Home » রাজনীতি » স্বৈরাচারের মিলনমেলা না তোয়াজের মাহফিল

স্বৈরাচারের মিলনমেলা না তোয়াজের মাহফিল

আবীর হাসান

ershadইফতাররাজনীতির রেটিং করলে এগিয়ে থাকবে এরশাদের জাতীয় পার্টিই। কেননা ১২ জুলাই শুক্রবারের ওই ইফতার পার্টিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেক অনেক দলের নেতারা উপস্থিত হয়েছিলেন। চুপচাপ তারা শুনেছেন এরশাদের ললিত বাণী। এরশাদ বলেছেন, অনুষ্ঠানটি মধুর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এ মেলা যদি রাজনীতিতে থাকতো তাহলে খুবই ভালো হতো। বাংলাদেশের মানুষ বিস্ময় নিয়েই শুক্রবার রাতে টেলিভিশনে দেখেছে এক টেবিলে বসে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কুশীলবদের স্বৈরাচারের বক্তৃতা শুনতে। পরদিনের পত্রিকাতেও গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছিল সংবাদটি। ছবিও ছেপেছিল কোন কোন পত্রিকা। ইফতার রাজনীতির রেটিংএ হয়তো এগিয়ে যেতো বিএনপি যদি ১৩ জুলাই শনিবার খালেদা জিয়ার ইফতার পার্টিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের নেতা যেতেন। কিন্তু দুপুরে আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিল। দলটির পক্ষ থেকে বলা হলো, ওই ইফতার পার্টিতে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর নেতারা যাবেন বলে আওয়ামী লীগ নেতারা যাবেন না। তাহলে স্বৈরাচারী এরশাদের ওখানেও যদি তারা না যেতেন ভালো করতেন। আর জামায়াতের সঙ্গে ১৯৯০এর দশকে তারা তো এক সঙ্গে বসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নির্ধারণসহ নানান বৈঠক করেছেন। মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে শেখ হাসিনার এক টেবিলে বসে সংবাদ সম্মেলনের ছবিও তো আছে। জামায়াতের সঙ্গে তারা এক অনুষ্ঠানে বসতেও চান না, এটা স্বাধীনতার পক্ষে যেকোনো গোষ্ঠী, ব্যক্তি বা দলের জন্য খুশির কথা। আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাস ভালো থাকলে এমন খুশি হওয়া যেতো। কিন্তু আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি প্রার্থী তো গোলাম আজমের বাসায়ও গিয়েছিলেন তার আর্শীবাদের জন্য। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়সহ বিভিন্ন সময়ে দুই দলের মধ্যে আঁতাতের চেষ্টাও তো হয়েছে। তবে চূড়ান্ত বিচারে বলা যায়, দেশের এই সঙ্কটপূর্ণ এবং সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বিএনপির ইফতার পার্টিতে অংশগ্রহণ করলে অন্তত রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ঘটনা ঘটতে পারতো। প্রধান দুই দলই আসল শক্তি। এ কারণে অন্য অজুহাতে এই ইতিবাচক বিষয়টিকে নেতিবাচক ফলাফলে রূপান্তরে আওয়ামী লীগ লাভবান তো হয়ইনি, বরং বৈরিতার সর্ম্পককে তারা আরো এক ধাপ এগিয়ে দিলেন।

এ কারণেই বিএনপির ইফতার পার্টি মধুর তো নয়ই, মিলনমেলাও হল না। এগিয়ে রইলেন এরশাদ। মূল ব্যাপারটি এই নয় যে, এরশাদকে এগিয়ে দিলেন আওয়ামী লীগবিএনপি আর বাম দলগুলোর নেতারা? কেবল একটা গোলটেবিলে যারা বসেছিলেন ক্লক ওয়াইজ তাঁদের তালিকাটা এ রকম মাঝখানে এরশাদ পাশে এইচটি ইমাম, তার পাশে মতিয়া চৌধুরী, তারপর রাশেদ খান মেমন, মাঝামাঝি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, তার বাঁ দিকে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এরপর চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, তার বাঁদিকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তারপর মাহবুবুল আলম হানিফ, তার পাশে রুহুল আমিন হাওলাদার।

নব্বইএর গণআন্দোলন যারা দেখেছেন, এরশাদের বিরুদ্ধে তিন জোটের নেতাদের বক্তৃতাবিবৃতির কথা যাদের মনে আছে তারা নিঃসন্দেহে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছেন। যারা নূর হোসেনের আত্মত্যাগ আর ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ডের কথা মনে রেখেছেন তাদেরও কষ্ট হওয়ার কথা। আসলে গত ২৩ বছর ধরেই কষ্ট একটু একটু করে বাড়ছে। স্বৈরাচারী এরশাদের গুটি চালাচালি, বেহায়াপনা আর ছ্যাবলামী করেও রাষ্ট্রীয় মদদ আদায় করে নেয়াকে কম করে দেখেন না অনেকে। এই যে আজ এ কথা, কাল সে কথা, কোন কোন সময় নিজের সম্মানকে ঝুকির মধ্যে ফেলে বিতর্কিত হওয়া, এসত্ত্বেও ইচ্ছাকৃত বলে মনে করেন অনেকে। এই ঝুকিগুলো নিয়ে তিনি কিছু কিছু অর্জন করেন এই অর্জনগুলোর অনেক কিছুই বৈষয়িক, এর সর্বশেষটি হচ্ছে ব্যাংক। তালিকায় আছে টেলিভিশন চ্যানেল। এরশাদ রাজনীতিবিদ নন, তাই রাজনৈতিক মান ও নীতি নৈতিকতা বিষয়ক বোধ তার নেই। কিংবা ওই বোধটা তিনি ধারণ করতে চান না। বিবেক যাতে না জাগে তার জন্যই এ ব্যবস্থা। অনেকে মনে করেছিলেন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঠিক আগের দিন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমতউল্লাহ খানকে সমর্থন দেয়াটা ছিল চাপে পড়ে করা নাচার আচরণ। কিন্তু আসল ব্যাপারটা তো এখন বোঝা যাচ্ছে, দু’পা এগোনোর জন্য এক পা পিছিয়ে ছিলেন তিনি। এখন ইফতারের রাজনীতিতে দুই দলই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বামরাও তার বাণী গিলছে। এই রাশেদ খান মেনন স্বৈরাচারী এরশাদের পেটোয়াবাহিনীর মার খেয়ে কি রাজপথে পড়ে থাকেননি? মতিয়া চৌধুরী, হাসানুল হক ইনু যারা আজ নির্বাচনী সরকারের অংশীদার হওয়ার কারণে ক্ষমতা ভোগ করছেন স্বৈরাচারী লান্নত কি তাদের কপালেও জোটেনি। সেই তারা, যারা তিন জোটের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন স্বৈরাচারের পুনরুত্থান ঠেকানোর জন্য, তারাই আজ পা দিলেন স্বৈরাচারের তৈরি করা ফাঁদে!

আওয়ামী লীগ, বিএপি, বামদলের নেতারা সবাই শুনেছেন এরশাদের কূটবাক্য। তিনি বলেছেন – ‘আমরা কেউ কারো শত্রু নই।’ অবশ্য তিনি এখন দুই পরস্পর বিরোধী দলের পরম মিত্র। তিনি তাদের নসিহতও করেছেন এই বলে যে, রাজনীতিবিদদের মধ্যে শান্তি শৃঙ্খলা থাকলে দেশ থেকে হানাহানি, সংঘাত চলে যেতো। গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণ চেয়েছেন তিনি।

বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ নেতারা কি বুঝেছেন এরশাদ কোথায় খোঁচা দিয়েছেন তাদের? কি আশা নিয়ে তারা এরশাদের ইফতার পার্টিতে গিয়েছিলেন, আর কি নিয়ে ফিরেছেন তার হিসাব নিকাশও কি একইদিনে করেছেন তারা? বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নেতারা রাজনীতিতে এখন কৌশলগত নাজুক অবস্থানে আছেন, আর তার সুযোগ নিচ্ছে এরশাদের মতো স্বৈরাচার। তারা বলতে পারেন ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই।’ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শেষ কথার ব্যাপারটা কি বিষয়ক? অগণতান্ত্রিক কিছু নিয়ে তো নয় নিশ্চয়ই। তাই যদি হয়, তাহলে বর্তমান বিশ্বে বেঁচে থাকা ঘৃণ্যতম স্বৈরাচারকে গণতন্ত্রের ছায়া দিতে তারা এতো উতলা হলেন কেন? এর ফলাফল বা পরিণাম কি হতে পারে তা কি ভেবেছন তারা?

দিল্লি দুর অস্ত’এর মতো বাংলাদেশে নির্বাচন এখন অনেক দূরের ব্যাপার। আর এই সময়ে এরশাদ তার অবস্থান দৃঢ় করে ফেলেছেন। নির্বাচন আসতে আসতে মাঝের সময়টায় এরশাদ হয়তো আরও বড় কিছু অর্জন করে ফেলবেন। তাকে কি সেই দিকেই এগিয়ে দিচ্ছেন না বিএনপিআওয়ামী লীগ আর বামপন্থী নেতারা?

জনসাধারণ হয়তো আরো কিছু হৃদয় ভাঙা বিস্ময়কর ঘটনা দেখবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কি সহনীয় মাত্রায় থাকবে!