Home » অর্থনীতি » বড় ঝুঁকি আর বিশাল ব্যয়ে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আসল মতলব কি?

বড় ঝুঁকি আর বিশাল ব্যয়ে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আসল মতলব কি?

মওদুদুর রহমান দেওয়ান

nuclearপারমাণবিক বিদ্যুৎ যদি ‘আধুনিকতা’র বাহন হয় তবে নিশ্চিত ভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭০ দশক এর পর থেকে আর আধুনিক হতে চাইছে না। জামার্নী এ ‘আধুনিকতাকে’ ছুড়ে ফেলে দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে,আর জাপানের রাস্তায় রাস্তায় ‘আধুনিকতা’ বিরোধী স্লোগান দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যৌক্তিকতা প্রমাণে যারা এর ঝুঁকিকে প্রাক্কলিত ঝুঁকি বলছেন, তারা সমন্বিত ও সার্বিক ক্ষতির হিসাবের খাতায় হয়তোবা নিজেদের রাখছেন না রাখছেন কৃষকশ্রমিকদিনমজুর সহ আমাদের মত সাধারণ মানুষদেরকে। একারণেই ক্ষমতাসীনরা জনগণ ও দেশের সীমাহীন ক্ষতির ব্যাপারে ‘আপসহীন’। সরকার এবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবেই। ১৯৫০, ’৬০ বা ’৭০ এর দশকে এই কেন্দ্রটি হলে আশ্চর্য হবার কিছু ছিল না। তখন নানা কারণে এবং মেরুকরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা ইউরোপ এবং সোভিয়েত, জাপান ভারত কিংবা অন্য অনেক দেশের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল আধুনিকতার প্রতীক। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে এটি যখন হয়ে উঠেছে মূর্তিমান আতংক ঠিক সে সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে দুই হাজার মেগাওয়াট এর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া চুক্তিটি অত্যন্ত প্রশ্নসাপেক্ষ, নানা সন্দেহের সৃষ্টিকারী।

আধুনিককালে ফ্রান্সবেলজিয়ামজার্মানীর মত অতি আধুনিক দেশগুলো যখন পরমাণু বিদ্যুৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তখন আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে প্রচার করে, বাংলাদেশে এর যৌক্তিকতা প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছেনযা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পুরোটাই আপন স্বার্থসংশ্লিষ্ট। কুইক রেন্টাল নিয়েও অনেক কথা শোনানোর মাধ্যমে চরম লুটপাট শেষে এখন প্রতিবছর ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

সম পরিমাণ সেবাদানে সক্ষম তুলনামূলক কম খরচের জিনিসকেই আমরা বলি সাশ্রয়ী। কিন্তু এই হিসাবের ক্ষেত্রটা হতে হয় সামগ্রিক, আংশিক নয়। কেন্দ্র স্থাপনের পর থেকে শুধুমাত্র উৎপাদন খরচ বিবেচনা করলে পরমাণু বিদ্যুৎ তেলগ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে সাশ্রয়ী। কিন্তু বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন ব্যয়, উচ্চ নিরাপত্তা রক্ষা ব্যবস্থা ব্যয়, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়, ইনসুরেন্স আর ঋণ পরিশোধের খরচ হিসাবে আনলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোনভাবেই সাশ্রয়ী নয়। বরং তা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল এবং অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টিকারী। তাইতো এমআইটি’র (ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি) গবেষণায় পরমাণু বিদ্যুৎ সবচেয়ে বেশি খরচ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনায় আমাদের প্রশিক্ষিত কোন লোকবল নেই। এক্ষেত্রে রাশিয়া হয়েছে আমাদের উন্নয়ন ব্যবসায়িক সহযোগী। বহু বছরের পারমাণবিক বিদ্যুতের এবং দুর্ঘটনায় অভিজ্ঞ রাশিয়াকে এ কাজে আমাদের পাশে আনা হয়েছে। এছাড়াও তাদের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য পাব, কারিগরী সহায়তা নেব। কিন্তু এর বিনিময়ে রাশিয়াকে আমাদের কতটা উজাড় করে দিতে হবে তা আমরা জানি না, রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার মারপ্যাচে হয়তো কোনদিন জানবোও না। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, কারো কারো কাছে রাশিয়ার এ সাহায্য ঔদার্য্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা হলেও বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবসা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি বড় উৎস।

ফ্রান্সের ফ্লামেনভিলেতে ১৬৩০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয় ২০০৬ সালে। এটি নির্মাণে প্রারম্ভিক ব্যয় ধরা হয় ৩৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা এবং ২০১২ সালের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা বলা হয়। কিন্তু নানা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা সংযোজন এবং ফুকুশিমা দূর্ঘটনার পরে আরো আধুনিকভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬২ হাজার কোটি টাকা এবং এখন তা ২০১৬ সাল নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সে হিসেবে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন দুই হাজার মেগাওয়াটের প্রতিটি কেন্দ্র স্থাপনে ব্যয় হবার কথা ৩০৩৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকারী সূত্রমতে প্রতিটি কেন্দ্র স্থাপনে ব্যয় হবে ১২১৫ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবতার সাথে কাগুজে হিসেবের কেন এত আকাশপাতাল তফাত? তবে কি কোন কমিশন বাণিজ্যের উদ্দ্যেশ্যে খরচ কম দেখানো হচ্ছে? নাকি খরচ কমাতে আনুষংগিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জলাঞ্জলি দেওয়া হচ্ছে?

ব্রাজিলের অ্যাংরা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু হয় ১৯৭০ সালে। ৫ বছরে ৬২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র নির্মাণের কথা বলে কাজ শুরু হয় যার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার ধরা। অথচ এর নির্মাণ কাজ শেষ করতে লেগে যায় ১৩ বছর আর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২১০ কোটি মার্কিন ডলারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ডায়াবলো ক্যনিয়ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু হয় ১৯৬৮ সালে যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৫০ কোটি ডলার। অথচ নির্ধারিত সময়ের ১০ বছর পর এটি যখন উৎপাদন শুরু করে তখন এর নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮০০ কোটি ডলার। তাই নির্মাণ কাজ যেনতেনভাবে শুরু করে দিতে পারলেই হলআমাদের যেহেতু কারিগরী দক্ষতা নেই, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি নেই, সংস্কৃতি নেই, দুর্নীতির বিচার নেই। তাই বছরের পর বছর এটিকে ঝুলিয়ে রেখে নানাভাবে ব্যয়বৃদ্ধি দেখিয়ে আয়েস করে টাকা লুটপাটের আশঙ্কা তো রয়েই যায়।

২০০০ সালে ব্রাজিলের একটি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দূর্ঘটনাবশত কয়েক হাজার হাজার গ্যালন তেজস্ক্রিয় পানি বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে অসংখ্য মানুষ। অথচ সেই দুর্ঘটনার খবরটি গোপন রাখা হয় দীর্ঘ চার মাস। তাই রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের উৎপাদনকালীন পর্যায়ে অপারেশনাল ত্রুটিবিচ্যুতি যে আমাদের জানতে দেয়া হবে না তা বলাই যায়।

এদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে গড়ে বাস করে প্রায় ১২০০ জন। যে কোন পারমাণবিক দূর্ঘটনার প্রথম ধাক্কাতেই কয়েক হাজার মানুষ মারা যাবার সম্ভাবনা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক। ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল দূর্ঘটনার সময় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে স্থানীয় জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল মাত্র ৬৩ জন। দূর্ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রাইপাট নগরীকে ঘিরে আশেপাশের ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূর্গত অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে প্রায় আড়াই লক্ষ বাসিন্দাকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। সেই দূর্গত অঞ্চল আজও পরিত্যক্ত, জনমানবহীন। তেমন কোন দূর্ঘটনা যদি ঘটেই যায় তবে বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব হবে ইউক্রেনের মত ২ লক্ষ উদ্ধারকর্মী নিযুক্ত করা? বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব হবে ৩০ লক্ষ মানুষকে স্থায়ীভাবে অন্যত্র পুনর্বাসন করা?

ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির পর জাপানের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় তহুকো’র উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যের ৭০৮০ ভাগ বাজার চলে গেছে চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দখলে। এমনকি তেজস্ক্রিয়তার কারণে দূর্ঘটনা অঞ্চলের ৩০০ কিলোমিটার দূরবর্তী কায়াসু কোম্পানীর উৎপাদিত দ্রব্যের বিক্রি কমে গেছে দুইতৃতীয়াংশ। কেমন হবে যদি আমাদেরকেও এমনি কোন দূর্ঘটনার পর ষোল কোটি মানুষের চাল আমদানী করতে হয় ভিয়েতনাম কিংবা ভারত থেকে আর গম আমদানী করতে হয় অস্ট্রেলীয়া কিংবা চীন থেকে?

পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পে আধুনিক সকল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, কাজেই এতে আর কোন ঝুঁকি নেইকথাটি প্রধানমন্ত্রী আজকাল প্রায়ই বলে থাকেন। বিশাল বিশেষজ্ঞের মতো যখন তিনি পারমাণবিক বিদ্যুতের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন, মনে হয় তিনি এর ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। কিন্তু জাপানের মতো দেশে প্রযুক্তি যখন ফুকুশিমা ট্রাজেডি ঠেকাতে পারে না তখন বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় এবং ভবিষ্যৎ কি হতে পারে তা যেকোনো বুদ্ধিজ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরই বোঝার কথা। কিন্তু উদ্দেশ্য যখন ভিন্ন এবং অন্য হয় তখন এসব কাণ্ডজ্ঞান এবং বুদ্ধিজ্ঞান দূরে সরিয়ে রাখতে হয়, সম্ভবত এটাই ক্ষমতার নিয়ম। জাতিগত বিপর্যয় সে প্রকল্প নিয়ে বিলাসিতা করা কি আমাদের শোভা পায়? সুনামি হবার পূর্বে সুনামির ভয়াবহতা তারা আচ করতে পারেনি। ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির পূর্বে এত বিশাল পরিমাণ ধবংসযজ্ঞের কোন ধারণাই তাদের ছিল না। ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল পারমাণবিক দূর্ঘটনার পর সকল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভবিষ্যৎ যে কোন ধরণের ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুত বলা হলেও ২০১১ তে এসে জাপানের মত প্রযুক্তিতে উৎকর্ষতা অর্জনকারী দেশে বিপর্যয়কারী ফুকুশিমা দূর্ঘটনা ঘটে।

বিশ্ব এখন পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এ ধরণের বিপদের আশঙ্কা অনেক বেশি। মেইঞ্জের ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর কেমিস্ট্রির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো পারমাণবিক দুর্ঘটনা। এমনকি আগে যেমনটা আশা করা হয়েছিল, বিপদের ঝুঁকি তার চেয়ে ২০০ গুণেরও বেশি। মেইঞ্জের ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, আগে যতোটুকু মনে করা হতো, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বিপর্যয়ের শঙ্কার তার চেয়ে অনেক বেশি। ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও গবেষক দলটির প্রধান জস লেলিভেল্ড বলেন, ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কার সৃষ্টি হয় এবং আমাদের পারমাণবিক মডেলে তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে পরীক্ষা করতে শুরু করি। সমীক্ষায় দেখা যায়, বিশ্বে এখন যতোগুলো পারমাণবিক চুল্লি সক্রিয় রয়েছে, তার একটিতে ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একবার দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ৪৪০টি পারমাণবিক চুল্লি সক্রিয় রয়েছে এবং আরো ৬০টি পরিকল্পনায় আছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ঘনবসতি ব্যাপক হওয়ায় সেখানে আরো বেশি লোকের পারমাণবিক দুষণের শিকার হওয়ার বিপদ রয়েছে। সেখানে বড় ধরণের পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটলে ৩৪ মিলিয়ন লোক আক্রান্ত হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও পূর্ব এশিয়ায় সংখ্যাটি হতে পারে ১৪ থেকে ২১ মিলিয়ন। জস লেলিভেল্ড বলেন, জার্মানি পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসায়, জাতীয়ভাবে তাদের তেজষ্ক্রিয় দূষণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পাবে। তবে জার্মানির প্রতিবেশীরাও তাদের চুল্লিগুলো বন্ধ করে দিলে, ঝুঁকি আরো বেশি কমবে। তিনি পারমাণবিক দুর্ঘটনার আশঙ্কার বিষয়টি মাথায় রেখে পরমাণু শক্তি ব্যবহার নিয়ে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

১৯৮৬ সালে ২৬ এপ্রিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কিয়েব শহরের চেরনোবিলে, ১৯৮৯ সালের ২৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে পেনসিলভেনিয়ার থ্রি মাইল আইল্যান্ডে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তার প্রতিক্রিয়া দীর্ঘদিন চলছে। জার্মানির নতুন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ শুধু বন্ধই করেনি, সঙ্গে সঙ্গে একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে মেয়াদউত্তীর্ণ কেন্দ্রগুলো। বেলজিয়াম, তাইওয়ান, জাপানও ক্রমে সরে গেছে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে। এমনকি বিদ্যুতের শতকরা ৭৭ ভাগ পরমাণু শক্তি থেকে পাওয়া ফ্রান্সের জনগণ সে দেশের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করার জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে এবং সে দেশের সরকারও এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ব্রাজিলের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ২০০০ সালের মে মাসে হাজার হাজার গ্যালন তেজষ্ক্রিয় লোনা পানি প্ল্যান্ট থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। আর এর ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে যায় বিপুল সংখ্য মানুষ। যদিও দুর্ঘটনার খবরটি চার মাস গোপন রাখা হয়েছিল। জাপানের বিপর্যয়ের পর জার্মানি বেশ কিছু পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। ফ্রান্স, ফিলিপাইনসহ কিছু দেশ পরমাণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন বন্ধ করে দিয়েছে। এভাবে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যে ঝুঁকি, সে ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বিশ্বের বহু দেশ।

আরেকটি বিষয় এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অত্যধিক খরচ, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছাড়াও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণ বা কিভাবে সরিয়ে ফেলা হবে তা একটি বড় সমস্যার বিষয়। ১৯৭৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০০ সালের মধ্যে চারশটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ১৯৭৮ সালের পর থেকে সে দেশে ১২০টি চুল্লি স্থাপনের প্রস্তাব ও পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। বাতিল করার কারণ হিসেবে অত্যধিক খরচ ও ঝুঁকির পাশাপাশি তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া অত্যন্ত ব্যয় সাপেক্ষ বলে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

বিভিন্ন তথ্যমতে, সুইডেনে শেষ পরমাণু চুল্লি নির্মাণের কাজ হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। স্পেনে ১৯৮৮, জার্মানিতে ১৯৮৯ এবং ইংল্যান্ডে ১৯৯৫ সালে। ১৯৮৯ সালে জার্মান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সে দেশের সবকটি চুল্লি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেয়া হবে। ২০০০ সালের মধ্যে ফ্রান্সে ২০০টি পরমাণু চুল্লি চালু হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে চালু চুল্লির সংখ্যা ৫০টির বেশি নয়। ২০১২ সালের ২২ মে সায়েন্স ডেইলি এক সংবাদ নিবন্ধে বলেছে, পশ্চিম ইউরোপ বড় মাত্রায় পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। নিবন্ধে আরো বলা হয়, প্রতি ১০ থেকে ২০ বছরে বড় ধরণের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে।

যে কোন পারমাণবিক দূর্ঘটনায় বিকিরিত কণা পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। এটি শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক প্রাণহানী বা অঙ্গহানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ব্যাপকতা ছড়াতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এরূপ দূর্ঘটনায় যে বিষাক্ত সিজিয়াম নির্গত হয় তা আশ্রয় পায় মাটিতে এবং মূলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ফসলে। এমনিভাবে এটি ঢুকে পড়ে আমাদের খাদ্য শৃঙ্খলে, বীজের মাধ্যমে ছড়াতে থাকে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে। এমনি কোন অনভিপ্রেত পারমাণবিক দূর্ঘটনায় কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ যে কতটা ভয়াবহ সংকটে পড়বে তা অকল্পনীয়। তাছাড়া বিকিরিত প্লুটোনিয়াম ছড়িয়ে পড়ে পানিতে। জলজ জীববৈচিত্র্যের উপর এর ধবংসযজ্ঞ চলতে থাকে ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অনেক নদীই আমাদের অজ্ঞতায় বর্জ্যবাহী নালায় পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যৎ বিকিরণের দূষণে যে সেটি বিষভান্ডার হয়ে উঠবে না তা কে বলতে পারে।

বলা হচ্ছে যে, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে যে কোন ধরণের ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যবহার করা হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। যদি পারমাণবিক কেন্দ্রেগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ১০০% নিরাপদ করেই গড়ে তোলা যায়, তবে কেন ভারতের তামিলনাড়ুর কুদাঙ্কুলাম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের নির্মাণ সহযোগী প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার ‘অ্যাটমস্ট্রোক্সপোর্ট’কে যে কোন ধরণের ভবিষ্যৎ দূর্ঘটনায় দায়মুক্তি দিয়ে চুক্তি করা হল। বলে রাখা ভাল যে, এই একই প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশ সরকার চুক্তিবদ্ধ।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা থাকার পরও এত সব ঝুঁকি আর অস্তিত্বের সংকট নিয়ে কেন এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ? এর সঠিক উত্তর নীতিনির্ধারনী মহলই সবচেয়ে ভাল দিতে পারবেন। তবে আমরা শুধু এটুকুই জানি যে প্রক্রিয়া যত জটিল আর কেন্দ্রীভূত করা যায় গোপনীয়তার ছলচাতুরীতে দুর্নীতি করার সুযোগ তত বেশী হয়। আর সচেতন মহলের আশংকা সত্যি করে যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটেই যায় তবে তাদের তেমন সমস্যা হবার কোন কারণ নেই। কেননা বাংলাদেশ আমাদের একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাই হলেও তাদের অধিকাংশেরই ‘সেকেন্ড হোম’ বলে একটা জায়গা রয়েছে। এই দেশে তারা শাসন করেন মাত্র।

কি উদ্দেশ্য জোর করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমাদের উপরে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষ তা জানতে চায়। আপনাদের মতলব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায়। কারণ কুইক রেন্টাল নিয়েও তখন বলা হয়েছিল, দেশ বিদ্যুতে ভরে যাবে। ভরে গেছে ঠিকই। তবে বিদ্যুতে নয়, দুর্নীতি, লোকসান আর সেই একই বিদ্যুৎ সঙ্কটে। এরপরেও কি আমাদের শোনতে হবে আরেক কল্পকাহিনী ‘বিদ্যুৎ আসবে, বিদ্যুৎ আসবে’। আর দুর্ঘটনার কথা বাদই দেয়া যাক। সামান্য একজন যুবলীগ নেতা একাই যেখানে হত্যা করতে পারেন ১১শএর বেশি গার্মেন্টস শ্রমিককে ভবন ধসের নামে, সাধারণের জীবন সে দেশে খুবই সাধারণ এবং অসম্ভব স্তা।।