Home » প্রচ্ছদ কথা » নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের পরিণতি – ভিনদেশী চিত্র

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের পরিণতি – ভিনদেশী চিত্র

আবীর হাসান

EGYPTআরব বসন্তের গ্রীষ্মে রূপান্তর হওয়া দেখতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। ঠিক এক বছরের মাথায় মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি গণআন্দোলন আর সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা খোয়ালেন। যারা বছর দেড়েক আগেও সামরিক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে তাহরির স্কোয়ারকে উত্তাল করে তুলেছিল, ঠিক তারাই আবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে সেইখানেই ক্ষোভে ফেটে পড়লো কেন? তাহলে কি অবলীলায় গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিল মিশরীয় জনগণ?

এই দুটো নিরীহ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে দেখতে হবে জনগণ কী চেয়েছিল আর মুরসি কি ওয়াদা করেছিলেন? হোসনি মোবারক বিরোধী আন্দোলনের সময়ই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল মিশরীয় জনগণের আশাআকাঙ্খা। সামরিক শাসনের যাঁতাকল থেকে মুক্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বেকারত্ব হ্রাস, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, মানবাধিকার রক্ষা, জনসাধারণের জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা বৃদ্ধি এবং কৃষি ও শিক্ষা খাতে অধিকতর বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি। এই বিষয়গুলোর প্রায় সবকিছুই মুরসির নির্বাচনী ওয়াদায় ছিল। তার সঙ্গে তিনি যোগ করেছিলেন ন্যায়পরায়ণতার বিষয়টিকে। কিন্তু এক বছরের মাথায় দেখা গেল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অন্যরা পেল না পেল কেবল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি বা ব্রাদারহুড সমর্থকরা। তারা দুটি নতুন পত্রিকা এবং তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন পেল। মোবারক বিরোধী অন্যরা কোন সুবিধাই পায়নি। বেকারত্ব হ্রাসের জন্য যা দরকার সেই সর্বোপরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই টানতে পারেনি মুরসি সরকার। আসলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি মুরসি। এ জন্য অনেকে ব্যক্তি মুরসিকে দায়ী না করে দায়ী করেন ব্রাদারহুডের নীতিকে। আসলে মিশরীয় পর্যটন শিল্প উন্নয়নে ইতিবাচক কোন পরিকল্পনা ছিল না রক্ষণশীল দলটির। ফলে ৬৩ শতাংশ মিশরীয় ক্ষুব্ধ মুরসির আমলে জীবনযাত্রার মান নেমে যাওয়ায়।

জনসাধারণের জন্য ভালো কোনো সিদ্ধান্তই নাকি নিতে পারেননি মুরসি। তিনি নিজেই কিছুদিন আগে রাষ্ট্রীয় সেবা কমানোর কার্যকারণ হিসেবে আইএমএফএর চাপাচাপির কথা বলেছিলেন। কিন্তু যেগুলো তার সরকার বা তিনি করতে পারতেন তা করেননি মুরসি। রাজনৈতিক বিরোধীদের তো নয়ই, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী কারোর কথাই শোনেননি তিনি। তিনি ডিক্রি জারি করে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিলেন আর উচ্ছৃঙ্খলতার সুযোগ দিয়েছিল ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীদের। নিজের গণতান্ত্রিক অধিকারের সীমারেখা ভুলে গিয়ে তিনি পূর্বসূরি স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের নীতিই আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন। হোসনি মোবারকের সমর্থক তো বটেই, মোবারক বিরোধীদেরও তিনি শত্রু ভাবতে শুরু করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

মুরসি সম্ভবত বিস্মৃত হয়েছিলেন তিনিই মিশর নামের দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার। বিস্মৃত না হলে তিনি মোবারক আমলের জননিপীড়ক আইনকানুনগুলো ফিরিয়ে আনতেন না ডিক্রি জারি করে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতেন না। স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটা অনেক দেশেই এ রকমটা দেখা যায়। নতুন নির্বাচিত নেতারা ভুলে যান এই ক্ষমতাটা গণতান্ত্রিক। তারা নিরুপদ্রবে থাকার জন্য স্বৈরাচারী কালাকানুনগুলো ফিরিয়ে আনেন কিংবা ওই বিষয়গুলোতে নিশ্চুপ থাকেন। পাকিস্তানে পিপিপি অজনপ্রিয় হয়েছে কেবল বেনজির ভুট্টোর মৃত্যুর কারণে নেতৃত্ব শূন্যতার জন্যই নয়, পারভেজ আমলের কিছু আইন আর নীতি তারা চালিয়ে গিয়েছিল, নিরপদ্রবে থাকার জন্য। দুর্নীতি আর অপশাসন চালিয়েছিল আগের চেয়ে বেশি। ফলে জনপ্রিযতায় ভাটা পড়াটা বিচিত্র কিছু ছিল না।

স্বৈরশাসকের ক্ষমতা নিরুপদ্রব রাখার কৌশল অনেক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছেই প্রিয় হয়ে দাঁড়ায় আর তৈরি হয় নতুন স্বৈরাচার। আর্জেন্টিনায় বার বার এ রকমটা দেখা গেছে। পেরনের ভূত নামতে আর্জেন্টিনার লেগেছে ৪০ বছরেরও বেশি। গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা নিয়ে জনসাধারণকে গণতান্ত্রিক অধিকার না দিয়ে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতা আর সুযোগ সুবিধা অত্যধিক বাড়িয়ে তুলে অজনপ্রিয় হয়ে পড়ার ঘটনা যে কেবল উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঘটে বা ঘটেছে তা নয়। উন্নত দেশগুলোতেও ঘটছে। সাম্প্রতিককালেই দেখা গেছে, ফ্রান্সে ভোগবাদী সারকোজির পতন ঘটতে। সুযোগ আছে বলে সারকোজি যতো রকম রাষ্ট্রীয় সুবিধা সব ভোগ করেছেন কেবল প্রতিদিন ১২৫টি গাড়ি স্ট্যান্ডবাই থাকতো তার জন্য। সীমাহীন ব্যক্তিগত ব্যয় ভোগ বিলাসও গোপন ছিল না। ফলে সারকোজি নিজেও ডুবেছেন দলকেও ডুবিয়েছেন।

ইতালির ঘটনাও প্রণিধানযোগ্য অস্বীকার করার উপায় নেই সিলভিও বার্লুসকনি এক সময় ইতালিকে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে টেনে তুলতে সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু বার বার গণরায় তাকে বেসামাল করে তুলেছিল। ফলে নির্বাচনের মাধ্যমেও নয়, জনবোধের কবলে পড়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে বিদায় নিতে বাধ্য হন তিনি। গ্রীসও এখন পর্যন্ত পাপান্ড্রুর অপশাসনের কুফল থেকে মুক্ত হতে পারেনি। কারণ পনেরো বছর আগে পাপান্ডুর সরকারের রেখে যাওয়া সংরক্ষণবাদী নীতি ত্যাগ করেনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কোন সরকারই। কারণ বারবারই জনরোষের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। তুরস্কের এরদোগান সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ ক্রমশ বাড়ছে। এর মধ্যে আবার সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করতে আইন করতে যাচ্ছে সরকার।

আসলে উন্নত বা উন্নয়নশীল কোন দেশের জনসাধারণই নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তন চায় না। চায় অধিকতর খোলামেলা পরিবেশ, নতুন নীতি, শান্তি আর উন্নতি। এই যুগে বিশ্বের কোন দেশের মানুষই ব্যক্তি অধিকার সম্পর্কে অসচেতন নয়। কাজেই তাদেরকে ভেতরের শত্রু, বাইরের শক্তি এসব জুজুর ভয় দেখানো বোকামি। প্রকৃতপক্ষে জনসাধারণ তো কারোর কাছে বিক্রি হয় না, বিক্রি হন শাসকরাই। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শাসক এ কাজটা করলে জনসাধারণের অভিমান বাড়ে ধূমায়িত হয় ক্ষোভ। সময় মতো তার বহিঃপ্রকাশও তারা ঘটায় সেটা নির্বাচনের মাধ্যমেও হতে পারে আবার গণবিক্ষোভের মাধ্যমেও হতে পারে মিশরের মতো।

মিশরের মানুষ স্বৈরাচারী শাসনামলের অশান্তি থেকে, নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তি চেয়েছিল। কিন্তু তার বদলে কি পেয়েছে তারা? মাত্র এক বছরে মিশরে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৯শটির বেশি, গণধর্ষণ হয়েছে ৬৩টি, নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৬০টি। এছাড়া মুসলিমখ্রিস্টান দাঙ্গা হয়েছে ৬ বারের বেশি। এ কারণে যদি বলা হয়, মুরসির জন্য এক বছর খুব কম সময় তার আর একটু সময় দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু ওপরের পরিসংখ্যানের সঙ্গে ব্রাদারহুডের অত্যাচার, মুরসির ক্ষমতায়ন এবং স্বজনপ্রীতি ও দুর্বৃত্তায়ন যোগ করলে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায় তার অপশাসনের বিষয়টি। তদুপরি ওয়াদা রক্ষার ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন হয়ে পড়ে। জাতীয় ঐক্যমত্য সৃষ্টির গণদাবির বিষয়টিকে তিনি একেবারে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে তাকে ঠেলে দিতে হয় আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের চেয়েও পেছনে। কারণ সে চেষ্টাও তিনি করেননি। এক বছরেই জনগণ বুঝে গিয়েছিল মুরসি ওয়াদা খেলাপকারী। তিনি চোখে ঠুলি পড়েছেন স্বৈরাচারের মতোই। তিনি চলে যেতে চান সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে জন্যই গণতন্ত্রকে খানিকটা ব্যহত করে হলেও তাকে নামিয়েছে মিশরীয়রা। গণতন্ত্রের অপমৃত্যু হয়েছে আগ বাড়িয়ে একথা বলা বোধহয় ঠিক হবে না।।