Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সাক্ষাৎকার – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সরকারি চাকরিতে কোটা ৫ ভাগের বেশি থাকা উচিত নয়

SIC sirপ্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রফেসর এমেরিটাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। লেখক এবং প্রাবন্ধিক। সরকারি চাকরিতে কোটা এবং এ কারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার একটি মাত্র যৌক্তিকতা আছে। আর এটা হলো যারা সুবিধা বঞ্চিত তাদেরকে সুযোগ করে দেয়া। আমাদের এখানে ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা আছে তারা নানান ভাবে বঞ্চিত, অর্থনৈতিকভাবে তারা ভালো নেই, লেখাপড়ারও তেমন সুযোগ পায় না। তাদের জন্য একটা কোটা থাকতে পারে, কিন্তু তাও আবার মেধাকে বাদ দিয়ে নয়। মেধার ভিত্তিতে তাদের যোগ্য হতে হবে, আর এটা হলেই তারা সুবিধা পাবে কোটার মাধ্যমে। এর বাইরে কোটার আদৌ প্রয়োজন আছে কি? এক সময় মনে করা হতো নারীদের জন্য কোটা থাকা দরকার। কেননা নারীরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া। কিন্তু এখন নারীরা আর পিছিয়ে নেই। এখন তারা প্রতিযোগিতামূলক ভাবে ছেলেদের সঙ্গে লড়ছে নানান ক্ষেত্রে এবং নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করছে। চাকরির ক্ষেত্রেও তারা তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে। কাজেই নারীদের আরও উৎসাহিত করা দরকার তারা কৃতকার্য হবে মেধার ভিত্তিতে, ছেলেদের সঙ্গে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতায়। এখন নারীদের জন্য বেশি যা প্রয়োজন তাহলো কর্মক্ষেত্রে তাদের যে পরিবেশ তার উন্নয়ন। তাদের উপরে যে নানা ধরণের হয়রানি করা হয় তা দূর করা এবং বন্ধ করা। এগুলোই বরং বেশি জরুরি, নারীদের জন্য কোটা ব্যবস্থার তুলনায়। কাজেই মহিলা কোটা তুলে দেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ এর আর প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না।

কাজেই গোটা ব্যবস্থাটার অসুবিধার দিকটা হচ্ছে যে, কোটা থাকলে মেধার মূল্যায়ন সঠিক হয় না। বিসিএস ক্যাডার সার্ভিস, সেখানে ইতোমধ্যেই নানান ধরণের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। তার অন্যতম কারণ কোটার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন। এর ফলে কম মেধাবানরা যারা কোটার ভিত্তিতে চলে আসে তার প্রতিক্রিয়া নানাবিধ হয়। একটা প্রতিক্রিয়া হয়, মেধাবীরা চাকরি পেল না, ফলে প্রশাসন তাদের থেকে বঞ্চিত হলো, কাজ থেকে বঞ্চিত হলো। তাদের পেলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হতে পারতো। মেধা খুবই দরকার প্রশাসনে। এটা তো গেল প্রশাসনের দিক। দ্বিতীয়ত. যারা শিক্ষার্থী তারা যখন দেখে বা দেখবে, তাদের চেয়ে কম মেধাবীরা চাকরি পেয়ে যাচ্ছে কোটার জোরে, তখন তাদের মধ্যে হতাশা এবং ব্যর্থতার বোধ দেখা দেয়। এবং তাদের মধ্যে লেখাপড়ার ব্যাপারেও আগ্রহের অভাব পরিলক্ষিত হয়। কারণ তাদের মধ্যে এই বোধ জন্ম নেয় যে, তারা পারবে না। অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, ৫৬ জন যদি আসে কোটাতে তবে ৪৪ জন আসে মেধাতে। এবার যেটা হয়েছে তাতো আরো দুঃখজনক। এবার প্রাথমিক বাছাই থেকেই কোটা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছে। আগে করা হতো শেষ পর্যায়ে। এবারে একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে যারা করেছে, তারা অতি উৎসাহী হয়ে এটা করেছে। আর এটা করে তারা নিজেদের জন্যও বিপদ ডেকে এনেছে এবং সরকারের জন্যও বিপদ সৃষ্টি করেছে। আর ছাত্রদের মধ্যেও ব্যাপক বিক্ষোভ তৈরি হয়েছে। মেধার ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীরা চাকরি পাবে, মেধার চর্চা করবে এই মনোভাবটা তাদের মধ্যে থাকা দরকার। সে মনোভাব যদি নষ্ট হয়, হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যদি তারা মনে করে মেধার চর্চায় লাভ নেই তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়বে আর প্রশাসনের মানের উপরেও প্রভাব পড়তে বাধ্য।

আমাদের বুধবার: এই প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কতেটা যৌক্তিক?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: তাদের আন্দোলন তো স্বতঃস্ফূর্ত। শিক্ষার্থীরা দাবি করছে যে, তারা মেধার স্বীকৃতি চায়। তারা তো বলছে না যে, তারা বিশেষ সুবিধা চায়। আন্দোলনের মধ্যে বিভিন্ন উপাদান হয়তো ঢুকে পড়েছে। যেমন বলা হচ্ছে, মৌলবাদীরা, জামায়াতিরা এর সুযোগ নিতে পারে। আবার ছাত্রলীগের একাংশ এর বিরুদ্ধে যে আচরণ করছে তাও গ্রহণযোগ্য নয়। ছাত্রলীগের যে মেধাবীরা রয়েছে শুনেছি,তারাও এই আন্দোলনের সঙ্গে আছে। কিন্তু ছাত্রলীগের অন্য এক অংশ অতিউৎসাহী হয়ে আক্রমণ করছে। দুই দিক থেকেই আন্দোলনের যে স্বতঃস্ফূর্ত এবং অনাবিল চরিত্র, সে চরিত্র বিপদগ্রস্ত হচ্ছে। এখন আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করে, দমন করে একে থামিয়ে দেয়া হলে তার ফল শুভ হবে না। যা করা দরকার তা হচ্ছে মেধার ভিত্তিতে পুরো ফল পুনঃবির্ন্যস্ত করা, পুনঃবিবেচনা করা। এবং কোটাকে অত্যন্ত সংকুচিত করে অর্থাৎ না পারলেই নয়, এভাবে সংকুচিত করতে হবে।

আমাদের বুধবার: তাহলে কাদের জন্য আসলে কোটা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি মনে করি, যারা সুবিধা বঞ্চিত অর্থাৎ ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা এবং যারা মানসিকভাবে সুস্থ কিন্তু শারীরিকভাবে পঙ্গু শুধুমাত্র তাদের জন্য কোটা থাকতে পারে। অর্থাৎ সরকারি চাকরিতে কোটা ৫ ভাগের বেশি থাকা উচিত নয়।

আমাদের বুধবার: অনেকেই বলছেন, কোটা ব্যবস্থার মধ্যে দলীয়করণ, দুর্নীতি এবং অন্যায় লুকিয়ে আছে। আপনার মন্তব্য কী?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এই সন্দেহ তো থাকেই। কেননা কোটা ব্যবস্থাতে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ থাকে এবং তা করা হচ্ছেই। যারা যোগ্য নয়, তাদের কোটার মাধ্যমে যোগ্য বলে বিবেচিত করা যায়। এর সুযোগ থাকে এবং সন্দেহের কারণও থেকে যায়।

আমাদের বুধবার: মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে আপনার মতামত কী?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এখন আর কোটার দরকার নেই। এখন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কোটাও চলে গেছে। এখন তো তার পোষ্যদের পর্যন্ত চলে এসেছে। কোটা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা। কারণ মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধারা করেছেন মুক্তির জন্য, সকলের মুক্তির জন্য। কোনো বিশেষ সুযোগ পাওয়ার জন্য কেউ করেনি। কিন্তু পরে বিশেষ সুযোগ নানা ক্ষেত্রে দেয়া হয়েছে। সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে। আবার সার্টিফিকেটের মধ্যে সবগুলো যে যথার্থ তাও নয়। তারপরেও যদি এতো দূর প্রলম্বিত করা হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হবে। কারণ ওই যুদ্ধটি ছিল সকলের মুক্তির জন্য, বৈষম্যেহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের সুযোগ কেউ পাবে কেউ সুযোগ বঞ্চিত হবে এ রকমটা করার জন্য যুদ্ধটি ঘটেনি।

আমাদের বুধবার: কোটা ব্যবস্থা তুলে নেয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন সময় গঠিত নানা কমিটি সুপারিশ করলেও তা মানা হয়নি। এর কারণ কী?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যা, কোনো সরকার মানেনি। কারণ মনে করা হতো এক সরকার দিয়ে গেলে পরের সরকার এসে তা তুলে দিলে ক্ষোভ তৈরি হবে। কিন্তু এখন বিক্ষোভ তো তৈরি হয়ে গেছে, শুরু হয়েছে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে। মনে রাখতে হবে, সরকারই কোটা ঠিক করে। এটা তো পাবলিক সার্ভিস কমিশন ঠিক করে না। সরকার তার নিজস্ব কারণে বা চাপে এটা করে।

আমাদের বুধবার: প্রশাসনের বর্তমান মান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: প্রশাসনের অবস্থা তো খুবই খারাপ। মেধাবীরা এক সময় প্রশাসনে ছিলেন। আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছিলেন। বাইরের চাকরি অনেক বেশি লোভনীয় ছিল, অনেকেই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছিলেন। এখন এটা অনেক কমে এসেছে। এখন প্রশাসনই হচ্ছে প্রধান ক্ষেত্র, যেখানে মেধাবানদের আসা উচিত। কিন্তু কোটার বাধার কারণে তারা আসতে পারবেও না, আসবেও না। আসতে পারবে না জেনে নিরুৎসাহিত হবে। কোটার মাধ্যমে শতকরা ৫৬ জন চাকরি পাবেএটা অস্বাভাবিক, একেবারেই অস্বাভাবিক।

আমাদের বুধবার: সার্বিক পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সার্বিক ব্যবস্থাটি হচ্ছে সর্বত্র অন্যায় চলছে, এক্ষেত্রেও একটা অন্যায় চলছে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।

১টি মন্তব্য

  1. ek vag kota rakha-o uchit noy. ai kota medha sunno kore.