Home » রাজনীতি » নেগেটিভ ভোট থেকে বিএনপির বাঁচার উপায়

নেগেটিভ ভোট থেকে বিএনপির বাঁচার উপায়

* ফের ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির বরপুত্ররা, সুবিধাভোগীরা কতটা দূরে থাকবে?

* ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালিত হবে তার রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে

পীর হাবিবুর রহমান

BNP-logo-পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয়ের হিসাবনিকাশ করছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল থেকে শুরু করে সরকারের প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনে পরিবর্তনের হাওয়া দেখা যাচ্ছে। সামনে এই ফলাফল প্রভাব ফেলবে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন উজ্জ্বীবিত, উল্লোসিত। অনেকের হাবভাবে মনে হচ্ছে ক্ষমতায় যেন চলেই এসেছেন। কে কোন মন্ত্রণালয় নেবেন, কে কোন রাষ্ট্রীয় পদপদবী কুড়াবেন তা নিয়েও তৈরি হচ্ছে প্রবল আকাঙ্খা। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আড়ালে চলছে ব্যাপক আলোচনা। জয়ের আভাস দেখে যেমন হয় তেমনিই। দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি আর বিএনপি’র বিকল্প আওয়ামী লীগএছাড়া ভোটের রাজনীতিতে মানুষের সামনে কোন বিকল্পই খোলা নেই। এক দলের রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতায় আরেক দল ক্ষমতায় আসছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নামসর্বস্বসহ ছোট ছোট দল। আর প্রতিবারে মানুষের তীব্র আকাঙ্খা থাকে, কামনা থাকে, এবার সরকার যেন তাদের অভাবঅভিযোগে, সুখেদুঃখে তাদের সাথী হয়। তারা কামনা করে জীবন ও জীবিকা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা, জ্বালানি বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম যাতে আর না বাড়ে, দুর্নীতি যেন কমে এবং জীবনের নিরাপত্তার গ্যারান্টি। চায় দেশের প্রকৃত উন্নয়ন।

পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী ফলাফল ও মানুষের রায় এবং আবেগঅনুভূতি পর্যবেক্ষণ না করে কোনো নিখুঁত পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ ছাড়া প্রথমে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো মন্তব্য করেননি। তার যোগ্য প্রার্থীরা কেন বিএনপি’র প্রার্থীদের কাছে বিপুল ভোটে হারলেন সেই কারণ চিহ্নিত করার আগেই হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী বলে বসলেন অসৎ ও সন্ত্রাসিরা বিজয়ী হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের মাধ্যম যদি হয় ব্যালট, তাহলে জনগণই যে ক্ষমতার উৎস সেই কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কেউই আমলে নিচ্ছেন না। বিএনপি নেতারা যতোই বলছেন সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ গণরায় দিয়েছে, যতোই তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনার হাতছানি দেখে। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এলে জনগণের কল্যানে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র পরিচালনায় কি করবে তার রূপরেখা এখনও দেয়নি। জাতীয় নির্বাচনের ময়দানে যে নির্বাচনী ইস্তেহার দেওয়া হয় ভোটের লড়াইয়ে মগ্ন মানুষ তা পাঠও করে না।

বিএনপি ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে শরীকদের নিয়ে দুইতৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসেছিল। সেই পাঁচ বছরের শাসনামল দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস, খুনখারাবি, বোমাগ্রেনেড হামলা, জঙ্গীবাদ মিলিয়ে হয়েছিল দুর্বিষহ। ওই শাসনামল টাইটানিকের মতো ডুবিয়েছিল বিএনপিকে। একগুয়ে নীতিতে একতরফা নির্বাচনের পথে ক্ষমতায় আসতে চেয়েছিল বিএনপি। বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা ভেঙে যাওয়ায় রাজনীতি রক্তাক্ত, সহিংস রূপ নিলে, মানুষ অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে আসে ওয়ানইলেভেন। সেই সময়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়িসহ অনেককেই চড়া মাশুল দিতে হয়। দুই নেত্রী জেল খাটেন। অনেকের ওপর নেমে আসে রিমান্ড, জেল, নির্যাতন। অনেকে দেশ ত্যাগ করেন। চড়া মাশুল সেদিন গুনেছিল বিএনপি।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সৃষ্ট গোটা দেশবাসীর ক্ষোভ ও অসন্তোসের পথে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনচতুর্থাংশ আসন নিয়ে আওয়ামী লীগের মহাজোট ক্ষমতায় আসে। ঘোষিত ইশতেহারে দেয়া হয় নানা প্রতিশ্রুতি। ক্ষমতায় আসার পর সাড়ে চার বছরে চট্টগ্রাম মেয়র নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাসের হিসাব দৃশ্যমান হতে থাকে। শেয়ার কেলেঙ্কারি, পদ্মা কেলেঙ্কারি, রেল কেলেঙ্কারি, হলমার্কের ব্যাংক কেলেঙ্কারি, অজ্ঞ মন্ত্রীদের ব্যর্থতা, আরেক দল মন্ত্রীনেতার দাম্ভিকতা, অতিকথন, মানুষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, জনমতের তোয়াক্কা না করে খামখেয়ালীপনার সঙ্গে রাষ্ট্র ও দল পরিচালনার ভ্রান্ত নীতি আওয়ামী লীগ মহাজোটকে হল অবস্থায়ই ফেলেনি, সরকারের জনপ্রিয়তা তলানিতে এনে দিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এমপিদের স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে আধিপত্য বিস্তার, আওয়ামী লীগের অবয়বে ও সরকারের আত্মায় সুযোগ সন্ধানীদের দৌরাত্ব নতুন অর্থাৎ যাদের হাইব্রিড বলা হয়ে থাকে এবং এককালীন বামদের প্রভাব সরকার ও দলের সঙ্গে ত্যাগী নেতাকর্মীদের দূরত্ব তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে গণঅসন্তোসের মুখে পাঁচ সিটিতে সরকারি দলের প্রার্থীরা বিএনপি’র প্রার্থীদের কাছে হেরে গেছে।

যে নেগেটিভ ভোটে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল সেই নেগেটিভ ভোটে সামনে বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্র পরিচালনা কিভাবে করবে তার রূপরেখা এখনও দেয়নি। ফের ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির বরপুত্ররা, ক্ষমতার সুবিধাভোগী উচ্ছিষ্টজীবীরা কতটা দূরে থাকবেন তার ঘোষণা নেই। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সংবিধান, আইন, বিধিবিধানবলে সংসদকে কার্যকর করে জবাবদিহিতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে নাকি দলবাজ প্রশাসনের কর্মকর্তা আর উগ্র নেতাকর্মীদের ওপর ভর করে বিরোধী দলকে দমননির্যাতনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ নেবে? ফের প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে উঠবে রাজনীতি নাকি বিরোধী দলের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার নীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পথ হাটবে? স্থানীয় সরকারকে দুর্বল রেখে সংসদ সদস্যরা এলাকায় এলাকায় প্রচন্ড ক্ষমতা নিয়ে আধিপত্য বিস্তার করবেন, নাকি আইন, বিধিবিধান প্রণয়নসহ রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়নে ভূমিকা রাখবেন? প্রশাসন আবার দলীয়করণের আগ্রাসনের শিকার হবে নাকি পেশাদারিত্বের উপর সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পথ হাটবে? দেশ দুর্নীতির অন্ধকারে নিমজ্জ্বিত হবে নাকি ঘুষ, দুর্নীতি ও তদবিরবাজদের আর ক্ষমতাবানদের কমিশন বানিজ্য রুখে দেওয়া হবে? নির্বাচনে মনোনয়ন বানিজ্যের অবসান হবে নাকি ফের মাঠের কর্মীদের বদলে নব্য টাকাওয়ালারা মনোনয়ন কিনে নিয়ে যাবেন? দেশের অর্থনীতিতে সাইফুর রহমানের সংস্কারের ধারা অব্যাহত থাকবে নাকি দলীয় আগ্রাসনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে? ব্যাংক, বীমা, টেলিভিশন লাইসেন্স দলবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হবে? দেশে দুর্নীতি ও দলীয়করণের আগ্রাসনমুক্ত সুশাসনের বাতাস বইবে, নাকি ফের অন্ধকার পথেই হাটবে? শিক্ষাঙ্গনগুলো সন্ত্রাস ও দলবাজ শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে নাকি ফিরিয়ে আনা হবে শিক্ষার পরিবেশ? আইন, বিচার ও শাসন বিভাগকে জনগণের আস্থার জায়গায় নিয়ে যেতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে কি ভূমিকা রাখবে? অভিযুক্ত মন্ত্রীএমপিদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবে? সর্বপরি যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে বিএনপি’র সিদ্ধান্ত কি হবে? থামিয়ে দেওয়া হবে নাকি তা চালিয়ে নেওয়া হবে? প্রতিবেশি ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন উচ্চতায় থাকবে? সব কিছু মিলিয়ে আজকের বিএনপি নেতৃত্বকে এখনই রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জনে পথ হাটবে নাকি সেই ট্রেডিশনাল ধারায় পথ হাটবে তা দেখার বিষয়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি জনপ্রিয় হতে পারেনি। অতীত ভুলের ফলে জনগণের মধ্যে এখন পরিপূর্ণ আস্থা আসেনি বলেই নেগেটিভ ভোটের উপরে নির্ভর করতে হচ্ছে। বিএনপির শাসনামলে অন্যায্য কর্মকাণ্ডের কথা মানুষ এখনো তুলনা করে। এসব মোচন না হলে মানুষের আস্থাশীল দলে পরিণত হবে না বিএনপি।

২০০১ সালের নির্বাচনে তারেক রহমান যে হাওয়া ভবনে তার পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে একটি টিম গঠন করে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেছিলেন, ভোটে জেতার পর সেই হাওয়া ভবনে সুবিধাবাদীরা ভর করেছিলেন ভাইয়া ভাইয়া বলে। তারা নাকি ফের তৎপর ইদানিং। সে সব চেহারা দেখলে মানুষ ভয় পেয়ে যায় অতীতের কথা চিন্তা করে। সুবিধাবাদী ও নষ্টদের দূরে রেখে আগামী দিনে দলকে মানুষের আস্থার জায়গায় নিয়ে জনপ্রিয় করে ক্ষমতায় আসার জন্য গণমুখী রূপরেখা উত্থাপন জরুরি।

নেগেটিভ ভোটে ক্ষমতায় এলে অপকর্মের পর বা মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার কলঙ্ক নিয়ে নেগেটিভ ভোটেই বিদায় নিতে হয়। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সামনে এখন প্রশ্ননেগেটিভ ভোটে আসবেন না জনপ্রিয়তা নিয়ে আসবেন? জনপ্রিয়তা নিয়ে আসতে হলে অতীত ভুল আর হবে না মর্মে এমন সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে এবং অতীত কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে দেশের মানুষের কল্যানে রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা ও অঙ্গীকার প্রদান করতে হবে। আর এটি হচ্ছে জনআস্থা অর্জনের উপায়। এছাড়া মানুষ বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বিকল্প হিসেবে নেগেটিভ ভোট দেবে ঠিকই, তবে মনে সন্দেহ নিয়েই। সন্দেহ দূর করতে এবং তাতে অটল ও আপসহীন থাকা এখন সময়ের দাবি। এটা করলে রাজনীতিও একটা ইতিবাচক বাঁক নেবে, আর তা না হলে বড় বিপর্যয় ও পরবর্তীতে নানা সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ মানুষ কতোবার আর নেগেটিভ ভোট দেবে। এক সময় নিশ্চয়ই তারা ভিন্ন উপায় খুঁজবে।।

১টি মন্তব্য

  1. Next time BNP more problems might be created then awami league.