Home » রাজনীতি » আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পোষ্টমর্টেম

আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পোষ্টমর্টেম

পীর হাবিবুর রহমান

AWAMI LEAGUE-logo. আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শাসনামলের সাড়ে চার বছরে এসে পাঁচটি সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রার্থীদের শোচনীয় ভরাডুবিতে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে পোষ্টমর্টেম চলছে। জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের আগাম হাওয়া বইছে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা হতাশার তীরে দাড়িয়ে দেখছেন প্রতিপক্ষ বিএনপি’র আত্মবিশ্বাস ও উল্লাসের দৃশ্য। দলের নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটছে। দলের হাইকমান্ড এখন কর্মীদের সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত। আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাঠগড়ায় নেতৃত্ব বিমর্ষ। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঝাপিয়ে পড়া দলের প্রবীন নেতা তোফায়েল আহমেদ ভোটের তিনদিন আগে থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ে যতবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন ততবার মানুষ তার চেহারায় আসন্ন পরাজয়ের চিহ্ন দেখেছে। ভোটের নয় দিন আগে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভোটযুদ্ধে নেমেছিল। সাড়ে চার বছরের শুরুতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের স্থানীয় রাজনীতির কান্ডারি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিশাল ভোটের পরাজয় দলকে সজাগ করতে পারেনি। মানুষের ভাষা বুঝতে পারেনি সরকার। হয়নি সতর্ক। নারায়নগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে গণবিষ্ফোরণ দেখেও সজাগ হয়নি। কুমিল্লায়ও দেখেনি জয়ের মুখ। রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের যোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থীদের একই দিনের ভোটে পরাজয় বরনের দৃশ্য দেখে যেন ঘুম ভেঙেছিল। সর্বশেষ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যেখানে আওয়ামী লীগ কখনও পরাজয় দেখেনি সেখানে ক্লিন ইমেজের টানা ১৭ বছরের টঙ্গীর নগরপিতা অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহর লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানের পরাজয় আওয়ামী লীগ নামের শক্তিশালী দলটিকে শুধু প্রবল ঝাকুনিই দেয়নি, নেতাকর্মীদের মনোবল ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। দিনে দিনে আওয়ামী লীগের ভ্রান্ত নীতি ও সরকারের একের পর এক ভুলের চড়া মাশুল দিতে হয়েছে এইসব নির্বাচনে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নয় দিন আগে মাত্র দলের শীর্ষ নেতৃত্ব জয়ের নেশায় মাঠে না নামলে ভোটের ব্যবধান আরো বেশি হত। গাজীপুর মেয়র নির্বাচনে যখন ভোটাররা প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নিচ্ছেন তখন মহাজোট থেকে মনের দিক থেকে যোজন যোজন দূরত্বে থাকা ও মাঠকর্মীরা বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে নেমে যাওয়ার পর এরশাদ নাটক, দলের অভ্যন্তরে তারুণ্যের বিষ্ফোরণ ঘটে যাওয়ার পর আরেক প্রার্থী জাহাঙ্গীরকে নিয়ে হাইমেলোড্রামা কোন কিছুই শেষ মূহুর্তে পক্ষে যায়নি। এমনকি এনবিআর’র নোটিশ ও বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে হজ্বের টাকা কেলেঙ্কারির অভিযোগ সরকার বিরোধী জনমতের কাছে আমলই পায়নি। আজমত উল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকলেও ভোটের ময়দানে সরকার বিরোধী জনমতের ঢেউ জোয়ারের মত উঠেছিল। কিন্তু, সরকার বিরোধী জনমত এতটাই একাট্টা হয়েছিল যে, উন্নয়নসহ কোনো কিছুকেই প্রাধান্য না দিয়ে সরকার বিরোধী মনোভাবকেই ভোটাররা বড় করে নিয়েছে। পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের জন্যই নয়, দেশবাসীর জন্যই মেসেজ ক্লিয়ার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনের জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ জোটের। সেই সঙ্গে যে বিএনপিজামায়াত শাসনামলে মানুষের মন ত্যক্ত, বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল, যে জনগণ ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোটকে গুনে গুনে ৩২ টি আসন দিয়ে পাঠিয়েছিল বিরোধী দলে, আওয়ামী লীগ জোটকে তিনচতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী করেছিল সেই জনতা ফের মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। তাদের সামনে এখন আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মহাজোটের শরিক এরশাদ বলেছেন, এই ফলাফল আওয়ামী লীগের জন্য ১০ নম্বর বিপদ সংকেত। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অকপটে বলেছেন, মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। এর প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনে পড়বে। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে পূনরায় বিজয়ী হওয়ার নজির ২২ বছর কোন দল দেখাতে পারেনি। আগামীতে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে সেই স্বপ্ন এখন আর নেতাকর্মীরাও দেখছেন না।

. কেন এই পরাজয়? আওয়ামী লীগের ভ্রান্ত নীতি, সরকারের গণবিরোধী কর্মকান্ড, নানান কেলেঙ্কারি ও দম্ভঅহঙ্কারের স্বর্ণ শিখরে বাস করে ভোটারদের মনোভাবকে আমলে না নিয়ে মানুষকে তাচ্ছিল্য করার অনিবার্য করুন পরিণতি দলটি এখন ব্যালট বিপ্লবে দেখছে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রবল জনমতের ওপর দাড়িয়ে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দানে খামখেয়ালীপনা দেখিয়েছে। অনেক অযোগ্যদের, হাইব্রিডদের নৌকায় তুলে গণজোয়ারে সংসদে এনেছে। এদের কর্মকান্ড সাড়ে চার বছরে মাঠ পর্যায়ে সরকারের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোস তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। সিন্ডিকেট আর স্থানীয় দলীয় মার্কামারা দুর্নীতিবাজ প্রশাসন বিএনপি শাসনামলের তুলনায় উত্তম চিত্র দেখাতে পারেনি। দীর্ঘ রক্তঝরা আন্দোলনে অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একতরফাভাবে বাতিল করে বিরোধী দলের হাতে আন্দোলনের ইস্যুই তুলে দেয়নি, মানুষের মনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জাতীয় পর্যায়ে শেয়ার কেলেঙ্কারি ৩২ লাখ বিনিয়োগকারীর রিক্তনিঃস হৃদয়ের আকুতি গোটা বাংলাদেশের মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছে। সরকার ব্যবস্থা নেয়নি। পদ্মা কেলেঙ্কারি ও এ নিয়ে নানা বিতর্ক সরকারের জন্য কাল হয়েছে। রেলের কালো বিড়াল সরকারের জনপ্রিয়তায় বিপর্যয় ডেকেছে। হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারি অন্যদিকে দলের লোকদের ব্যাংক, বীমা, টিভি লাইসেন্স ও তদবির বানিজ্য আর দুর্নীতি সঙ্গে মন্ত্রীনেতাদের দাম্ভিক আচরণ ও অরাজনৈতিক কথাবার্তা এককথায় অতিকথন ভোটের ময়দানে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করে প্রতিপক্ষের পাল্লা ভারী করে দিয়েছে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় দলের অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতাদের বাদ দিয়ে আদর্শচ্যুৎ এককালের কমিউনিস্টদের পাল্লা ভারী করেছে। এতে কর্মীদের কাছে দলের অবয়বের এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে কর্মীদের সঙ্গে দলের এবং সরকারের দূরত্ব দিনে দিনে অনেক বেড়েছে। কর্মীদের সঙ্গে মন্ত্রীদের সম্পর্ক গড়েই ওঠেনি। জীবনে সংসদে আসেননি নিজ যোগ্যতায়, অথচ শেখ হাসিনার বদৌলতে নৌকায় চড়ে সংসদে এসে বা বাইরে থেকে মন্ত্রী হওয়া জোট শরিকদের দলের মধ্যের নেতাকর্মীরা কোনোদিন ভালভাবে নেয়নি। দুই দুইটা দলীয় কাউন্সিল আওয়ামী লীগ যাদের নেতৃত্বে এনেছিল প্রেসিডিয়াম থেকে সাংগঠনিক সম্পাদক পর্যন্ত তারা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই কোন ভাবমূর্তি গড়তে পারেননি। সাংগঠনিক কর্মকান্ড এগিয়ে নিতে পারেননি। মানুষের মধ্যে ইমেজ তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন। মাঝপথে আওয়ামী লীগ নামের তৃণমূল বিস্তৃত দলটি গণবিচ্ছিন্নই হয়নি, সাংগঠনিকভাবে হয়েছে ভঙ্গুর, দুর্বল ও স্থবির। সাড়ে চার বছরে দু’টি কাউন্সিল হলেও পল্টনে বা বিভাগ পর্যায়ে বড় সমাবেশ করতে পারেনি। এই প্রথম দুই দুইবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম না বসেন পার্টি অফিসে, না গেছেন কোন জেলায় সাংগঠনিক সফরে। নেতাকর্মী থেকে নক্ষত্রের দূরত্বে তার বাস। স্থানীয় সরকারের মত বৃহৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কাঁধে নিলেও মন্ত্রণালয়েও নিয়মিত নন। দলের প্রেসিডিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে বাইরে থেকে আসা অথবা যোগ্যতাহীন পছন্দের ব্যক্তিদের অভিষেক এবং আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদের মত আজীবনের আওয়ামী লীগারদের ঠাই না পাওয়া কর্মীদের মন বিষন্ন করেছে। আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির নেতৃত্ব জেলায় জেলায় সাংগঠনিক কর্মকান্ডে দলকে গোছাতে পারেনি। বদনাম কুড়িয়েছেন অনেকে। ভোটারদের মন বিষিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে সরে গিয়ে সরকারের অহমিকার পতন ঘটেছে পাঁচ সিটি নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে তাদের ব্যর্থতা কাটিয়ে জনমত পক্ষে টানবে এমন আভাস এখনও দেখা যাচ্ছে না।

নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসের গ্রামীন ব্যাংক নিয়ে সরকারের টানাহেচড়া মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এই মূহুর্তে এই নোবেল বিজয়ী ও তার গ্রামীণ ব্যাংক রক্ষায় মাঠে নেমেছেন। জনমত গড়ছেন। কোন কিছুই সরকারের পক্ষে যায়নি। বিএনপিজামায়াত শাসনামলে দুর্নীতি, বিরোধী দলের ওপর দমননির্যাতন, দলীয়করণ, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের উত্থানে গোটা বাংলাদেশ বিক্ষুব্ধ হয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ সরকার মানুষকে বুকভরা স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় এসে বিএনপি’র শাসনামলের চিত্র পাল্টাতে পারেনি। মাঝখানে গণরায় নিয়ে শুরু করা যুদ্ধাপরাধের বিচার যেখানে চলছিল সেখানে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের সরলপ্রাণ তারুণ্যের অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে শাসকজোটের ভ্রান্তনীতি ও একদল বর্ণচোরাদের মতলববাজিতে হটকারি পথ নিয়ে মাটি খুড়ে ডেকে আনা হয় হেফাজতে ইসলামকে। ভোটের ময়দানে রাজশাহীতে ওয়ার্কার্স পার্টিকে পাওয়া গেলেও আর কোথাও কোন শরিকদের খুঁজে পায়নি আওয়ামী লীগ সঙ্গে। অন্যদিকে বিএনপি’র পাশে দাড়িয়েছিল মরণপন লড়াইয়ের মনোভাব নিয়ে জামায়াত শিবির ও হেফাজতে ইসলাম। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের এই ভরাডুবির পোষ্টমর্টেম শেষে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক কাঠামো বিন্যাস, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রণকৌশল কি হয় তাই এখন দেখার বিষয়। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাড়ে চার বছরের ভুল আর ভ্রান্ত নীতির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো সময় এখন আওয়ামী লীগের হাতে নেই।।