Home » অর্থনীতি » যে কেলেঙ্কারির বিচার নেই – শেয়ারবাজার

যে কেলেঙ্কারির বিচার নেই – শেয়ারবাজার

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

share marআর্থিক খাতে ব্যাপক সমালোচিত শেয়ারবাজার। টানা দরপতন আর নজিরবিহীন অস্থিরতায় পুরো সময়ই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিনিয়োগকারীরা অস্বস্তিতে ছিল। পুঁজি হারিয়েছে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। প্রতিবাদে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশকে অধিকাংশ সময়ই রাজপথে থাকতে দেখা গেছে। শেয়ারবাজারে বিপর্যয়ের কারণ চিহ্নিত করে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা দিলেও এ পর্যন্ত কারসাজির নায়কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। উল্টো কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। ২০০৯১০ সালে শেয়ারবাজারে ঘটে যাওয়া কারসাজিতে তদন্তের দুই বছর পার হয়ে গেলেও দোষীদের চিহ্নিত করে কোনো ধরনের শাস্তির আওতায় আনতে পারেনি সরকার। কারসাজির ঘটনায় কৃষি ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রায় ৯০ শতাংশ সুপারিশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০১১ সালের ৭ এপ্রিল তদন্ত কমিটি সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। দুই বছর পরও তদন্ত প্রতিবেদনের বেশিরভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিএসইসির ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

শেয়ারবাজারে কারসাজি থেমে নেই। কারসাজি চক্রের হোতারা পরিকল্পিতভাবে শেয়ারবাজারে উত্থানপতনের ঘটনা ঘটিয়ে ফায়দা হাসিল করছে। তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে। বরাদ্দ মূল্যের চেয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি দরে এসব কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন হচ্ছে। কারসাজি চক্রের হোতারা এসব কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের শেয়ারবাজারকে ফুলিয়েফাঁপিয়ে তোলা হয়। বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে বিভিন্ন জেলাউপজেলা পর্যায়ে ব্রোকারেজ হাউসের শাখা ছড়িয়ে দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি হবে না এমন আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। আয়োজন করা হয় রোড শো’র। ফলে সাধারণ মানুষ না বুঝেই শুধু মুনাফা লাভের আশায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে থাকে। শেয়ারবাজার নিয়ে দেশব্যাপী এক ধরনের উন্মাদনা তৈরি হয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের দৈনিক লেনদেন ২০০ কোটি টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। আর সূচকও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ৩ হাজার পয়েন্টের নিচে থাকা ডিএসই’র সাধারণ সূচক ৩ গুণ বেড়ে প্রায় ৯ হাজার পয়েন্টে উন্নীত হয়। অতিমূল্যায়িত শেয়ারবাজারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা উপায়ে শেয়ারবাজার থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে শুরু করে। শেয়ারের প্রচণ্ড চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ না থাকার কারণে এবং কারসাজি হোতাদের লুটপাটের পরিণাম হিসেবে শেয়ারবাজারে নেমে আসে মহাধস। এতে পুঁজি হারানো সাধারণ বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নেমে আসে। তাদের প্রতিবাদ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে পড়ে পুরো দেশ।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বাজারের ধস ঠেকাতে মার্জিন লোনের সুবিধা বৃদ্ধি, ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর আশ্বাস, ৫ হাজার কোটি টাকার বাংলাদেশ ফান্ড গঠনসহ আরও নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। গঠিত হয় পুঁজিবাজার তদন্ত কমিটি। এতেও বাজারে ধস থেমে থাকেনি। সূচকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমতে থাকে লেনদেনের পরিমাণ। সমালোচনা সত্ত্বেও কালো টাকার অবাধ বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েও শেয়ারবাজারে গতি ফেরানো যায়নি। বিক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণে বিশেষ স্কিম প্রণয়নসহ ২১ দফা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। ৬ মাসের মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হলেও গত দেড় বছরেও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ স্কিমের সুপারিশ অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা মার্জিন লোনের সুদ মওকুফের সুবিধা পাননি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সুদ মওকুফের সুবিধা দিলেও তাতে জুড়ে দেয়া হয়েছে নানা শর্ত। এসব শর্তের কারণে বিনিয়োগকারীরা সে সুবিধাও নিতে পারছেন না। ফলে প্রণোদনা প্যাকেজ বড় ধরনের প্রতারণা বলেই মনে করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ব্যাংকস (এবিবি) ৫ হাজার কোটি টাকার ফান্ড গঠন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএবি) শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও তার কোনো কিছুই হয়নি।

শেয়ারবাজার স্থিতিশীলে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ ঘোষণা আর প্রতিশ্রুতির মধ্যেই আটকে গেছে। এ পর্যন্ত মোটা দাগে কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বিশ্লেষকরা। গত আড়াই বছরে সরকার গঠিত বিশেষ স্কিম কমিটির পাঁচ দফা প্রতিশ্রুতি ছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিএসইসি, ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা বাজার স্থিতিশীলে তিন ধাপে সাত দফা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রয়েছে নিঃস্ব বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সরকারি ও বৃহৎ মূলধনী কোম্পানি আপলোড, ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা। সুপারিশ ও প্রতিশ্রুতিতে আশায় থাকা প্রায় ৩০ লাখ বিনিয়োগকারী সব হারিয়ে দিশাহারা। সর্বশেষ প্রণোদনা বাস্তবায়নে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে ৯০০ কোটি টাকা অর্থায়নের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর পরেও অস্থিতিশীল বাজারে কোনো আশা দেখছেন না নিঃস্ব ৩০ লাখ বিনিয়োগকারী। সিকিউরিটিজ হাউস মালিক, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, ডিএসইর কেউ জানেন না কবে স্থিতিশীল হবে শেয়ারবাজার। অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, ডিএসই একে অপরের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে নিঃস্ব বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, আগে কারসাজি করেছে এখন বাজার নিয়ে জুয়া খেলা হচ্ছে। এ জুয়া খেলায় এসইসি, আইসিবিও সহায়তা করছে। শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। শেয়ারবাজার স্থিতিশীল করতে দীর্ঘ মেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিএবি সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার কয়েক দফায় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেন। এফবিসিসিআই সভাপতি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ কয়েক দফায় এজাতীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে কোনোটিরই বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। এদিকে গত ২৯ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে ৯০০ কোটি টাকা অর্থায়নের ঘোষণা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আইসিবি ও বিএসইসির মাধ্যমে সরকারের বাজেট থেকে এ টাকা সরবরাহের ঘোষণা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে না, এমন আশঙ্কা রয়েছে বলে কয়েকটি অসমর্থিত সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, ২০১১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বর্তমান অর্থমন্ত্রী সরকারি ২৬ কোম্পানি শেয়ারবাজার আপলোড করতে না পারলে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল ছাড়া একটি কোম্পানিও আপলোড হয়নি। এ ছাড়া দেশের বৃহৎ মূলধনী প্রতিষ্ঠান বাজারে আনার নানা উদ্যোগের কথা জানায় এসইসি ও ডিএসই কর্তৃপক্ষ। আড়াই বছরে ২৩টি কোম্পানি আপলোড হলেও বড় আকারের মূলধনী প্রতিষ্ঠান একটিও নেই। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে মহাধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। তখনকার নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খায়রুল হোসেন ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে থাকা শেয়ারের সূচক বাড়ানোর ঘোষণা দেন। দায়িত্ব নেওয়ার চার মাসের মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ৬ হাজার পয়েন্ট ছাড়িয়ে যায়। এরপর বাজারকে ব্যাপক পতনের হাত থেকে তিনিও রক্ষা করতে পারেননি। বর্তমানে সূচকের অবস্থান ৪ হাজার পয়েন্টের নিচে। এ সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ২০১০ সালে শেয়ারবাজার থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা মুনাফা নিলেও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা দিতে রাজি নয়। বরং প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৫ হাজার কোটি টাকা কম সুদে বিশেষ ঋণ দাবি করে আসছে।বাজার পরিস্থিতি উন্নতি নিয়ে ডিএসই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকার, অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। সব দেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ সুবিধা দিয়ে শেয়ারবাজারে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, বিএসইসি বলছে বাজার স্থিতিশীল করার দায়িত্ব কমিশনের নয়। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাজারে সঠিক ভূমিকা নিলে বাজার স্থিতিশীল হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গর্ভনর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, শেয়ারবাজার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয় নয়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্প ও কৃষি খাতের ঋণ সরবরাহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ। জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দোষীদের শাস্তি কার্যকর ও বাজারকে ঢেলে সাজালে ক্ষতিগ্রস্তরা হারানো পুঁজি কিছুটা হলেও ফিরে পেতেন। কিন্তু বিএসইসি এমন কোনো কাজই করেনি।

সঙ্কট নির্ণয়ে ব্যর্থ এসইসি: বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারের সঙ্কটগুলো নির্ণয়ে এসইসি বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আর এ জন্য এসইসি গত ১৪ মাসেও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারেনি। তারা মনে করেন, ২০১০ সালে শেয়ারবাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে গিয়েছিল তারই পরিণতিতে বাজারে ধস নামতে শুরু করে। কিন্তু এসইসির প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল কৃত্রিমভাবে বাজার ধরে রাখার প্রচেষ্টা। আর এজন্য নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছে এসইসি। তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রত্যেক পরিচালকের ২ শতাংশ এবং সম্মিলিতভাবে পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে বাধ্যবাধকতা আরোপ শেয়ারের দরকে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার জন্য করা হয়েছিল। কিন্তু এ কৌশল অবলম্বন করেও বাজারের পতন ঠেকাতে পারেনি এসইসি। ক্রমাগত দরপতনের সুযোগে এবং এসইসির অনভিজ্ঞতার সুযোগে অনেকেই নানা কৌশলে নিজেদের সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজেও ব্যাংকগুলোকে অনেক সুবিধা দেয়া হয়।

আড়ালেই রয়ে গেছে কারসাজির হোতারা: ২০০৯২০১০ সালে শেয়ারবাজারে বিভিন্ন অনিয়ম ও কারসাজির বিষয়ে ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত কমিটি ১৭টি কোম্পানির তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি ‘অ্যাকশন কমিটি’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ এনে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এসব বিষয়ে কমিশন এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। ফলে কারসাজির হেতারা এখন পর্যন্ত রয়ে গেছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। উপরন্তু তদন্ত কমিটির সুপারিশে ব্যাপকভাবে আলোচিত সালমান এফ রহমান, রকিবুর রহমানের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হলেও রকিবুর রহমান আবারও ডিএসইর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এসইসির পরামর্শক কমিটির একজন সদস্য হিসেবে সালমান এফ রহমান বাজার উন্নয়নে বিভিন্ন সুপারিশও পেশ করেন। এ কারণেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি নিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন না। এজন্য বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীরা আসছেন না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেরিয়ে গেছে ১০ লাখ বিনিয়োগকারী: বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হওয়ায় পুনর্গঠিত এসইসি দায়িত্ব নেয়ার ১৪ মাসের মধ্যে বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে ১০ লাখ বিনিয়োগকারী। এসইসি দায়িত্ব নেয়ার সময় শেয়ারবাজারে বিও অ্যাকাউন্টধারী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪ লাখ। আর গতকাল বিও একাউন্টের সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ৮২ হাজার। এ হিসাবে এ সময়ে বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে ১০ লাখেরও বেশি বিনিয়োগকারী। এ বিষয়ে মিজানুর রহমান নামে একজন বিনিয়োগকারী বলেন, বর্তমান এসইসির ওপর বিনিয়োগকারীরা আর আস্থা রাখতে পারছেন না। সেজন্য তারা বাজার ছেড়ে চলে গেছেন।

১৯৯৬ সালের কেলেংকারি: দেশের বৃহৎ শেয়ার কেলেংকারির ঘটনায় কয়েক দফায় বিএসইসির পক্ষ থেকে দায়ের করা ১৫টি মামলার বিচারকাজ ঝুলে আছে ঘটনার পর থেকেই। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এসব মামলার অনেকই উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে। মামলাগুলো সচল করে বিচারের জন্য প্রস্তুত করার বিষয়ে সরকার আন্তরিক নয় বলেও জানালেন একজন আইনজীবী। বিএসইসি বা এসইসিও আইনজীবী নিয়োগ দিচ্ছে না। এসব মামলায় ১৫ কোম্পানি এবং ৩৬টি ব্রোকারেজ হাউস অভিযুক্ত। এছাড়া ২০১০ সালের ডিসেম্বর ও ২০১১ সালের জানুয়ারির শেয়ার কেলেংকারির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করে বিএসইসি, তাতে অভিযুক্ত ৫ বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধেও বিচারকাজ শুরু করতে পারছে না সরকার পক্ষ। গত বছরের ২১ আগস্ট ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে আরও দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে তারও কোন বিচারআচার নেই। এই বাস্তবতায় কেলেংকারির নায়কদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তের পরিণতি কি হবে, আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোর নিষ্পত্তি কবে হবে আর সেই সঙ্গে শেয়ারবাজার আবার কবে ঘুরে দাঁড়াবে তা অনুমান করা দুঃসাধ্য।

হাজার হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেলেংকারির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও তদন্ত থেমে যাওয়ায় এই অপরাধসহ শেয়ারবাজার থেকে কারসাজি করে হাতিয়ে নেয়া অর্থ দেশেবিদেশে পাচারকারী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীরা এখন স্বস্তিতেই আছেন। অথচ দুদক যখন প্রথম এই বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে তখন শেয়ার কেলেংকারির নায়কদের অনেকেই নিজেকে বাঁচাতে দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন। এরই মধ্যে সরকার ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধের তদন্ত ও বিচারের জন্য নতুন আইন তৈরি করে, যা ২০১২ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আইনে বলা হয়, এই আইন ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে। নতুন আইনটি হওয়ার পর ২০০৯ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (৮নং আইন) ও অধ্যাদেশ রহিত বা স্থগিত হল মর্মেও নতুন আইনে বলা হয়। সূত্র জানায়, নতুন আইনটি হওয়ার পর এবং এই আইনের কার্যকারিতা ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি শুরু হয়েছে বলায় দুদক নিজ থেকেই শেয়ার কেলেংকারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত থামিয়ে দেয়।।