Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – ড. আকবর আলি খান

সাক্ষাৎকার – ড. আকবর আলি খান

বিরোধী দলের উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ তারা পেয়েছে ঋণাত্মক বা নেগেটিভ ভোট। সরকারকে ভোট দেবে না সে জন্যই তাদের ভোট দিয়েছে

Akbar Ali Khan pic. আকবর আলি খান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং বিশ্লেষক। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থীর পরাজয় এবং এর আগে অনুষ্ঠিত চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যত রাজনীতিতে এর প্রভাবসহ এ সম্পর্কিত বিষয়ে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। ইতোপূর্বেও চারটি এবং সদ্য অনুষ্ঠিত গাজীপুরের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পরাজয়কে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করছেন?

আকবর আলি খান: স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় এতে স্থানীয় কিছু উপাদান অবশ্যই থাকে। কিন্তু যেটা দেখা গেছে যে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের এই শহরগুলোতে শুধু স্থানীয় ইস্যুতেই নির্বাচন হয়নি, এখানে দেশের সামগ্রিক যে সমস্যাগুলো, সেগুলো নির্বাচনে চলে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও এগুলোকে অনেকটা ময়দানে টেনে এনেছে। গাজীপুরের নির্বাচনেও কেন্দ্রীয় সব নেতারা প্রচারপ্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। জাতীয় বিষয়গুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গাজীপুর আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ কারণে যে, এটি একটি নতুন সিটি করপোরেশন। কাজেই এখানে স্থানীয় ইস্যু সেভাবে দানা বেঁধে উঠেনি। তাছাড়া গাজীপুরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বসবাস, শ্রমিকদের সংখ্যাও অনেক বেশি। আর ভোটারও ১০ লাখ। এ নির্বাচনে জাতীয় ইস্যু বেশি গুরুত্ব ও প্রাধান্য পেয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় মনে হয়, ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট অসন্তুষ্টি রয়েছে। এই নির্বাচনের ফলাফল এই অসন্তুষ্টিরই বহিঃপ্রকাশ। একটি বিষয় হলো, ভোটারদের উপস্থিতি কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় কম। অর্থাৎ ৬০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট দেয়। দ্বিতীয়ত. এর আগের চারটি এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পরাজিত হলো অর্থাৎ এর প্রত্যেকটিতে কিন্তু তারা গত নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়েছিলেন। যদিও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নতুন। তবুও জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও টঙ্গী পৌরসভার নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জয়লাভ করেছিল। কাজেই তাদের আসন কিন্তু চলেই গেল। এতে মনে হয়, সরকারের বর্তমান নীতি ও কর্মকাণ্ডে ভোটারদের মধ্যে একটি অসন্তুষ্টি রয়েছে। ফলাফল অসন্তুষ্টিরই বহিঃপ্রকাশ। ভোটাররা এই অসন্তুষ্টি সম্পর্কেই তাদের মতামত পেশ করেছেন।

আমাদের বুধবার: অসন্তুষ্টির কারণ কি?

আকবর আলি খান: অসন্তুষ্টির অনেক কারণ আছে। প্রথম যে কারণটি তাহলো যেকোনো দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা ভোটারদের সব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। ক্ষমতাসীনরা স্থানীয় পর্যায়ে অনেক বাড়াবাড়ি করে। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে যেসব সমস্যা রয়েছে যেমন মূল্যস্ফীতি একটি বড় সমস্যা। এর বাইরেও অনেকগুলো ঘটনা এর মধ্যে ঘটেছে পদ্মা সেতু, হলমার্ক, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া হেফাজত নিয়েও একটি বড় ধরণের ব্যাপার ঘটে গেছে। এগুলো সবই হয়তো ব্ন্দিু বিন্দু করে সিন্ধুতে পরিণত হয়েছে। সবগুলো এক হয়ে সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে এবং সরকারের দিক থেকেও হয়তো ভোটারদের যথেষ্ট সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়নি। এক্ষেত্রে সরকারকে দুটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে। এক. ভোটারদের ভালো করে বোঝাতে হবে কিন্তু শুধুমাত্র বুঝিয়েই এটা হবে না। দুই. কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নীতি সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে।

আমাদের বুধবার: একদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অন্যদিকে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, সরকার জনগণের আস্থা হারিয়েছে। তাদের মন্তব্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

আকবর আলি খান: এটা ঠিক। তবে নির্বাচনের ফলাফলে বিরোধী দলেরও উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ বিরোধী দল যে ভোট পেয়েছে তা ঋণাত্মক বা নেগেটিভ ভোট। সরকারকে ভোট দেবে না সে জন্যই তাদের ভোট দিয়েছে। কিন্তু তারাও যদি গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে না পারেন, তাহলে যে সমর্থন দেখা যাচ্ছে তা সুসংহত করা সম্ভব হবে না। এখানে বিরোধী দল যদি এগিয়ে থাকতে চায়, তাহলে জনগণের কাছ গ্রহণযোগ্য সুস্পষ্ট কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু বহু প্রশ্নে বিরোধী দল কি করতে চায়, তা তারা বলছেন না। শুধু ঋণাত্মক ভোট পেয়ে তারা খুশি হচ্ছেন। যখন জাতীয় নির্বাচনের প্রশ্ন আসবে, তখন কিন্তু ওই সব প্রশ্নও আসবে যে, এদের পরিবর্তন করে তাদের আনলে কি লাভ হবে?

আমাদের বুধবার: এই ফলাফল আগামী নির্বাচনের উপরে কতোটা প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?

আকবর আলি খান: আগামী নির্বাচন কি প্রভাব পড়বে তা বলা কঠিন। কারণ ভোটের আগে এখনো সময় আছে। সরকার রণকৌশল পরিবর্তন করতে পারে। ভোটারদের মেজাজও কিন্ত সবসময় স্থির থাকে না, পরিবর্তন হয়। সবকিছুই নির্ভর করছে দুটি দল আগামীদিনে কি কৌশল নির্ধারণ করে, তার ওপর। এখানে আরো একটি বিষয় থেকে যায় অর্থাৎ নির্বাচন কতোটা অবাধ, সুষ্ঠু হবে এবং বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা সে বিষয়টি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে কোনো অর্থবহ আলোচনাও দেখছি না এবং সমাধানের ইঙ্গিতও পাচ্ছি না।

আমাদের বুধবার: সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আর প্রয়োজন নেই। বিষয়টি আপনার কাছে কতোটা যৌক্তিক বলে মনে হয়?

আকবর আলি খান: স্থানীয় সরকার আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। যেমন গাজীপুরের নির্বাচনে প্রায় এগারো হাজারের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনশটি আসনে যদি এই হারে নিয়োগ দিতে হয় তাহলে ত্রিশ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যদের প্রয়োজন হবে। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড, পুলিশ, আনসার মিলিয়েও ত্রিশ লাখ জোগাড় করা সম্ভব নয়। কাজেই নির্বাচন কমিশন গাজীপুরে যা করেছে, জাতীয় নির্বাচনেও তা করতে পারবে না। জাতীয় নির্বাচনের তিনটি অংশীদার রয়েছে। একটি হলো নির্বাচন কমিশন। আরেকটি হলো বিশাল সংখ্যার রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং, পোলিং অফিসারসহ নির্বাচনকালীন সময়ের কর্মকর্তাকর্মচারীরা। এরা কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাকর্মচারী। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের অধীনে তাদের ন্যস্ত করলেও দেখা যাবে যে, সরকারের নিয়ন্ত্রণ তাদের ওপরে অনেক বেশি থাকে। নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী যুক্ত থাকে। সেখানেও সরকারের কঠিন নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। শুধু নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করলে কতোটুকু অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব বিরোধী দল সেটা যাচাই করবে। কিন্তু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এতো কিছুর পরেও জয়লাভের কারণে বিএনপি ভেতর থেকে যেকোনো অবস্থায় বা যে কোনো ভাবে হোক, নির্বাচন অনুষ্ঠান হলে তাতে অংশগ্রহণের একটি চাপ দলের মধ্যে থেকেই আসবে বলে আমার ধারণা। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন আছে কি নেই তা নির্ভর করবে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উপরে। কিন্তু তারা যদি কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে না পারেন এবং বিরোধী দল যদি নির্বাচন বয়কট করে, তাহলে কিন্তু ওই নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। এটা তাত্তিক ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যাবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের উপরে এমন আস্থার সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়। এ অবস্থা হলে সমস্যার সমাধান হবে। তাছাড়া যদি উভয় পক্ষ কোনো সমঝোতায় আসতে পারে তাহলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। নতুবা বিদ্যমান সমস্যা আরো বাড়তেই থাকবে।

আমাদের বুধবার: আপনি বলেছেন, সরকারের নীতি কৌশল পরিবর্তন বা ভোটারদের বোঝানোর বিষয়টি। কিন্তু এর জন্য যথেষ্ট সময় কি তাদের হাতে আছে?

আকবর আলি খান: আমার ধারণা, সময় হাতে আছে। তবে পুরোপুরি না পারলেও এগুলো বাস্তবায়ন করলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন করা সম্ভব। যদি ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ ভোটারকেও পরিবর্তন করা যায়, তাহলে অনেক আসনের ফলাফল পরিবর্তিত হয়ে যাবে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।