Home » আন্তর্জাতিক » ভারত মহাসাগর – যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতা

ভারত মহাসাগর – যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতা

নম্রতা গোস্বামী ও জেনি শ্যারন

এশিয়ান টাইমস অনলাইন থেকে অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

indian oceanমার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের গত মার্চে প্রকাশিত কৌশলগত নির্দেশিকা মতবাদে ‘এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু’ নীতির কথা সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সিলেনস অব কমিউনিকেশনের (এসএলওসি) অবাধ অবস্থান অব্যাহত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।

মতবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, এই কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি সম্প্রসারণ করবে। ভারত যাতে মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তার জোগানদার এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে, সেজন্যই ভারতীয়দের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ নজর। দুই দেশের কৌশলগত স্বার্থ মিলে যাওয়ায়, ভারত এখন অন্য কোনো দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই বেশি বেশি সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে, কর্মকর্তা বিনিময় করছে এবং বার্ষিক প্রতিরক্ষা সংলাপে বসছে।

যুক্তরাষ্ট্রভারতের ক্রমবর্ধমান এই কৌশলগত অংশীদারির বিষয়টি চীনের নজর এড়ায়নি। চীনের অভ্যন্তরে এই কৌশলগত সম্পর্কের উদ্দেশ্য নিয়ে বেশ জল্পনাকল্পনা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বারবার জোর দিয়ে বলে আসছে, এই অংশীদারি এবং নৌবাহিনীর উপস্থিতি উদীয়মান চীনের মোকাবিলার কোনো কৌশলগত প্রয়াস নয়। কিন্তু চীন তাদের এই বক্তব্য গ্রহণ করেনি।

নৌশক্তি বাড়ানো নিয়ে চীন যা চিন্তা করছে, তা কেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেচনা করা উচিত? কারণ চীন ও ভারতের সীমান্ত বিতর্কে ইতোমধ্যেই বেশ বড় রকমের ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক নৌশক্তি বাড়ানো নিয়ে একে অন্যের কৌশলগত লক্ষ্য প্রশ্নে অনিশ্চয়তা যোগ হওয়ার ফলে বিরাজমান উত্তেজনা প্রশমন বা নিরসন করা আরো বেশি কঠিন হয়ে পড়ছে। অবশ্য চীন, ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকারোরই সংঘাত কাম্য নয়। কারণ সংঘাত মানেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর হুমকি সৃষ্টি। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনটি দেশকেই মারাত্মক ঝুঁকিকে ফেলে দেবে।

গত কয়েক বছর ধরে আমরা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিশেষ করে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য কয়েকটি দেশের মধ্যে যৌথ সামরিক ও নৌ মহড়া বৃদ্ধি পেতে দেখছি। ভারত ও চীন উভয়েই মনে করছে, তারা একে অন্যের দ্বারা ঘেরাও হতে যাচ্ছে। আর এই আশঙ্কা প্রতিরোধে উভয় দেশই তাদের নৌশক্তি বাড়াচ্ছে।

ভারত মহাসাগরে চীনও এখন অনেক বেশি সক্রিয়। তারা ভারতীয় উপস্থিতি মোকাবিলা এবং একইসঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর তাদের দাবি সমুন্নত রাখার কৌশল হিসেবে ভারত মহাসাগরে আরো বেশি আক্রমণত্মক সাবমেরিন মোতায়েন করছে। নৌশক্তির এই আধুনিকায়নের বিষয়টি ভারতের নজর এড়ায়নি। তারাও আধুনিকায়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে। এর অংশ হিসেবে তারা রাশিয়ার কাছ থেকে একটি বিমানবাহী রণতরী, ফ্রান্স থেকে সাবমেরিন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নৌ টহল বিমান কিনেছে। চীন মনে করছে ভারত মহাসাগরে তার ‘মুক্তার মালা’ (স্ট্রিং অব পার্লস) নামে পরিচিত কৌশলগত পরিকল্পনা মোকাবিলার জন্যই ভারত এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

উভয় পক্ষই এখন তাদের নৌশক্তি বিপুলভাবে বাড়ানোর কাজে নিয়োজিত হয়েছে। ভারত তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী দুই দশকের জন্য নৌবাহিনীতে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। আর চীন আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কেবল যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গে ভারতের যৌথ নৌ মহড়া নয়, অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নৌ মহড়ায় অংশগ্রহণের ভারতীয় পরিকল্পনার বিষয়টিও চীনের নজরে পড়েছে। প্রথম ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে সম্প্রতি এ কে অ্যান্টনি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারি আরো বাড়ানোর ভিত্তি স্থাপন করে এসেছেন। এই সফরের প্রেক্ষাপটেই দুই দেশ আগামী বছর যৌথ সামরিক মহড়া চালানোর পরিকল্পনা করেছে। অধিকন্তু, ২০১২ সালের জুলাই মাসে ভারত ও জাপান যৌথ নৌ মহড়া চালায়। আর ২০১৩ সালের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের জাপান সফরকালে দুই দেশ আরো ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার জন্য নিয়মিত যৌথ মহড়া পরিচালনা এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়।

স্পষ্টভাবেই বলা যায়, ভারত ও তার প্রতিবেশিদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারি এবং তাদের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান যৌথ সামরিক ও নৌমহড়া চীনের কাছে তাকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা মনে হতে পারে। সে রকম কিছু যদি নাও হয় এবং মহড়া এবং অংশীদারির বিষয়ে যদি চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে করা হয় (আসন্ন ২০১৪ রিম অব দ্য প্যাসিফিক এক্সারসাইজএর মতো) তবে তা সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সংশয়সন্দেহ নিরসন করতে পারবে না।

এক্ষেত্রে সমস্যা দুই দিক থেকেই হতে পারে। চীনকে আমন্ত্রণ জানানো না হলে এটা চীনকে ঘেরাও করার আঞ্চলিক কৌশল হিসেবে মনে করা হবে। আবার চীনকে আমন্ত্রণ জানানো হলে, বেইজিংয়ের কাছে সেটা মনে হতে পারে, এটা করা হয়েছে চীনের সামরিক আধুনিকায়ন সম্পর্কে আরো গোয়েন্দা তথ্য লাভের আমেরিকান প্রয়াসে।

চীনা যেসব নথিপত্র প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ভারতের অংশীদারি এবং আঞ্চলিক নৌ সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগকে চীন তাকে ঘিরে ফেলার উদ্যোগ ভাবছে। চীনা সংবাদমাধ্যমেও যুক্তরাষ্ট্রের চীনকে আঞ্চলিকভাবে ঘিরে ফেলার বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা চলছে। ২০১১ সালে গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কেবল চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি আন্তর্জাতিকভাবেই ক্ষুণ্ন করতে চাচ্ছে না, বরং দেশটির অভ্যন্তরীণ সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করেও নিজ দেশেই চীনকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে।

আর আন্তর্জাতিকভাবে চীনকে ঘিরে ফেলার কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারি গঠন করছে, আঞ্চলিক বিরোধ তীব্রতর করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে চীনভারত সীমান্ত বিরোধের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। এটা চীনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আরো বেশি ধক্ষংস ও ক্ষতিকর নীতি হওয়ায় এ নিয়ে বেশ আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক অংশীদারদের উচিত তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আরো বেশি খোলামেলা করা এবং স্বচ্ছতা আনা, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত চায়, চীন যেন নিজেকে ঘেরাওয়ের শিকার বলে না মনে করে। কিন্তু চীন আসলে সেটাই মনে করে। চীন দেখছে যে ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তার, দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে হস্তক্ষেপ করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যে ব্যবহৃত প্রধান সমুদ্রপথে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বিঘœ সৃষ্টির আশঙ্কা মোকাবিলার প্রস্তুতির নিতে যুক্তরাষ্ট্র সামুদ্রিকভাবে চীনকে ঘিরে ফেলার কাজ সক্রিয়ভাবে করছে।

চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তি বাড়ানো নিয়ে ব্যাপক ভুল বুঝাবুঝি রয়েছে। তারা অনেক বিষয় প্রকাশ না করায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই দেশ তিনটির কোনোটি কি চূড়ান্তভাবে সংঘাত কামনা করে? ভুল বুঝাবুঝির সঙ্গে অনিশ্চয়তার যোগ হলে এমন এক সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে যার ধকল কারো পক্ষে কাটানো সম্ভব হবে না, এবং সেটা প্রতিরোধও করা যাবে না।।