Home » রাজনীতি » কোটা নিয়ে কূটকৌশল ও বাস্তবতা

কোটা নিয়ে কূটকৌশল ও বাস্তবতা

শরিফুজ্জামান পিন্টু

quotaসরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি অনেকটা আকস্মিকভাবে আলোচনায় এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ব্যানারে চলমান এই আন্দোলন হঠাৎ ধাক্কা খেয়েছে। এর পেছনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরোক্ষ ইন্ধন থাকার অভিযোগ উঠেছে।

ব্রিটিশরা ১৮৫৩ সালে উপমহাদেশে সিভিল সার্ভিস চালু করে। ১৯২৫ সালে আইসিএস পরীক্ষায় প্রথম মুসলমানদের জন্য কোটা চালু হয়। এরপর সরকারের এক নির্বাহী আদেশে সংখ্যালঘুদের জন্য কোটা চালু হয় ১৯৩৪ সালে।

বাংলাদেশের সংবিধান রচনার আগেই সরকারের নির্বাহী আদেশে কোটা পদ্ধতি চালু হয়। অর্থাত কোনও আইন নয়, সরকারের নির্বাহী আদেশেই এটা চলছে। তিনবার কোটা পদ্ধতি পুনর্বিন্যাসও হয়েছে নির্বাহী আদেশবলে। এর মধ্যে একবারও মুক্তিযোদ্ধা কোটা স্পর্শ করা হয়নি। ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কোটা পদ্ধতি চালুর পর আজ পর্যন্ত বহাল আছে স্পর্শকাতর এ বিষয়টি।

কোন প্রেক্ষাপটে কোটা চালু হয়েছিল তার লিখিত কোনও তথ্য প্রমান নেই। তবে ধারণা পাওয়া যায়, তিনটি বিষয় মাথায় রেখে কোটা চালু করা হয়েছিল।

প্রথমত: অভাবঅনটনে থাকা উত্তরবঙ্গকে টেনে না তুললে আরেকটি পূর্ব পাকিস্তান তৈরি হতে পারে মর্মে স্বাধীনতাত্তোর শাসকদের ধারণা হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত: সরকারি সব চাকরি নোয়াখালিকুমিল্লা খেয়ে ফেলছে, এমন পরিস্থিতির অবসান চাওয়া হয়েছিল।

তৃতীয়ত: মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, শ্রেষ্ঠত্ব ও সংগ্রামের কথা বিবেচনা করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ ছিল।

এই তিন প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কোটা চালু হয়। তখন মেধা কোটা ২০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, নির্যাতিত বা ক্ষতিগ্রস্থ মহিলা কোটা ১০ শতাংশ এবং জেলা কোটা ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

১৯৭৬ সালের ৮ এপ্রিল নির্বাহী আদেশে এটা সংশোধন করে মেধা কোটা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ করা হয়, মুক্তিযোদ্ধা কোটা আগের মতই ৩০ শতাংশ রাখা হয়, ১০ শতাংশ নির্যাতিত মহিলা কোটার পাশাপাশি ১০ শতাংশ সাধারণ মহিলা কোটা চালু হয়। এছাড়া জেলা কোটা ৪০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

সর্বশেষ ১৯৮৫ সালের ২৮ এপ্রিল আরেক নির্বাহী আদেশে মেধা কোটা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়।

বর্তমানে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রথম শ্রেণী চাকরিতে ৫৫ শতাংশ বিভিন্ন কোটা ও ৪৫ শতাংশ মেধা কোটায় নিয়োগ হয়। কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান কোটা ৩০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ ও উপজাতি কোটা পাঁচ শতাংশ। এছাড়া এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা থাকলেও না পাওয়া গেলে মেধাকোটা থেকে পূরণ করা হয়।

সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ হয়না। পিএসসির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ থাকলেও ৮১০ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। সেক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ি মুক্তিযোদ্ধা কোটার পদগুলো মেধার ভিত্তিতেই পূরণ করা হচ্ছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে এই কোটা অনুসরন করা হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি চাকরীতে মেধা কোটার অস্তিত্বই নেই। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর সরকারি চাকরিতে জেলা কোটা ৩০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, এতিম ও প্রতিবন্ধী কোটা ১০ শতাংশ, আনসার ও ভিডিপি কোটা ১০ শতাংশ, উপজাতি কোটা পাঁচ শতাংশ এবং মহিলা কোটা ১৫ শতাংশ।

প্রতিবেশি দেশ ভারতে মেধার ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ এবং কোটার ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ নিয়োগ হয়ে থাকে। নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়ায় মেধাকোটার অস্তিত্ব নেই, শতভাগ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়। পাকিস্তানে মেধা কোটা মাত্র ১০ শতাংশ এবং বিভিন্ন কোটা ৯০ শতাংশ। এমনকি বিশ্বব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন অঞ্চল থেকে কতজন নেওয়া হবে, সেই কোটা আছে।

প্রতিবেশী দেশসহ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ৪৫ শতাংশ মেধা এবং ৫৫ শতাংশ অন্যান্য কোটা খুব একটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু মেধা কোটা আরেকটু এগোনো উচিত এবং তা ৬০ শতাংশ হলে ভালো হয়, এমন মতই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

এটা সত্য যে, কোটা চালু থাকলে তা মননশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া কোটার মাধ্যমে একটি বৈষম্য দুর করতে গিয়ে আরেকটি বৈষম্য তৈরি না হয় সে বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার। এখন পর্যন্ত দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিসিএসসহ সরকারি নিয়োগে কোটা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সময় আসেনি। তবে এও সত্য, সরকারি কোটা অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে পারেনা, এর নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং এই ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার লক্ষ্য থাকতে হবে।

অনগ্রসর বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষায় এগিয়ে দেওয়া গেলে, সুযোগ ও সমতা বাড়াতে পারলে কোটার প্রয়োজন হবেনা। যতক্ষন সেই কাজটি শেষ না হচ্ছে ততক্ষণ প্রার্থীদের মেধা, দক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে। এ কাজটি করতে হবে যৌক্তিক ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে।।

pintu.dhaka@gmail.com