Home » বিশেষ নিবন্ধ » আবার গণ-অনাস্থা

আবার গণ-অনাস্থা

(তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ)

আমীর খসরু

Gazipur-city-corporation election-5আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ সদম্ভে উচ্চারণ করেছিলেন, গোপালগঞ্জের পরেই আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি গাজীপুর। এ কথা তিনি একবার নয়, দুইবার নয়, অসংখ্যবার উচ্চারণ করেছিলেন। ক্ষমতাসীনদের অন্যান্যরাও বলেছিলেন, একই কথা। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ক্ষমতাসীন জোটের প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের পরাজয়ের মধ্যদিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, জনগণ আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতেই এবার হানা দিয়েছে, তছনছ করে দিয়েছে তাদের দম্ভ। নিজেদের ঘাঁটিতেই যখন তাদের এই পরিণতি সে অবস্থায় সারাদেশে তাদের অবস্থান এখন কোথায় তা জনগণ প্রমাণ করে দিয়েছে। চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার অংশীদারদের জন্য এ নির্বাচনটি রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল যাতে তাদের পক্ষে যায়, তাদের প্রার্থী যাতে জয়ী হয় এ লক্ষ্যে নানা কলাকৌশল, পথ এবং পদ্ধতি তারা গ্রহণ করেছিলেন। নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে সেনা মোতায়েনের দাবিসহ বেশ কিছু দাবি জানানো হলেও তা মানা হয়নি। তাদেরই সাজানো, তাদেরই ঠিকঠাক করা ব্যবস্থার মধ্যদিয়েই জনগণ জবাব দিয়েছে। তাদের শক্ত ঘাঁটিতেই ধস নেমেছে। ধসের মাত্রাটা এমন যে, ক্ষমতাসীন প্রার্থী তাদের নিজের কেন্দ্রেই হেরে গিয়েছেন। এমনকি স্থানীয় এমপির নিজ কেন্দ্রেই এই প্রার্থী কম ভোট পেয়েছেন তার প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায়।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে কয়েকটি সংবাদপত্র এবং অনেক বিশ্লেষক বলেছিলেন, এটি জাতীয় নির্বাচন এবং এর ফলাফল যদি ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে যায় তাহলে তা হবে আগামীদিন জাতীয় নির্বাচনের জন্য সংকেতবাহী।

চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরে এই নির্বাচনের ফলাফলও আসলে ফলাফলের ধারাবাহিকতা ছাড়া কিছুই নয়। এই ধারাবাহিকতা জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, মনবেদনা, সরকারি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গজনিত হতাশা, সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনগণের বিতশ্রদ্ধ হওয়ার বহিঃপ্রকাশ এবং প্রতিবাদ। এ বিষয়টিকে এভাবেও বিশ্লেষণ করা যায় যে, গত পৌনে পাঁচ বছরে ক্ষমতাসীনদের যাবতীয় দুঃশাসন, অপশাসন, দুর্নীতির ভারে সরকার নিজে নিজেই ভেঙে পড়ছে। নিজেদের অপশাসন এবং দুঃশাসনের মাত্রাটা এতোই বেশি হয়ে গিয়েছে যে, তার পক্ষে জনসমর্থন পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আর সম্ভব নয়।

ইতোপূর্বে অনুষ্ঠিত চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পরে আওয়ামী লীগের মহা প্রাসাদে যে আতঙ্ক, ভয়, শঙ্কা এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, গাজীপুরের ফলাফল তাকে আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ ইতোপূর্বে চার নির্বাচনের ফলাফলের পরে গাজীপুর নির্বাচনটি হয়ে দাঁড়ায় একটি পরীক্ষার মতো। কারণ চারটি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ক্ষমতাসীনরা বলেছিল নানা কথা, যেমন প্রার্থী, পরিস্থিতি এবং অন্যান্য কিছু কারণে তাদের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। এতে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হ্রাস প্রমাণিত হয় না। কিন্তু গাজীপুর নির্বাচনে বিষয়টি পুনরায় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ক্ষমতাসীনরা জনগণের আস্থা পরিপূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় ইস্যুতে এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে।

২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের উপরে জনগণ যে আস্থা প্রদর্শন করেছিল, গাজীপুর এবং আগের সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোর মধ্যদিয়ে জনগণ যে ক্ষমতাসীনদের উপরে আস্থাশীল নয় তা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। তাদের অনাস্থা তারা প্রকাশ করেছেন। এ কারণে গাজীপুর নির্বাচনকে আস্থা ভোটের আরেকটি গণভোট হিসেবে গণ্য করাই সঙ্গত।

বর্তমান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতেহার এবং বিভিন্ন জনসভায় নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বলা হয়েছিল, দ্রব্যমূল্য হ্রাস, জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ নানা কথা। কিন্তু বাস্তবে দ্রব্যমূল্য এখন আকাশছোঁয়া। গ্যাসবিদ্যুতের কোনো উন্নতি হয়নি বরং দিনে দিনে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কুইক রেন্টালের নামে ক্ষমতাসীনদের নিজ ব্যক্তিবর্গকে অনিয়মের পথ খুলে দেয়া হয়েছে। এই কুইক রেন্টালের টেন্ডারে দেয়া হয়েছে ইনডেমনিটি। কুইক রেন্টাল দিয়ে এখন সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ গুনতে হচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে জনমানুষের উপরে। তেলগ্যাস বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সীমাহীন অবনতি হয়েছে। টেন্ডারবাজিচাঁদাবাজি এখন নিত্যদিনকার ঘটনা। হত্যা, খুন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন উপসর্গ ‘গুম’। ছাত্রলীগযুবলীগসহ ক্ষমতাসীনদের অবাধ দৌরাত্ম্য এবং আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়ায় জনমানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এদের হাতে সামান্য একজন বিশ্বজিতও নিরাপদ নন। যৌন সন্ত্রাস, হত্যা, খুন, দখলসহ হেন অপকর্ম নেই যা তারা করছে না। কিন্তু সরকার তাদের ব্যাপারে নির্বিকার।

দমনপীড়ন, নির্যাতনের মাধ্যমে বিরোধী দল, মতপথকে দমনের নানা কৌশল এবং পদ্ধতি এ সরকার গ্রহণ করেছে। বিরোধী দলসহ বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের কাউকে রাজপথে তো দূরে থাক, ঘরের মধ্যেও নির্বিঘেœ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেয়া হয়নি। রাজপথ তারা নিষিদ্ধ করেছে, চিন্তা নিষিদ্ধ করেছে, কণ্ঠ নিষিদ্ধ করেছে।

পুলিশর‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে নিজস্ব দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, এই প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীন স্বকীয় সত্বা এখন আর নেই। তারা পরিণত হয়েছে দলের বাহিনীতে। এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর হাতে নারীসহ কেউই নিরাপদ নয়। সাধারণ মানুষ তো নয়ই। এর সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের ক্যাডাররা যুক্ত হয়ে বিরোধী পক্ষ দমনের নামে নানা কর্মকাণ্ড করেছে, যা সবারই জানা। দেখামাত্র গুলি, মিছিলমিটিং বন্ধ করা, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে এ সময়ে। সন্ত্রাস দমনের নামে নতুন আইন করা হয়েছে তড়িঘড়ি। আর এটি করা হয়েছে বিরোধী দল ও মত দমনের জন্য।

অর্থনীতিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। গার্মেন্টস খাতকে সীমাহীন দুর্ভোগের মুখোমুখি করা হয়েছে। জিএসপি সুবিধাটুকুও বাংলাদেশ হারিয়েছে ক্ষমতাসীনদের জন্য। রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশনসসহ বিভিন্ন গার্মেন্টসে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। অসহায় বলি হয়েছে শত শত নিরীহ শ্রমিক।

পররাষ্ট্রনীতিতে একচোখা নীতি গ্রহণ করে করিডোরসহ নানা সুবিধা ভারতকে দেয়া হয়েছে। এখন সুন্দরবনকে ধ্বংস করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ভারতকে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে দেয়ার মধ্যদিয়ে।

সামগ্রিকভাবে এক দুঃশাসনের পরিস্থিতি যখন সৃষ্টি হয়েছে, জনগণের জনজীবনকে করা হয়েছে দুঃসহদুর্বিষহ তখনই ভোটের মাধ্যমে জনগণ জানিয়ে দিয়েছে একটিই বার্তা দূর হও দুঃশাসন।

এই নির্বাচনে ইসলামী দল এবং গ্র“পগুলো একটি ভূমিকা পালন করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ইসলামী দলগুলোর এই উত্থান এবং তাদের একটি অনুঘটক হিসেবে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে আসা, তাও ক্ষমতাসীনরা করেছে বিরোধী দলকে চাপে রাখার জন্য। যে হেফাজতকে বা অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে মাঠে নামিয়েছিল ক্ষমতাসীনরা, তারাই এখন সরকারের বড় শত্রু। যে জামায়াতের সঙ্গে ক্ষমতাসীনরা আঁতাত করতে গিয়েছিল, সে জামায়াত এখন আর তার কথা শুনছে না।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোনো পেশাজীবী, শ্রমজীবী পক্ষকেই সরকার ক্ষেপিয়ে তোলেনি, এমন নজির দেখা যাবে না।

চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের পরাজয়ের পরে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আর গ্রহণযোগ্য নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু গাজীপুর সিটি করপোরেশন পুনরায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প কিছু নেই।

বিএনপি ক্ষমতাসীনদের পরাজয় এবং তাদের প্রার্থীর জয়কে নিজেদের বিজয় হিসেবেই দেখছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তা নয়। জনগণ দুঃশাসন এবং ওয়াদা ভঙ্গকারীর হাত থেকে মুক্তি চেয়েছে। এ অবস্থায় মুক্তির প্রত্যাশায় তারা সামনে যে বিকল্পই হাতে পেয়েছে, তাকেই ভোট দিয়েছে। এটা হচ্ছে নেগেটিভ ভোট। ক্ষমতাসীনদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের ইতিবাচক সুফল পেয়েছে বিএনপি। এ ভিন্ন অন্য কোনো বাস্তব পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। এ ভোটের মাধ্যমে বিএনপির জন্যও জনগণ বিশেষ একটি বার্তা দিয়েছে। দুঃশাসন ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে তারা আবারও বিকল্প পথ খুঁজে বের করবে এটি বিএনপিকে মনে রাখতে হবে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, এটা যতোদূর বিএনপির বিজয় তার চেয়েও বেশি জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি গণঅনাস্থা।

আর সরকারের জন্য বার্তা তো জনগণ ভোটের মাধ্যমেই দিয়ে দিয়েছে। এই বার্তা পাওয়ার পরেও যদি সরকার প্রধান এবং ক্ষমতাসীনদের শিক্ষা না হয়, তাহলে তাদের জন্য জনগণের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আরো ভয়ঙ্কর বার্তা অপেক্ষা করছে।।

১টি মন্তব্য

  1. Eto sposto Kotha bolar Ki dorkar? Apnar ki voy lage na?