Home » প্রচ্ছদ কথা » সরকার কি রায় কার্যকর করবে?

সরকার কি রায় কার্যকর করবে?

আমীর খসরু

war crime tribunalজামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের মামলার রায়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে ৯০ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে। মামলার রায়ে যে শাস্তি দেয়া হয়েছে তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মামলার রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ওই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। আইনমন্ত্রী থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতাদের এই তাৎক্ষণিক সন্তোষ প্রকাশ নিয়ে অনেকেই যেমন বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, তেমনি তাদের মনে সৃষ্টি হয়েছে নানা সন্দেহের। তবে এর বিপরীতে ক্ষমতাসীনদের অনুগত এবং শুভাকাঙ্খীদের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় হতাশা দেয়া দিয়েছে। হতাশার কারণে এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা মঙ্গলবার হরতালও করেছেন। যারা বিস্মিত হয়েছেন, তারা বিস্মিত হয়েছেন এ কারণে যে, রায়ের পূর্ণাঙ্গ খুটিনাটি দেখার আগেই তাৎক্ষণিক সন্তোষ প্রকাশ করে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাতের বিষয়টিই স্পষ্ট হয়েছে। আবার ১১ ছাত্র সংগঠনের হরতালে সক্রিয় সমর্থন দিয়েছে সরকার সমর্থক গণজাগরণ মঞ্চ। গণজাগরণ মঞ্চের নিজস্ব অবরোধ কর্মসূচি এবং শাহবাগের সমাবেশ থেকে রায় মানি না বলে যে ঘোষণা তার মধ্যেও ব্যাপক হতাশার দিকটি যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সরকারের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের বিষয়টিও। গণজাগরণ মঞ্চের মতোই হতাশ হয়েছে আওয়ামী লীগ ঘরানার এবং তাদের অনুগত বিভিন্ন সংগঠন। রায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং হতাশা ব্যক্ত করেছেন প্রফেসর আনিসুজ্জামান, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, মুনতাসির মামুনসহ আওয়ামী লীগ ভক্ত ব্যক্তিরা। এমনকি ক্ষমতাসীন জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু)সহ ওই দলগুলো গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছে মৃত্যুদন্ড না দেয়ায়। রাশেদ খান মেনন তার প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সন্তুষ্টিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং জামায়াত প্রশ্নে সরকারের দোদুল্যমানতার সমালোচনা করেছেন।

কাজেই গোলাম আযমের মামলার রায় প্রশ্নে ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও তাদের মূল দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নটি আঁতাতের। ক্ষমতাসীন জোট এর অনুগত, শরিক এবং শুভাকাঙ্খীদের মধ্যে আগে থেকেই জমে থাকা সন্দেহের ঝুড়িটা আবার উন্মুক্ত হয়েছে। প্রশ্নটি জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার। জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে বৈঠকটি নিয়েও নতুন করে আবার নানা কথা উঠছে। প্রশ্নটি জামায়াতের সঙ্গে ওই আঁতাতের এবং সমঝোতার। এই একই আঁতাতের প্রশ্নটি উঠেছিল জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার রায়ের পরে। তরুণরা তখন ওই আঁতাতের বিরুদ্ধে দলনিরপেক্ষভাবে কোনো ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চকে দলীয়করণ করার কারণে এখন ওই স্থানের পরিস্থিতি ভিন্ন। এবারেও ব্যাপক সংখ্যক তরুণ গোলাম আযমের রায়ে হতাশ হলেও বিস্মিত হননি। বিস্মিত নন, কারণ তারা জানেন ভেতরে ভেতরে আসলে কি হচ্ছে।

রায়ের পরে জামায়াতের ভাংচুর নিয়ে সরকার বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তেমন কোনো স্পষ্ট বক্তব্য চোখে পড়েনি। এটিও একটি দিক।

পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরে ক্ষমতাসীনদের মনোবল যখন লণ্ডভণ্ড, তখন এই রায়ের মধ্যদিয়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে, এমনটাই প্রত্যাশা করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু বাস্তবে এটা কতোটা প্রভাব বিস্তারী হবে তা এখনই বলা যায় না। আওয়ামী লীগের ধারণা ছিল, অন্যান্য রায়ে না হলেও গোলাম আযমের মতো ‘জামায়াত গুরুর’ দন্ডের ব্যাপারে জামায়াতের পাশে এসে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি দাঁড়াবে। অন্তত নৈতিক সমর্থনটুকুও দেবে। কিন্তু বিএনপি জামায়াতের হরতালে সমর্থন দেয়নি। এমনকি রায় নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেনি। এখানে অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়টিও যে আওয়ামী লীগের মাথায় নেই, তা নয়। তারা এখন এই দূরত্বকে আরো বৃদ্ধির চেষ্টা চালাবে। কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে এই দূরত্বকে। সরকার, ক্ষমতাসীন দল দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতকে বিএনপির কাছ থেকে আলাদা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এবার এই চেষ্টা আরো প্রবল হবে, চাপ বাড়বে জামায়াতের উপরে, যাতে জামায়াত প্রকাশ্যে বিএনপি থেকে আলাদা হয়ে যায়। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের মধ্যে এমন একটা তাগিদ অনুভূত হচ্ছিল।

ইতোমধ্যেই ঘোষণা দেয়া হয়েছে, বুধবার জামায়াতের মহাসচিব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। পর পর এই রায় ঘোষণার নিশ্চয় কোনো মাজেজা আছে। তবে আইনের ভাষায়, রায় ঘোষণা সম্পূর্ণভাবে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার।

কিন্তু এই রায় ঘোষণার মাধ্যমে সরকার কি লাভবান হবে? মনোবল কি ফিরে আসবে ক্ষমতাসীনদের মাঝে? এই সরকারের ওপরে জনগণের আস্থা যে একেবারেই তলানিতে নেমে এসেছে, তার কি কোনো হেরফের হবে?

জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত নিয়ে তরুণদেরসহ অনেকের চাপের কারণে হেফাজতে ইসলামকে টেনে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে এসেছিল আওয়ামী লীগ। এতে তাদের কোনো লাভ হয়নি। বরং বুমেরাং হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করেও আওয়ামী লীগ কি লাভবান হতে পারবে? জামায়াত কি পারবে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে গেলে তার বিলীন হওয়ার ত্বরান্বিতকরণ প্রক্রিয়া ঠেকাতে?

কিন্তু জনমনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি রয়েছে তাহলো রায় তো একের পর এক ঘোষিত হচ্ছে, এই সরকারের শাসনামলে কি রায়গুলো আদৌ কার্যকর হবে? না, রায়ের দন্ড কার্যকর করার বিষয়টি তারা রেখে যাবে অসমাপ্ত দাবা খেলার একটি ঘুটি হিসেবে ভবিষ্যতের জন্য, ভিন্ন কোনো চাল দেয়ার প্রবল আকাঙ্খায়?