Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেলের ইতিহাস ষড়যন্ত্র আর রক্তপাতের

ফারুক চৌধুরী

oil-22তেলের ইতিহাসে বড় অংশজুড়ে আছে জাতীয়করণের ঘটনা। এর সঙ্গে যুক্ত তেল রাজনীতি যা ভূরাজনীতির অংশ। এ নিয়ে ষড়যন্ত্র, রক্তপাত, অভ্যুত্থান কম হয়নি। এর সঙ্গে একদিকে যুক্ত ছিল তেলের মালিকানা দখলে রাখতে সক্রিয় বিভিন্ন তেল কোম্পানি। আরেকদিকে ছিলেন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ। সংক্ষেপে দেখা যাক তেল জাতীয়করণের তারিখগুলো।

মেক্সিকো ১৯৩৮ সালে সব বিদেশি তেল কোম্পানি জাতীয়করণ করে। এসব কোম্পানির সব সম্পদ আনা হয় মেক্সিকোর তেল সংস্থা পেমেক্সয়ের নিয়ন্ত্রণে। আংলো ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি জাতীয়করণ করা হয় ১৯৫১ সালে। ইরাক ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করে ইরাক পেট্রোলিয়াম পদক্ষেপ নেয়। এর আগে, ১৯৬১ সালেও ইরাক তেল জাতীয়করণের পদক্ষেপ নেয়। বিভিন্ন তেল সম্পদ ইরান জাতীয়করণ করে ১৯৭৩ সালে। এর আগেই তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংস্থা বা ওপেকভুক্ত দেশসমূহ স্ব স্ব দেশে তেল সম্পদ জাতীয়করণ শুরু করে। এ কাজ শুরু হয় ১৯৭১ সাল থেকে। লিবিয়াও এ সময়ে বিপিকে দেয়া কনসেশন জাতীয়করণ করে। এর দুই বছর আগে ১৯৬৯ সালে কর্নেল গাদ্দাফির নেতৃত্বে একদল সেনা অফিসার সামরিক অভুত্থান ঘটিয়ে রাজা ইদ্রিসকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তারা ক্ষমতা গ্রহণ করে নানা জনমুখী পদক্ষেপ নেন। ভেনেজুয়েলায় তেল শিল্প জাতীয়করণ করা হয় ১৯৭৫ সালে।

এসব ঘটনার আগে ১৯৫৯ সালে, কায়রোতে অনুষ্ঠিত হয় অ্যারাব অয়েল কংগ্রেস বা আরব তেল কংগ্রেস। এ সম্মেলনে সমঝোতা হয় যে, তেল উৎপাদক দেশগুলো তেল উৎপাদন ও বিপণনে আরো প্রভাব ফেলবে। এ সমঝোতাকে বলা হয় জেন্টেলম্যান্স এগ্রিমেন্ট বা ভদ্রলোকের চুক্তি বা এক কথা। এ সমঝোতারই পরের বছর ১৯৬০ সালে গঠিত হয় ওপেক। এটি গঠিত হয় বাগদাদে। শুরুতে এর সদস্য ছিল সৌদি আরব, ভেনেজুয়েলা, কুয়েত, ইরান, ইরাক। আজ এ সংস্থা সদস্য হিসেবে আরো পাওয়া যায় আলজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, কাতার, ইকুয়েডর, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে।

এ সংস্থা গঠনের ১০ বছর পরে ১৯৭১ সালে তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য আলোচনা শুরু করে লিবিয়া, সৌদি আরব, আলজেরিয়া ও ইরাক। আলাপআলোচনার মধ্যদিয়ে তেলের দাম পিপেপ্রতি ২ দশমিক ৫৫ ডলার থেকে বৃদ্ধি করে নির্ধারিত হয় ৩ দশমিক ৪৫ ডলার। একেবারে শুরুতে তেলের দামের কথা পাঠকের নিশ্চয়ই খেয়াল আছে। তেল জাতীয়করণের ওপরে উল্লেখিত ঘটনাগুলোর আগেও এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ছিল বলিভিয়ায় ১৯৩৭ সালে। এরও আগে ১৯১৮ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার তেল জাতীয়করণ করা হয়। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে সোভিয়েত রাশিয়ায় তেল জাতীয়করণের ঘটনাটি ছিল বিপুল। কারণ এ দেশটিতে মেহনতি মানুষ তখন নিজেদের রাষ্ট্র গড়ছিলেন। অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, সব ক্ষেত্রে তারা নতুন একটি পদ্ধতি দাঁড় করাচ্ছিলেন যা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য।

এছাড়াও মিয়ানমার তেল জাতীয়করণ করে ১৯৬২ সালে। সে সময় এ দেশটির নাম ছিল বর্মা। একই বছরে মিসরও অনুরূপ পদক্ষেপ নেয়। এর পরের বছর আর্জেন্টিনা ও ইন্দোনেশিয়া এবং ১৯৬৮ সালে পেরু তেল জাতীয়করণ করে। ব্রাজিল তেল জাতীয়করণের পদক্ষেপ নেয় ১৯৫৩ সালে, গঠিত হয় সে দেশের তেল সংস্থা পেট্রোব্রাস।

তেলের ইতিহাসে তেল সম্পদ দেশে দেশে জাতীয়করণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পর্যায়ক্রমে এর বিবর্তন ঘটেছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এসব দেশে তেলের খোঁজ পাওয়া যায়। সে সময় এসব দেশ ছিল দারিদ্র্যে নিমজ্জিত। ঔপনিবেশিক নয়া উপনিবেশিক শাসন এ দেশগুলোকে বঞ্চিত করেছে ন্যায্য পাওনা থেকে। উপনিবেশিক নয়া ঔপনিবেশিক প্রভুরা যথাসম্ভব লুট করেছে এসব দেশ। কোনো কোনো দেশের তেল ছাড়া অন্য কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ কার্যত ছিল না। উদাহরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ দেশগুলোর কথা উল্লেখ করা যায়।

কয়েকটি গরিব, সাবেক উপনিবেশ, না উপনিবেশে তেলের খোঁজ পাওয়া গেল। কিন্তু এ দেশগুলোর তেল বিষয়ে কোনো জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি ছিল না। মাটির নিচ থেকে তেল আহরণ এবং তেল বিপণন বিষয়ে এসব দেশের কোনো ধারণাই ছিল না। এ অবস্থাকে প্রধান প্রধান তেল কোম্পানি সুযোগ হিসেবে গণ্য করে। এসব কোম্পানি তেল আহরণ বিষয়ে আলাপআলোচনা চালিয়ে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর কাছ থেকে নানা সুবিধাসহ তেল আহরণ ও বিপণনে চুক্তি করে। এ কোম্পানিগুলো তেল আহরণ ও বিপণনের একচেটিয়া সুযোগ পেয়ে যায়। বিনিময়ে এই তেল সওদাগররা তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সরকারসমূহকে দেয় কিছু অর্থ। এর নাম হয় রয়্যালিটি।

এর সঙ্গে ছিল সামান্য উৎপাদন কর। এমন লেনদেনের ফলে তেলের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলো কোম্পানিদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। সে নিয়ন্ত্রণও মাত্র কয়েকটি কোম্পানির। সংখ্যায় এরা সাত। এদের অনেকে নাম দিলেন, সেভেন সিস্টার্স, সাত বোন।

সেভেন সিস্টার্স অভিধা প্রথম ব্যবহার করেন ইতালির জাতীয় তেল কোম্পানির প্রধান এনরিকো মাত্তেই। এই সাত বোনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল মমতার মাখামাখির পাশাপাশি মারামারির। এ সাত বোন হচ্ছে: এক্সন (পূর্বতন নাম স্টান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি), মবিল (পূর্বতন স্টান্ডার্ড অয়েল অব নিউইয়র্ক), সোকোল (প্রথমে নাম ছিল স্টান্ডার্ড অয়েল অব ক্যালিফোর্নিয়া, পরে নাম হয় সেভরন), গালফ, টেক্সাকো, শেল ও ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। এ সাত বোনের পাঁচটির সদর দফতর যুক্তরাষ্ট্রে, একটির সদর দফতর ব্রিটেনে (বিপি) এবং একটি ইঙ্গডাচ (রয়্যাল ডাচ/শেল) পরবর্তীকালে এ সাত কোম্পানির আরো বিবর্তন হয়। এরা মিলেমিশে হয় চারটি কোম্পানি: শেল, এক্সনমবিল, শেভন, বিপি। কেউ কেউ বলেন, কনোকো ফিলিপস ও টোটালফিনাএলফ হচ্ছে উল্লেখিত সাত বোনের বৈমাত্রীয়/বৈপৈত্রীয় বোন।

এদের মধ্যকার সম্পর্ককে যে যেভাবে দেখে থাকেন না কেন, পুঁজি এদের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি করে, সে সম্পর্ক এদেরই আয়ুর মতো মেয়াদি। আর এ অভিন্ন সম্পর্কে আবদ্ধ এরা সবাই মিলে জগতে যে কাজগুলো করে, তা ইতিহাসের পাতায় রেখে যায় ছাপ। গভীর সে ছাপ ইতিহাসে নানা ঘটনার সাক্ষী, নানা ঘটনায় জড়িত। দেশে দেশে কোটি কোটি মানুষের জীবনে তো বিপুল প্রভাব ফেলে, বহু ঘটনা ঘটায়।।

(চলবে…)