Home » অর্থনীতি » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৪)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৪)

পাকিস্তান প্রকল্পের ফাটল ও পূর্ব বাংলার ভিন্ন যাত্রা

আনু মুহাম্মদ

60'sমাঝখানে ভারত রেখে ১২০০ মাইল দূরের দুই অঞ্চল নিয়ে একটি দেশ এমনিতেই ছিল একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। ‘সব মুসলমান ভাই ভাই’ এই অনুমিতির উপরই এই প্রকল্প দাঁড়িয়েছিল। ধারণা ছিল এই যে, এই দেশে মুসলমানরা, তাদের ভাষা বা গায়ের রং যাই থাকুক না কেন তারা সমান মর্যাদা নিয়ে থাকবে। মুসলমান হিসেবে বর্ণ হিন্দুদের কাছে অপমান ঘাড়ধাক্কা খেয়ে খেয়ে বাঙালী মুসলমানের মধ্যে এই সমাধানই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পাকিস্তানের সমর্থন ভিত্তিও অনেকখানি নির্ভরশীল ছিল বাঙালী মুসলমানের সমর্থনের উপরই। কিন্তু আরেকটি বড় আঘাত তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ছোটবড় নানা ঘটনা, সরকারি নীতি ও কর্মসূচি, সরকারি ক্ষমতাবানদের ভাষ্য, বিভিন্ন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এই বিষয়গুলি ক্রমে স্পষ্ট হয় যে এই অঞ্চলের মুসলমানেরা পাকিস্তানী ও মুসলমান পরিচয় নিয়ে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গঠনে আগ্রহী হলেও পাকিস্তানী ক্ষমতাবানদের তাতে কোন আগ্রহ নেই। তারা নিজেদের মুসলমান বা পাকিস্তানী হিসেবে ভাববার আগে পাঞ্জাবী, সিন্ধী বা বেলুচ ভাবতে ভালবাসে। আর দূরের বাঙালীদের প্রতি তাদের অবজ্ঞা, সন্দেহ, বিদ্বেষ এতবেশি যে, প্রতি কথা আচরণ আর হাসিঠাট্টায় বারবার তা প্রকাশিত হয়। এগুলো প্রায় সাধারণ ব্যাপার ছিল। বাঙালী মুসলমানদের অপূর্ণাঙ্গ মুসলমান হিসেবে দেখার এবং তাদের মুসলমান বানানোর জন্য বাংলা ভাষা সংস্কৃতিকে হেয় করা ছিল একটি নিয়মিত চর্চা। এই একই দৃষ্টিভঙ্গী ছিল বাঙালী সমাজের ‘আশরাফ’ মুসলমানদেরও। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমান কার্যত আতরাফ হিসেবেই নিজেদের নতুন করে উপলব্ধি করেন অবাঙালী বা আশরাফ মুসলমান ভাইদের সামনে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই বাঙালীদের মুসলমান বানানোর চেষ্টার বহিপ্রকাশ ঘটে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করবার চেষ্টায়। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন, অথচ তিনি নিজেই উর্দু ভাষায় কথা বলতেন না। আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই সময়ে গঠিত ব্যুরো অব রিকন্সট্রাকশন বা বিএনআর থেকেও একই প্রস্তাব দেয়া হয়। পরে শিক্ষা নিয়ে যিনি পাকিস্তান কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই হামুদুর রহমান ১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমীর এক অনুষ্ঠানে আরবী হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং এ নিয়ে কাজ করবার জন্য শওকত ওসমানকে বলেছিলেন। ইসলাম বিরোধী অভিহিত করে রবীন্দ্র সাহিত্য ও সঙ্গীত থেকে বাঙালী মুসলমানদের ‘রক্ষা’ করবার নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। বাংলা বাঙালী সবকিছুই যেন হিন্দুয়ানি। এসবের প্রতিবাদে ক্রমে সরব হতে থাকেন লেখক শিল্পীরাও। ১ বৈশাখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু, পোষাক সাজে বাঙালী রূপ আনা, মেয়েদের কপালে টিপ দেয়া এগুলোও ছিল প্রতিবাদেরই অংশ।

পূর্ব বাংলার ভিন্ন যাত্রা

১৯৫০ সালের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে জমিদারী প্রথা বাতিল পাকিস্তানের সামন্তপ্রভু গোষ্ঠী ভালো চোখে দেখেনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এর মধ্য দিয়ে বাঙালী মুসলিম মানস নিজেদের সত্ত্বাকেই নতুন করে আবিষ্কার করে যা পাকিস্তানী প্রকল্পের জন্য মানানসই ছিল না। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে উচ্ছেদ করে দিয়ে হকভাসানীসোহরাওয়ার্দী নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট যেসব কর্মসূচি নিয়ে আবির্ভূত হয় সেগুলো পাকিস্তানে ত্রয়ী ক্ষমতার সবাইকেই যে সতর্ক করে তুলেছিল তা পরবর্তী ঘটনাবলী থেকেই বোঝা যায়। যুক্তফ্রন্ট এই ২১ দফার ভিত্তিতেই নির্বাচন করেছিল এবং নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানের আসল ক্ষমতার কাছে জনগণের এই নির্বাচিত ক্ষমতা টিকতে পারেনি।

এই ২১ দফা এখানে উল্লেখ করা দরকার, কেননা ৬০ দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল এরই ধারাবাহিকতা। এগুলো ছিল সংক্ষেপে নিুরূপ:

. বাঙলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা।

. জমিদারী ও খাজনা প্রথা সংস্কার।

. পাট ব্যবসা জাতীয়করণ করা ও পাটের মূল্য নির্ধারণ করা এবং পাট কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদান।

. সমবায় ব্যবস্থা প্রবর্তন ও হস্তকুটির শিল্পের উন্নতি সাধন।

. লবন শিল্পের স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনয়ন ও লবন কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদান।

. শিল্প ও কারিগরী শ্রেনীর গরীব মোহাজেরদের পুনর্বাসন ও কাজের আশু ব্যবস্থা।

. খাল খনন ও সেচের ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে বন্যা ও দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা।

. পূর্ববঙ্গকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে শিল্পায়িত করা। কৃষির আধুনিকায়নের মাধ্যমে খাদ্যে ও শিল্পে দেশকে স্বাবলম্বী করা। আন্তর্জাতিক শ্রমসংঘের মূলনীতি অনুসারে শ্রমিকদের সব ধরণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

. দেশের সর্বত্র প্রাথমিক ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় বেতনভাতার ব্যবস্থা করা।

১০. শিক্ষার আমূল পরিবর্তন করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কেবল মাতৃভাষার মধ্যে দিয়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা। একই মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা।

১১. উচ্চশিক্ষাকে সস্তা ও সহজলভ্য করা এবং শিক্ষার্জন ব্যয় কমানোর জন্যে ‘ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ ইত্যাদি প্রতিক্রিয়াশীল কানুন বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।

১২. শাসন ব্যয় হ্রাস করা।

১৩. দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ, রিশওয়াত বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা।

১৪. জন নিরাপত্তা আইন ও অর্ডিন্যান্স ইত্যাদি কালাকানুন বাতিল করা।

১৫. বিচার বিভাগকে শাসনবিভাগ থেকে পৃথক করা।

১৬. যুক্তফ্রন্টে প্রধানমন্ত্রীর বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে স্বল্প ব্যয়ের বাড়িতে থাকা।

১৭. ভাষা শহীদদের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ শহীদ মিনার নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া।

১৮. ২১ ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস ঘোষণা করে সরকারী ছুটি দেওয়া।

১৯. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন।

২০. আইন পরিষদের আয়ু কোন অজুহাতে বাড়ানো যাবে না এবং আয়ু শেষ হবার ৬ মাস আগে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন।

২১. যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় কোন আসন শূণ্য হলে তিন মাসের মধ্যে তা পূরণের জন্য উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

এই ২১ দফার ভিত্তিতে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলেও যে টিকতে পারলোনা তা এখন আর কারও কাছে বিস্ময়কর মনে হবে না। পাকিস্তানে নির্বাচিত সরকারের টিকে থাকার দৃষ্টান্ত খুব কম। ১৯৫৪ সালের মধ্যে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ উচ্ছেদ হওয়ার পর ক্রমে তার ভেতর থেকেই গড়ে উঠা আওয়ামী লীগ প্রধান দলে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ততদিনে পাকিস্তানের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে। বিভিন্ন সামরিক চুক্তিতে পাকিস্তান ততদিন আস্ট্রেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কন্ঠও আস্তে আস্তে শোনা যেতে থাকে। আওয়ামী লীগের মধ্যে এর সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পাকমার্কিন চুক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান গ্রহণ করলেও দলের অন্য প্রধান নেতা সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর অনুসারী শেখ মুজিব এই অবস্থান গ্রহণে সম্মত হননি। এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ভাঙন পর্যন্ত গড়ায়। আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে এসে মওলানা ভাসানী গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। তখন ১৯৫৭ সাল। ইতিমধ্যে অনেকবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতা তখন কার্যত বেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাতে। আর সামরিক বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। রাষ্ট্রীয় নীতিতেও তাদের প্রভাব বাড়ছে। আর পাক সামরিক নীতি শুধু নয়, পরিকল্পনা শিক্ষা সবকিছুতেই মার্কিনীরা ততদিনে সরাসরি যুক্ত।

(চলবে…)