Home » অর্থনীতি » তেল গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল গ্যাস লুট দেশে দেশে

আফ্রিকার অভিজ্ঞতা

ফারুক চৌধুরী

oil africaসম্পদ, প্রাচুর্য আর দারিদ্র্য, লুট আর দুর্দশা, কতিপয়ের বিলাস আর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মানবেতর জীবনের কথা উঠলেই আফ্রিকার প্রসঙ্গে ওঠে। ‘বিচিত্র’ এক মহাদেশ।

নক্রুমা ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত বই নিও কলোনিয়ালিজম, দ্য লাস্ট স্টেজ অব ইম্পেরিয়ালিজময় বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের শুরুতেই লিখেছেন, আফ্রিকা আপাতদৃশ্য এক বৈপরীত্য। তার মৃত্তিকা প্রাচুর্যে ভরা। অথচ সে মাটির ওপর আর নিচ থেকে যে সামগ্রী আসে, সেগুলো আফ্রিকানদের সমৃদ্ধ করে না। সে সামগ্রী সম্ভার ধনী বানায় তাদেরই যারা আফ্রিকাকে গরিব বানানোর জন্য কাজ করে চলে। আফ্রিকার খনিতে যে লোহা আকর মজুদ আছে তা আমেরিকার মজুদের দ্বিগুণ, (তৎকালীন) সোভিয়েত ইউনিয়নের দুইতৃতীয়াংশ। আফ্রিকার খনিতে যে কয়লা মজুদ আছে তা দিয়ে তিনশ বছর চলা যায়। তেলের নতুন নতুন খনি আবি®কৃত হয়েছে। বিশ্বের সম্ভাব্য জনশক্তির শতকরা ৪০ ভাগ রয়েছে আফ্রিকায়। অন্য কোনো মহাদেশে এতো পানি শক্তি নেই। সাহারা মরুভূমির বিস্তৃতি সত্ত্বেও আফ্রিকায় আবাদযোগ্য ও চারণ ভূমি যা আছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নেরচেয়ে বেশি। বেশি এশিয়ার চেয়ে। আফ্রিকার বনভূমি যুক্তরাষ্ট্রের বনভূমির দ্বিগুণ। এমন মহাদেশ সম্পর্কে যে কাউকে প্রশ্ন করলে আফ্রিকার পরিচয়ের সঙ্গে উঠে আসবে দারিদ্র্য, সংঘাত, দুর্ভিক্ষ, লুটের কথা। অথচ এ মহাদেশটি মানব জাতির সূতিকাগার। এখানে প্রায় ৭০ লাখ বছর আগে প্রাণী আর পূর্ব মানবের বিবর্তন রেখা দুটির মিলন ঘটেছিল। এখানেই সর্বপ্রথম মানুষের পূর্ব পুরুষরা ববসতি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে তাদের যাত্রা হয় ইউরোপে, এশিয়ায়।

দফায় দফায় সে যাত্রার পরে মহাদেশটিকে করায়ত্ত করে বেলজিয়াম, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পর্তুগাল, স্পেন। পৃথিবীর ভূভাগের শতকরা ২০ ভাগ নিয়ে গঠিত এ মহাদেশে বসবাস বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ। আর ২০০৫ সালে মহাদেশটিতে উদ্বাস্তুর সংখ্যা ছিল দেড় কোটি। এদের মধ্যে ৩৩ লাখ মানুষ সংঘাত, সহিংসতা, রক্তপাতের হাত এড়াতে নিজ বাসভূমি থেকে পালিয়েছেন অন্য দেশে। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজ দেশেই আছেন। তবে নিজ বসতের এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গায়। সারা পৃথিবীতে যে ৩৮টি দেশকে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বিপুলভাবে ঋণগ্রস্ত গরিব দেশ হিসেবে গণ্য করে, সেগুলোর মধ্যে ৩২টি রয়েছে এ মহাদেশে। এ সব তথ্য দেয়া হয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সাময়িকীর ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায়। ব্রুন্টল্যান্ড কমিশন তার রিপোর্টে আফ্রিকা সম্পর্কে বলেছিল মহাদেশটি চক্কর খেতে খেতে নিচে নামছে। সেখানে আছে দারিদ্য, ক্ষুধা, হ্রাসমান সঞ্চয়, নতুন বিনিয়োগে অবহেলা, শিক্ষার অভাব, শিশু মৃত্যুর চড়া হার, গ্রামে অনাহার থেকে পালাতে শহরে এসে বিড় জমানো। এসব বাড়িয়ে তোলে অপর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহের সমস্যা।

আফ্রিকার এই সঙ্কটের বহু কারণ। এ সবের একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, আফ্রিকার অনেক দেশের কাঁচামালের দাম পড়ে গেছে। বাণিজ্যের শর্ত হয়েছে প্রতিকূল সাহায্যের তহবির গেছে কমে। আফ্রিকায় কৃষি উৎপাদন সাম্প্রতিককালে এতো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, সেটা কোনো আক্রমণকারী সেনাবাহিনীর পোড়া মাটি নীতি অনুসরণ করলে যে ক্ষতি হতো তার চেয়েও বেশি। অথচ আফ্রিকার অধিকাংশ দেশের সরকার মাটির সে ক্ষতি রোধে যে অর্থ খরচ করে, সম্ভাব্য আক্রমণকারী সেনাদলের হাত থেকে রক্ষা পেতে খরচ করে তার চেয়ে বেশি।

কেন এমন অবস্থা এ মহাদেশের? এ প্রশ্নেরও উত্তর দেন নক্রুমা। আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ মহাদেশটির শিল্পোন্নয়নে নিয়োজিত হয়নি। তা ব্যবহৃত হয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ার শ্রী বৃদ্ধিতে। এ এক বিরামহীন প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা প্রবল ভাবে বেড়েছে। সমর প্রস্তুতি আর পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। কারণ হিসেবে তিনি পাকা মালের বর্ধমান চাহিদা মেটাতে ধাতব ও অধাতব কাঁচামাল আহরণে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। এ সব প্রযুক্তি কাঁচামাল আহরণের কাজ দ্রুত করতে পারে।

মোদ্দা কথায় ব্যাপারটি দাঁড়াচ্ছে: আরো মুনাফার জন্য আরো পণ্য তৈরি, আরো পণ্য তৈরির জন্য আরো কাঁচা মাল আহরণ, আরো কাঁচামাল আহরণের জন্য খুবলে নাও, কেড়ে নাও, ছিনিয়ে নাও, দখল কর যা কিছু আছে আফ্রিকার। আর কাঁচা মালের ক্ষেত্র ও পাকা মালের বাজার দখলে রাখতে বানাও অস্ত্র। সেই সঙ্গে কোনো কোনো দেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে পড়েছে সমর শিল্পনির্ভর।

এ ধারাই আফ্রিকাকে আবৃত্ত করে দেয় নিরক্ষরতা, অনাহার, দুর্নীতি, অপশাসন, বঞ্চনা, নির্যাতনের কালো চাদরে। সেখানে চাপিয়ে দেয়া হয় যুদ্ধগৃহযুদ্ধঅস্ত্র কেনা আর সেনাদল, পোষার বিপুল ব্যয়।

অথচ ব্রিটেনের শ্রমিক দলীয় নেতা ও এককালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারন্ড উইলসন ১৯৫৩ সালে দ্য ওয়্যার অন ওয়ার্ল্ড পভার্টি এন এপিল দ্য কনশেন্স অব অ্যানকাউন্ড বইতে লিখেছিলেন: মানবজাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সবচেয়ে জরুরি সমস্যা যুদ্ধ নয়, কমিউনিজম বা জীবন ধারণ ব্যয় বা কর। তাহচ্ছে ক্ষুধা, এ ক্ষুধা একই সঙ্গে দরিদ্র, দুর্দশার কারণ ও ফলাফল।

আফ্রিকার এ দারিদ্র্য, ক্ষুধা, দুর্দশার সঙ্গে যুক্ত মহাদেশটির সম্পদ অন্যত্র চলে যাওয়া, শিল্পে ব্যবহার্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ৫৩টি খনিজ সম্পদ ও ধাতব পদার্থ রয়েছে আফ্রিকায়। অথচ আফ্রিকায় শিল্পোন্নয়ন হয়নি। এগুলো চলে যায় বহুজাতিক কোম্পানির (বক) হাত ধরে অন্য দেশে, প্রভুদের পকেটে। সব বহুজাতিক কোম্পানি (বক) বিনিময়ে দিয়েছে হানাহানি, অস্ত্র, যুদ্ধ, বিবাদ।

আফ্রিকাকে কব্জা করতে ঔপনিবেশিক প্রভুরা তৈরি করেছে খণ্ড খণ্ড সত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। তাদের ঘরে গেছে মুনাফা। এ কাজে যুক্ত নানা নাম: শেল, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো, ইম্পেরিয়াল টোবাকো, বর্মা অয়েল, নচাংগা কপার, রোকানা করপোরেশন, রোডেশিয়ান মাইন্স, ব্রিটিশ সাদ আফ্রিকা। এসব একচেটিয়া কোম্পানির নামে ও সংগঠনে সময়ান্তরে পরিবর্তন ঘটেছে। বেশ কিছু নাম এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। পুরনো নাম বদলে হয়েছে নতুন নাম। তবে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের কাজ অব্যাহত রয়েছে। কেবল ব্রিটিশ একচেটিয়া কোম্পানি নয়, ফরাসি, জার্মান, বেলজিয়াম, ইতালীয় একচেটিয়া কোম্পানিগুলোও ছিল। এদের মধ্যে ছিল খনি কোম্পানি, পরিবহন কোম্পানি, ব্যাংক, বিনিয়োগ কোম্পানি, সব মিলিয়ে এক আঁতাত। আফ্রিকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগ ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পায় ১১ কোটি ডলার থেকে ৭৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। এর অধিকাংশই আসে মুনাফা থেকে। যে ৬৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার বৃদ্ধি পায় তার মাত্র ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার প্রকৃতপক্ষে নতুন বিনিয়োগ। উদ্বৃত্ত আবার বিনিয়োগসহ মোট বিনিয়োগ থেকে মুনাফা পায় যুক্তরাষ্ট্র, আর আফ্রিকার দেশগুলোর লোকসান হয় ৫৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া কোম্পানিগুলো ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত সেই মুনাফা করে ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ হিসাবের ভিত্তি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান। তবে অন্যান্য সূত্রের হিসাবে মুনাফার পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলার। এখানে উল্লেখিত ডলারের মূল্যমান তৎকালীন। এসব তথ্য প্রদান করে নক্রুমা মন্তব্য করেছেন: এসব সংখ্যা দিয়ে এ কথা বুঝতে গণিতবিদ হওয়ার দরকার পড়ে না যে, আফ্রিকায় বিনিয়োগ থেকে মুনাফার প্রায় শত ভাগ।

এভাবে পুঁজি, বিনিয়োগ, মুনাফা, আঁতাত, কোম্পানি, একচেটিয়া বাজার, ইত্যাদির কাহিনী আফ্রিকাজুড়ে, প্রায় ৫০০ বছর আগে পর্তুগিজ উপনিবেশিক শক্তির আফ্রিকায় পা দেয়অর সময় থেকে। আজ সে গল্প আরো মার্জিত, পরিশীলিত, সূক্ষ্ম, শিল্প সম্মত। আজ সে গল্পে মূল চরিত্ররা বহুজাতিক কোম্পানি (বক), তাদের পেটোয়ারা এবং তাদের বংশবদ সরকারগুলো।

সবাই মিলে খুঁজে বেড়িয়েছে আফ্রিকার সম্পদ আর সে সম্পদ লুটের কৌশল। যেমন ১৯৪৯ সালের জুলাইয়ে জানানো হয়, মার্শাল প্ল্যান সংশ্লিষ্ট মার্কিন বিশেষজ্ঞরা এটলাস পর্বতমালা থেকে উত্তমাশা অন্তরীণ পর্যন্ত চষে বেড়াচ্ছেন আফ্রিকায় কৃষিজ ও খনিজ সম্পদরাজির খোঁজে। পাওয়া গেল ফরাসি উত্তর আমেরিকায় (অর্থাৎ সেখানে ফরাসি ঊপনিবেশ) সীসা খনি, ফরাসি ক্যামেরুনে টিন খনি, ফরাসি কঙ্গোতে দস্তা ও সীসা খনি, এমন প্রাপ্তি চলেছে, চলছে।

দেখা যাবে লোহা, বক্সাইট, হীরা, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফেট, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, ইউরেনিয়াম, সেসানা, মোনোজাইট, জিরকন, ক্রোমিয়াম, দস্তা, সীসা, তেল ও গড়্যাস আহরণ আফ্রিকার নানা দেশে বেড়েছে অকল্পনীয় হারে। সাহরা মরুভূমিতে লোহা, তেল ও গ্যাস রয়েছে। সেখানে রয়েছে মুনাফার নজর।

আফ্রিকায় তেল ও গ্যাসের সন্ধান বকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে থাকে অনেক আগে থেকেই। লগ্নি আর শিল্প স্বার্থরক্ষার মধ্যে শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। সেখানে অনেক আগেই জড়িয়ে পড়ে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল, মবিল সকোনি, গালফ অয়েল, কন্টিনেন্টাল অয়েল, ডাচ শেল, টেক্সাকো, হ্যানোবার ব্যাংক, টেনেসি করপোরেশন, টেনেসি ওভারসজি করপোরেশন। আজ ব্যবসায়িক লেনদেন ও কলাকৌশল এ সব কোম্পানির গঠন, নাম, ইত্যাদিতে পরিবর্তন ঘটেছে, এসেছে নতুন নাম।

তবে তেল ও গ্যাস দখলের পতিযোগিতা রয়ে গেছে। রয়েছে আগ্রাসন, যুদ্ধ, দখল। সেই সঙ্গে আছে অর্থনৈতিক ছলাকলা, যুক্তরাষ্ট্রের এককালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস বলেছিলেন: একটি বিদেশী জাতিকে জয় করার দুটো পথ আছে। একটি হচ্ছে অস্ত্রবলে দেশটির জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, অপরটি হচ্ছে আর্থিক পন্থায় দেশটির অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম।

আজও এ খেলা বা যুদ্ধ চলছে। তাই আফ্রিকার নানা দেশে এর চিহৃ বা তাণ্ডব দেখা যায়। আফ্রিকার যে দেশগুলোতে সংঘাত, সহিংসতা, গৃহযুদ্ধ, দাঙ্গা, বিদেশী সামরিক হস্তক্ষেপ দেখা গেছে বা যাচ্ছে এবং দেখা যাবে, সে দেশগুলোতে রয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ, তেল, গ্যাস এবং এসব সম্পদ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কয়েকটি দেশের ঘটনাবলীর দিকে দৃষ্টি দিলে তা স্পষ্ট হবে। আগামীতে এমন কয়েকটি দেশের ঘটনার দিকে চোখ ফেরানো যাবে।।

(চলবে…)