Home » রাজনীতি » যতো দোষ মেধাবী আর ভোটারদের

যতো দোষ মেধাবী আর ভোটারদের

আবীর হাসান

movement against quotaগণতন্ত্রকে কেউ হাতে ধরে কানাগলিতে নিয়ে ফেলবে এমনটা ভাবতে কষ্ট হয়। তবু ভাবতে হয় অনেকেই ভাবছেন। কারণ আর ছয় মাসও নেই নির্বাচনের কিন্তু ক্ষমতাসীন মহাজোট বা আওয়ামী লীগ খুব একটা গা করছে না নির্বাচন নিয়ে। কথার কথা হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন নির্বাচন হবে। তবে তাদের সরকারের অধীনে। আরও মৃদুস্বরে বলছেন তাঁরাই ক্ষমতায় যাবেন। জনগণ ম্যান্ডেট দেবে কিনা জোর গলায় তা বলার মতো অবস্থায় তারা নেই এটা সত্যি। তবে জোর গলায় যেটা তারা বলছেন সেটা হচ্ছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে কি কি ক্ষতি হবে তার ফিরিস্তি। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা বিএনপিকে ধমকও দিচ্ছেন নতুন নিয়মের নির্বাচনের আসার জন্য। অন্যদিকে বিএনপি নেতারাও বেশ কষ্ট করেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচচনের বিষয়টাকে জিইয়ে রেখেছেন। কারণ এতো এতো ইস্যু তাদের সামনে আসছে যাচ্ছে যে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে অনেক অনভিজ্ঞ নেতা খেই হারিয়ে ফেলেছেন। আন্দোলন করে নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করা তাদের পক্ষে অনেকটাই অসম্ভব। কারণ আন্দোলন সংগঠিত করার কর্মী বাহিনী বিশৃঙ্খল। সহযোগী সংগঠনগুলো নিষ্ক্রিয়। নির্বাচন হলে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে বটে। কিন্তু নির্বাচনটা করানোর ক্ষমতা বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট এখন পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি। কাজেই এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা প্রবীন নাগরিকরা নিনর্বাচন নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন। উদ্বিগ্ন জনসাধারণ শঙ্কিত, নির্বাচনের সময় পেরিয়ে গেলে কোনো আপদ না এসে জোটে! অবশ্য বর্তমানের বিপদ সামাল দিতেই তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। কারণ ক্ষমতাসীনরা যে ক্ষেপে গেছে জনগণের ওপর!

এতোদিন অর্থাৎ গত পৌনে পাঁচ বছর ধরে ক্ষমতাসীনদের প্রতিপক্ষের তালিকায় বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট নেতারা ছাড়াও ছিলেন ড. ইউনূস, বুদ্ধিজীবীরা, সাংবাদিকদের অনেকেই এবং আইনজীবীদের বিরাট একটা অংশ। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর দেখা গেল, ভোটারদের সরাসরি দোষারোপ করছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত। আগের চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা বলেছিলেন, ‘নিরপেকক্ষ নির্বাচন করাই সরকারের কৃতিত্ব জনগণ যাদের পছন্দ করেছে তাদের ভোট দিয়েছে।’ অথচ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর একেবারেই উল্টে গেছে মনোভাব তো বটেই, মুখের কথাও। ‘ভালো প্রার্থী’ বাদ দিয়ে নাকি জনগণ ভোট দিয়েছে দুর্নীতিবাজকে। দোষী জনগণ! বিস্ময় নয়, ক্ষোভ নিয়েই একাধিকবার একথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেং অন্য নেতারাও।

জনসাধারণ যে তাদের আর চাইছে না একথাটা বুঝেই এই ক্ষোভ ঝাড়া। হয়তো কথাটা ঘুরিয়ে বলতে গিয়ে উদ্ভট অগণতান্ত্রিক এবং শপথ ভাঙা এই মন্তব্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারের নেতাদের। এর আগে কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, নির্বাচনে জনসাধারণ চাইলে তারা থাকবেন না চাইলে থাকবেন না চলে যাবেন। সেই মানসিকতা যে এখন আর নেই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জনসাধারণের ওপর বিরাগের বশবর্তী হয়েছেন তারা। অথচ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের সময় তারা শপথ করেছিলেন– ‘দায়িত্ব পালনকালে কারো প্রতি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হবেন না।’

এই বিরাগ তো গাজীপুরের ভোটারদের প্রতিই নয় অন্য অনেকের প্রতিই যে আছে তা বোঝা যাচ্ছে। যে তরুণ সমাজের আর্থিক অবস্থা বদলে দেবেন বলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী, সেই প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল? পিএসসির কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে যে প্রধানমন্ত্রী বললেন, যারা রাস্তায় ভাংচুর করে স্থাপনা ধ্বংস করে তারা চাকরি পাবে না। ‘তারা কিসের মেধাবী?’ এমন প্রশ্নও তুলছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী কি বিরাগের বশবর্তী হননি এক্ষেত্রেও? আর ভাংচুরের কথাই যদি ধরি তাহলে বলতে হয় ভাংচুর করতে করতেই তারা এতদূর এসেছেন। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করার সময় কি ভাংচুর না করে রাস্তায় রাস্তায় গাড়িতে আগুন না দিয়ে তারা আন্দোলন করেছিলেন? এই কালচারটা এসেছে কোত্থেকে? ওই ছেলে মেয়েরা এই কাজের জন্য যদি অমেধাবী আখ্যা পায় তাহলে বলতেই হবে আখ্যাদাতারা রাজনীতিবিদ হওয়ারই যোগ্য নয়। সম্মানজনক কোনো সম্বোধনও তাদের জন্য নয়। মেধাবীদের যে অপছন্দ এখনকার ক্ষমতাসীনদের মেধা তারা অবশ্য প্রথম থেকেই বুঝিয়ে দিয়ে আসছেন। এবার সব খোলামেলা হয়ে গেল। বিরাগে ক্ষোভে টগবগ করতে করতে তিনি আরও বলেছেন, ‘মেধাবীরা গাড়ি পোড়ায় না উচ্ছৃঙ্খল হয় না এরা কি চাকরি পাওয়ার যোগ্য? তাই যদি হয় তাহলে গাড়ি পুড়িয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা কি ক্ষমতায় থাকার যোগ্য? তারা কি রাজনীতি করার অধিকারী? কোটা রেখে মেধাবীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার নিয়মটাকে সাপোর্ট করে উল্টো প্রধানমন্ত্রী বলেছন, ‘আন্দোলন করে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা ঠিক নয়? জনগণের সমঅধিকার নিশ্চিত করার বিধানটি এখনো সংবিধানে রয়েছে অথচ পিএসসিতে কোটা ক্রমাগত বাড়িয়ে বাড়িয়ে পঞ্চাশ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া কতোটা সাংবিধাানিক এ প্রশ্ন কি তোলা যায় না? মন্ত্রিসভায় পচা বামের কোটা বাড়িয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া রাষ্ট্রটি দেখেও কি টনক নড়ে না। অধিকন্তু সীমা লঙ্ঘনের ঘটনাও যে ঘটেছে একই সঙ্গে। কারণ পিএসসি নিয়ন্ত্রণের খায়েশটাও এর মাধ্যমে হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে আর কোনো সরকার পিএসসিকে খোলাখুলি নিয়ন্ত্রণ করতে এমন বক্তব্য দেয়নি। এই তরুণ মেধাবীদেরকে ফুটেজের ভয় দেখানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের অপকর্ম কটুক্তি আর কদর্য কথাবার্তায় ফুটেজও তো অনেক আছে তাই নয় কি?

মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধার কোটা এসব নিয়েও অনেক নসিহত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধের চল্লিশ বছর পর যে যুক্তি এবং প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা কোটা পিএসসিতে রাখা হয়েছে তা মোটেও সুস্থতার পরিচায়ক নয়। এক্ষেত্রে মহাকবি হোমারের একটি উক্তিই যথেষ্ট: ‘খুব কম সন্তানই বাবাদের মতো হয়, অধিকাংশই হয় জঘন্য, সামান্য কিছু হয় তাদের বাবাদের চেয়ে ভালো।’ এ উক্তিটি বহু ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। হতে পারে

যাই হোক এই সময়ে নির্বাচনের কয়েক মাস বাকি থাকতে দেখা যাচ্ছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং শপথ রক্ষার দিকে সাফল্য পায়নি ক্ষমতাসীনরা। এই ব্যর্থতার ক্ষোভ নেতায় ঝাড়ছেন জনগণের ওপর। জনগণও তাদের ক্ষোভ ঝাড়ছে সুবিধা মতো। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা। যাদেরকে বলা হয়েছিল চাকরি দেয়ার কথা, বলা হয়েছিল জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার কথা। সাধারণ মানুষের জন্য তো সুশাসন পুলিশতন্ত্রের নামান্তর। এখন হাতে আছে কেবল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। সেটা নিয়েও যতো গর্জন ছিল ততোটা কিন্তু বর্ষণ হচ্ছে না। সময়কে দন্ডায়মান করার অপপ্রয়াস চলছে কিন্তু তার নিস্ফলা পরিণতি অনিবার্য। এর মধ্যে প্রকাশ হয়ে গেছে ক্ষমতাসীনদের ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার টার্গেট। কিন্তু ১৩ থেকে ২১ যে ‘হনুজ’ ‘দুরস্ত’। উপরন্তু নির্বাচন নিয়েই যে ভোটারদের ওপর ক্ষুব্ধক্রুদ্ধ সরকার, সরকার প্রধান। তিনি নির্বাচন পর্যন্ত যাবেন কিভাবে? ক্যামেরাপ্রিয় বিরোধী দলই বা তাদের আরাধ্য নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করবে কিভাবে? উপায় নেই। সেক্ষেত্রে ভোটারদের নিষ্ক্রিয় রাখার ক্ষমতায় থাকার সর্বোত্তম পন্থা হতে পারে ক্ষমতাসীনদের। বিষয়টা বিপদ ডেকে আনতে পারে আর তাহলে গণতন্ত্র কানাগলিতে মুখ থুবড়ে পড়বে পিঠে (বুকে নয়) ছুরি খেয়ে! আপদের দুঃশাসনের অপেক্ষায় থাকা ছাড়া গত্যন্তর তো দেখা যাচ্ছে না বাংলাদেশের সামনে!