোধী পক্ষের ওপর কোন রাজনৈতিক দমননির্যাতন চালাবে না, এমন একখানি চুক্তি পর্দার অন্তরালে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় ঘটতে পারে। কিন্তু, রাজনীতির প্রতি যাদের গভীর পর্যবেক্ষন সেই সব মহলের অনেকেই বলছেন, অক্টোবরে যখন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ফাংশনাল হয়ে যাবে তখন আজকের প্রশাসন আর শাসকের হয়ে বিগত সাড়ে চার বছরের মূর্তি নিয়ে দৃশ্যমান থাকবে না। তখন বিরোধী দল যেমন দমননির্যাতনের আঁধার ভেদ করে ঘুরে দাড়াবে, তেমনি তাদের দলীয় প্রশাসনের কর্তা ও সুবিধাবাদীরা এক হয়ে চোখ পাল্টে দেবে। তখন বিএনপি জোটের দাবি আদায়ের আন্দোলন রাজপথে অন্য মূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হবে। এইখানে সংঘাত ও সহিংস রাজনীতির মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা সবার। এখানেই দেশিবিদেশি সবার দৃষ্টি। তাই কারো কারো মতে এই সংঘাতের পথ ধরেই আগামী জাতীয় নির্বাচন ফের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হবে। এমনি এক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় ভোটের সরকারের বদলে অন্য সরকার এসে পরিস্থিতি সামাল দেবে। সেটি জাতীয় সরকার না অসাংবিধানিক তত্ত্বাবাধয়ক সরকার সেটি পরিস্কার নয়।

নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে জনগণের ভোটের সরকার না হলে সংঘাতের পথে এই দুই দলের ঘুড়ি কাটাকাটিতে যে জাতীয় সরকার আসবে সেখানে রাজনীতিবিদ থেকে দেশবরেণ্য নাগরিকদের সমন্বয়েই ঘটবে। সংসদে অতিকথনে পারদর্শী সরকার দলীয় পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, রোজ কেয়ামত পর্যন্ত জরুরি অবস্থা জারি বা অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলের আর সুযোগ নেই। বিরোধী দলকে সমঝোতার পথে আসার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা বয়কটের হুমকি দিলে আমরাও যদি বলি তত্ত্বাবধায়ক হলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যাবে না তাহলে কি হবে? সাংবিধানিক শূণ্যতা সৃষ্টি করে রাতের অন্ধকারে কেউ ক্ষমতায় আসবে সেই দিন ভুলে যান। আমরাআপনারা নির্বাচন করলাম না, সংসদও নেই, তখন কি হবে? তখন রাষ্ট্রপতি যদি সর্বোচ্চ আদালতের পরামর্শ নিয়ে বর্তমান সংসদ পূনরুজ্জ্বীবিত করেন তখন আপনারা কি করবেন? পর্যবেক্ষকরা মনে করেন এক্ষেত্রে আর যাই হোক বিরোধী দল তখন ঘরে বসে থাকবে না। রাজপথকেই তারা আশ্রয় করে নেবে। আইনজীবী ড. তুহিন মালিক এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ি সংসদ ভেঙে গেলেও নির্বাচন না হলে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার যে সুযোগ থাকার আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেছিলেন সেটির হিসেব মিলে গেছে। এটি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় থেকে যাবার নীল নকশার প্রকাশ বলে তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেছেন, পাঁচ বছর পর পর যেখানে সংসদ ভেঙে নির্বাচনের সাংবিধানিক নিয়ম সেখানে মরা গাছে ফুল ফোটাবেন কি করে? ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর নির্বাচন হবে না বললেই হল নাকি? নির্বাচন হতেই হবে। সংসদ পুনরুজ্জ্বীবিত হওয়ার সুযোগ নেই। সময় যত গড়াচ্ছে বিতর্ক তত বাড়ছে। বাড়ছে যার যার অবস্থানে অনমনীয় দৃঢ়তা। বাড়ছে নানা আশঙ্কা, বাড়ছে জল্পনাকল্পনা। সেই পথেই প্রশ্ন সামনে ভোটের গণতান্ত্রিক সরকার নাকি জাতীয় সরকার?