Home » রাজনীতি » শেখ হাসিনার ক্রোধ এবং আফসোস

শেখ হাসিনার ক্রোধ এবং আফসোস

শাহাদাত হোসেন বাচ্চু

PM Hasinaক্ষমতাসীন দল এবং সেই দলের নেত্রী, দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভীষণ ধন্দে পড়েছেন। এমনকি চরম হতাশাও ব্যক্ত করে ফেলেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী’র মুখ থেকে উচ্চারিত এমত আফসোস শুনে অবাক হলেও জনগণ মোটেই স্তম্ভিত নয়। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পরে যে মেসেজ আওয়ামী লীগ জনগণের কাছ থেকে পেয়েছে সে সম্পর্কে গত চার বছর ধরেই তো মিডিয়াসহ নানা মাধ্যমে বলা হয়েছিল। এসব থোড়াই পরোয়া করেছে ক্ষমতাসীনরা। বরং সংবাদপত্রে প্রকাশিত জরিপের ফলাফল নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। টকশো’র মতো জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে যারা অংশ নিয়ে সত্যিকার কথাগুলো এবং বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন, তাদের নিশিকুটুম্বসহ নানা বিধায় তিনি আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এই টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট নাগরিক, বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ সবাইকে একযোগে গালাগাল করেছেন। আর বলেছেন, তারা সত্য কথা বলছে না। বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে। এখন প্রমাণিত হয়েছে, আসল সত্য কোনটি? জনগণের সঙ্গে প্রতিনিয়ত দুরত্ব তৈরী, চূড়ান্ত অবহেলা প্রদর্শন, জনসম্পদের অবাধ লুণ্ঠন এবং চরম দাম্ভিকতার জবাব প্রথম সুযোগই যে জনগণ দেবে এটি বাংলাদেশে কখনও কোন ক্ষমতাসীন দলের হিসেবের মধ্যে বোধকরি থাকে না। অবশেষে “কাদম্বীনি মরিয়া প্রমান করিল যে, সে মরে নাই।” ২০০৬ সালে তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপিরও এরকম ভূয়া আত্মদর্শন ঘটেছিল এবং আফসোস ও হতাশা ভরা ছিল তাদের কন্ঠেও।

বিআরটিসি’র এসি কোচ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভা মঞ্চে শেখ হাসিনার বক্তব্যের অনেকখানি স্বগতোক্তির মতোই মনে হয়েছে। হতাশা এবং আফসোস ঝরে পড়ছিল তার কন্ঠ থেকে, ……“এতো উন্নয়ন করার পরেও আমাদের সৎ প্রার্থীরা হেরে গেল, বিপরীতে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীরা নির্বাচিত হলো। তাহলে উন্নয়ন করে কি লাভ, কাদের জন্য উন্নয়ন….” মনে হচ্ছিল শেখ হাসিনা নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছিলেন! নাকি দলের লোকজনদের অথবা জনগণকে? অবশ্য জনগণকে প্রশ্ন করার তার তেমন কিছুই নেই। কারণ এই জনগণ ঝাঁকের কইয়ের মতোই ঝাঁক বেধে ২০০৮ সালে দেশের পার্লামেন্টে তিনচতুর্থাংশ আসনে তাকে এবং তার দলকে নির্বাচিত করেছিল।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য এটিই কি কাল হয়ে দাড়ায়? যেমনটি হয়েছিল ১৯৭৩’র নির্বাচনে অর্জিত ‘ব্রুট মেজরিটি’র ক্ষেত্রে। কিংবা ২০০১ সালে বিএনপিজামায়াত জোটের ক্ষেত্রেও ‘ব্রুট মেজরিটি’ যে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করছে। ২০০৮ এর নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনা বা তার দল কখনই মূল্যায়ন করে উঠতে পারেনি যে, এই ভোটের সবটাই তার পক্ষের ভোট নয়। তার দলের বা মার্কার নয়। এই ভোটের একটি বিশাল অংশ বিএনপিজামায়াত জোটের ভয়াবহ দু:শাসন, দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসের বিপক্ষের। যেটি ইতিমধ্যেই পাঁচটি সিটি নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছে। যার শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন থেকে। নারায়ণগঞ্জকুমিল্লা ছিল সরকারের প্রতি পুনরায় সতর্কীকরণ সঙ্কেত। ২০০৮ সালে তরুন প্রজন্ম ভোট দিয়েছিল চমকপ্রদ নির্বাচনী ইশতেহার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের ওয়াদায় আকৃষ্ট হয়ে। ক্ষমতায় আসার পরে কাগজেকলমে মহাজোট সরকার নামে অভিহিত করা হলেও ক্ষমতাসীনরা আওয়ামী লীগার হিসেবেই গত সাড়ে চার বছর দেশ শাসন করে আসছে। এটি এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, ২০০৮ সালে তিনচতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আওয়ামী লীগকে যেভাবে ‘বেদিশা’ করে ফেলেছিল, ২০১৩তে এসে উল্টো ফলাফলে একই সঙ্গে ক্রোধহতাশাআফসোস, সব কিছু মিলে আবারো ‘বেদিশা’ করে তুলতে শুরু করেছে ক্ষমতাসীনদের।

অবশেষে সময় এসেছে হিসেব মেলানোর। সাড়ে চার বছর পরে সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ অনুভব করতে শুরু করেছে, লাভের ঘর এখন শূন্যফাঁকা। নতুবা দলের সকলের মুখ থেকে অমন হতাশাআফসোসের মাতম উঠবে কেন? তাদের ভাষায়, এতো উন্নয়ন, এতো উন্নয়নউন্নয়নের জোয়ারে তাদেরতো ভেসে যাবার কথা। তারপরেও জনগণ কেন তাদের উন্নয়ন বুঝতে না পেরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এই হিসেবটিই ক্ষমতাসীনরা এখন আর মেলাতে পারছেন না। দলের দ্বিতীয় ব্যাক্তি সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক দলীয় সভানেত্রীর হাতে বিদেশ থেকে ফেরা মাত্রই কেন পদত্যাগ পত্র তুলে দেবেন? যদিও পরে আশরাফ পদত্যাগের খবরটি ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন!

মাত্র কিছুকাল আগেই প্রধানমন্ত্রী ও তার পারিষদবর্গের মুখে শোনা যাচ্ছিল, অধিকাংশ নির্বাচনী ওয়াদা তারা পূরন করে ফেলেছেন এবং বাকিটা ফেলতে যাচ্ছেন! জনগণ এ হিসেবটি মেলাতে পারছিল না। দ্রব্যমূল্যের চাপে নিস্পিষ্ট, ভয়াবহ দুর্নীতির শিকার, আতঙ্কিত এবং নিরাপত্তাহীন ১৬ কোটি জনগণ কখনই বিশ্বাস বা আস্থা স্থাপন করতে পারেননি, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা বাস্তবায়নের ব্যাপারে। যখনই এ বিষয়ে জনগণের পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীনদের সতর্ক বা পরামর্শ দিতে গেছে, তখনই তারা ভয়ংকর ক্ষিপ্ত হয়েছেন, চরম দাম্ভিকতার সঙ্গে উচ্চারন করেছেন, তাদের চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই। ফলে যখনই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, নিরীহনিরাপত্তাহীন জনগণ চরম নেতিবাচক উত্তর দিয়ে ক্ষমতাসীনদের না জানিয়ে দিয়েছে। যদিও তারা জানে, যাদেরকে তারা হ্যাঁ বলছে তাদের সঙ্গে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের কোনই তফাৎ নেই। তারপরেও এই মুহুর্তে কি জনগণের সামনে আর কি কোন বিকল্প আছে?

যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে তবে আগামী মাস ছয়েকের মধ্যে সরকারকে আরেকটি সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেত্রী কিছুকাল আগে বলে দিয়েছেন, ২৫ অক্টোবর সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচনের দিন ধার্য করা হবে। এই ঘোষনার ফলে নির্বাচন কমিশনকে আরেকটি সংসদ নির্বাচনের আঞ্জাম করতে হবে কালবিলম্ব না করেই। যদিও আগামী নির্বাচন আয়োজন এবং এই নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহনএ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক সংকট এখন চরমে। ঈদের পরে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তার একটি আভাস মিললেও কোনক্রমেই আগাম বলা সম্ভব নয় শেষতক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। আগামীতে নির্ধারিত সময়ে একটি সুষ্ঠ এবং দলনিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কিনা? কারণ সরকারী দল আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে যেমন অনড়, তেমনি তত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপিও আপাতত: অনড়। ফলে উৎকন্ঠিত জনগণ চরম আশংকা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে আপাতত: কোন আশার আলো তারা দেখতে পাচ্ছে না।

ক্ষমতাসীন দল বা তাদের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীবর্গ যখন উন্নয়নের কথা বলেন, তারা কি ভেবে দেখেছেন জনগণের কাছে কোন উন্নয়নের কথা তারা বলছেন? আমাদের দেশের খুব সাধারণ ও নিরীহ জনগণ, যাদেরকে বলা হয় আমজনতা, তারা কিসে তুষ্ট, কোন কালে কোন ক্ষমতাসীনরাই সে বিষয়টি পরোয়া করে না। খুবই কম চাহিদা এই আমজনতার। তারা চান, দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা, বাচ্চার নিরাপদ শিক্ষা ও স্কুলকলেজ যাত্রা, পরিবার ও সমাজের নিরাপত্তা, আইনের শাসনশুধুমাত্র এটুকুই থাকে ক্ষমতাসীনদের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠদের চাওয়া। জনগণ যদি ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করে, এই সাধারণ চাওয়াটুকু তারা কি গত সাড়ে চার বছরে পেয়েছে? কিংবা স্বাধীনতার পরে কখনও কি পেয়েছে? ২০০৮এর নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ওয়াদা করেছিল, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখবে। কিন্তু বাস্তবে গত সাড়ে চার বছর ১৬ কোটি মানুষকে দ্রব্যমূল্যের ভয়াবহ উর্ধগতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তার সমস্ত ভবিষ্যত সঞ্চয় পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে। তার এই জমানো অর্থ চলে গেছে ক্ষমতাসীনদের লালিত সিন্ডিকেটের পকেটে। আওয়ামী লীগ যদি বলে উন্নয়ন করেছে, জনগণ বলবে, উন্নয়ন ঘটেছে দেশিবিদেশি পর্যায়ে দুর্নীতির, টেন্ডারবাজির, চাঁদাবাজি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্কবিসমিল্লাসহ বিভিন্ন ব্যাংকের কেলেঙ্কারি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি, তেলগ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বিরোধীদের দমনে নানাবিধ কৌশল অবলম্বন এবং জনজীবনকে অতিষ্ঠ করার ক্ষেত্রে।

নির্বাচনী ওয়াদাই ছিল দুর্নীতি রোধ করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদের বিবরন দিতে হবে। ঘুষদুর্নীতি উচ্ছেদ, ঋণখেলাপী, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশী শক্তি নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। গত সাড়ে চার বছর এই ওয়াদার বিপরীতে জনগণ কি প্রত্যক্ষ করছে? জনগণ বলবে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকের হিসেব মতো প্রায় অর্ধ লক্ষ ঋণখেলাপীর তালিকা রয়েছে তার সিংহভাগই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। একই সময়ে পেশী শক্তির মাধ্যমে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বন্দুকযুদ্ধ, খুনোখুনি কারা করছে? জনগণ অবলীলায় উত্তর দেবে, ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ। যার পেছনে প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অবশ্য বলার চেষ্টা করেছেন, ছাত্রদল ও শিবির থেকে অনুপ্রবেশকারীরা নাকি এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসবই জনগণ শুনছে এবং যখনই উত্তর দেবার সুযোগ পেয়েছে, ব্যালটের মাধ্যমে তা দিয়ে দিয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সমস্যা সমাধানে দেয়া ওয়াদায় বলা হয়েছিল, ২০১৩ সালের মধ্যে উৎপাদন ৭ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। ছোটবড় অনেকগুলি স্থায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করা হবে। এই ওয়াদার বিপরীতে গত সাড়ে চার বছর ধরে জনগণ দেখছে, প্রধানমন্ত্রী ও তার সাবেক আমলা উপদেষ্টার অধীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর উন্নয়ন আটকে আছে রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশনের কাছে। জনগণের উপরে তা চেপে বসে আছে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতই। এর প্রভাবে গত চার বছরে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ছে ভয়ানক নেতিবাচক প্রভাব। অর্থনীতিবিদদের মতেঃ ইউনিট এক টাকা বাড়লে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ক্ষেত্র ভেদে চাপ পড়ে ১০ থেকে ২৬ টাকা পর্যন্ত। সংসদে ‘ইনডেননিটি’ পাওয়া রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশনের ব্যাপারে জনগণের কাছে সরকারকে কোন জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। কিন্তু জনগণের পকেট থেকে ইতিমধ্যে গচ্চা চলে গেছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

সুতরাং শেখ হাসিনা এবং তার সরকারতো হতাশ হতেই পারেন এটা ভেবে যে, ২০১৩ তে এসে তার ভাষায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেও জনগণের মন তিনি পেলেন না। কিন্তু যাদের জন্য রেন্টাল পাওয়ার ষ্টেশনের দিকে গিয়ে জনগণের পকেট কাটার সুযোগ করে দিয়েছেন, দলের দু:সময়ে তারা কি তাঁর পাশে থাকবে? অন্যদিকে, দক্ষিনপশ্চিমাঞ্চলের রামপালে পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ভারতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ধ্বংসের যে সর্বনাশা আয়োজন এই সরকার করেছে তার বিরুদ্ধে এটিও জনগণের একটি প্রতিবাদ। বিএনপি’র ড. মঈন খান যদিও বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে তারা এই প্রকল্প বাতিল করে দেবেন, সেটি জনগণ বিশ্বাস না করলেও এই মুহুর্তে এটি একটি চমক তো বটেই। কারণ বিএনপি এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে কখনই কোন কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলেনি। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে এই চুক্তি তারা বাতিল করবে জনগণ তা বিশ্বাস করে না। জনগণ নব্বইয়ের পর থেকে প্রত্যক্ষ করছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগবিএনপির মধ্যে কার্যত কোন তফাত নেই।

পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীনতার পরের চার দশক জনগণ দেখেছে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করতে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে। ২০০৮ এর নির্বাচনী ওয়াদায় আওয়ামী লীগ বলেছিল জনজীবনে নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করে তোলা হবে। এই ওয়াদার বিপরীতে গত সাড়ে বছর জনগণ কি প্রত্যক্ষ করেছে? সিটি নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে জনগণের উত্তর হচ্ছে, গত সাড়ে চার বছর বিগত সময়ের তুলনায় পুলিশকে দলীয় বাহিনীতে রূপান্তর করার বিষয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। তারা বিরোধী দলকে তো দুরে থাকুক, জনগণের কোন ইস্যু নিয়ে অরাজনৈতিক যে কোন আন্দোলনকেও রাস্তায় দাড়াতে দেয়নি, নির্মম দমনপীড়নের মাধ্যমে সরকারী জিঘাংসা ও প্রতিহিংসা চরিতার্থের হাতিয়ারে পরিনত হয়েছে। ফলে জনগণের চরম অবিশ্বাস এবং অনাস্থা তৈরী হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ রক্ষাকারী পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহের ওপর।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও এই সরকার তাদের সদিচ্ছার বিষয়ে জনগণকে কখনই আশ্বস্ত করতে পারেনি। সবসময় সন্দেহের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে জনমনে ক্ষোভ এবং ক্রোধের সঞ্চার করেছে। এই সন্দেহ এবং ক্ষোভ থেকে চলতি বছর তৈরী হয় গণজাগরন মঞ্চ। এখান থেকেও সরকার রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এর ফলে এই আন্দোলনটি অকালেই মুখ থুবড়ে পড়ে। অন্যদিকে এর বিপরীতে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা হেফাজতে ইসলাম নামের একটি ধর্মভিত্তিক সংগঠন, যা একসময় আওয়ামী লীগ’র লালিতপালিত ছিল, তা চলে যায় জামায়াতবিএনপি’র কবলে। আওয়ামী লীগ হেফাজতকে খুশি করার জন্য গণজাগরন মঞ্চের কতিপয় ব্লগারকে গ্রেফতার করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। এরপরেও হেফাজতের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ খুবই আগ্রহী ছিলেন এবং বিচ্ছিন্নভাবে আলোচনা অনুষ্ঠিতও হয়েছে। অবশেষে ৫ মে’র রক্তাত্ত একটি দিনে হেফাজতকে ক্ষমতাসীনরা ঢাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। হেফাজত এবং গণজাগরন মঞ্চ নিয়ে সরকারের দুমুখো আচরন জনগণ যে মেনে নিতে পারেননি সেটি ক্ষমতাসীনরা মানতে নারাজ।

সাম্প্রতিককালে হেফাজত নেতা আহমদ শফীর দেয়া ওয়াজের বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। আহমদ শফীর বক্তব্য যে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং মধ্যযুগীয়এ বিষয়ে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিক শেখ হাসিনা’র সঙ্গে একমত পোষন করবেন এবং তার সঙ্গে সঙ্গে নিন্দা ও প্রত্যাখ্যান করবেন এই বক্তব্য। কিন্তু আহমদ শফীর চেয়েও কয়েকগুণ কুরুচিপূর্ণ কথা বলে প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে নোংরা ইঙ্গিত করলে জনগণ মেনে নিতে চায় না এবং নিজেকে কোন স্তরে নামিয়ে আনা হয়, এটি বোধকরি শেখ হাসিনার হিসেবের মধ্যে থাকে না। শুধুমাত্র জনগণ কেন, তার দলের লোকদেরও বলতে শুনেছি, তার স্তরের একজন নেতাকে অনেককিছু বলার বা করার লোভ বা আগ্রহ সামলে নিতে হয়। এই মেসেজটি তার কাছে কখনও পৌঁছেছে বলে মনে হয় না।

এত কিছুর পরেও সাড়ে চার বছরের মাথায় ক্ষমতাসীনরা বুঝতে পারছেন না অনেক কিছুই। যদ্দিন ক্ষমতায় থাকবেন, তদ্দিন এটি মালুম করতেই পারবেন না এবং দুষতে থাকবেন জনগণকে। মাত্র সাড়ে চার বছর আগে এই জনগণই তাদের তিনচতুর্থাংশ আসনে জিতিয়ে দিয়েছিল। রঙিন চশমাটি খুলে ফেলতে পারলে বুঝতে পারতেন ক্ষমতাসীন হবার পরে কিভাবে তারা ক্রমশ: জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন! তৃণমূলের সংগঠিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে এমপি, মন্ত্রী কিংবা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দুরত্ব বাড়ছে। সরকার প্রথম দিন থেকে নীতি নিয়েছে, যে কাউকে দিয়ে যে কোন কাজ করানোর। এটা যে কতো বড় ভুল নীতি, গত সাড়ে চার বছরে প্রতিটি বড় কাজের ব্যর্থতাই তা প্রমান করে। যে কাউকে দিয়ে, অযোগ্যকে দিয়ে যোগ্যতার সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে কাজ করানো যায় না। এ পর্যন্ত এই নীতি থেকে সরেনি সরকার। ফলে দেশ, দল, ব্যক্তির ক্ষতি অবশিষ্ট রাখেনি এই সরকার। সেটি না বুঝে কেন সৎ লোকরা হেরে যাচ্ছে, সে বিষয়ে খোদ সরকার প্রধানের কন্ঠে আফসোস উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু জনগণ প্রমান করেছেন, গত সাড়ে চার বছর আগে তারা কোন ভুল করেননি, বর্তমানেও করছেন না, ভবিষ্যতেও করবেন না। যদিও দুই যাত্রার ফল সবসময় তাদের জন্য একই রকম।।