Home » বিশেষ নিবন্ধ » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৩)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৩)

ক্ষমতার তিনখুঁটি ও বশ্যরাষ্ট্রে রূপান্তর

আনু মুহাম্মদ

60'sপাকিস্তানের এই দশালাভে তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতি ও ক্ষমতার গতিপ্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে ইউরোপের পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। যুদ্ধের পর আভ্যন্তরীণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বহু উপনিবেশ এক একে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে। এই জোয়ারের সময়ে অন্য অনেক দেশের মতো ভারত ও পাকিস্তানও বৃটিশ আধিপত্য থেকে মুক্তিলাভ করে। তবে এই সময়কালে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র আর অপরিবর্তিত থাকেনি। বৃটিশ সাম্রাজ্য তখন অস্তমিত, নতুন পরিপ্রেক্ষিতে তার অবস্থা বিদায়ী সর্দারের মতো। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নতুন সর্দার হিসেবে ততদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবির্ভূত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একমাত্র অক্ষত এই বৃহৎ শক্তি তখন বৃটিশ সাবেক উপনিবেশগুলোতে নিজের ক্ষমতার জাল তৈরিতে ব্যস্ত।

কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে পুনর্বিন্যস্ত হতে থাকলেও এই কেন্দ্র তখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো না। কেননা ততদিনে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রধান দুই শক্তির একটি হিসেবে আবির্ভূত। ১৯৪৯ সালে সংঘটিত চীন বিপ্লব পুরো এশিয়ায় শুধু নয় সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকেই শক্তিশালী করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, পূর্ব ইউরোপ, কিউবা মিলে একটি শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক ব্লক বিশ্ব রাজনীতি ও বিভিন্ন অঞ্চলে জনগণের চিন্তা ও লড়াইকে তখন প্রবলভাবে প্রভাবিত করছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক বিস্তার ঠেকানোর জন্য পুঁজিবাদী বিশ্বের সর্দার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অর্থনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠায় আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করে। এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য তার দরকার ছিল বিভিন্ন দেশে তার জন্য প্রতিকূল সরকার উচ্ছেদ এবং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এর জন্য দরকার ছিল কোন না কোন ধরণের স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা যার মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা তুলনামূলকভাবে সহজ। আর দরকার ছিল সেসব দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষা মিডিয়াসহ বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের উপর পূর্ণ আধিপত্য স্থাপন করা। এই কাজ করবার জন্য যে সামরিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা দরকার তা পুঁজিবাদী পশ্চিমা বিশ্বে তখন একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই ছিল।

১৯৫০ এ কোরিয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত পরাজিত হলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ১৯৫৩ সালে ইরানে নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে হটিয়ে তারা শাহানশাহর মাধ্যমে একটি বশ্য সরকার প্রতিষ্ঠা করে। তাইওয়ান দিয়ে চীনের বিপরীত শক্তি প্রতিষ্ঠা করে। ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখলেও মার্কিন মডেল এর মধ্যে প্রবেশে সম্মত হয়নি। বরঞ্চ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষত পরিকল্পিত ভারীশিল্প ভিত্তিক উন্নয়নে ভারত ক্রমে সোভিয়েত সমর্থনে অগ্রসর হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমে পাকিস্তান হয়ে দাঁড়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিনী প্রধান অবলম্বন। পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি মার্কিন অনুকূল ছিল বরাবর। পাকিস্তানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখবার জন্য তাদের দরকার ছিল তল্পীবাহক আমলাতন্ত্র এবং সামরিক বাহিনী। এবং বলাই বাহুল্য, পাকিস্তানের এই দুই গোষ্ঠীই ছিল পশ্চিমা ক্ষমতার প্রত্যক্ষ স্থানীয় প্রতিনিধি। প্রশিক্ষণ, বিদেশী সাহায্য, বিদেশ সফর, বৃত্তি ইত্যাদি মাধ্যমে এই সম্পর্কটিই পুনরুৎপাদিত হয়েছে বরাবর। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য সামাজিক শক্তির তুলনায় বেঢপ মাত্রায় বিকশিত ও মোটাতাজা হয় সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্র, যাকে হামজা আলাভী বলেছেন ‘অতিবিকশিত’ বা ‘ওভারডেভেলপড’।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ভারত পাকিস্তানের জন্য হুমকি ছিল। এই হুমকি বা নিরাপত্তাহীনতার বোধ কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানে একদিকে সামরিক বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি, রাজনীতি ও প্রশাসনে তাদের আধিপত্যবৃদ্ধিকে বৈধতা দেয়া হয়েছে এবং অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপাদমস্তক শৃঙ্খলিত অবস্থান তৈরি হয়েছে। ১৯৫৪ সালের মধ্যেই পাকিস্তান দুটো সামরিক চুক্তিতে যুক্ত হয়। একটি সিয়াটো, আরেকটি সেন্টো যা বাগদাদ চুক্তি নামেও পরিচিত, পরে যা থেকে ইরাক সরে যায়। পাকিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক নিয়ে মার্কিনী সামরিক বলয় বরাবর কার্যকর ছিল। পাকিস্তানের নিরাপত্তার নামেই এগুলো করা হয়েছে। তবে এটা এখানে মনে রাখতে হবে যে, যুক্তরাষ্ট্র যখন পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য সামরিক বাহিনীর অস্ত্র প্রশিক্ষণ যোগান দেবার মাধ্যমে স্থায়ী নির্ভরশীলতার বন্ধন তৈরি করছে ঠিক সেই সময়ে ভারতকেও তারা প্রতিরক্ষা সমর্থন দিয়েছে। আইয়ুব খান তাঁর ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স : এ পলিটিক্যাল অটোবায়োগ্রাফি’ গ্র্রন্থে বর্ণনা করেছেন, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে দুই রাষ্ট্রকেই সামরিক সমর্থন দিয়ে গেছে।

১৯৬২ সালে ভারত চীনের যুদ্ধের পর ভারতের সঙ্গে মার্কিন সামরিক ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন দু’দিকের সমর্থনই গ্রহণ করতে থাকে। আইয়ুব খান সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চেষ্টা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক চুক্তি থাকায় তা খুব অগ্রসর হযনি। তখন থেকে এখন পর্যন্ত পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন অনুযায়ী সব সার্ভিসই দিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামরিক সম্পর্ক বহাল রেখেছে অধিক গুরুত্বের সঙ্গে।

দেশের ভেতর ও বাইরের শর্তাবলী মিলিয়ে তাই পাকিস্তানে কখনোই রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়াতে পারেনি। এই ব্যাপারে যেকোন উদ্যোগই শুরুতেই আক্রান্ত হয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষমতার তিন খুঁটি সামন্তপ্রভু, আমলাতন্ত্র এবং সামরিক বাহিনী, এগুলো কেন্দ্রীভূত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, প্রধানত পাঞ্জাবে। এই ক্ষমতায় আবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোন শরীকানা ছিল না। সামরিক বাহিনীতে এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনেও আধিক্য ছিল পশ্চিমাদেরই। তার ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ এই ক্ষমতা বিন্যাসের জন্য যে নিপীড়ন আর ভোগান্তির শিকার হয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পেয়েছেন তার থেকে একটি বাড়তি জাতিগত বিদ্বেষ, বৈষম্য আর নিপীড়ন।।

(চলবে…)