Home » অর্থনীতি » নজরদারি – সিআইএ’র ডিজিটাল স্টাইল

নজরদারি – সিআইএ’র ডিজিটাল স্টাইল

ম্যাথিউ এম এইড

ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন অবলম্বনে মোহাম্মদ হাসান শরীফ

CIAকয়েক বছর আগে নেদারল্যান্ডসে এক গোয়েন্দা সম্মেলনে কফি পান বিরতির সময় এক স্ক্যান্ডেনেভিয়ান সন্ত্রাস প্রতিরোধ কর্মকর্তা একটি গল্প বললেন। তার দেশের একটি গোয়েন্দা দল একবার এক জঙ্গিনেতার ওপর নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছিল। হঠাৎ করেই তারা তাদের উচ্চশক্তির ক্যামেরার মাধ্যমে দেখতে পেলেন দুটি লোক চুপিসারে জঙ্গির অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকছে। জঙ্গি তখন মাগরিবের নামাজ পড়তে স্থানীয় মসজিদে গেছেন। লোক দুটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে কোথাও খোঁজ চলাল না বা মূল্যবান কিছুই নিল না। সাধারণ চোরেরা যেসব কাজ করে, এ দুজন তার কিছুই করল না। তবে তাদের একজন একটি ডিস্ক বের করে জঙ্গির ল্যাপটপ কম্পিউটারে কিছু প্রোগ্রাম ঢুকিয়ে দিল। আর অন্যজন তখন জানালার দিকে নজর রাখছিল। মাত্র দুই মিনিটে কাজ শেষ। তারপর তারা নিঃশব্দে চলে গেল। তাদের আসা কিংবা যাওয়ার কোনো প্রমাণই থাকল না।

ডাচরা অল্প সময়ের মধ্যেই জেনে গেল, ওই দুই লোক যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সদস্য। তারা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পরিচিতি ‘ব্ল্যাক ব্যাগ জব’ বা ‘সারেপটিশিয়াস এন্ট্রি’ নামের মিশনে অংশ নিয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও এ ধরনের মিশন পরিচালিত হতো। তখন টার্গেট লোকের বাড়ি গিয়ে গোপন কোনে হানা দেওয়া, কোড বই চুরি করা, সাইফার মেশিনের ছবি নেওয়া ইত্যাদি কাজ করা হতো। এখন দিন বদলে গেছে। এখন গোপনে টার্গেট লোকটির কম্পিউটারে কিছু প্রোগ্রাম ঢুকিয়ে দিতে পারলেই তার ইমেইল একাউন্টসহ ওই কম্পিউটারের সব তথ্য জানা সম্ভব।

এ ধরনের মিশন সবসময়ই চলছিল। তবে স্নায়ুযুদ্ধের পর মিশনের সংখ্যা কমে যাচ্ছিল। কিন্তু নাইন ইলেভেনের পর আবার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি ও সামরিক যোগাযোগ ও কম্পিউটারব্যবস্থায় হানা দিতে সিআইএ’র শত শত কর্মী নানা স্থানে হানা দিয়েছে। এমনকি বিশ্বের বড় বড় বিদেশি বহুজাতিক করপোরেশনগুলোও বাদ পড়েনি। স্পাইওয়্যার সফটওয়্যার অত্যন্ত গোপনে কম্পিউটার সার্ভারে স্থাপন করা হয়েছে; টেলিফোন লাইনগুলোতে মাইক্রোফোন লাগানো হয়েছে; ফাইবার অপটিক ক্যাবল, ডাটা সুইচিং সেন্টার ও টেলিফোন একচেঞ্জে আড়িপাতা সরঞ্জাম বসানো হয়েছে; কম্পিউটার ব্যাকআপ টেপ এবং ডিস্কগুলো চুরি করা হয়েছে কিংবা গোপনে কপি করা হয়েছে।

বিশেষ করে চীন, পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় সিআইএ’র কার্যক্রম ছিল সবচেয়ে বেশি জোরালো। কয়েক বছর আগে যুদ্ধপীড়িত দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে সিআইএ’র একটি দল বেশ কয়েকটি ফাইবারঅপটিক ক্যাবল ট্রাঙ্ক লাইনে সক্রিয় একটি সুইচিং সেন্টারে অত্যাধুনিক ট্যাব বসাতে সক্ষম হয়। এর মাধ্যমে সিআইএ এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) দেশটির জেনারেল স্টাফ এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতিটি স্পর্শকাতর অভ্যন্তরীণ কমিউনিকেশন ট্রাফিক পেয়ে যায়। অতি সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি ঘটনায় সিএইএ অফিসারেরা পশ্চিম ইউরোপের একটি বাড়িতে গোপনে প্রবেশ করে এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত কম্পিউটারে বিশেষ সফটওয়্যার স্থাপন করে যায়। তাদের সন্দেহ ছিল, ওই লোকটি সিরিয়ার আননুসরা ফ্রন্ট নামের জঙ্গি সংগঠনের রিক্রুটিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। ওই অভিযানের মাধ্যমে সিআইএ লোকটির সব ইমেইল এবং স্কাইপের মাধ্যমে কম্পিউটারে সে যেসব কথা বলেছে, তার সবকিছুই জেনে ফেলে।

মজার ব্যাপার হলো, সিআইএ ও এনএসএ একই দেশের দুটি নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংস্থা হলেও তাদের মধ্যে অনেক সময়ই সম্পর্কটা মধুর ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে তারা একে অন্যকে শত্র“পর্যন্ত জ্ঞান করত। একবার এক সিআইএ এজেন্ট জনৈক লেখককে জানিয়েছিলেন, তার সংস্থা ও এনএসএ’র মধ্যে শত্র“তা সবচেয়ে ভয়াবহ।

সংস্থা দুটির মধ্যে বিরূপতা শুরু হয় শীর্ষ পর্যায় থেকে। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত সিআইএ’র পরিচালক পদে কর্মরত অ্যালেন ডব্লিউ ডুলস এনএসএ পরিচালক জেনারেল রালফ ক্যানকে এত অপছন্দ করতেন যে তিনি পরিকল্পিতভাবে তাদের অনেক কার্যক্রম এনএসএকে জানাতেন না। এমনকি ১৯৫০এর দশকের বার্লিন টানেল ক্যাবল ট্যাপিং সম্পর্কেও তিনি তাদের কিছুই জানতে দেননি। আর ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সিআইএ’র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী রিচার্ড এম হেমস জানিয়েছিলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সমাজে তার তিন দশকের দায়িত্ব পালনকালে এনএসএ’র চেয়ে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সাথে তার সম্পর্ক অনেক বেশি উষ্ণ ও আন্তরিক ছিল।

তবে ৯/১১এর পর দুই সংস্থার মধ্যকার বৈরিতার অবসান ঘটে সম্ভবত চিরকালের জন্য। তারা এখন পরস্পরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বি বা প্রতিযোগী না হয়ে বরং সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।

বর্তমানে সিআইএ’র ক্যাডারদের, যারা টেকনিক্যাল অপারেশনস অফিসার হিসেবে পরিচিত, বিদেশি কমিউনিকেশন ও কম্পিউটার সিস্টেমে অনুপ্রবেশের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সংগৃহীত তথ্য দিয়ে প্রদান করা হয় এনএসএকে। সিআইএ বিদেশের বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়, প্রধান প্রধান সামরিক কমান্ড হেডকোয়ার্টার, বড় বড় বহুজাতিক করপোরেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক এনজিওতে কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ এবং কম্পিউটার সিস্টেম অপারেটরদের নিয়োগ করার কার্যক্রম জোরদার করেছে।

/১১এর পর থেকে সিআইএ’র ন্যাশনাল ক্লানডেসটাইন সার্ভিস (এনসিএস) ‘ব্ল্যাক বক্স’ নামে পরিচিত আরেক ধরনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। এর মাধ্যমে তারা কম্পিউটার পাসওয়ার্ড চুরি, বাণিজ্যিকভাবে প্রাপ্ত কম্পিউটার সিকিউরিটি সফটওয়্যার সিস্টেম বাইপাস করা, সেলুলার টেলিফোন ক্লোন করার মতো কাজগুলো করতে পারে কোনো ধরনের আলামত না রেখেই। একটি সাদামাটা উদহারণ দেওয়া যাক। কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা প্রায়ই কোনো সিস্টেম ইন্সটলমেন্টের সময় ডিফল্ট একাউন্ট ও পাসওয়ার্ড মুছতে ভুলে যায়। তারা অনেক সময় কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সার্ভার বা ইমেইল একাউন্টে ভুলভাবে প্রটেকশন সেট করে। এই ভুলটাই ভালোভাবে ব্যবহার করে সিআইএ কর্মীরা।

বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে সিআইএ এখন বেশ সহজেই টেলিফোন মেটাডাটা রেকর্ড পেয়ে যায়। বিশেষ করে দূরবর্তী বা আন্তর্জাতিক টেলিফোন কলের রেকর্ড তারা স্থানীয় নিরাপত্তা সার্ভিস বা পুলিশের সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পেয়ে যায়।

আমেরিকার ইউরোপিয়ান মিত্রদের বিষয়টি অবশ্য ভিন্ন। এনএসএ এবং ব্রিটিশ সিগন্যালস ইন্টিলিজেন্স সার্ভিস জিসিএইচকিউ’র মধ্যকার সুসম্পর্ক সুবিদিত। তবে সিআইএ কিন্তু ব্রিটিশ নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য পেতে হিমশিম খায়। একই কথা খাটে জার্মানি, স্ক্যান্ডেনেভিয়া ও নেদারল্যান্ডসের বেলায়। তবে ফরাসি গোয়েন্দারা সিআইএ’র সাথে তাদের তথ্য বিনিময় করে থাকে।

সিআইএ বেশ ভালোভাবেই তাদের কাজ করে যাচ্ছিল। আমেরিকার সাধারণ মানুষ টেরও পায়নি আড়িপাতার জাল কত বিস্তৃত ছিল। আর সফলভাবে কাজ করতে পেরে সিআইএ স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু তাদের আরামের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন একটা মানুষ। তার নাম অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই লোকটির কাছে চারটি ল্যাপটপ রয়েছে। এগুলোতে সিআইএ’র বিভিন্ন অভিযানের তথ্য, তাদের টার্গেটদের পরিচিতি রয়েছে। স্নোডেন তিন সপ্তাহ ধরে মস্কোর বাইরে শেরেমেটাইয়েভো বিমানবন্দরের ট্রানজিট লাউঞ্জে অবস্থান করছেন। সিআইএ এবং এনএসএ উভয়েই জানে, স্নোডেন যদি তার হাতে থাকা সব তথ্য ফাঁস করে দেন, তবে মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তিতে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এমনকি তা মার্কিন সরকারের জন্যও মাথা হেট করার মতো কলঙ্ক বয়ে আনবে। কেউ যদি জানতে চায়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার কেন অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেন এবং তার ল্যাপটপ কম্পিউটারগুলো হাতে পেতে চায়, তার কারণ এটাই।।