Home » আন্তর্জাতিক » ভারতের বাঁধ – তিস্তায় বাংলাদেশ কি আদৌ পানি পাবে?

ভারতের বাঁধ – তিস্তায় বাংলাদেশ কি আদৌ পানি পাবে?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

dam on testaভারতের সিকিমে তিস্তা নদীর উপর একের পর এক পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুলছে ভারত। এতে ভবিষ্যতে তিস্তায় বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা তো দূরে থাক, আদৌ পানি পাবে কিনা সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ তিস্তার ওপরে তিনটি বাঁধ তৈরি হয়ে গেছে, আরও দশটির পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভারতের সংবাদমাধ্যম এবং ঢাকায় একাধিক সূত্র এ খবর দিয়েছে। একাধিক পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করায় তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হবে। পশ্চিমবঙ্গের সেচমন্ত্রী বলেছেন, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে পানিবন্টন নিয়ে ভাবা সম্ভব নয়।

সেচমন্ত্রী আরো বলেন, তিস্তার ওপরে শুধুমাত্র কালিঝোড়ায় একটি পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের বিদ্যুৎ দফতর তাদের অনুমতি নিয়েছিল। কিন্তু তারপরে সিকিমে আরো দুটি পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হয়েছে এবং একটির কাজ চলছে। ভবিষ্যতে আরো দশটি পানিবিদ্যুৎ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

ভারত ১৯৮২ সালে গজলডোবার কাছে তিস্তা নদীর উপর ব্যারেজ নির্মাণ করে ও ডাইভারশন খাল কেটে মহানন্দা নদীতে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। তাছাড়া উত্তরবঙ্গের কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ জেলার ৯ দশমিক ২২ লাখ হেক্টর জমিতে তিস্তার পানি দিয়ে সেচ দেয়ার জন্য ভারতের বিশাল পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে দোয়ানীর কাছে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করেছে, যার আওতায় বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার ৬ দশমিক ৩২ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশে নির্মিত তিস্তা ব্যারেজের কাছে ঐতিহাসিকভাবে তিস্তা নদীর সর্বাধিক গড় প্রবাহ ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার কিউসেক এবং সর্বনিম্ন গড় প্রবাহ ছিল ১০ হাজার কিউসেক। ভারতে ক্রমবৃদ্ধি হারে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে বাংলাদেশে এর প্রবাহ এখন ১ হাজার কিউসেকে এসে দাঁড়িয়েছে। এমনকি খরার সময় তা পাঁচশ কিউসেক হয়ে যায়।

ভারতীয় মিডিয়া ও সীমান্তের ওপারের বিভিন্ন সুত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে, এ সব প্রকল্প নির্মান করছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ব ন্যাশনাল ডাইড্রো পাওযার করপোরেশন বা এনএইচপিসি। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২৬ জুন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সেচ মন্ত্রী মহাকরণে বলেন, তিস্তা সিকিম থেকে পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার আগে রাজ্য সরকারের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। সে অনুমোদন নেয়নি বলে মন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন। মন্ত্রীর ভাষায় এ ভাবে তিস্তার উপর পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুললে বিপদ আসবে দু দিক থেকে। প্রথমত শুকনা মৌসুমে এ নদীতে পানি মিলবে না। দ্বিতীয়ত বর্ষার সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পানি ছাড়লে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। হিমালয়ান নেচার এন্ড এডভোঞ্চার ফাউন্ডেশন সহ কয়েকটি পরিবেশ প্রেমী সংস্থা মন্ত্রীর মতো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাদের আশংকা তিস্তায় একের পর এক পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুললে পশ্চিবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের বিস্তৃর্ণ এলাকা বিপর্যায়ের মুখে পড়বে।

এনএইটপিসি’র এক কর্মকর্তা মন্ত্রীর আশংকা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, সিকিমে তিস্তার উপর পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের দুটি ইউনিট নির্মাণ কাজ চলছে। আগামীতে মাঝিটাডে একটি অর্ধ সমাপ্ত পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মান কাজ হাতে নেওয়া হতে পারে। এছাড়া তিস্তার উপর আরো কয়েকটি ছোট ছোট পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের প্রস্তাব সংস্থার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা এনএইচপিসি’র বক্তব্যকে সমর্থন করে বলেছেন, প্রতিটি পদক্ষেপ আইন মেনে করতে হয়। তারা সব ধরণের আইন মেনে সিকিমে বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ার কাজে হাত দিয়েছে। সিকিম ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে তিস্তার উপর দুটি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ছে এনএইচপিসি। এ দুটি প্রকল্প বামফ্রন্ট আমলে অনুমতি নেওয়া হয়। অনুমতি দেওয়ায় রাজ্যের সেচ মন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, কেন্দ্রীয সরকার একদিকে বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দিতে বলছে। আবার সেই নদীর উপর একের পর এক পানিবিদুৎ প্রকল্প নির্মানের অনুমতি দিয়ে চলেছে।

নিমাণাধিন প্রকল্প গুলো ছাড়াও তিস্তার উপর আরো ১০টি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের ন্যাশনাল হাইড্রো পাওয়ার করপোরেশনের।

ভারতের প্রধান মন্ত্রী মনমোহন সিংহের বাংলাদেশ সফর কালে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দোহাই দিয়ে সে চুক্তিটি আর হলো না। এরপরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দফায় দফায় তদবির করা হলেও বেশ কিছুদিন সেই মমতা ফ্যাক্টরকে কাজে লাগানো হলো। কিন্তু সবশেষ গতমাসে ঢাকায় বাংলাদেশভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক ছিল, যাতে ভারতীয় মন্ত্রীর ঢাকায় আসার কর্মসূচি আগেই নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু এবার খোদ দিল্লি প্রকাশ্যে তিস্তার পানি না দেয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করলো। মন্ত্রী এলেন না, যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হলো না। আর তিস্তার পানিবন্টনের বিষয়টি আদৌ মীমাংসা হবে কিনা তাও এখন দেখার বিষয়।

শুকনা মৌসুমে বাংলাদেশে তিস্তা শুকিয়ে যায়। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে সেচ সংকট সৃষ্টি হয়, ঘটে পরিবেশ বিপর্যয়। আবার বর্ষা মৌসুম ভারত থেকে অতিরিক্ত পানি ছাড়ায় বাংলাদেশে তিস্তা পাড়ে বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে।।