Home » অর্থনীতি » ভারতের স্বার্থে সুন্দরবন ধ্বংসের নিশ্চিত আয়োজন

ভারতের স্বার্থে সুন্দরবন ধ্বংসের নিশ্চিত আয়োজন

মওদুদুর রহমান

RAMPALবাঘ আমাদের অনন্য প্রতীক। পৃথিবীর বিস্ময় এই বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসস্থল আমাদের সুন্দরবন। এই বন প্রাণপ্রকৃতির এক অনন্য আধার। হাজার প্রজাতির জীব বৈচিত্র্যের সম্মেলনে গড়ে ওঠা সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। পৃথিবী জুড়ে প্রকৃতির সাথে মানুষের সহাবস্থানের নিত্য নতুন উপায় যখন উদ্ভাবিত হচ্ছে ঠিক তখনই সুন্দরবনের অস্তিত্ব নিশ্চিত হুমকিতে ফেলে ভারতের স্বার্থে বাংলাদেশ করতে যাচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিশাল রামপাল প্রকল্প।

পৃথিবীতে প্রচলিত জ্বালানীগুলোর মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে কয়লা। একশ বছর ধরে চলে আসা কয়লা ব্যবহারের ক্রমাগত দূষণে পৃথিবী জুড়ে ঝড়জলোচ্ছাসখরা, সুনামিক্যাট্রিনা সিডরআইলা এখন নিত্যসঙ্গী। বাংলাদেশে সিডরআইলা’র রেখে যাওয়া ক্ষত এখনও আমরা বয়ে বেড়াচ্ছে। এই সিডরআইলা’র ক্ষতি নিশ্চিতভাবেই কল্পনার সীমাকেও হার মানাত যদি না সুন্দরবন বুক চিতিয়ে প্রাকৃতিক উন্মত্ততার বাধা হয়ে না দাঁড়াত। দক্ষিণাঞ্চলীয় এই ‘সুন্দরবনী’য় বাধা না থাকলে ধ্বংসলীলা চলত বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্ত হতে উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত। এই সুন্দরবন শুধু আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচই নয়। এটি ৫ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। অথচ সুন্দরবনের এতসব উপযোগীতা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিত্য পরিবেশ দূষণে সুন্দরবনের ক্রমাগত ক্ষতির কোন প্রতিকার না করে, আমাদের চোখে উন্নয়নের ঠুলি পড়িয়ে সুন্দরবন থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরে রামপালে হতে যাচ্ছে বিশালাকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

ইতোমধ্যেই রামপাল এলাকার প্রায় ৪০০০ পরিবারকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে ১৮৩৪ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কোম্পানী গঠন আর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করে বেআইনীভাবে লোক দেখানো পরিবেশগত সমীক্ষা রিপোর্ট (ইআইএ) প্রকাশ করা হয় এ বছরের শুরুর দিকে। এই ইআইএ রিপোর্টে সুন্দরবনের পরিবেশপ্রতিবেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যেনতেন ভাবে প্রকল্পটি করে ফেলার পক্ষে ওকালতি করার চেষ্টা প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে ভারত হয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অংশীদার। চুক্তিনামা অনুসারে বাংলাদেশভারতের যৌথ বিনিয়োগ হবে ৩০ শতাংশ। বাকি ৭০ শতাংশ ভারতেরই কোন ব্যাংক হতে বাংলাদেশ উচ্চসুদে ঋণ করার। এ প্রকল্পে ভারতীয় সব কোম্পানী মূলধনী যন্ত্রপাতির ব্যবসা করবে। ভারত এ প্রকল্প ব্যবসায় কর অবকাশ সুবিধাও পাবে। আবার উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ধার্য করা হারেই বাংলাদেশকে কিনতে হবে। অর্থাৎ মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে ক্ষয়ক্ষতির সকল দায়ভার বহন করতে হবে বাংলাদেশকেই। অথচ চুক্তি অনুসারে এ ব্যবসার মুনাফা উভয়ের মাঝে সমান দুই ভাগে ভাগ হবে।

সুন্দরবন থেকে প্রকল্প স্থানের দূরত্ব বাস্তবে মাত্র ৯ কিলোমিটার হলেও সরকারীভাবে এই দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার বলে প্রচার করা হচ্ছে। যদিও ভারতেরই ইআইএ গাইডলাইন অনুসারে জীববৈচিত্রের গুরুত্ব সম্পন্ন কোন এলাকার আশেপাশে ২৫ কিলোমিটার এর মধ্যে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ যে ভারত নিজের দেশের আইন অনুসারে প্রাণপরিবেশ ধ্বংসকারী এমন প্রকল্পের কথা চিন্তাও করতে পারত না সে ভারতই বাংলাদেশকে চরম সংকটে ফেলে ব্যবসায়িক সহযোগী সেজে চলে এসেছে রামপাল প্রকল্পের লাভের গুড় খেতে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয় প্রায় ৩০ বছর আগে। সেখানে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্রমাগত দূষণে ছাইয়ের আস্তরনে ঢাকা পড়ে আর এসিড বৃষ্টির প্রকটতায় ৪৮ কিলোমিটার জুড়ে হাজার হাজার ওক, পেকান, এলম গাছ ইতোমধ্যেই মরে গেছে। এই যদি হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণে কৃত্তিম বাগানের গাছ গাছালির করুণ অবস্থা তবে রামপাল প্রকল্পের দূষণে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে থাকা নিবিড় সুন্দরবন যে পরবর্তী ১০থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই হারিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞগণ আশংকা প্রকাশ করছেন, তা মোটেই অত্যুক্তি নয়।

যে কোন প্রকল্পে প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূষণ রোধ করার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি কথার কথাই থেকে যায়। কেননা মুনাফার বাজারে প্রযুক্তি ব্যবহারের বাড়তি ব্যয় ধোপে টেকে না, আর দূষণ নিরোধক যন্ত্রপাতির আয়োজনে উৎপাদন শেষ পর্যন্ত সুলভ হয় না। তাই রামপালের ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়া ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড, ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, ২ হাজার ৬০০ টন ছাই যে সুন্দরবনের নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে নিয়ে আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

যদি অতি মাত্রায় আশাবাদী হয়ে ধরেও নেই যে, এ প্রকল্পে অত্যন্ত ব্যয়বহুল দূষণ নিরোধক ব্যবস্থা নেয়া হবে, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি রামপাল প্রকল্প দিয়েই আমাদের দেশে শুরু হবে কিন্তু তারপরও এ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় ৪৭ লক্ষ টন কয়লা তো সুন্দরবনের গভীরতম অংশের মধ্য দিয়েই পরিবহন করা হবে। লক্ষ টনী বাল্ক ক্যারিয়ার আর হাজার টনী লাইটারেজ জাহাজের সারা বছরব্যাপী আনাগোনা, তীব্র শব্দ, জাহাজ হতে চুইয়ে পড়া তেল, কয়লার ভাংগা টুকরা, জাহাজ চলাচলের প্রচন্ড ঢেউ যে সুন্দরবনের ইকোসেস্টেমে ধবংসাত্মক পরিণতি ডেকে নিয়ে আসবে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

উন্নয়নের নামে সুন্দরবন হত্যার ধ্বংসাত্মক এ আয়োজনের প্রথম শিকার হয়েছেন সাপমারী কাটাখালী, কৈগরদাসকাটি, কাপাসডাংগা, বাশেরহুলা মৌজাসহ রামপালের ৪ হাজার পরিবার। জোরপূর্বক তাদেরকে ভিটা মাটি ছাড়া করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবে কেড়ে নেয়া হয়েছে গোয়ালের গরু আর জমির ধান। এই ১৮৩৪ একর জায়গা জুড়ে বছর প্রতি যে ১৩০০ টন ধান আর ৬০০ মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন ছিল তা ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। সর্বনাশা এই প্রকল্পে হাজার জীবনের সাজানো সংসার নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তারা উদ্বাস্তু। তাদের কেউ কেউ দিনমজুরি করে অতি কষ্টে দিনানিপাত করছে আবার কেউবা শহরমুখী হয়ে বস্তির জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

রামপাল প্রকল্প যে সুন্দরবনের নিশ্চিত ধ্বংস নিয়ে আসছে এ ব্যাপারে সচেতন বিশেষজ্ঞ মহল শতভাগ নিশ্চিত। বিভিন্ন ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ, সভাসেমিনার’এ তা প্রতিনিয়ত তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু শাসক শ্রেণীর কুম্ভকর্ণের ঘুম যেন ভাংছেই না। সময়ে সময়ে তাদের কাছে থেকে আমরা শুধু পাচ্ছি সুন্দরবন রক্ষার ‘গায়েবী’ আশ্বাস। অথচ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পের প্রারম্ভিক কাজ শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে।

রামপাল প্রকল্প নিয়ে শাসকগোষ্টী সুন্দরবনকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শেষ বিকল্প হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছেন। ভাবটা এমন যে, দেশের উন্নয়নে ‘সুন্দরবনীয়’ বিদ্যুৎই লাগবে। অথচ আমরা জানি আধুনিককালে সীমিত সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহারে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের হাজারটা উপায় আছে। কিন্তু হাজার বছরের বিবর্তনে গড়ে ওঠা আমাদের সুন্দরবন পৃথিবীতে একটিই। রামপাল প্রকল্প সেই সুন্দরবন ধ্বংসের নিশ্চিত আয়োজন সম্পন্ন করছে।।