Home » আন্তর্জাতিক » বিএসএফের গুলিতে নিহতদের পরিবারের দুরাবস্থার দিনরাত্রি

বিএসএফের গুলিতে নিহতদের পরিবারের দুরাবস্থার দিনরাত্রি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

Jhenidah Boarder pic ------02.02কোথাও নদী কোধাও সমতল জমি। মাঝে পিলার। এক পাশে লেখা আছে বাংলাদেশ। অপর পাশে লেখা ভারত। এ পিলার বিভক্ত করেছে দুটি দেশকে। খেয়াল না করলে বোঝা যায় না কোন জমিটি বাংলাদেশের। আর কোন জমিটি ভারতের। জিরো লাইন থেকে উভয় পাশের একশ’ ৫০ গজ করে নো ম্যানস ল্যান্ড। নোম্যানস ল্যান্ডের বাংলাদেশ পাশে জন বসতি আছে। আবার ভারতীয় অংশেও আছে জন বসতি। জিরো লাইন পেরিয়ে দেড়শ’ গজ অভ্যন্তরে ভারতের কাটা তারের বেড়া। কাটাতারের বেড়ার বাইরে বসবাসকারি ভারতীয়রা একই মাঠে বাংলাদেশিদের সাথে পাশাপাশি জমিতে হাল চাষ করে। মাঠে পাশাপাশি বসে বাংলাদেশিদের সাথে গল্প গুজবও করে। দু দেশের নাগরিক হলেও তাদের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব নেই। 

আবার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে বলা হয়ে থাকে। বিজিবি বিএসএফ’র মধ্যে বন্ধূত্বপূর্ণ পরিবেশে পতাকা বৈঠক মাঠ পর্যায়ে কোম্পানী কমান্ডার, ব্যাটালিয়ন বা সেক্টর পর্যায়ে হয়ে থাকে। বাহ্যিক আন্তরিকতার ঘাটতি দেখা যায় না। কিন্তু আমাদের আহত করে সীমান্ত হত্যা। অর্থাৎ বিএসএফ এর গুলিতে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা গুলো আমাদের বেদনাহত করে। প্রতিটি মানুষের মৃত্যু বেদসাদায়ক। আর অস্বাভাবিক মৃত্যু আরো বেদনাদায়ক। পশ্চিমের জেলা ঝিনাইদহ। এ জেলার মহেশপুর উপজেলায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে ভারতের সাখে সীমান্ত। সীমান্ত প্রহরায় বিজিবি’র ৮টি ক্যাম্প রয়েছে। এ উপজেলার সীমান্তে প্রায়শই বিএসএফ’র গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হয়। এ কারনে মহেশপুর মিডিয়ার খবর হয়। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বিগত ৪ বছরে এ উপজেলার সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর গুলিতে কমপক্ষে ১০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। আর গত বছর ৪ জন নিহত হয়েছে। বিএসএফ ধরে নিয়ে যায় আরো ৭ জনকে। যারা বিএসএফ এর গুলিতে মারা যায় তারা হত দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ।। পরিবারের একমাত্র অবলম্বল ছিলেন।

বিএসএফ এর গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু বয়ে এনেছে তার পরিবারে চরম দুর্দিন। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারি মানুষের অধিকাংশ দরিদ্র। কারণ সীমান্তে কৃষি ছাড়া অন্য কোন পেশা নেই মানুষের। তাদের নানা প্রয়োজনে সীমান্তে যেতে হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে মহেশপুর সীমান্তে বিএসএফ এর গুলিতে যারা মারা গেছে তাদের প্রায় সকলেই দরিদ্র শ্রেনীর ও যুবক বয়সের। তারা পরিবারের একমাত্র উপার্জ্জনক্ষম ব্যাক্তি ছিলেন।

মহেশপুর উপজেলার লড়াইঘাটা গ্রামের জামাল হোসেন ২০০৯ সালে নদীয়া জেলার ফতেপুর ক্যাম্পের বিএসএফ এর গুলিতে প্রাণ হারান। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি। তার স্ত্রী, ৩ ছেলে মেয়ে ও বৃদ্ধা মা আছেন। তাদের কষ্ঠের শেষ নেই। শীতের দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধা মা এক চিলতে উঠানে দাড়িয়ে আছেন। ছেলের কথা বলতে গিয়ে দু’ চোখের পানি ঝরতে লাগল্। বললেন এতিমদের নিয়ে বেঁচে আছি। তাদের দুঃখের শেষ নেই। ছেলের বিধবা বৌ হামিদা খাতুন ছেলে মেয়েদের মুখে এক মুঠো ভাত তুলে দিতে পরের জমিতে কামলা খাটে। তখনও বাড়ি ফেরেনি। বিকালে বাড়িতে ফিরবে বলে আয়েশা খাতুন জানান। বড় মেয়ে স্কুলে পড়াশুনা করে। তার পড়ার খরচ যোগানো কষ্ঠকর কর। জামাল হোসেনের মৃত্যুর পর পরিবারটি অভাবের সাগরে ভাসছে।

শ্রামকুড় গ্রামের শাহ জামালের ছোট্ট ছেলে নাহিদ বাড়ির উঠানে অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলছিল। কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে কাঁদো কাঁদো মুখে বলল তার বাবাকে গুলি মেরে ফেলে বিএসএফ। তখন সে ছোট্ট ছিল। বড় হয়ে দাদার কাছে এ কথা শুনেছে। মা অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছে। এখন দাদা কাছে থাকে। শাহ জামালের বৃদ্ধ বাবা আব্দুর রশিদ ঢালি জানান, এক দিন রাতে সীমান্তে গিয়েছিল শাহ জামাল। ফতেপুর ক্যাম্পের বিএসএফ এর গুলিতে মারা যায়। পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিল সে। যুবক ছেলের মৃত্যুর পর তার সংসারে দুর্দিন নেমে আসে। সামান্য জায়গা জমি আছে। তাতে সংসার চলে না। বৃদ্ধ রশিদ ঢালির ছেলের কথা মনে হলে চোখের পারি ঝরে। বৃদ্ধ জানান, না মেওে ধওে নিয়ে জেলে রাখলেও তো জীবনে বেঁচে থাকত। এক দিন তো বাড়ি ফিরত।

শ্যামকুড় মাঠপাড়া গ্রামের তোরাপ আলির ছেলে রবিউল গত বছরের অক্টোবর মাসে বিএসএফ গুলিতে মারা যান। স্ত্রী, ১ ছেলে, ১ মেয়ে ও বৃদ্ধা মা আছেন। তাদেরও সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি ছিল রবিউল। তার মৃত্যুর পর তারা দুখের সাগরে ভাসছে। স্ত্রী আইমন নেছা জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর খুবই কষ্ঠে আছেন। দুখের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তিনিও একজন হত দরিদ্র মানুষ ছিলেন। কামলা খেটে সংসার চালাতেন। বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তখনও দুপুরের রান্না হয়নি।

শ্যামকুড় গ্রামের উৎসাহী স্কুল ছাত্র সাইফুল ইসলামের মা জাহিদা খাতুন ছেলের কথা মনে পড়লে কেঁদে বুক ভাসান। ১২ বছর অগে দিনের বেলায় বিএসএফ এর গুলিতে মারা যায় সাইফুল। সে গ্রামের স্কুলের ১০ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। সীমান্তে গেলে সুটিপুর ক্যাম্পের বিএসএফ তাকে গুলি করে হত্যা করেছিল। বাবা রমজান এখনও ছেলে হারানো ব্যাথা ভুলতে পারেন নি। মনে পড়লে চোখের পানিতে বুক ভাসে। শুধু মহেশপুর উপজেলার সীমান্তে বিএসএফ এর গুলিতে নিহতদের পরিবারেই দুর্দিন নয়। অন্যান্য সীমান্তে নিহতদের পরিবান্তেও একই চিত্র বলে জানা যায়।

শুধু জামাল হোসেন, শাহ জামাল, রবিউল ইসলাম বা সাইফুলের পরিবার নয় বিএসএফ এর গুলিতে নিহত বাংলাদেশিদের প্রতিটি পরিবারেও একই দৃশ্য। খোজ নিয়ে জানা যায়, বিগত এক দশকে মহেশপুর উপজেলার শ্যামকুড়, লড়াইঘাটা, অনন্তপুর ও শ্যামকুড় মাঠপাড়া গ্রামে ১০ জন বিএসএফ এর গুলিতে নিহত হয়েছে। অন্য নিহতরা হচ্ছেন, আব্দুল কাদেরের ছেলে জামাল উদ্দিন ও আব্দুল মান্নান, আক্কাস আলি, জামাল উদ্দিন,শাহাবুল, রবীন ও আব্দুল জব্বার। সকলেই হত দরিদ্র মানুষ ছিলেন। তাদেও মৃত্যুতে পরিবার গুলো চরম দুর্দিনে আছে।

শ্যামকুড় গ্রামের জিন্নাত অলি জানান, ইছামতি নদীর ধারে বাংলাদেশ অংশে ঘাসকাটার সময় সকাল ১০টার দিকে পাখিউরা ক্যাম্পের বিএসএফ তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। আহত হয়ে নদীর পানিতে পড়ে যান। তারপর গ্রামের লোকেরা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে। চিৎিসা করে প্রাণে বেঁচে গেলেও পঙ্গু হয়ে গেছেন। মিন্টু নামে শ্যামকুড় গ্রামের এক যুবক বিএসএফ এর গুলিতে এক পা হারিয়ে পঙ্গু জীবন কাটাচ্ছেন।

গত বছর (২০১২) মহেশপুর উপজেলার সীমান্ত এলকায় বিএসএফ এর গুলিতে ৪ জান নিহত হয়। ৭ জনকে ধরে নিয়ে যায়।

বিজিরি’র এক কর্মকর্তা জানান, বিএসএফ এর সাথে বৈঠক কালে তাদেরকে বলা হয় কেউ ভুল করে সীমান্ত অতিক্রম করলে গুলি না করতে। আটক করে আইনে সোপর্দ করতে বলা হয়ে থাকে।

সীমান্ত হত্যা ভিন্ন চিত্র

গত ১১ ফেব্রয়ারির সকাল। ঠাকুরগাঁ জেলার হরিপুর উপজেলার চাপাশার সীমান্তের গোবিন্দপুর গ্রাম দিয়ে কয়েক জন ভারতীয় চোরাচলানী সার ও ফেনসিডিল নিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্ঠা করে। বিজিবি’র টহল দল তাদের চ্যালেঞ্জ করে। বিজিবি’র ভাষ্য মতে ভারতীয় চোলানীরা বিজিবি’র উপর চড়াও হয় এবং তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বিজিবি’ জোয়ানেরা গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়। এতে দু’ জন ভারতীয় চোরাচালানী আহত হয়। ভারতের উত্তর দিননাজপুর জেলার মকরহাট মুসলিম পাড়ার আব্দুল ফরিদ নামে এক জন পরে মারা যায়। তার ভাইপো আহত হয়।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত খবরে জানা যায়, খবর পেয়ে ইটাহারের বিধান সভা সদস্য (বিধায়ক) অমল আচার্য পশ্চিমবঙ্গের মূখ্য মন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যাায়ের সাথে তাৎক্ষনিক কথা বলে নিহতের পরিবারকে দু’ লাখ টাকা অনুদান ঘোষনা করেন। এছাড়াও রাজ্যার জনস্বাস্থ্য ও গ্রন্থাগার মন্ত্রী আব্দুর করিম, জেলা পরিষদের সভাপতি মোক্তার আলি সরর্দার ও জেলা কংগ্রেস সভাপতি মোহিত সেন গুপ্ত এলাকায় ছুটে যান এবং সীমান্ত হত্যার শিকার আব্দুল ফরিদের পরিবারের পাশে দাড়ান। এলাকা বাসি দাবি জানান, নিহতের পরিবারের এক জনকে সরকারি চাকরি দিতে হবে।

কিন্তু আমাদের দেশে চিত্রটি ভিন্ন। প্রায়ই বিএসএফ গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়। মিডিয়াতে খবর প্রকাশিত হয়। বিজিবি’ ঘটনার জন্য বিএসএফ এর কাছে প্রতিবাদ জানায়। পতাকা বৈঠক বসে বিজিবি বিএসএফ। লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে লাশও ফেরত দেওয়া হয় না। এখানেই শেষ। নিহত পরিবারকে সাহার্য দেওয়া হয় না।কেউ সমবেদনা জানাতে নিহতের বাড়িতে যায় না।।