Home » আন্তর্জাতিক » মিয়ানমারে মুসলিম বিরোধী ‘নব্য নাৎসি’ আন্দোলন

মিয়ানমারে মুসলিম বিরোধী ‘নব্য নাৎসি’ আন্দোলন

এশিয়া টাইমস অন লাইনে মং জারনির প্রতিবেদন অবলম্বনে মোহাম্মদ হাসান শরীফ

myanmarমিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ সহিংসতার পর এখন কেবল সেখানেই নয়, অন্যান্য রাজ্যেও মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে অভিহিত করার কোনো মানে হয় না। দেশটিতে আক্ষরিকভাবেই নাৎসিবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছে। হিটলারের জার্মানি যেভাবে ইহুদিদের বিরুদ্ধে জাতি নির্মূল অভিযান শুরু করেছিল, প্রেসিডেন্ট থিন সেইনের দেশে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এই জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কাছে হিটলারের মাইন ক্যাম্ফ প্রিয় একটি গ্রন্থ। এমনকি তারা হিটলারের কলাকৌশল বিশুদ্ধভাবে শেখার জন্য জার্মান ভাষাও শিখছে।

মিয়ানমারে সম্প্রতি একটি নতুন নাৎসি দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশসংলগ্ন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমবিরোধী জাতি নির্মূল অভিযানের প্রেক্ষাপটে বেশ ঘটা করে রাখাইন ডেভেলপমেন্ট পার্টির (আরএনডিপি) নিবন্ধন নেওয়া হয়। দলটির জন্ম হয়েছে মিয়ানমারের নতুন রাজধানী নেপিডাওয়ে। আর বিরোধী নেত্রী আং সান সুকি প্রকাশ্যেই বিতর্কিত দলটির চেয়ারম্যান এবং পার্লামেন্ট সদস্য ড. আই মংসহ অন্য নেতাদের সঙ্গে খানাপিনা করেছেন।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিন সেইন, পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ‘৯৬৯’ নামে পরিচিত নব্যনাৎসি বৌদ্ধ আন্দোলনটির প্রতি সব ধরণের সহিষ্ণুতা কিংবা কৌশলগত প্রশ্রয় দিয়ে আসছে। বৌদ্ধ মৌলবাদী আন্দোলনটির চালিকাশক্তি হচ্ছে ইউ বিরাঠুর মতো ফ্যাসিস্ট ভিক্ষুরা। রাখাইনে তাদের মিশন সম্পন্ন করার জন্য গঠন করা হয়েছে আরএনডিপি। এই দলের অন্যতম নেতা হচ্ছেন আং মং। বাংলাদেশবংশোদ্ভূত এই রাখাইন লোকটি শত শত রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা এবং এক লাখ ২০ হাজার লোককে উদ্বাস্তেু পরিণত কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও তাকে কোনো ধরণের শাস্তি পেতে হয়নি।

বিচার বিভাগ যে নানাভাবে বৌদ্ধ বর্ণবাদীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে, তার একটি প্রমাণ হলো সম্প্রতি এক মুসলিমকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদানের ঘটনা। ওই লোকটির অপরাধ ছিল, তিনি তার মোটরসাইকেলের চাবি দিয়ে ফুটপাতের এক দোকানের কাচে লাগানো একটি ৯৬৯ স্টিকার তুলে ফেলেছিলেন। তাকে সাজা দেওয়া হয় ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে। আবার ২০১২ সালের জুনে রাখাইন শহর টঙগকে প্রকাশ্য দিবালোকে ১০ মুসলিম তীর্থযাত্রীকে হত্যার সঙ্গে জড়িত কাউকেই বিচারের সামনে হাজির করতে পারেননি প্রেসিডেন্ট থিন সেইন। গত বছরের রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্যও কাউকে সাজা পেতে হয়নি।

এ ধরণের খোলাখুলি দায়মুক্তি পাওয়ার পর আরএনডিপি খোলাখুলিভাবেই নাৎসিবাদী কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশুদ্ধ ‘বৌদ্ধ রাজ্য’ প্রতিষ্ঠায় নেমে পড়বে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আরএনডিপির নিজস্ব জার্নাল ‘টোটেটইয়ায়ে’ (প্রগতি) রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমার মুসলমানদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করার সময় নিয়মিতভাবেই ‘জানোয়ার’ শব্দটি ব্যবহার করে। মিডিয়া সাক্ষাতকারে এবং পার্লামেন্টে আলোচনাকালেও আরএনডিপি নেতারা তাদের আদর্শ হিসেবে ইসরাইল এবং এর বর্ণবাদীব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। ইসরাইল যেভাবে ফিলিস্তিনিদের দমন করছে, তারাও মনে করেন, রাখাইন ‘দেশপ্রেমিক’রা সেভাবেই রোহিঙ্গাদের দমিয়ে রাখবে।

টোটেটইয়ায়ে’ পত্রিকার ২০১২ সালের নভেম্বর সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়, সাবেক নাৎসি নেতা হিটলার ইহুদিদের জন্য দানব হতে পারেন, কিন্তু অনেক জার্মানের কাছে তিনি জাতীয়তাবাদী নায়ক। এর মাধ্যমে তাদের নাৎসিবাদী চিন্তাভাবনা প্রকাশিত হয়েছে।

দলটি যেকোনো আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিরোধের জন্যও দেশটির নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ‘জাতি নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করলেও এতে কর্ণপাত না করতে বলেছেন তারা।

তারা ১৯৮২ সালের বর্ণবাদী সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট জবরদস্তিমূলকভাবে বাস্তবায়নেও দাবি জানাচ্ছে। ওই অ্যাক্টে রোহিঙ্গাদের কোনো ধরণের নাগরিক অধিকার প্রদানের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা যে বংশানুক্রমিকভাবে ১৮২৪ সালে প্রথম ব্রিটিশ যুদ্ধের আগে থেকে মিয়ানমারে বাস করছে, সে ধরণের কোনো দলিল তাদের কাছে নেই। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, এ ধরণের দলিল ‘বিশুদ্ধ’ বর্মিদের কাছেও নেই। উনিশ শতকের আগে দেশটিতে কোনো ছাপার মেশিন আসেনি। তখনকার সামন্ততান্ত্রিক সমাজে লেখার কাজ করা হতো তালপাতায়। সেগুলো দীর্ঘ দিন টিকে থাকার সম্ভাবনাও ছিল না। অথচ ওইগুলোর উপর নির্ভর করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

আরএনডিপির বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মিয়ানমারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমর্থিত হচ্ছে। এমনকি দেশটির বুদ্ধিজীবী মহলও তাদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করছে। তারাও ওই সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছে। তারা নানা প্রবন্ধনিবন্ধের মাধ্যমে নাৎসিবাদী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করছে। অনেকেই বলছে, জাতীয় নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া ঠিক হবে না। তারা এমনকি গত বছরের রোহিঙ্গাবিরোধী সহিংসতাতে জাতি নির্মূল হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তাদের বক্তব্য ধ্বনিত হয়েছে রাখাইন রাজ্যের মুখপাত্র উইন মিয়াংয়ের কথায়: ‘এটাকে কিভাবে জাতি নির্মূল বলা যায়? তারা কোনো জাতিগত গ্রুপ নয়।’

এ ধরণের বর্ণবিদ্বেষ পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়। সেই ২০০৪ সালের দিকে থাইমিয়ানমার সীমান্ত এলাকা মাই সটে নির্বাসিত রাখাইন ভিন্নামতালম্বীরা হিটলারের কুখ্যাত ‘মাইন ক্যাম্ফ’ পড়তে এবং আলোচনা করতে দেখা গেছে। এ কারণে মিয়ানমারের নব্য নাৎসিদের হিটলারের বর্ণবাদী মূলমন্ত্র মূল লেখা অনুযায়ী পড়ার জন্য জার্মান ভাষা শেখার আগ্রহে বিস্ময় সৃষ্টি করে না।

মিয়ানমারে নিযুক্ত সাবেক এক জার্মান রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, সম্প্রতি উদীয়মান অবস্থাকে ‘নব্যনাৎসিবাদী বৌদ্ধ আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করলে জার্মান পররাষ্ট্র দফতর তার ‘নাৎসি’ বা ‘নব্য নাৎসি’ শব্দের ব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়। থিন সেইনের বেসামরিক পোশাক পরা সরকারের সঙ্গে জার্মানির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় ‘নাৎসি’ শব্দটি ব্যবহার সম্ভবত বার্লিনের জন্য বিরক্তির কারণ হয়েছিল।

কেবল জার্মান কর্মকর্তারাই নয়, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক গণহত্যা বা নাৎসিধরণের ঘটনাবলী প্রকাশ করার ব্যাপারে আরো অনেকে আপত্তি আছে। ইয়াঙ্গুনভিত্তিক পশ্চিমা কূটনীতিকরাও রোহিঙ্গা এবং অন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে নেপিডাওসমর্থিত ব্যাপক সহিংসতাকে ‘জাতি নির্মূল’ হিসেবে দেখতে চান না।

অবশ্য, স্নায়ু যুদ্ধের পর থেকে মিয়ানমারে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রায়নের সুপারিশকারী পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়’ এখন ‘গণহত্যা অধিকারদানকারীর’ ভয়াবহ ভূমিকা পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ব্রিটেন থেকে জাপান, প্যারিস ক্লাব থেকে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক, ‘বার্মাধবংসকারী’ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের কথা নাই বা বলা হলোযেমনটা বলেছেন আং সান সুকির অস্ট্রেলিয়ান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিন টারনেলসবাই কোনো না কোনোভাবে তাদের নিজেদের বৃহত্তর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থসিদ্ধির কথা ভাবছে।

মুসলিমবিরোধী জাতি নির্মূলের পর প্রত্যক্ষভাবে ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মান আসতে থাকায় নেপিডাও যে তার সমালোচকদের পাত্তা দিতে কসুর করবে না, এটাই স্বাভাবিক। ওবামা মিয়ানমারের সাম্প্রতিক মুসলিমবিরোধী সহিংসতার ব্যাপারে মৃদু উদ্বেগ প্রকাশ করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘জাতি নির্মূল’ শব্দ এড়িয়ে গেছেন। কারণ, আর যাই হোক, কে চাইবে তাদের নতুন ব্যবসায়িক ও কূটনীতিক অংশীদারকে মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে গণহত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে?

(এশিয়া টাইমস অন লাইন অবলম্বনে)