Home » রাজনীতি » এই বাম নামধারীদের মানুষ বিশ্বাস করবে কেন?

এই বাম নামধারীদের মানুষ বিশ্বাস করবে কেন?

ফারুক আহমেদ

left paties১৯৯০ সালে গণ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে নয় বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। এর পর থেকে এ পর্যন্ত বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে মানান বা বেমানান যাই হোক না কেন সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগ বলা চলে। মাঝখানে ২০০৭ ও ২০০৮কে এই সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য সঙ্কট এবং উত্তোরণের সময় বলা যায়।

কিন্তু এরপরের অর্থাৎ ২০০৯ থেকে এখনো পর্যন্ত এই সংসদীয় গণতন্ত্রের যুগে বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা কি? এ সময়কালে গণতান্ত্রিক কি কি অধিকার মানুষ ভোগ করেছে? দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, বাজার ব্যবস্থাপনায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীনতা, মানুষের জানমালের নিরাপত্তহীনতা, হত্যা, আইন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড,লুন্ঠন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, যৌন সন্ত্রাস এসব কিছুই সংসদীয় গণতন্ত্রের এই যুগে সরকারগুলো যেন পরষ্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলকভাবে বৃদ্ধি করে চলেছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যনীতি, কৃষিনীতি, শিক্ষানীতি, পররাষ্ট্রনীতিতে জনস্বার্থবিরোধী চরিত্রউপাদান ক্রমবর্ধমান গতিতে চলছে। বিদেশমূখী তথা দলীয় এবং সংশ্লিষ্ট লোকদের পকেটমূখী গণবিরোধী জ্বালানী নীতি, তেলগ্যাস সহ জাতীয় সম্পদ নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি বরং লুটপাটের তীব্রতা এবং ধরণ ক্রমবর্ধমান নীতিতে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। জনগণের আশু সংকট দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সমস্যা, পানি সমস্যা, বেকার সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতা লাগাতারভাবে বেড়ে চলেছে। দুই বড় দল অন্যদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে পালাক্রমে ক্ষমতায় থাকছে। যেই বিরোধী অবস্থানে থাকছে তারা জনগণের এসব সমস্যা সমাধানের জন্য কোন আন্দোলন করছে না, করেনি। বিরোধী অবস্থানে থেকে কেউই সরকারের এসব নীতির বিরুদ্ধে এবং লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলেনি, আন্দোলন করেনি। সরকার ও বিরোধীদল নিজেদের শাসন সংকটের মধ্যদিয়ে বার বার নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে এবং এ সংকট উত্তোরণের নৈরাজ্যিক সমাধান জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের এই নৈরাজ্য সৃষ্টি দ্বারা জনগণ আক্রান্ত, ক্লান্ত এবং দিশেহারা।

সংসদীয় গণতন্ত্রেরই শাসনের সঙ্কট উত্তোরণের সময়ের পরে ২০০৮এ নির্বাচন হয় এবং নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ও জোট জয়ী হয়ে পরবর্তী সরকার এবং বিরোধীদল একই কাজ বর্ধিত আকারে করে চলেছে। মানুষ পথে নামছে না। এই দুই দলকে মানুষ চিনেছে। তাদের কর্মকান্ডে মানুষ বার বার আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু পথে নামছে না। অথচ এদেশের মানুষের পথে নেমে আসার ইতিহাস আছে। আন্দোলনের গৌরবোজ্জল সব অধ্যায় আছে। তবে এখন কেন সবচেয়ে আক্রান্ত হয়েও মানুষ রাস্তায় নামছেন না? মানুষ কেন ঘরে বসে বসে মার খাচ্ছেন? মানুষ যে একেবারে নামেনি তা নয়। অতিষ্ট হয়ে ফুলবাড়িতে নেমেছে, কানসাটে নেমেছে, অড়িয়ল বীল রক্ষার জন্য নেমেছে, রূপগঞ্জে জমি রক্ষার জন্য নেমেছে। কিন্তু এ সবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এর মধ্যে সামগ্রিকতা নেই। কিন্তু যেসব বিষয় উল্লেখ করা হলো এবং মানুষ সামগ্রিকভাবে যেভাবে আক্রান্ত তাতে দেশব্যাপী সামগ্রীকভাবে মানুষের রাস্তায় নামার কথা।

আর এসব আন্দোলনসংগ্রাম গড়ে তোলা, এতে নেতৃত্বদানের কথা ছিল বামদলগুলোর। কিন্তু এসব স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে বামদের কি কোনো ভূমিকা ছিল বা এখনো আছে? ছিল না এবং নেই বলেই ওই সব আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলা তো দূরের কথা, দিনে দিনে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ, তেলগ্যাস, টেন্ডারবাজিচাঁদাবাজি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খুন, গুম অথবা করিডোর, তিস্তা নদীর পানি বন্টন, টিপাইমুখ, রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ দেয়া, বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশ হত্যাসহ ভারতকে দেয়া একতরফা সুযোগসুবিধাসহ কোনো এক ইস্যুতেও বাম দলগুলো সম্মিলিতভাবে কিংবা বক্তৃতাবিবৃতি বাদে রাস্তায় নেমেছে এমনটা মানুষ লক্ষ্য করেনি। লক্ষ্য করেনি বলেই মানুষ তাদের উপরে ভরসা রাখবে কি করে? তাজরিন ফ্যাশন বা রানা প্লাজা ধসের মতো বড় বড় ঘটনা হাতে পেয়েও চুপচাপ থেকেছে তারা। উল্টো দল ভাঙনের মাধ্যমে ‘ছোট হয়ে আসছে’ দলের আকার ও পরিসর। এছাড়া শাসক শ্রেণীর দলগুলো যখন শাসন সংকটে পড়ে তখন এসব বাম নামধারী অনেক দল চেয়ে থাকে কখন ওই দলের হয়ে ভাড়া খাটা যাবে। ইতোমধ্যে রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, দিলিপ বড়ুয়ার মত লোকদের এবং এদের বাম নামের সংগঠনগুলো এ কাতারে নাম লিখিয়েছে। এরা যতোদূর না নিজেদের বাম বলে জাহির করে তার চেয়েও বেশি চিন্তাযুক্ত থাকে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কোনো ধরণের কোনো ক্ষতি হয়ে গেল কি না? এ কারণেই সংসদে থাকার পরেও তেলগ্যাস বন্দর নিয়ে শাসকদের দেশ বিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে সংসদে সামান্য বক্তৃতাবিবৃতি বাদে তাদের কোনো কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি। বরং এসব বাম নেতাদের নামে স্কুলসহ নানা কথা শোনা যায়। তারা জনদুর্ভোগ অর্থাৎ দ্রব্যমূল্য, তেল গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সীমাহীন অবনতি, চরম পর্যায়ের দুর্নীতি, করিডোরসহ ভারতমুখী কূটনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি, দেশীয় সম্পদ লুণ্ঠনসহ কোনো ক্ষেত্রেই কোনো কার্যকর আন্দোলনসংগ্রাম গড়ে তোলা তো দূরের কথা, এ নিয়ে সোচ্চার হতেও পারছেন না। তাদের কোনো চেষ্টাও নেই। যারা সংসদে আছেন তারা এসব বিষয়ে পুরো সময়কালের এক দুইবার মুখ খুলেছেন মাত্র, তাও খুবই বিনীতভাবে। তারা ক্ষমতাসীনদের চেয়েও ক্ষমতাকে বেশি ভালোবাসেন, এমনটাই প্রমাণ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের কোনো ক্ষতি না হয় এমন চেষ্টায়ই তারা রত। তাদের কথাবার্তাআলাপ আলোচনা শুনে মনে হয়, ইংরেজিতে একটি কথা আছে ‘হলিয়ার দেন দ্যা পোপ’।

তবে তেলগ্যাস খনিজ সম্পদ, বন্দর রক্ষাসহ দেশীয় স্বার্থে যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনটি হচ্ছে তা গড়ে তুলেছেন সমাজেরই দায়িত্বশীল, প্রগতিশীল ব্যক্তি এবং বেশ কিছু সংগঠন। এককভাবে কোনো বাম দল বা দলগুলো এ ব্যাপারে সোচ্চার হননি। বাম নামধারীদের কেউ কেউ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ওই আন্দোলনে যতোটুকু দরকার ততোটুকুই সম্পৃক্ত রাখেন এবং কোনো বড় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ হলেই বক্তৃতা দিয়েই সরে পড়েন এবং ফটো তোলার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন।

যে সব বাম সংগঠন বা দল সরকারের বাইরে রয়েছে তারাই বা কি করছে? তারাও কি এর বাইরে? এইসব বাম নামধারী দলগুলোকে জনগণ সনাক্ত করেছে।এদের চরিত্র সম্পর্কে জনগণ পাঠ নিয়েছে। এইসব বাম নামধারী দলের নেতারা যতই জনগণের সচেতনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুক না কেন, জনগণ সচেতন বলেই এদের কাতারে গিয়ে যোগদান করেন না বা তারা কামনাও করেন না। কারণ কোনো জনসম্পৃক্ত কিংবা জনগণের নিত্যদিনকার এবং ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন সব কারণে বামপন্থীরা সোচ্চার হয়েছে এমন নজির জনগণের হাতে নেই। জনগণের অভিজ্ঞতা বরং অন্যরকম।

সরকারের কর্মকান্ডে জামায়াতের সঙ্গে সরকারের আঁতাত হচ্ছে বুঝতে পেরে মানুষ যখন আন্দোলনে মাঠে নেমে আসলেন তখন বাম নামধারী এইসব দলগুলো সরকারের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গোটা আন্দোলনকে সরকারের সহযোগিতায় সুবিধাবাদিতার মধ্যদিয়ে আন্দোলনকে নিষ্ক্রীয় করে দিল। জনগণ নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও সেসবের ধারে কাছে না গিয়ে তার কোন একটিকে নিয়েও আন্দোলন সংগঠিত না করে সরাকারী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই বাম নামধারীরা উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদীর সুরে কথা বলছে।

এই হলো বাংলাদেশে বাম নামধারীদের অবস্থা। এদের নিজস্ব কোন রাজনৈতিক কর্মসূচী নেই। অন্যের উচ্ছ্বিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে এরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। এসব দলের নেতাদের কথাবার্তা শূনলেই তা পরিষ্কার বুঝা যায়। এসব দলের নেতারা প্রায়ই বলে থাকে ‘বি.এন.পি কে জামায়াত ছাড়তে হবে’। জামায়াতকে হঠানো অবশ্যই সম্ভব হতো যদি বাম দলগুলো শক্তিশালী হতো এবং ছোট কিংবা বড় যাই হোক না কেন, একটা বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারতো। বাম দলগুলো বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে না পারার কারণে রাজনীতির মেরুকরণ তো অবশ্যই, এর প্রভাব পড়েছে সমাজের সর্বত্র। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক সংগঠনসহ গণসংগঠন এবং সামাজিক সংগঠনগুলো এখন দখল করে নিয়েছে এবং নিচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মাশ্রয়ী গোষ্ঠী। এটাই নিয়ম। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার এটাই হচ্ছে পরিণতি। কাজেই এমন দিন আসবে কিংবা এসে গেছে, এই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার শক্তিও বামদের থাকবে না। বামদের ন্যূনতম ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চিন্তার বদলে দল ভাঙনের চিন্তাটাই বড্ড বেশি মাত্রায় দেখা যায়। কাজেই তাদের উপরে বিশ্বাস মানুষের জন্মাবে কেন?

অথচ বামপন্থীদের ডাকে মানুষ সাড়া দেননি তা কিন্তু নয়। যখন বাম নামধারীরা এমন সুবিধাবাদিতায় ভেসে যায়নি তখন কিন্তু বামপন্থীদের ডাকে মানুষ সেই মাত্রায়ই সাড়া দিয়েছেন যে মাত্রায় এরা মানুষের কাছে গেছেন। ১৯৬০৭০এর দশকের যতোগুলো বড় বড় আন্দোলন হয়েছে, সংগ্রাম হয়েছে তা ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক যে পর্যায় থেকেই হোক না কেন, সে সব আন্দোলনসংগ্রাম গড়ে তোলা, এই আন্দোলনকে অব্যাহত রাখা এবং পরিণতিতে নিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ কি বামপন্থীদের সঙ্গে থাকেনি? এ কথা সত্যি, স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল সুর, মূল স্লোগান, চিন্তাভাবনা এবং পরিণতিতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কি বামপন্থীদের বিশাল ভূমিকা ছিল না? এবং মানুষ কি তখন আজকের মতো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল? নিশ্চয়ই না। যদি মুখ ফিরিয়ে নিতো তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসহ বহু আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে মহান অর্জনগুলো আদৌ অর্জিত হতো না।

স্বাধীনতাত্তোর সময়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে বামপন্থীদের অবস্থান ছিল। এখন কোথায়ও তাদের কোন কর্মসূচী নেই। অন্যের কর্মসূচী নিয়ে তারা নড়াচড়া করেন, যার সঙ্গে জনগণের জীবন জীবিকার কোন সম্পর্ক নেই,জনগণের সমস্যারও কোন সম্পর্ক নেই। এই বাম নামধারীদের বাংলাদেশের মানুষ কেন বিশ্বাস করবে?