Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

মোসাদ্দেক তেলের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এক নাম

ফারুক চৌধুরী

Mossadegh-mohammadতেলের ইতিহাসে সাতটি প্রধান কোম্পানি রয়েছে অনেক ঘটনার নেপথ্যে। কলকাঠি নেড়েছে, নাটবল্টু ঘুরিয়েছে। সাত বোন বা সপ্তভগিনীর নামে অভিহিত এই সাত কোম্পানির হাতে ছিল তেলের প্রায় নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ। পরে এদের মধ্যে কয়েকটি একীভূত হয়, দাঁড়ায় চারটি কোম্পানি। এ চারটি কোম্পানি হলো: শেল, এক্সনমবিল, শেভরন ও বিপি। এসব কোম্পানির সঙ্গে তেল জাতীয়করণের নানা ঘটনা জড়িয়ে আছে।

আর তেল জাতীয়করণের প্রসঙ্গ এলেই একটি নাম বারবার মনে পড়ে। সে নাম মোসাদ্দেক। কেউ কেউ বলেন মোসাদ্দেগ। তার পুরো নাম মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। তিনি ছিলেন ১৯৫০এর দশকে ইরানের প্রধানমন্ত্রী। এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। কুটিল ষড়যন্ত্র আর নিষ্ঠুরতাপূর্ণ অভ্যুত্থানের সে ঘটনা ইরানের তেল শিল্প ১৯১৩ সাল থেকে ছিল ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে।

সে সময় এ নিয়ন্ত্রণ ছিল অ্যাংলোপার্শিয়ান অয়েল কোম্পানির হাতে। এ কোম্পানিকে সংক্ষেপে বলা হয় এপিওসি। পরে এ কোম্পানির নাম হয় অ্যাংলো ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (এআইওসি)। আরো পরে এ কোম্পানির নাম হয় বিপি বা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। মোসাদ্দেক ইরানে সামাজিক সংস্কারমুখী নানা পদক্ষেপ নেন। তবে, তার নেয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তেল জাতীয়করণ। সে পদক্ষেপই হয়ে উঠলো তার কাল। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার অনুরোধে অভ্যুত্থান সংগঠিত করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)। মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় ইরানি সেনাবাহিনীর জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদিকে। সে অভ্যুত্থানের সাংকেতিক নাম অপারেশন এজাক্স। ক্ষমতাচ্যুত মোসাদ্দেককে কারাবন্দি করে রাখা হয় তিন বছর। এর পরে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে করে রাখা হয় গৃহবন্দী। কতো বিচিত্র এ ধরণী আর কতো অদ্ভুত শক্তিমত্তের মুষ্টিবদ্ধ এ ধরণীতে তৈরি নানা আইন। দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষার পদক্ষেপ নিতে গিয়ে ‘চমৎকার’ পুরস্কার পেলেন মোসাদ্দেক। তিনি প্রয়াত হন ১৯৬৭ সালের ৫ মার্চ।

সুইজারল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব ল ডিগ্রি পান মোসাদ্দেক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর নামে তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এরপরে শুরু হয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। এ দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি অর্থমন্ত্রী, বিচারমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাায়িত্ব পালন করেন। মোসাদ্দেক ১৯৪৪ সালে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন জেবহে মেলি বা ন্যাশনাল ফ্রন্ট অব ইরান (ইরানের জাতীয় ফ্রন্ট) নামের সংগঠনের। আরো ১৯ জনকে নিয়ে তিনিই এ ফ্রন্ট গঠন করেছিলেন। এ সংগঠনের লক্ষ্য ছিল ইরানের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা ও ইরানের রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপের অবসান ঘটানো। বিদেশী হস্তক্ষেপ অবসানে মোসাদ্দেকের অন্যতম পরিকল্পনা ছিল ইরানে অ্যাংলো ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানির (এআইওসি) কার্যক্রম জাতীয়করণ করা। তেল জাতীয়করণের প্রতি ছিল ইরানি জনগণের ব্যাপক সমর্থন।

সে সময় ইরানের অধিকাংশ তেল মজুদ ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। সেখান থেকে তেল আহরণ করতো এআইওসি। সে তেল রফতানি হতো ব্রিটেনে। কিন্তু এ তেল থেকে ইরান পেত যৎসামান্য। ইরান বার বার বলে আসছিল, তেলের লাভ আধাআধি বা ৫০ শতাংশ করে ভাগাভাগি করতে। কিন্তু তাতে আপত্তি জানাচ্ছিল ইংরেজ তেল কোম্পানি। এ সব নিয়ে ইরানে জনমনে জমা হচ্ছিল ক্ষোভ।

শাহর পছন্দসই লোক প্রধানমন্ত্রী জেনারেল হজ আলি রাজমারা ১৯৫১ সালের ৩ মার্চ পার্লামেন্টে হাজির হয়ে তেল জাতীয়করণ না করার জন্য পার্লামেন্ট সদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, ইরান আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না এবং তেল শিল্প পরিচালনা করার সামর্থ্য ইরানের নেই।

এ ঘটনার কয়েকদিন পরে তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। এ নিয়ে দু’টি বক্তব্য পাওয়া যায়। কেটিতে বলা হয় যে, খুন করে ফাদায়েনইসলাম নামে একটি জঙ্গি মৌলবাদী সংগঠনের একজন সদস্য। তবে অপর বক্তব্যে বলা হয় যে, শাহর ঘনিষ্ঠ চক্রের নির্দেশে এক সৈন্য সাদা পোশাকে গুলি চালায় রাজমারার ওপরে। ইরানি সেনাবাহিনীর একজন কর্নেলের লেখা একটি স্মৃতি কথায় বলা হয় যে, রাজমারর দেহে যে গুলির চিহৃ পাওয়া যায়, সে গুলি সৈন্যদের ব্যবহৃত কোল্ট রিভলবারের। এদিকে তেল থেকে বেশি হারে রয়্যালটি পাওয়ার জন্য তেল কোম্পানির সঙ্গে ইরানের আলোচনা ব্যর্থ হয়। ইরানি মজলিস বা আইন সভার নিম্ন কক্ষ ও সিনেট বাউচ্চ কক্ষ ১৯৫১ সালের ১৫ ও ২০ মার্চ ইংরেজ তেল কোম্পানি জাতীয়করণের পক্ষে ভোট দেয়। ইরানের তেল শিল্পের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ইরানের নিয়ন্ত্রণ। জেনারেল রাজমারাকে হত্যায় জনমনে উল্লাস আইন সভা সদস্যদের ওপর প্রভাব ফেলে। সেই সঙ্গে ছিল তেল শিল্প জাতীয়করণের দাবিতে ইরানের কমিউনিস্ট পার্টি বা ভূদেহ পার্টি আহূত দেশব্যাপী ধর্মঘট। মজলিস ২৮ এপ্রিল মোসাদ্দেককে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের পক্ষে ভোট দেয়। প্রস্তাবের পক্ষে পড়ে ৭৯ ভোট। বিপক্ষে ভোটের সংখ্যা ছিল মাত্র ১২। মোসাদ্দেকের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব বুঝতে দেরি হলো না শাহর। তিনি মোসাদ্দেককে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। মোসাদ্দেক ১ মে জাতীয়করণ করলেন এআইওসি। এ কোম্পানিকে দেয়া কনসেশন বাতিল করলেন তিনি। এ কনসেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৯৯৩ সালে। ইরানে কোম্পানির সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হলো। পরের মাসে পাঁচজন মজলিস সদস্যকে পাঠানো হলো খুজেস্তানে, জাতীয়করণ আদেশ বলবত করার জন্য।

মোসাদ্দেক ১৯৫১ সালের ২১ জুন এক ভাষণে বললেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চালানো আমাদের আলোচনা এখন পর্যন্ত কোনো সুফল বয়ে আনেনি। তেল থেকে পাওয়া আয় দিয়ে আমাদের পুরো বাজেটের অর্থ যোগানো যেতে পারে, দূর করা যেতে পারে আমাদের জনগণের দারিদ্র, অসুখ পশ্চাৎপদতা। ব্রিটিশ কোম্পানির ক্ষমতা নির্মূল করা ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। আমরা দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রও নির্মূল করবো। এ দুটি মাধ্যমে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করা হয়েছে। এই অভিভাবকত্ব বা খবরদারির অবসান ঘটলে, ইরান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করবে।

এ বক্তৃতায় তিনি আরো বলেন, ইরান রাষ্ট্র তেল উৎপাদন নিজ নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। সম্পদের ন্যায়সঙ্গত মালিককে সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া এ কোম্পানির কাজ আর কিছু নয়। জাতীয়করণ আইন অননুসারে তেল থেকে প্রাপ্ত ছাক্কা মুনাফার ২৫ শতাংশ আলাদা করে রাখা হবে কোম্পানির আইনসম্মত ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার জন্য। বিদেশে জোর গলায় প্রচার করা হয়েছে যে, ইরান বিদেশী তেল বিশেষজ্ঞদের বহিষ্কার করতে চায়। আর তার পরে বন্ধ করে দিতে চায় তেল স্থাপনাগুলো।

এ অভিযোগ কেবল অবাস্তবই নয়, তা পুরোপুরিই বানোয়াট। তেল নিয়ে ইরানি জনগণের এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়ে গেল সংঘাতের ক্ষেত্র। একদিকে ইরান, আরেক দিকে ব্রিটেন। এ সংঘাত বিস্তৃত হলো।।