Home » অর্থনীতি » বায়বীয় পদ্মা সেতু

বায়বীয় পদ্মা সেতু

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

padma-bridgeপদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে সরকার ঠিক কি করতে চাইছে, বোধগম্য হচ্ছে না কারো। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিল, মালয়েশিয়াভারতচীনরাশিয়ার প্রস্তাব, নিজস্ব অর্থায়নে এটি নির্মাণের কথাবার্তা সবাই ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হয়েছে। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে বর্তমান সরকারের আমলে এর নির্মাণ কাজ শুরু হবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। অনেকে ধারণা করছেন, জাতীয় নির্বাচনের বৈতরনী পার হতে লোক দেখানো ফলক স্থাপন করা হতে পারে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের রূপরেখা ঘোষণা করেন। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছে। অথচ অর্থ সংস্থানের কোনো ব্যবস্থাই করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী বার বার বলেছেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হবে। অর্থমন্ত্রী তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা আমাদের লাগবে। এরই মধ্যে হঠাৎ করে চীনা একটি প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতু নির্মাণে একটি প্রস্তাব দেয় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। যোগাযোগ মন্ত্রী এ প্রস্তাবের বিষয়েও আগ্রহ দেখান। পরদিনই অর্থমন্ত্রী তা আমলে নেয়া হবে না বলে জানান। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুতে রাশিয়া ও চীনের প্রস্তাব ‘গ্রহণযোগ্য নয়’। প্রতিউত্তরে যোগাযোগ মন্ত্রী বলেন, প্রস্তাব দেয়ার ‘এক দিন যেতে না যেতেই’ অর্থমন্ত্রীর এ ধরণের মন্তব্য জনগণকে ‘হতাশ’ করে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চাইনিজ পলি টেকনোলজি কর্পোরেশন পদ্মা সেতু নির্মাণে ২৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এ বিষয়ে চলতি মাসেই সমঝোতা স্মারক সই করতে চায় তারা। চীনের প্রস্তাব বিশ্ব ব্যাংকের চেয়ে খারাপ কিছু হবে না বলেও সে সময় মন্তব্য করেন যোগাযোগ মন্ত্রী। তবে এর দুই দিনের মাথায় অর্থমন্ত্রী মুহিত সাফ জানিয়ে দেন, চীনের ওই প্রস্তাব গ্রহণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। ‘চীনের প্রস্তাব বা এ ধরণের কোনো প্রস্তাব যদি আমরা গ্রহণ করি তাহলে আমাদের আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রত্যাহার করতে হবে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভাল।’

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণের অর্থায়ন নিয়ে দুর্নীতি প্রশ্নে বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর দাতা সংস্থাটি ‘না’ করে দেয় সরকারকে। গত জানুয়ারিতে নিজস্ব অর্থায়নেই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত মাসের শেষে সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিক দরপত্রও ডাকা হয়।

পদ্মা সেতু নিয়ে মহাজোট সরকার বিব্রত না জাগ্রত? বহুল আলোচিত এই সেতু নিয়ে দেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের তিন কোটি মানুষ স্বপ্ন দেখা প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু সরকার ‘পদ্মা সেতু ইস্যুটি’ ‘বার বার হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মতো’ জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছে। সরকার ঝুড়ি থেকে ‘এক এক সময় এক একটি দেশ ও বিদেশি কোম্পানির নাম’ বের করে এনে বলছেন ওরা পদ্মা সেতুকে বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু মানুষ সে সবের বাস্তবতা দেখতে পারছে না। জনগণকে এভাবে বোকা বানানোর কৌশল আর কতদিন চলবে? ইতোমধ্যে কোরিয়া, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, ভারতসহ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন কোম্পানির নাম প্রকাশ করে দাবি করা হয় ওই সব কোম্পানি বা দেশ পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে। এমনকি মালয়েশিয়ার একটি কোম্পানির সঙ্গে এ নিয়ে সমঝোতা চুক্তিও করা হয়। কিন্তু মানুষ এতো সব প্রস্তাব ও আগ্রহের প্রতিফলন দেখতে পারছে না। বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের বড় একটা অংশ পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে চায় বলে সরকার থেকে প্রচার করা হয়। কিন্তু বিনিয়োগ আর আসে না। গত কয়েক মাস থেকে পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করা দেশ ও কোম্পানির নাম প্রকাশের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। গত মঙ্গলবারও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, চীনের পলি টেকনোলজি কর্পোরেশন ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগ করতে চায়।

উল্লেখ্য ২৯০ কোটি ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রধান অর্থদাতা প্রতিষ্ঠান ছিল বিশ্ব ব্যাংক। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার দেয়ার কথা ছিল প্রতিষ্ঠানটির। এ ছাড়া এডিবির ৬১ কোটি, জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকার ৪০ কোটি এবং ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) ১৪ কোটি ডলার দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেনসহ সরকারের কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিপ্রায়ের অভিযোগ উঠায় বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করে। অতপর পর্যায়ক্রমে জাইকা (জাপানী উন্নয়ন সংস্থা), এডিবি (এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক) ও আইসিবি (ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক) পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণ দেয়ার চুক্তি প্রত্যাহার করে নেয়। তারপর পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক নাটক হয়। এসএনসি লাভালিন সাবেক কর্মকর্তা রমেশ সাহার ডায়েরি, বিশ্বব্যাংক আর বাংলাদেশ সরকারের চিঠি চালাচালি, দুর্নীতি তদন্তে বিশ্বব্যংকের প্রতিনিধির বাংলাদেশ দুই দফায় সফল, দুদকের তদন্ত, মন্ত্রীদের স্ববিরোধী কথাবার্তা, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা, কানাডায় এসএনসি লাভালিনের দুই কর্মকর্তার বিচারসহ অনেক ঘটনা ঘটে পদ্মা ইস্যুতে। অর্থনীতিবিদ এবং প্রযুক্তিবিদরা স্পষ্ট করে জানান, দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ অসম্ভব। তারপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদ্মা সেতুর অর্থায়নের জন্য ব্যাংকে দুটি একাউন্ট খোলা হয়। সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ্মা সেতুর টাকা তুলে ভাগবাটোয়ারায় সময় ছাত্রলীগের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়। প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয়ার পর বাংলাদেশের বিমা কোম্পানিগুলো থেকে জানানো হয় পদ্মা সেতু নির্মাণের বিমা কোম্পানি অর্থায়ন করবে। অতপর বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের খবরও প্রচার করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে ঘোষণা দেয়া হয় পদ্মা সেতুর অর্থায়নের। সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া বাজেটেও পদ্মা সেতুর নামে বরাদ্দ রাখা হয়। যে সেতুর স্বপ্ন দেখা মানুষ ভুলে যেতে বসেছে তখনও সরকার বার বার পদ্মা সেতু ইস্যু সামনে নিয়ে আসছে। সরকার মনে করছে পদ্মা সেতু ইস্যু জিইয়ে রেখে আগামী নির্বাচনে ভোট ধরে রাখা যাবে। কিন্তু মানুষ বুঝে গেছে এ সরকারের পক্ষে আর পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়। তারপরও সরকার পদ্মা সেতু র্নির্মাণর এবং সেতুতে বিনিয়োগের ব্যপারে নতুন নতুন তথ্য হাজির করছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ৬ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৩১৪ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে এ কথা জানান। অর্থমন্ত্রী জানান, ভারতের ২০ কোটি ডলারের (২০০ মিলিয়ন) অনুদানও পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যবহার করবে সরকার। পদ্মা সেতু নির্মাণে দেশের জনগণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশি অভিবাসীদের সহায়তা চেয়েছেন তিনি। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হলেও এই প্রকল্পে ‘যথাসময়ে’ ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক এবং আরও কিছু উন্নয়নসহযোগীর সমর্থন আদায় করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রকল্পের জন্য ভারতের অনুদান ২০০ মিলিয়ন ডলার আমরা ব্যবহার করব। আমি এও আশা করছি যে, এই প্রকল্পের জন্য ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক এবং আরও কতিপয় উন্নয়নসহযোগীর সমর্থন আমরা যথাসময়ে আদায় করতে পারব। নিজস্ব অর্থায়নে আমরা পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ যে শুরু করেছি, সেটিই একমাত্র উপায় বলে আমার মনে হয়।’

বর্তমান সরকারের আমলে পদ্মা সেতু নির্মাণ হবে না, সেটি নিশ্চিত। তবে দেখার বিষয় নির্বাচনে জেতার কৌশল হিসেবে তারা কি পদক্ষেপ নেয়। অনেকে ধারণা করছেন, হয়তো একটি নাম ফলক স্থাপন করা হবে বটে, কাজঅর্থ কোনোটিই জোগাড় করতে পারবে না তারা। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করার জন্য আরেক মেয়াদ ক্ষমতায় আসতে চান বলে ভোট চেয়েছেন। বর্তমান সরকারের দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু থেকে বঞ্চিত জনগণ পুনরায় তাদের সুযোগ দেয়া কিনা?