Home » শিল্প-সংস্কৃতি » “উইকিলিক্স” নিয়ে চলচ্চিত্র – চৌর্যবৃত্তি নয় সত্য প্রকাশের বৃত্তি

“উইকিলিক্স” নিয়ে চলচ্চিত্র – চৌর্যবৃত্তি নয় সত্য প্রকাশের বৃত্তি

ফ্লোরা সরকার

film on wikilicks২০১০ এ স্কয়ার ম্যাগাজিন প্রামাণ্যচলচ্চিত্রকার অ্যালেক্স গিবনিকে এই সময়ের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার হিসেবে অভিহিত করা হয়। ২০০৭ সালে গিবনিকে যখন তার প্রামাণ্যচিত্র ‘ট্যাক্সি টু দ্যা ডার্ক সাইড’ এর জন্য অস্কার প্রদান করা হয় স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একজন চিত্রনির্মাতা হিসেবে স্থান করে নেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বলে পরিচালক অ্যালেক্স গিবনি বিতর্কের উর্দ্ধে নন। আর তাই তার সাম্প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্ত প্রামাণ্যচিত্র “উই স্টিল সিক্রেটস দ্যা স্টোরি অফ উইকিলিক্স” নিয়ে তুমুল বিতর্কের ঝড় উঠেছে চলচ্চিত্র জগতে। গত ২৪ মে নিউইয়র্ক এবং লস এঞ্জেলেসে ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। তাছাড়া গত ১৯জুন থেকে ৩০ জুন ৬৭তম এডিনবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে। ছবিটি নিয়ে বিতর্কের কারণ ছবির বিষয়বস্তু এবং ছবির নায়ককে কেন্দ্র করে। পরিচালক গিবনি এমন এক সময়ে ছবিটি নির্মাণ করেছেন যখন ছবির বিষয়বস্তু এবং এর নায়ক ইতিমধ্যে বাস্তব বিতর্কের জালে জড়িয়ে আছেন। ছবির বিষয়বস্তু উইকিলিক্স নামক প্রতিষ্ঠান এবং জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ যার হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা শুরু তাকে কেন্দ্র করে নির্মিত। শুধু তাই নয় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত অন্যান্য কর্তাব্যক্তি, গোপন তথ্য সরবরাহকারীগণ এবং মিডিয়ার হুইসেলব্লোয়ার, যারা এসব তথ্য সংগ্রহ এবং সরবরাহ কাজে নিয়োজিত তাদের সকলকে ছবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উই স্টিল সিকরেটস্” শুরু হয়েছে ২০০৬ এ উইকিলক্সের অগ্রযাত্রার কাহিনী দিয়ে। তারপর প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিভিন্ন লিক্স্ অর্থাৎ তথ্যের ফুটো ধরে একে একে ২০০৯২০১০ সালের আইসল্যান্ডের আর্থিক ধস, সুইস ব্যাংকের কৌশলে ট্যাক্স এড়ানোর কাহিনী, কেনিয়ার সরকারে দুনীর্তি থেকে শুরু করে অ্যাড্রিয়ান ল্যামোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ব্র্যাডলি ম্যানিং এর সংযোগ সহ ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সমস্ত গোপন নথি যা যা উইকিলক্স কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল কিছুই বাদ যায়নি। এমনকি গত ২০ আগস্ট ২০১০ থেকে জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের বিরুদ্ধে যে নারীঘটিত কেলেঙ্কারির অভিযোগ শুরু হয়েছিল তাও ছবি থেকে বাদ পড়েনি। ছবিটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে সিনেমা জগতের দুই দিকপাল অলিভার স্টোন এবং মাইকেল মুরের একটি লেখা দিয়ে আজকের এই লেখার সূত্রপাত করা যাক।

চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে আমরা আমাদের পেশাগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের নিউজ মিডিয়া আমেরিকানদের কাছে সরকারের মন্দ খবরগুলো পরিবেশনে প্রায়শই ব্যর্থতার যে পরিচয় দেয় তার প্রতি গুরুত্বারোপ করে চলেছি। আমরা তাই উইকিলিক্সের মার্জিত কাজের প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ এবং প্রশংসা করি লন্ডনে অবস্থিত ইকুউয়েডার দুতাবাসের সিদ্ধান্তে, যারা জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জকে রাজনৈতিক আশ্রয় দান সহ বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করছেন। উইকিলিক্স কর্তৃক ‘কোল্যাটারাল মার্ডার’ (যেখানে হেলিকপ্টার দিয়ে ইরাকের নিরীহ জনগণের উপর হত্যার ফুটেজ প্রচার করা হয়) এবং আফগানিস্তান যুদ্ধের বিভিন্ন ফুটেজ প্রচারের পর থেকে মার্কিন প্রশাসন প্রচন্ড চাপের মুখে আছে যাতে করে বুশ প্রশাসনের কোন কীর্তি এবং কুকীর্তি দেশের বাইরে অভিযুক্ত হতে না পারে। বিশেষ করে প্রশাসনের যেসব কর্তাব্যক্তিরা আমেরিকানদের অন্ধকারে রাখতে ইচ্ছুক তারাই আজ সব থেকে হিংস্র হয়ে উঠেছেন। দুটি রাজনৈতিক দলেরই সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটে নির্বাচিত নেতারা মি.অ্যাসেঞ্জকে “হাই টেক টেরারিস্ট” নামে অভিহিত করছেন। সিনেটার ড্যানি ফেইস্টিইন, যিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেট দলের একজন সদস্য এবং ইন্টেলিজেন্সের সিনেট সিলেক্ট কমিটি পরিচালনা করেন, তিনি মি.অ্যাসেঞ্জকে ‘এসপিওনাজ অ্যাক্ট’ এর অধীনে অভিযুক্ত করে বিচারের সুপারিশ করেছেন। যদিও অ্যাসেঞ্জের বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ এখনো কোন ক্ষেত্র থেকে উত্থাপিত হয়নি। শুধুমাত্র ২০১০ এ সংঘঠিত নারীঘটিত কেলেঙ্কারির জন্যে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে—–ইত্যাদি ইত্যাদি”, নিউইয়র্ক এডিশান, এর গত ২১ আগস্ট, ২০১২ সংখ্যায় ‘ উইকিলিক্স অ্যান্ড ফ্রি স্পিচ’ শিরোনামে লেখাটি ছাপা হয়। কাজেই বুঝতে অসুবিধা হয়না যে, অবাধ তথ্য প্রবাহের এই সময়ে, যে সময়টিকে জঁ পল সার্ত্রের ‘এজ অফ রিজন’ পার হয়ে ‘এজ অফ দ্যা ইন্টারনেট’ নামে অভিহিত করা হয়, সেই সময়ে স্বাধীন তথ্য প্রবাহের দাবি যত সোচ্চার হয়ে উঠছে, রাষ্ট্রগুলো ততই সেই দাবি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে। তথ্য ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীন যতক্ষণ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে। আর তাই ‘কোল্যাটারাল মার্ডার’ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ একজন হাই টেক টেরারিস্ট হয়ে যান, জাড়িয়ে পড়েন নারী ঘটিত কেলেঙ্কারীতে। গিবনির ছবিতেও তাই উইকিলিক্সের সীমিত প্রশংসা করা হলেও অ্যাসেঞ্জকে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে রেহাই দেয়া হয়নি।

ছবির প্রথম অংশ যুক্তরাষ্ট্র সহ অন্যান্য সুপার পাওয়ার কিভাবে ইন্টারনেটের সব জটিল হ্যাকিং এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে গত ২০০০ সাল থেকে তার উপর দৃষ্টিপাত করা হয়। আবার এসব হ্যাকিংই যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোতামের এক চাপে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে সেটাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। বিশেষত ৯/১১ র পরে বিভিন্ন তথ্যের পরিধিকে আরও সংকুচিত করা হতে থাকে।

ছবির দ্বিতীয় অংশটির প্রায় অনেকটাই ব্যাডলি ম্যানিংকে ঘিরে আবর্তিত। সিনে ভিউ প্রত্রিকার মতে যা বেশ দীর্ঘ এবং কিছুটা ক্লান্তিকর। জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের প্রতি কোন ধরণের সহানুভূতি বা প্রশংসা নয়, বরং অ্যাসেঞ্জ ডিজিটাল যুগের একজন প্রতীক, যার কাছে আছে একটা ল্যাবটপ এবং যিনি তা দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ দাপিয়ে বেড়ান তার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রামাণ্যচিত্র হলেও ছবির মূল দুটি চরিত্র জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ বা ব্র্যাডলি ম্যানিং এর কোন সাক্ষাৎকার আমরা পাইনা। যদিও ‘কোল্যাটারাল মার্ডার’ ফাঁস হবার পর ম্যানিংয়ের বিরুদ্ধে তথ্য ফাঁসের অভিযোগে অভিযুক্ত করার দরুণ তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ সম্ভব না হলেও জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জেরও কোন সাক্ষাৎকার নিতে অপারগ হন ছবির পরিচালক গিবনি। কারণ হিসেবে জানা যায় সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্যে অ্যাসেঞ্জের এক মিলিয়ান ডলারের পরোক্ষ দাবির কথা। যে দাবির কথা গিবনি দ্যা ডিসেন্ডার পত্রিকার ২৪ মে ২০১৩ সংখ্যায় অকপটে প্রকাশ করেন। গিবনি সেই দাবি পূরণে শুধু অপারগতাই প্রকাশ করেননি, সেই সঙ্গে ছবির মূল চরিত্র অ্যাসেঞ্জের পরিবর্তে ম্যানিংয়ের উপর কেন্দ্রীভূত হতে দেখা যায়। পুরো নাম প্রাইভ্যাট ব্র্যাডলি ম্যানিং, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিভাগের ইন্টেলিজেন্স অ্যানালিস্ট হিসেবে ইরাক যুদ্ধের সময় কর্মরত ছিলেন। ৫ এপ্রিল ২০১০, উইকিলিক্স ইন্টারনেটে একটি বিস্ফোরিত খবর প্রকাশ করে, যেখানে একটি ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে দেখা যায় একটি হেলিকপ্টার দিয়ে বাগদাদের একটি জায়গায় প্রায় ডজনখানেক নিরীহ মানুষের উপর বিস্ফোরক নিক্ষেপ করা হয়, যেখানে রয়টার্সের দুজন সাংবাদিকও নিহত হন। বলাই বাহুল্য এটা সেই কোল্যাটারাল মার্ডার নামে খ্যাত ঘটনা। শুধু তাই নয় ২০০৩ থেকে ২০০৯ এর মধ্যে প্রায় ১৩৯ জন সাংবাদিক কর্মরত অবস্থায় ইরাকে নিহত হন। তাছাড়া আফগান যুদ্ধের প্রচুর খবর উইকিলিক্সের মাধ্যমে একই সময়ে প্রকাশিত হতে থাকে। ৬ জুলাই, ২০১০ এ ২২ বছর বয়সী ম্যানিংকে ‘বাগদাদ ভিডিও’ সহ আরো শত শত ইরাক ও আফগান যুদ্ধের গোপন তথ্য উইকিলিক্সে সরবরাহের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং গ্রেফতার করা হয়। হয়তো ম্যানিংয়ের জীবন ব্যাপী কারাগার যাপন হতে পারে। ম্যানিংয়ের যাই ঘটুক না কেনো ছবিটি সম্পর্কে কিছু বিস্তারিত বক্তব্য পরিচালক গিবনি গত ২৫ মে, ২০১৩, গোথামিস্ট পত্রিকায় দীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন। প্রথমেই যে কথাটি তিনি বলেন তা হলো উইকিলিক্সের আদর্শ এবং জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ সমর্থক নয়। কেননা তার মতে অ্যাসেঞ্জ পরবর্তীতে উইকিলিক্সের আদর্শ থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন। তিনি আরও জানান যেকোন সরকারের গোপনীয়তা প্রকাশের জন্য উকিলিক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আছে, কেননা সব সরকারই তাদের অপরাধ,দুনীর্তি, ভুলভ্রান্তি ঢাকার লক্ষ্যে গোপনীয়তার আশ্রয় গ্রহণ করে। গিবনির মতে কোন গোপন তথ্য প্রকাশের বেলায় লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন সেসব প্রকাশিত তথ্য যেন নির্দোষ বা নৈতিকতাসম্পন্ন হয়। অর্থাৎ একইসঙ্গে গোপন তথ্য প্রকাশ এবং সেই প্রকাশিত তথ্য হিতকর হয়। কিন্তু গোপনীয়তা এবং হিতসাধন একই সঙ্গে ঘটতে পারে না। কেননা ক্ষতিকর বিষয়গুলোই সাধারণত গোপন করা হয়। ক্ষতিকর আর হিতকর একই সমান্তরালে তো চলা সম্ভব নয়। অ্যাসেঞ্জের লাগামহীন আফগান যুদ্ধের তথ্য প্রকাশেরও সমালোচনা করেন গিবনি। কেননা এতে করে অ্যাসেঞ্জের চেয়ে ম্যানিংয়ের ক্ষতি হয়েছে অধিক পরিমাণে। আর তাই গিবনি নিপুণ স্বচ্ছতথ্য প্রবাহের উপর গুরুত্বারোপ করেন। মানুষকে স্থির সিদ্ধান্তে আসতে হবে কোন কোন বিষয় গোপন করা হবে কোন কোন বিষয় করতে হবে না। কিন্তু গিবনি কথিত কিছু রেখে কিছু ঢেকে মানুষের পক্ষে কতটুকু নিপুণতার সাথে স্বচ্ছতা অর্জন সম্ভব সেটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জকে নায়ক থেকে খলনায়কে রূপান্তরের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গিবনি বলেন “অ্যাসেঞ্জকে নায়ক বা খলনায়ক কোন পর্যায়ে আমি তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইনা। প্রথম পর্যায়ের অ্যাসেঞ্জ অত্যন্ত সততার সঙ্গে তথ্য প্রকাশের কাজগুলো করে গেছেন সত্য। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের অ্যাসেঞ্জকে কারোর প্রতি কোন সমীহ করতে দেখিনা। অনেকটা বেপরোয়া ভাবেই তিনি যেকোন তথ্য ফাঁস করে দিতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে শিখেছি যে কোন তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সবাইকে এমনকি সরকার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মানুষদেরকে গণনার মধ্যে আনতে হবে। তথ্যের ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার রোধে এর প্রয়োজন আছে। আমার ছবিতে উইকিলিক্সের একজন প্রাক্তন সদস্য জেমস বলের মুখে অ্যাসেঞ্জ সম্পর্কে তাই বলতে শোনা যায় – ‘একজন আদর্শ দুনীর্তিপরায়ণ’।” এখানে যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো তথ্য প্রকাশিত হোক তা সকলেই চাই, কিন্তু নিজেদের বিষয়আশয় ব্যতিরেকে। উইকিলিক্স বা তার প্রকাশক জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ যতদিন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের তথ্য প্রকাশ করেছেন ততদিন পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু যেদিন থেকে ইরাক এবং আফগান যুদ্ধের গোপন তথ্যগুলো ফাঁস হতে শুরু করলো ঠিক সেদিন থেকে তথ্যের স্বচ্ছতা, অস্বচ্ছতা, সত্য, মিথ্যা, নৈতিকতা, অনৈতিকতার প্রশ্ন উত্থাপিত হতে শুরু করলো। শক্তিধর দেশগুলোর একটা বড় সমস্যা অন্যের ক্ষেত্রে যত বড় বড় ক্ষতি ঘটে যাক তাতে কোনকিছু যায় বা আসে না, কিন্তু নিজেদের গায়ে সামান্য আঁচড় লাগলে সেই আঁচড়ের দাগ তুলতে পৃথিবীকে ধক্ষংস করে হলেও তারা সেই দাগ তুলবে। সেই কারণে জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জকে আজ বাস্তবে যেমন নায়ক থেকে খলনায়কে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেয়া চলছে, তেমনি উদ্যোগ দেখা যায় গিবনির সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত “উই স্টিল সিক্রেটস দ্যা স্টোরি অফ উইকিলক্স” ছবিতে।

ট্রুথডিগ পত্রিকার বর্ষিয়ান চিত্রসমালোচক ক্রিস হেজেস গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে তার সাপ্তাহিক কলামে ‘উই স্টিল সিক্রেস’ এর সমালোচনা করতে যেয়ে বেশ চমৎকার একটা শিরনাম লেখেন -“অ্যালেক্স গিবনির ‘উকিলিক্স’ কি কাউকে বিব্রত করার লক্ষ্যে একটি অপপ্রচারের রাজনৈতিক কৌশল? জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জকে ডেভিড বা জেসাস বা জোয়ান অফ আর্কের সঙ্গে তুলনা করে হেজেস মন্তব্য করেন “উই স্টিল সিক্রেটস, ছবিটি অসম্পূর্ণ মানুষের একটি বিশৃঙ্খল কাহিনী”। শুধু তাই নয় ইউনিভার্সাল স্টুডিও কর্তৃক নির্মিত গিবনির ছবিটি কর্পোরেটের টাকায় কর্পোরেটের মন যোগানোর একটি ছবি হিসেবেও তার সমালোচনা করেন হেজেস। কর্পোরেটের দখলে যখন শিল্প হস্তগত হয়ে যায় তখন স্বাভাবিক ভাবেই তার উপস্থাপন ভিন্ন হতে বাধ্য। হতে পারে পরিচালক অ্যালেক্স গিবনি একজন অত্যন্ত উঁচু মাপের শিল্পী। কিন্তু যেকোন শিল্প সৌকর্য, তার সত্যতা কর্পোরেটের টাকার থলিতে হারিয়ে যেতে বাধ্য। আর তাই বুশ প্রশাসনের অত্যন্ত শক্তিধর সি.আই.. এবং এন.এস.আই. এর পরিচালক মাইকেল হেডেনকে একজন যুক্তিপূর্ণ মানুষ হিসেবে ছবিতে উপস্থাপিত হতে দেখা যায়।

কোল্যাটারাল মার্ডার’ এর নায়ক মাইকেল হেডেনকে কোন বিপদের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়না। বিপদ নেমে আসে জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ আর ব্র্যাডলি ম্যানিংয়ের মাথায়। যারা সেসব অমানবিক কীর্তির প্রকাশ ঘটান। মাইকেল হেডেনের মতো নিরাপদ দূরত্বে থাকেন পরিচালক অ্যালেক্স গিবনিও, কেননা তিনি জানেন কাদের উপর দোষের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে ছবির কাহিনী গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু মুশকিল হলো গোপনীয়তার চৌর্যবৃত্তির নামে যাদেরকেই দোষারোপ করা হোক না কেনো সত্য প্রকাশেরই জয় হয় শেষ পর্যন্ত। কেননা পৃথিবীর মানুষ গোপনীয়তা নয় সত্যের সন্ধান করে যায় অবিরত। আর সেই সত্যপ্রকাশকেরাই ইতিহাসে নায়কের ভূমিকায় সর্ব কালে, সর্ব যুগে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও হতে থাকবেন। সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে রাখি কাকতালীয় হলেও সত্য এই যে, ৩ জুলাই জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের বিয়াল্লিশতম জন্মদিন। তার জন্মদিনের প্রতি থাকলো আমাদের শুভেচ্ছা।।