Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ষাট দশকের এ দেশের বাংলা চলচ্চিত্র (পর্ব – ৩)

ষাট দশকের এ দেশের বাংলা চলচ্চিত্র (পর্ব – ৩)

ফ্লোরা সরকার

movie-60sবাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের সঙ্গে মোটা দাগে বিদেশী চলচ্চিত্রের মূল পার্থক্য গানের ব্যবহারের প্রতুলতা এবং অপ্রতুলতায়। সাধারণত বাইরের চলচ্চিত্র বিশেষত হলিউড সহ অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্রে গানের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। অপেরা ধর্মী চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা, কেননা সেসব চলচ্চিত্র নির্মানই হয় সঙ্গীতপ্রধান করে। বাংলাদেশে গান চলচ্চিত্রের প্রাণ স্বরূপ। গান ছাড়া এখানকার চলচ্চিত্রের কথা ভাবাই অসম্ভব। আমাদের চলচ্চিত্রের জন্মলগ্ন থেকে তাই গানের বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। শুধু তাই না, এমনও হয়েছে শুধু গানের কারণে দর্শক একই ছবি বার বার দেখতে গেছেন। যদিও গানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নাচের ব্যবহারও হয়ে থাকে। তবে গান দিয়েই এই নাচের যাত্রা শুরু। এখানে যেটা লক্ষণীয় তা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের চলচ্চিত্রে গানের যে ব্যবহার আমরা দেখি তা হতো প্রধাণত সময়কে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধান বোঝানোর উদ্দেশ্যে গানের ব্যবহার করা হতো। উদাহরণ স্বরূপ আমরা স্মরণ করতে পারি, ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবির সেই দৃশ্যটির কথা যেখানে কাশেম নৌকায় যাচ্ছে মালাকে নিয়ে আসার জন্যে। তারপর ‘রূপবান’ ছবির সেই দৃশ্যটির কথা যখন রূপবান পথের পথ অতিক্রম করছে রহিমকে নিয়ে বনবাসের উদ্দেশ্যে। অথবা ‘বেহুলা’ ছবির সেই দৃশ্যের চিত্রায়ন, যখন বেহুলা তার মৃত স্বামী লখিন্দারকে নিয়ে নদী যাত্রায় গমন করে। অর্থাৎ ছবির প্রয়োজনে গানের ব্যবহার হয়েছে। যা এখনকার ছবিতে আমরা পাইনা। বর্তমানে আমরা দেখি প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনে গানের যত্রতত্র ব্যবহার। ষাট দশকের ছবিগুলোতে যেহেতু ছবির প্রয়োজনে গানের ব্যবহার হতো তাই গানের প্রধান দুটি অঙ্গ সুর আর কথায় থাকতো আন্তরিকতা, নান্দনিকতা এবং গভীরতা।

১৯৬৫ সালে যখন রূপবান ছবিটি মুক্তি পায় সেই সময় থেকে লোকগাঁথা এবং রূপকাহিনী ভিত্তিক ছবির প্রবল স্রোত বয়ে যায় পুরো ষাট দশক ধরে। এসব ছবিতে যেসব গান আমরা পাই তা যেন আমাদের মাটি থেকে উঠে আসা সব গান। যেমন ‘ভানুমতি’ ছবিতে সাধারণ ধোপা আর ধোপানীর দৃশ্যে দুটো গানের কলি – “এবার তরে ও পিয়ারি আইনা দিমু তাঁতের শাড়ি, আয়নাটা আর রেশমি চুড়ি, আলতা দিমু পায়” এসবই একান্ত ভাবে এই দেশ, এই মাটির উপাদান। আবার ‘রূপবান’ ছবির কিছু গানের কলি যেন দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে যায়। যেমন ছবির শুরুতে যখন একাবক্ষর বাদশা নৌকায় বনবাসের উদ্দেশ্যে যান, তখন মাঝি গেয়ে ওঠে – “যারা ছিলো চতুর নাইয়া, তারাই গেলো বাইয়া রে নদী, তারাই গেলো বাইয়া আমি অধম রইলাম পইরা ভাঙ্গা তরী লইয়া” অথবা রহিম বাদশা তাজেলের উদ্দেশ্যে গেয়ে ওঠে – “— মন না জেনে প্রেমে মইজো না আগে না চিনিলে গো তারে, শেষে কাঁদলে দুঃখ যাবে না” বা রূপবানের কন্ঠে শুনি -“ভাতের ক্ষুধা লাগলে দাইমা গো, ও দাইমা পানিতে কি সারে গো”। অর্থাৎ আমাদের সেই সময়ের লোকগাঁথা বা রূপকথা ভিত্তিক ছবির জন্যে একদিকে আমরা যেমন মাটির গান, নিজেদের গান পরিস্ফুটনের সুযোগ পাচ্ছিলাম তেমনি ব্যক্ত করছিলাম গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা নিজেদের গল্পকাহিনী। এর পাশাপাশি ইতিহাস ভিত্তিক ছবিরও প্রকাশ ঘটেছিল ষাটের দশকে। প্রশ্ন উঠতে পারে কেনো সেই সময়ে এই ধরণের ছবির সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটছিলো। তার প্রধান একটি কারণ, ষাটের দশকে এই দেশের প্রায় সকল শ্রেণীর মানুষ নিজেদের ইতিহাস,শিল্প,সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের দিকে ক্রমশ তাদের দৃষ্টি কেন্দ্রিভূত করছিলেন। এদেশের শিক্ষিত শ্রেণীর উপর পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোর ছটা সেই সময়ে পড়তে শুরু করছিলো। বিশেষত শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ সেই শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে ক্রমশ নিজেদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের শিকড়ের অনুসন্ধানে অত্যন্ত উৎসুক হয়ে উঠছিলেন। অর্থাৎ দেশীয় ঐতিহ্যের নবরূপায়ন ঘটছিলো। তাছাড়া হিন্দী ও উর্দু ছবির প্রাদুর্ভাব রোধ করার লক্ষ্যেও, দেশের মাটি, দেশের মানুষ, সেই মানুষের জীবন প্রবাহের ধারা তুলে আনার আকুল আগ্রহ ও উৎসাহ এসব ছবি নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। যে কারণে এক দিকে যেমন এসব ছবি আমাদের পূর্ব ইতিহাস আর ঐতিহ্য অবগত করতে সাহায্য করেছিল অন্যদিকে নিজেদের জীবন কাহিনী বলে প্রায় প্রতিটি ছবিই ব্যবসা সফল হয়েছিল। এবার সেসব ছবিগুলোর দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।

এ দেশের অন্যতম প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সালাউদ্দিন পরিচালিত ‘রূপবান’ ছবিটির টাইটেল শুরু হয় যাত্রার আবহসঙ্গীতের মাধ্যমে। ফলে ছবির শুরুতেই পরিচালক লোকগাঁথার একটি আবহ নির্মাণ করে ফেলেন। রূপবান ছবিটি শুধু লোকগাঁথাই নয় বরং ছবিটিকে বলা যায় অপেরা ধর্মী চলচ্চিত্র। সারা ছবি জুড়ে প্রায় ২৬ টির মতো গান রয়েছে। গানের মধ্যে দিয়েই কাহিনী এগিয়ে যায়। এদেশের অন্যতম স্বনামধন্য অভিনেত্রী সুজাতার প্রথম ছবি হলেও তার অসাধারণ অভিনয় গুণে তিনি যেন যথার্থ রূপবানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। রূপবানের জনপ্রিয়তা এতোটাই সাফল্য লাভ করে যে পরের বছর ১৯৬৬ সালে ছবিটির উর্দু সংস্করণে আবার মুক্তি লাভ ঘটে। শুধু তাই নয় ছবিটি সেই সময়ে হিরক জয়ন্তী (একশত সপ্তাহ) পালন করেছিল এবং কিছু কিছু হলে একটানা প্রায় ছয় মাসেরও অধিক সময় ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছিল। রূপবানের নির্মাণ শৈলী বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ততটা নিপুণ মনে না হলেও কাহিনীর আকর্ষণে যেন গল্প এগিয়ে যায়। একটি বারো বছরের বালিকার সঙ্গে বারো দিনের শিশুর বিয়ের কাহিনীর যে চমৎকারিত্ব তাই যেন ছবিটিকে আকৃষ্ট করে। রূপবানের পর ১৯৬৬ সালে আমরা পাই এই দেশের বহুল প্রচলিত, বহুল শ্রুত লোকগাঁথা বেহুলালখিন্দরের কাহিনী ভিত্তিক ‘বেহুলা’ ছবি। ছবিটি নির্মাণ করেন আমাদের চলচ্চিত্রের আরেক দিকপাল পরিচালক জহির রায়হান। ছবির শুরু করা হয় চমৎকার কিছু কথা দিয়ে -“—নৈরাশ্যমথিত হৃদয়ে আশার একটি দীপ শিখাকেও যে অনির্বান রাখিয়া দুস্তর সংসার গাঙ্গুরে ভেলা ভাসাইয়া দিয়াছে তাহার জীবনে বাঁচিবার মতো বলের তো অভাব হয়না এবং পরিণামে বাঁচিয়া উঠিতে পারে সেই। বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী, না পদ্মপুরাণে দেবতা নাই, পদ্ম পুরাণ প্রকৃত মানুষেরই কাহিনী।” সাপের দেবতা মনসা। চাঁদ সওদাগর মনসার পুঁজো দেয়না বলে তার ছয় ছয়টি ছেলেকে মেরে ফেলে মনসা দেবী। শেষ যে ছেলেটি, লখিন্দর বেঁচে থাকে, যার সঙ্গে বেহুলার বিয়ে হয় তাকেও মেরে ফেলে তার বাসর রাতে। দেবতার সঙ্গে মানুষের যে লড়াই বা দ্বন্দ্ব তাই কাহিনীর মূল উপজিব্য। এবং সে দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত মানুষই জয়ী হয়। আর তাই মৃত স্বামীকে নিয়ে যখন বেহুলা প্রভু ইন্দ্রের সভায় যায় এবং ইন্দ্র যখন তাকে জানায় দেবতাদের পুঁজো করার কথা বেহুলা তাকে বলে “জোর করে কি ভক্তি আদায় করা যায়?” এই একটি সংলাপ যেন শত শত সংলাপকে ছাপিয়ে যায়। এদেশে যুগ যুগ ধরে জোর পূর্বক ভক্তি আদায়ের যে প্রথা প্রচলিত তার তীব্র প্রতিবাদ ফুটে উঠে এই একটি মাত্র সংলাপে। আজও সেই ভক্তি আদায়ের চেষ্টা অব্যহত আছে, বায়বীয় কোন দেবতার আকারে নয় মনুষ্যরূপী দেবতার আকারে। বেহুলা তাই হয়ে উঠে সর্বকালের চলচ্চিত্র।

১৯৬৮ সালে আমরা পাই রহিম নেওয়াজ পরিচালিত ‘সুয়োরানীদুয়োরানী’ ছবি। হরিণ শিকার করতে যেয়ে রাজা কীভাবে এক রাক্ষসী নারীর কবলে পড়েন এবং সেই রাক্ষুসীর কারণে কীভাবে তার রাজার প্রথম স্ত্রী এবং তার পুত্রকে দেশ ছাড়া হতে হয় তারই রূপকথা ভিত্তিক ছবি। সেই পুরানো রূপকথা, কিন্তু মিথ্যা বা মন্দের জয় কখনোই হয়না, ভালো বা সত্যের জয় অনিবার্য, তারই পরিচয় পাই ছবিতে। কিউ.এম.জামান (এদেশের প্রথম চিত্রগ্রাহক এবং নায়িকা সুলতানা জামানের স্বামী) ১৯৬৯ সালে নির্মাণ করেন ‘ভানুমতি’। এখানেও আমরা দেখি রাজার দুই স্ত্রীর কুটবুদ্ধি এবং প্রতিহিংসার শিকার হন রাজার তৃতীয় স্ত্রী এবং সেই স্ত্রীর তিনটি সন্তান। এখানেও দেখি মন্দের কখনোই জয় হয়না। মানুষের ভালো থাকার বিশ্বাস মানুষকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করে। এসব ছাড়াও আরও লোকগাঁথা এবং রূপকাহিনী ভিত্তিক ছবি নির্মিত হতে আমরা দেখি এই সময়ে, যেমন ১৯৬৬ সালে নির্মিত হয় আবার বনবাসে রূপবান, গুনাই বিবি,ভাওয়াল সন্যাসী, ১৯৬৭ তে কাঞ্চনমালা এবং ১৯৬৯ এ আলোমতি, গাজিকালু চম্পাবতী ও মলুয়া। সব থেকে কৌতুহলোদ্দীপক বিষয় হলো এসব ছবিতে ভূতপ্রেতরাক্ষসজীনপরিদের ঘিরে কাহিনী আবর্তিত হলেও, অবাস্তব মনে হয়না। তার একমাত্র কারণ, কাহিনীগুলো যেন মানুষের বাস্তব জীবনের প্রতিফলন। যে জীবন রাক্ষসপরীদেওদানবের রূপক বা প্রতীক দিয়ে সাজানো। আর তাই লোকগাঁথা আর রূপকথার কাহিনী টিকে থাকে যুগ যুগ ধরে। যেসব কাহিনী অবলম্বনে ষাট পরবর্তীতেও আরো ছবি নির্মিত হতে দেখি।

পরিচালক খান আতাউর রহমান যেন যথার্থ সময়ে, ১৯৬৭ সালে নির্মাণ করেন ইতিহাস ভিত্তিক ‘সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিটি। কেননা সেই সময়ে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন যেভাবে প্রবল বেগে শুরু হয়েছিল ঠিক সেই সময়ে ছবিটির নির্মাণ একটি সময়োচিত কাজ হিসেবে গন্য হবার মতো। যদিও তার পরের বছর ১৯৬৮ তে, পরিচালক ইবনে মিজান কতৃর্ক নির্মিত হয় আরেকটি ইতিহাস ভিত্তিক ছবি ‘শহীত তিতুমীর’, কিন্তু ‘সিরাজউদ্দৌলা’ যেন সেই সময়ের সব ছবিকে ছাপিয়ে যায়। ছবিটি প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এতোটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে একই বছরে এই ছবি উর্দু সংস্করণে মুক্তি পায়। শুধু কাহিনী বিন্যাস বা নির্মাণ শৈলীর জন্যে নয়, প্রধানত শক্তিমান অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের অভিনয় গুনে আমরা যেন একজন রক্তেমাংসে গড়া সিরাজউদ্দৌলাকে দেখতে পাই। ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার অভিনয়ের ধারাবাহিকতা আজও আমাদের বিস্মিত করে। ছবির শুরুতেই আমরা দেখতে পাই একটি খোলা জায়গায় একজন ইংরেজ কর্তৃক এক প্রজাকে চাবুক দিয়ে অত্যাচার করতে। ছদ্মবেশে সিরাজ সেটা অবলোকন করছিলেন। অসহায় লোকটি সিরাজের কাছে সাহায্যের জন্যে এলে সিরাজ ইংরেজ লোকটিকে সাবধান করলে লোকটি উল্টো সিরাজকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। সিরাজ তখন তাকে হত্যা করে। নির্যাতিত সেই প্রজা যখন বিস্মিত হয়ে সিরাজকে বলে নবাব সিরাজউদ্দৌলার দেশে কোন লোককে হত্যার অধিকার কারোর নেই। সিরাজ উত্তরে বলেন ‘ অত্যাচার যদি সহ্যের সীমা পার হয়ে যায় তাহলে হত্যার অধিকার আছে’। প্রথম দৃশ্যের প্রথম এই সংলাপের মধ্যে দিয়েই পরিচালক সিরাজউদ্দৌলার চরিত্র এবং সেই সঙ্গে ইংরেজের প্রতি তার ব্যবহার আমাদের বুঝিয়ে দেন যে ইংরেজকে প্রথম থেকেই সিরাজ সন্দেহ পোষণ করে এসেছিলেন। যে সন্দেহের বীজ তার দাদা নবাব আলীবর্দি খান রোপণ করে দিয়েছিলেন। আর তাই পরের দৃশ্যেই আমরা দেখতে পাই সিরাজ তার সিংহাসনের সামনে নতজানু হয়ে সেই বিখ্যাত সংলাপ বলেন, যে সংলাপ সেই সময়ে মানুষের মুখে মুখে প্রচলচিত ছিলো – “বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার মহান অধিপতি, তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব। তুমি বলেছিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কর্মচারীদের প্রশ্রয় দিওনা, তুমি বলেছিলে সুযোগ পেলেই তারা এদেশ কেড়ে নেবে, আমি তাদের প্রশ্রয় দেবো না ——”। এরপর একের পর এক ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমরা দেখি নবাবের ঘটনাবহুল জীবনের কাহিনী। প্রাসাদের অন্দরে এবং বাইরে দুই জায়গাতেই একদিকে ইংরেজ এবং অন্যদিকে বিশ্বাসঘাতক মিরজাফর, জগতশেঠেরা কীভাবে নবাবকে অস্থির আর অসহায় করে তুলছে। আলেয়া যখন নবাবের কাছে সন্দেহের উর্দ্ধে যায় তখন সিরাজের মুখে চমৎকার একটি সংলাপ শুনি যে সংলাপের সত্যতা বর্তমান সময়েও পরিলক্ষিত হয়, সংলাপটি হলো – “আমাদের এই দুর্ভাগা দেশে কে যে বন্ধু, কে যে শত্র“, তার সব খবর আমি জানিনা”। শওকত জং এর মৃত্যুতে সিরাজ এতোটাই অসহায় বোধ করেন যে বলে উঠেন “এই প্রাসাদটাকে মনে হচ্ছে কারাগার”। তবে ছবির শেষ অংশে যখন পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা হেরে যান সেই সময়ে সিরাজ এবং গোলাম হোসেনের দুটো সংলাপ যেন যুগ যুগান্তরের এক সত্য বাণী আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়

গোলাম হোসেন আমি আবার সৈন্য সংগ্রহ করবো, আবার যুদ্ধ করবো, এই জন্মে না পারি, জন্ম জন্মান্তরে এই কলঙ্ক আমরা দূর করবো।

সিরজউদ্দৌলা কিন্তু মীরজাফর, জগতশেঠ, রাজবল্লভের দল কি আর জন্ম গ্রহণ করবে না গোলাম হোসেন?

কী অসাধারণ দুটো সংলাপের মধ্যে দিয়ে পরিচালক খান আতাউর রহমান ১৭৪৭ সালে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধকে বর্তমান সময়ে নিয়ে আসেন। পাকিস্তান স্বাধীনের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরেও, আজও আমরা সেই ইংরেজের শুধু মুখাপেক্ষী নই আরও বৃহৎ আকারে ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের করালো গ্রাসে ডুবে আছি। এখন তাদের এই দেশে বসে শাসন করতে হয়না। নিজ ভূমে বসে পরবাসীদের শাসন আর শোষণ করেন। জগতশেঠ আর রাজবল্লভেরা কী জীবন্ত হয়ে বর্তমানেও বিরাজিত। সিরাজউদ্দৌলা ছবির মতো এতো যতœশীল সংলাপ আমরা খুব কম ছবিতে দেখি। এই ছবির মূল প্রাণকেন্দ্রই যেন তার সংলাপ। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে ছবির কাহিনী বেছে নেয়া,অভিনয়, সংলাপ, কস্টিউম, সেট ডিজাইন আর পরিচালনার দক্ষতায় ছবিটি তাই এই দেশের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি হয়ে থাকে। ষাট দশকে একদিকে যেমন এই ধরণের ছবি আমরা পাই ঠিক তেমনি ভাবে পাই সামাজিক ছবি। যেসব ছবির গল্প আমরা পরবর্তী পর্বে নিয়ে আসবো।।

2 টি মন্তব্য

  1. খুবই ভালো লাগলো, অর্থবহ বিশেষ আলোচনামুলক একটি লেখা, বর্তমান সময় এবং বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে শুদ্ধ করার সুগম পথের সূচনা যেন তোমার এই লেখনীর চিন্তা ভাবনা থেকে খুঁজে পাওয়া যায়। অসংখ্য শুভ কামনা তোমার জন্য।

  2. “ভাতের ক্ষুধা লাগলে দাইমা গো, ও দাইমা পানিতে কি সারে গো”।
    “জোর করে কি ভক্তি আদায় করা যায়?”
    ১৯৬৮ তে, পরিচালক ইবনে মিজান কতৃর্ক নির্মিত হয় আরেকটি ইতিহাস ভিত্তিক ছবি ‘শহীত তিতুমীর’, কিন্তু ‘সিরাজউদ্দৌলা’ যেন সেই সময়ের সব ছবিকে ছাপিয়ে যায়। সিরাজউদ্দৌলা ছবির মতো এতো যতœশীল সংলাপ আমরা খুব কম ছবিতে দেখি। এই ছবির মূল প্রাণকেন্দ্রই যেন তার সংলাপ।