Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ষাট দশকের এদেশের বাংলা চলচ্চিত্র (পর্ব – ১)

ষাট দশকের এদেশের বাংলা চলচ্চিত্র (পর্ব – ১)

ফ্লোরা সরকার

history of bangla movies১৯৫৬ সালে বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যখন “মুখ ও মুখোশ” মুক্তি পেলো তখন সেই সময়ের দুটো সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাক এবং ইত্তেহাদে ছবিটির প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল – “পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ইতিহাস এক নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা করবে পাকিস্তানের প্রথম বাংলা ছবি”। তার দুই বছর আগে অর্থাৎ ১৯৫৪ সালের ৬ মার্চ হোটেল শাহবাগে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) মহা সমারোহের সঙ্গে ছবিটির মহরত অনুষ্ঠিত হয় এবং দৈনিক আজাদে বড় বড় শিরনামে ছবিটির প্রযোজনা সংস্থা ইকবাল ফিল্মস্ লিমিটেডকে অভিনন্দন জানানো হয়। বাংলাদেশের বাংলা চলচ্চিত্রের আগমন এভাবেই মহসমারোহের সঙ্গে তার অগ্রযাত্রার সূচনা করেছিল। তবে তার আগে ১৯৩১ সালে ১২ রীলের নির্বাক চিত্র “দ্যা লাস্ট কিস” মুক্তি পেয়েছিল এবং ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফর উপলক্ষে নির্মিত হয় প্রথম সবাক তথ্যচিত্র। তবে “মুখ ও মুখোশ” কে প্রধানত এদেশের বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি ‘মাইল স্টোন’ হিসেবেই পরিগণিত করা হয়ে থাকে। কেননা পূর্ণাঙ্গ কাহিনী চিত্র বলতে যাকে আমরা বুঝে থাকি, যার পথ ধরে পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্র জাগরণের বিস্ফোরণ্ ঘটে তা “মুখ ও মুখোশ” এর কারণেই ঘটেছিল। স্টুডিও বিহীন, দক্ষ টেনিশিয়ান, কলাকুশলী, অভিনয়শিল্পী বিহীন, বলা চলে প্রায় শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হয় বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রটি।

চলচ্চিত্র ইতিহাসের বয়স তখন পঞ্চাশোর্ধ। অর্থাৎ পৃথিবীর বাকি অংশ তখন চলচ্চিত্রের যাত্রা পথে প্রায় মধ্য গগনে অবস্থিত। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের লুমিয়ের ভাতৃদ্বয়ের ছবির জগত পেরিয়ে, চ্যাপলিনের অবাক করা আনন্দের জগত পার হয়ে, আমেরিকার ওয়েস্টার্ন, ইটালির নিওরিয়ালিজম, ফ্রান্সের থিয়েট্রিকাল সিনেমা এবং আভাঁ গার্দ ছাড়াও বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতে ইম্প্রেশানিজম, সুরিয়ালিজম, এক্সপ্রেশেনিজম সহ নানান ইজমের পরীক্ষানিরীক্ষা প্রায় শেষ। বিশ্ব চলচ্চিত্র যখন পূর্ণ বয়স্ক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভূমিষ্ট ঠিক সেই সময়ে। শুধু বিশ্ব চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেই নয়, বিশ্বের আর্থসামাজিকরাজনৈতিক অঙ্গনেও দেশটি তখন সদ্য স্বাধীন হয়েও পরাধীনতার আরেক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবার পথে। ৫২’র ভাষা আন্দোলন সদ্য সমাপ্ত, বাঙালি তার স্বাধিকারঅধিকার অর্জনে সচেতন হবার পথে পা বাড়িয়েছে। নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বুঝে নেয়ার বয়স তখন এদেশের জনগণ অতিবাহিত করছে। সেই সময়ে চলচ্চিত্রের মতো একটি বিশাল আর্ট ফর্মে প্রবেশের ঘটনা আমাদের বিস্মিত করে বৈকি।

মুখ ও মুখোশের” সেই বিস্ময়কর সময়ের পর এদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা কিন্তু হতবিহবল হয়ে বসে থাকেননি। নির্মিত হতে থাকে একের পর এক চলচ্চিত্র। ষাটের দশক আমাদের চলচ্চিত্র জগতে তাই একটি নবতর সৃষ্টির জগত, একটি প্রতিবাদের জগত, নিজেদের বুঝে ওঠার, জেগে ওঠার জগত। এই সময়ে একদিকে আমরা যেমন পাই ফতেহ লোহানী, সালাউদ্দিন, এহতেশাম, মুস্তাফিজ, সাদেক খান, ওবায়দুল হক, সুভাষ দত্ত, খান আতাউর রহমান, নজরুল ইসলাম, ইবনে মিজান, আজিজুর রহমান, আমজাদ হোসেন আর জহির রায়হানের মতো কৃতী নির্মাতা তেমনি পাই কাজী খালেক, আনোয়ার হোসেন, রোজি, আলতাফ, সুমিতা দেবী, রানী সরকার, রহিমা খাতুন, ইনাম আহমেদ, বেবী জামান, মোস্তফা, আজিম, সুজাতা, সুলতানা জামান, কবরী, আনোয়ারা, আব্দুল মতিন, শওকত আকবর, নারায়ন চক্রবর্তী, মঞ্জুর হোসেন, তুলিপ, জাহানারা আহমেদের মতো সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ কিছু চলচ্চিত্র অভিনয় শিল্পী। শুধু তাই নয়, কৌতুকাভিনয় যা ছিলো সেই সময়ের ছবিগুলোতে একটি অপরিহার্য অঙ্গ, সেই সুবাদে আমরা পাই আশিষ কুমার লোহ, সাইফুদ্দিন, খান জয়নুল, ফরিদ আলী, রানু, হাসমত, লালুর মতো দক্ষ কৌতুকাভিনেতা। চিত্রগ্রাহকদের মাঝে পাই রফিকুল বারী চৌধুরী, বেবী ইসলাম, আব্দুস সামাজ, সাধন রায়ের মতো প্রতিভাধর চিত্রগ্রাহক। অর্থাৎ এদেশের চলচ্চিত্র তার যাত্রারম্ভে চলচ্চিত্রকে সাজিয়েগুছিয়ে গড়ে তোলার জন্যে কলাকুশলীর কোন অভাব দেখেনি। দেখেনি বলেই একে একে নির্মিত হতে থাকে আকাশ আর মাটি, জাগো হুয়া সাভেরা, নদী ও নারী, আসিয়া, কখনো আসেনি, সূর্যস্নান, সুতরাং, কাঁচের দেয়াল, রূপবান, বেহুলা, ১৩ নং ফেকুউস্তাগার লেন, কাগজের নৌকা, সিরাজউদ্দৌলা, আয়না ও অবশিষ্ট, সাত ভাই চম্পার মতো বক্সঅফিস সফল আরও অনেক ছবি। সেই সময়ে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প শুধু নবীন অবস্থাতেই ছিলোনা সেই সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছিল একদিকে ভারতের হিন্দী ও বাংলা ছবি এবং অন্যদিকে পাকিস্তানের উর্দু ছবির সঙ্গে। অর্থাৎ চলচ্চিত্রে হিন্দী, উর্দু এবং পশ্চিম বঙ্গের বাংলা ছবি এই তিনটি ধারার মুখোমুখি তখন আমাদের বাংলা ছবি। দর্শকদের আদর্শ চরিত্র একদিকে যেমন ছিলো দিলীপ কুমার, মিনা কুমারী, বৈজয়ন্তী মালা, উত্তম কুমার, সূচিত্রা সেন, পাহাড়ী সান্যাল, ছবি বিশ্বাস অন্যদিকে শামীম আরা, জেবা, ওয়াহিদ মুরাদ, মোহাম্মদ আলী প্রমুখ। গল্প বা কাহিনী মানেই তাদের গল্প বা কাহিনী।

আমাদের নিজস্ব কোন চরিত্র নেই, নেই কোন কাহিনী। চলচ্চিত্রের সংকটময় সেই নানান ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে এদেশে তখন একদিকে যেমন নির্মিত হয়েছে সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক, লোককাহিনী ভিত্তিক ছবি, অন্যদিকে পরিশিলীত মননের নান্দনিক ছবি। আমাদের এবারের পরিবেশনা তাই ষাট দশকের সেসব সোনালি দিনের ছবি নিয়ে। তার প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণ নিয়ে। সেসব ছবির নির্মাণ শৈলী, অভিনয় শৈলী, কাহিনীর বিষয়বস্তু, বুনট ও ধারাবাহিকতা, সম্পাদনা, সঙ্গীত,চিত্রগ্রহণ সহ আরও নানান দিক উন্মেচন নিয়ে। যে উন্মোচন আমাদের বুঝতে সহয়াতা করবে সেই সময়ের ছবিগুলোর নানান ভালোমন্দ দিক থাকা সত্ত্বেও সিনেমার হলগুলোতে দর্শকের সমাগম কেনো, কীভাবে এতো বৃদ্ধি পেয়েছিল। বা কখনো হ্রাস পেতো কিনা। বিভিন্ন পর্বে পরিবেশন করা হবে পর্বভিত্তিক এই লেখায়।।

(চলবে…)

2 টি মন্তব্য

  1. Shat er doshoker Bangla cinemar ai information gulu oneker ojana. Very greateful to writer for selecting this topics. Want to get some more. Thanks….

  2. স্টুডিও বিহীন, দক্ষ টেনিশিয়ান, কলাকুশলী, অভিনয়-শিল্পী বিহীন, বলা চলে প্রায় শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে নির্মিত হয় বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রটি।
    ৫২’র ভাষা আন্দোলন সদ্য সমাপ্ত, বাঙালি তার স্বাধিকার-অধিকার অর্জনে সচেতন হবার পথে পা বাড়িয়েছে। নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বুঝে নেয়ার বয়স তখন এদেশের জনগণ অতিবাহিত করছে। সেই সময়ে চলচ্চিত্রের মতো একটি বিশাল আর্ট ফর্মে প্রবেশের ঘটনা আমাদের বিস্মিত করে বৈকি।