Home » অর্থনীতি » ভরা মৌসুমেও চালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি

ভরা মৌসুমেও চালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

rice priceবোরো ধানের ভরা মৌসুমে ধান চালের দাম বেড়ে চলেছে। ধানের বাজার চড়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা দাম পায়নি। ঢাকার বাইরেই প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৪ ৫ টাকা এবং চিকন চাল কেজি প্রতি ৬ ৭ টাকা বেড়েছে। আর ঢাকায় গত দুই সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন জাতের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২ থেকে ১০ টাকারও বেশি। মোটা ধান মন প্রতি দেড়শ’ টাকা এবং চিকন ধান বি আর ২৮ ও কথিত মিনিকেট ২শ’ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। হাট বাজার গুলোতে ধানের আমদানিও কমে গেছে।

দফায় দফায় ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বোরো মৌসুমে সেচ খরচ বেড়ে যায়। বিঘা প্রতি সেচ খরচ ৮শ’ টাকা থেকে এক হাজার টাকা করে বেশি নেয় সেচ যন্ত্রের মালিকরা। এতে ধানের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। সরকারের সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে খোলা বাজারে ধান চালের মূল্য বেশি হওয়ায় সংগ্রহ অভিযানে লক্ষ্যমাত্র অর্জিত হবে না বলে আশংকা করা যাচ্ছে। এবার প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহ মূল্য সাড়ে ১৮ টাকা এবং চালের ২৯ টাকা ধার্য করা হয়েছে। ২ মে থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে, চলবে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, চলতি বছরে সারাদেশে ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টরে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬০ হাজারে হাইব্রিড, ৪০ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টরে উচ্চফলনশীল ও ৪৫ হাজার হেক্টরে স্থানীয় জাতের বোরো চাষের কথা ছিল। বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টন চাল। কিন্তু চাষ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মনিটরিং শাখার এক কর্মকর্তা জানান, ৪৭ লাখ ৩০ হাজার হেক্টরে বোরো চাষ হয়েছে। তবে তিনি বলেন, চাষ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও ফলন ভাল হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। এদিকে চাষিরা জানান, বিগত কয়েক বছর যাবত ধানের দর পতনে চাষিরা ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে। এ কারণে এ বছর বোরো চাষ কমিয়ে অন্য ফসল চাষে ঝুঁকে। ফলে বোরো চাষে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তরা বলছেন, ফলন লাভ হয়েছে। তবে চাষিরা বলছে ফলন ভালো হয়নি। টানা বর্ষণ ও ঘুর্ণিঝড় মহাসেনের প্রভাব ধানের ক্ষতি হয়েছে। কাটা ধান পানিতে থাকায় চারা গজিয়ে যায়। এতে ফলন কম হয়েছে। এ বিঘা জমিতে বোরো চাষে জমি চষা খরচ এক হাজার টাকা, বীজ ও চারা ৫শ’ টাকা, সেচ ৩ হাজার টাকা, নিড়ানি ২শ’ টাকা, সার ও কীট নাশক ২ হাজার টাকা, কাটা, মাড়াই ও শুকানো ২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ১২ হাজার টাকা। বিঘাতে ধান উৎপাদন হয়েছে গড়ে ২০ মন। ধান উঠার পর সাড়ে ৫শ’ টাকা করে বিক্রি করে আয় হয়েছে ১১ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি লোকসান হয়েছে এক হাজার টাকা। এখন ধানের বাজার চড়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা দাম পায়নি।

ধান চাল ব্যবসায়ী ও চাতাল মালিকদের সুত্রে জানা যায়, নতুন ধান উঠার পর প্রতি মন মোটা ধান সাড়ে ৫শ’ টাকা থেকে ৬শ’ টাকা দরে বিক্রি হয়। সে ধান বর্তমানে সাড়ে ৭শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বি আর ২৮ ধান নতুন উঠার পর সাড়ে ৬শ’ টাকা থেকে ৭শ’ টাকা মন দরে বিক্রি হয়। সে ধানের দাম বেড়ে এখন সাড়ে ৮শ’ টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। মিনিকেট ধানের দাম মন প্রতি প্রায় দুশ’ টাকা চড়ে ৯শ’ ১৫ টাকা থেকে ৯শ’ ২৫ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর গ্রামের চাষি ইজাজুল ইসলাম বলেন, তিনি নতুন ধান উঠার পর প্রতি মন ৬শ’ ৬০ টাকা দরে বিক্রি করেন। সে ধানের দাম চড়ে এখন সাড়ে ৮শ’ টাকা হয়েছে। উত্তর বঙ্গের জেলা গুলোতে মোটা ধানের দাম চড়ে ৭শ’ টাকা থেকে ৭শ’ ১৫ টাকা হয়েছে। বি আর ২৮ ধানের দাম চড়ে প্রতি মন সাড়ে ৮শ’ টাকা হয়েছে। গত বছর এ সময় মোটা ধানের দাম প্রতি মন ৬শ’ টাকার নিচে ছিল। আর প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ২২ ২৩ টাকা ছিল। বি আর ২৮ চালের দাম প্রতি কেজি ৩০ ৩১ টাকা ছিল। মিনিকেট চালের দাম ছিল ৩৪ ৩৫ টাকা কেজি। কিন্তু উৎপাদক অর্থাৎ কৃষক ন্যায্যমূল্য পায়নি। দাম বাড়ার সবটুকু লাভ নিয়ে গেছে মজুদদার আর মধ্যসত্বভোগীরা। এ কারণে ধানের দাম বাড়লেও কৃষকের কোনো লাভ হয়নি।

বর্তমানে মোটা চাল প্রতি কেজি ২৫ ২৬ টাকা থেকে চড়ে খুচরা ৩১ ৩২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিআর ২৮ চালের দাম ৩২ ৩৩ টাকা কেজি থেকে বেড়ে ৩৬ ৩৮ টাকা এবং মিনিকেট ৩৫ ৩৬ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ ৪২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কথিত সুপার মিনিকেটের দাম কেজি প্রতি আরো দু’ টাকা বেশি। গত বছর এ সময়ের চেয়ে মান ভেদে প্রতি কেজি চালের দাম ১০ টাকা বেশি। দরিদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা ভাল দাম না পেলেও মজুতদাররা বাম্পার লাভ করছে। সদ্য শেষ হওয়া অর্থ বছরে ২১ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টরে আউশ ধানের চাষ হয়। আউশের উৎপাদনের পরিমান ছিল ১০ লাখ ৫৩ হাজার টন। আমনের আবাদ হয় ৫৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টর। উৎপাদন হয় এক কোটি ২৮ লাখ ৪৭ হাজার টন। বোরোর উৎপাদনের পরিমান এখনও নির্ধারণ হয়নি। তবে বোরো উৎপাদন এক কোটি ৮৭ লাখ টন ধরলে চালের মোট উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ২৬ লাখ টন। গমের উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন। মোট দানাদার খাদ্য উৎপাদনের পরিমান দাড়ায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৫৫ হাজার টন। দেশে দানাদার খাদ্য শস্যের চাহিদা নিয়েও ভিন্নতা আছে। খাদ্য অদিদপ্তর দৈনিক মাথাপিছূ ৫শ’ গ্রাম হিসাবে বার্ষিক খাদ্য শস্যের চাহিদার পরিমান নির্ধারণ করে। এ হিসাবে দেশে দানাদার খাদ্য শস্যের (চাল গম ) বার্ষিক চাহিদা দু’ কোটি ৯২ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দৈনিক মাথাপিছু ৪শ’ ৫৪ গ্রাম দানাদার খাদ্য শস্যের হিসাব ধরে থাকে। এ হিসাব অনুযায়ী বার্ষিক খাদ্য শস্যের চাহিদা হয় দু কোটি ৬৫ লাখ ১৩ হাজার টন। কোন হিসাবেই দেশে দানাদার খাদ্য শস্যের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। তবে কেন এ সময় ধান চালের দাম বাড়ছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে ধানের দাম বাড়ায় চাষি লাভবান হচ্ছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষির হাতের ধান ফুরিয়ে গেছে। তারা ধান উঠার পর দায় দেন পরিশোধ করতে কম দামে ধান বিক্রি করে ফেলেছে। বড় চাষি,বড় ব্যবসায়ী ও মিল মালিকের ঘরে ধান মজুত আছে।।