Home » রাজনীতি » সফরের কূটনীতি – অসহায় একা বন্ধুহীন বাংলাদেশ

সফরের কূটনীতি – অসহায় একা বন্ধুহীন বাংলাদেশ

আমীর খসরু

foreign returnপররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির ঘন ঘন বিদেশ সফর নিয়ে নানা কথা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। আর মন্ত্রী তার আপন তাগিদ থেকে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ওই সব রিপোর্টের জবাব দিয়েছেন এক সংবাদ সম্মেলনে। মন্ত্রী চরম ক্ষোভ আর সংবাদপত্রের ভূমিকায় বীতশ্রদ্ধ হওয়ার কথাটিও যে লুকাতে পারেননি, তা তার সামগ্রিক অবয়ব এবং পুরো বক্তব্যেই স্পষ্ট। সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার সফরের ব্যাপারে প্রকাশিত সব রিপোর্টের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, তিনি ৬শ দিন নয় ৫১৭ দিন বিদেশ সফর করেছেন। তিনি এও দাবি করেছেন যে, ঘরে বসে থাকলে দেশের সাফল্য এমন পর্যায়ে পৌছাতো না। তিনি আবার আফসোসও করে বলেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো তার নিজের বিমান বলতে একটিও নেই। মন্ত্রীর বিদেশ সফর সম্পর্কে যা বলার তা অন্যান্য সংবাদপত্রগুলোই রিপোর্ট করেছে। এ কারণে বিদেশ সফরের বিষয় নিয়ে নতুন করে কিছু আলোচনার নেই।

তবে মন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য অভাবনীয় সাফল্য এনে দেয়ার কথা বলেছেন। অর্জনের কথা বলেছেন। মন্ত্রীর আপন দল আওয়ামী লীগের অনেক সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতিতে কতোটা সাফল্য অর্জিত হয়েছে, এমন প্রশ্ন অসংখ্যবার উত্থাপন করেছেন। সংবাদপত্রের রিপোর্টের ব্যাপারে চটজলদি তিনি যেভাবে জবাব দিয়েছেন, একজন নাগরিক হিসেবে ওই সব রিপোর্টের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছেন। প্রত্যাশা থাকলো, একই ভাষায়, একই ভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সংসদীয় সহকর্মীদের প্রশ্নের জবাবগুলো ঠিক সেভাবেই দেবেন।

মন্ত্রীর সফর নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রী সফলতার কথা বলেছেন, আর প্রশ্নটি সেখানেই। সংবাদ সম্মেলনে সফলতার প্রসঙ্গে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। বললে ভালো হতো। তাহলে তার ব্যাপারে যে রিপোর্টগুলো হয়েছে তা যে ভুল, অসাঢ় এবং উদ্দেশ্যমূলক বলে তিনি উল্লেখ করেছেন, তা তাৎক্ষণিক প্রমাণিত হয়ে যেতো। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা না করে, অঙ্ক কষা বা নামতা পড়ার কৌশল কেন নিলেন না তা বোধগম্য হলো না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সবার মতো সেই একই দর্শন ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এমনটাই বরাবর অনুসরণ করা হচ্ছে। বাস্তবতায় এবং কাজে যাইই থাকুক। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও ওই একই কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারের ২৩ দফায় () ভারত, নেপাল, ভূটান ও মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক এবং সহযোগিতা, () মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও কানাডাসহ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার এবং বিস্তৃত করা, রাশিয়াচীন এবং আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক () সৌদি আরব, মিশর, প্যালেস্টাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের মুসলিম দেশসমূহের সঙ্গে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্র জোরদার করার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং উজ্জ্বল করা হবে। এই ইশতেহারের কতোটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে আর কতোটুকু বাস্তবায়ন হয়নি তার হিসাব যে কেউই মেলাতে পারেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকে আছে দুটো উল্লেখযোগ্য বিষয়ের ওপরে। বলতে গেলে দাঁড়িয়েই আছে () জনশক্তি রফতানি ও প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ, () গার্মেন্টস শিল্পে বিদ্যমান বাজারগুলো ধরে রাখা এবং নিত্যনতুন বাজার খুজে বের করার উপরে। নিত্যনতুন বাজার সৃষ্টি জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জনশক্তির ক্ষেত্রে আলাদা মন্ত্রণালয় আছে, আছে গার্মেন্টস শিল্প দেখভালের জন্যও। কিন্তু এক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সব সময়ই অনুঘটকের ভূমিকাই পালন করে থাকে। শুধু অনুঘটক নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেই প্রধান ভূমিকা নিতে হয়। দুটো মন্ত্রণালয় অর্থাৎ জনশক্তি এবং বাণিজ্য তা জনশক্তি ও গার্মেন্টস শিল্পের ক্ষেত্রে মূলত ব্যবস্থাপনাগত বা ম্যানেজারিয়াল কাজটিই সম্পন্ন করে মাত্র।

কিন্তু জনশক্তি বাজারের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে এক ভয়ঙ্কর এবং ভীতিকর চিত্র দেখতে পাই। বর্তমান সরকারের সময় এসে বাংলাদেশের প্রধানতম জনশক্তি বাজার সৌদি আরবে বাংলাদেশী জনশক্তি রফতানি বন্ধ। এরপরের যে জনশক্তি রফতানির দেশগুলো যেমন কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের পুরোটা বাজারের সিংহ দরজা বাংলাদেশের জন্য বন্ধ। এর জন্য যে কূটনৈতিক দৌড়ঝাপ, দূতিয়ালি প্রয়োজন ছিল, বাস্তবে তা নেই। প্রধানমন্ত্রীর সফরেও এই বন্ধ দরজা খোলেনি। মাঝে মধ্যে আকামা নবায়নের কিছু গতানুগতিক ঘোষণা ছাড়া সৌদি আরবের দিক থেকে আমরা কোনো সাড়াশব্দ পাই না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েকদফা সেখানে গেলেও কোনো লাভ হয়নি। কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রেও আমরা একই পরিস্থিতি এবং ঘটনাবলী দেখছি।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পরে মালয়েশিয়া তাদের বাজার উন্মুক্ত করেছে বলে যে ঘোষণা দিয়েছিল, তাতে উল্লাসিত হয়েছিল একদিকে সরকার অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ বেকার মানুষ। কিন্তু নতুন যে পদ্ধতি জিটুজি অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ে জনশক্তি নেয়ার যে ব্যবস্থা হয়েছে, তাতে এখন পর্যন্ত শ’দুয়েকের বেশি বাংলাদেশি গেছেন কিনা সন্দেহ। সরকারি পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, তারা মানের দিকে নজর দিচ্ছেন, সংখ্যার দিকে নয়। এর কি ফলাফল তা দিব্য সৃষ্টিতে দেখতে হয় না, খোলা চোখেই দৃশ্যমাণ। সাধারণত বাংলাদেশ থেকে আগে বছরে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ লাখ জনশক্তি বৈধভাবেই বিদেশ গেছেন, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত। যে অবস্থায় তাতে এই সংখ্যা অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সংখ্যা আরো কমতে থাকবে। এর প্রভাব ঠিক এখনই যে রেমিট্যান্স বা প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের পরিমাণের উপরে পড়বে তা নয়, কিছুদিনের মধ্যে এই অর্থের পরিমাণ কমতে থাকবে, তা নিশ্চিত।

যে সব বাজার বন্ধ হয়ে আছে তার বন্ধ দুয়ার খোলার চেষ্টার বদলে, সরকার আফ্রিকায় আবাদযোগ্য কৃষি জমি খোজার প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল। কিন্তু অচিরেই এই প্রজেক্ট যে একটি অকার্যকর ও ব্যর্থ উদ্যোগে পরিণত হবে তা অনিবার্য ছিল। এই প্রকল্প গ্রহণে কিছু ব্যক্তির সফর হয়েছে, লাভালাভ হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের কোনোই লাভ হয়নি।

গার্মেন্টস শিল্পের ক্ষেত্রেও ওই একই অবস্থা। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে চাপ দেয়া হচ্ছিল, দেশিবিদেশি বিভিন্ন পক্ষ থেকে। এক পর্যায়ে রানা প্লাজা, তাজরিন ফ্যাশন্সসহ বিভিন্ন ধরনের মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণে ওই বিষয়গুলো পৌছে গেছে স্ব স্ব দেশের সরকারগুলোর উচ্চপর্যায় পর্যন্ত। তাদের পক্ষ থেকেও নানা ধরনের চাপ দেয়া এবং শর্ত দেয়া হচ্ছিল, বলা হচ্ছিল নানা সাবধান বাণী। কিন্তু ওই সব চাপ, সাবধান বাণী উপেক্ষা করার কারণে গার্মেন্টসসহ পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতি, এমনকি সামগ্রিক ব্যবস্থার উপরে এখন বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিপর্যয়টি নেমে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জিএসপি সুবিধা স্থগিতের কারণে। খোদ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে এই স্থগিতাদেশ দেন।

জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার কারণে যতোটা না আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তার চাইতেও হাজার গুণে ক্ষতি হয়েছে দেশটির তলানিতে যতোটুকু ভাবমূর্তি ছিল তার। কিন্তু জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দফতর আনুষ্ঠানিকভাবে যে প্রতিক্রিয়া জানায়, এক কথায় তা অবিশ্বাস্য। ওই প্রতিক্রিয়ায় জিএসপি সুবিধা স্থগিতের জন্য একটি মহলকে দায়ী করা হয়। কিন্তু আপন ঘর মেরামতের আগে, নিজকে সংশোধনের বদলে, এই দোষারোপ যে কাজে আসে না বা আসবেও না তা আবারও প্রমাণিত হলো। কিন্তু এখনো দায়ী করার সংস্কৃতি থেকে সরকার বের হতে পারেনি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন খুবই স্বল্প সময় নির্ধারণ করে অতিঅবশ্য পালনীয় কর্মপরিকল্পনা বেধে দিয়েছে। ওদিকে বাংলাদেশের বিশাল বাজার ইউরোপের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জেনেভায় রীতিমতো বৈঠক করে স্বল্পসময়ের মধ্যে কি করে পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে হবে, তার জন্য মাত্র কয়েকমাসের সময়সীমা বেধে দিয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ সরকার শ্রম আইন সংশোধন করেছে তা আন্তর্জাতিক মানের নয় বলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও এই শ্রম আইন যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয় তা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে।

এতো গেল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি দিক। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল অর্থাৎ সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয় তা কি বাস্তবে দেখা যাচ্ছে? এক কথায় না। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে সরকারের একদেশমুখী পররাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন কারণে। চীনের সঙ্গে আস্থা অনাস্থার কোনো সম্পর্কই নেই। পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল। বাংলাদেশের দিক থেকে কয়েকদফা চেষ্টা করা হয়েছিল সম্পর্ক উষ্ণ করার, কোনো ফল হয়নি। নেপাল, ভুটানকে ট্রানজিট এনে দেয়া হবে বলে যে আশ্বস্ত করা হয়েছিল বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকাদিল্লি সফরকালে এ বিষয়ে যেসব কথাবার্তা হয়েছিল তা কি বাস্তবায়িত হয়েছে? ভারত বাদে সার্কভুক্ত কোন দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো?

গার্মেন্টেসের কথা বাদই দিলাম, মানবাধিকার পরিস্থিতি, . ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন কারণে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেমনতেমন ভাবে চলছে। ড. ইউনূস, গ্রামীণ ব্যাংক এবং ভূরাজনৈতিক কারণে সরকারের একদেশমুখী পররাষ্ট্রনীতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক ভালো নেই। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিকসহ বেশ কিছু কারণে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক বলতে গেলে প্রথমদিন থেকেই খারাপ হতে শুরু করে। কূটনৈতিক সম্পর্ক যে পর্যায়েই থাক রাশিয়া থেকে অস্ত্র ক্রয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্রয়ের চুক্তির কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের যতোটুকু প্রয়োজন, তারা ততোটুকুই সম্পর্ক রাখছে। বরং রাশিয়ার কাছ থেকে এসব ক্রয়ে অনেক দেশই বাংলাদেশের উপরে নাখোশ।

শুধু বিভিন্ন দেশই নয়, বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশের ললাটে একে দেয়া হয়েছে দুর্নীতির এক অমোচনীয় চিহৃ। বিশ্বব্যাংক এই দুর্নীতির অভিযোগেই পদ্মা সেতুতে তাদের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানি উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা)। এসব অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিষয়আশয় হলেও এখানেও কূটনীতির বিষয়টি বাদ যায় না।

তাহলে কূটনৈতিক সাফল্যের যে দাবি পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন, বাস্তবে তার পরিস্থিতি কি? পররাষ্ট্রমন্ত্রী আপনিই বলুন।

হ্যাঁ, সাফল্য আছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একদেশমুখী করার ক্ষেত্রে। ভারত এখন আমাদের একমাত্র বন্ধু দেশ। যদিও ভারত তার আকাঙ্খা, চাহিদা এবং প্রয়োজনগুলো মেটাচ্ছে মাত্র। কিন্তু তিস্তার পানিবন্টন সমস্যার সমাধান হয়নি, অদূর ভবিষ্যতে হবে তার কোনো আলামতও দেখা যাচ্ছে না। এতদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কথা বলা হতো তিস্তার ক্ষেত্রে কৌশল হিসেবেই। গেলো মাসে বাংলাদেশভারতের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, যাতে ভারতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উপস্থিত থাকার কর্মসূচিও চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি সফর বাতিল করলেন। ওই বৈঠকে তিস্তার পানিবন্টন ছিল অন্যতম আলোচ্য। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে ছিল। ভারত এখন তিস্তার উপরে একের পর এক বাধ দিচ্ছে, পানি সরিয়ে নিচ্ছে অন্যত্র। টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প এগিয়ে চলছে। আর অভিন্ন নদীগুলোর প্রশ্ন তো কোনো ধরনের কোনো আলোচনাই উঠে না।

সীমান্তে হত্যাকাণ্ড চলছেই। বিএসএফের হাতে ফেলানিসহ হাজারও ফেলানি নিহত হয়েছেন গত কয়েক বছরে। কিন্তু কোনো প্রতিবাদ নেই। ভারত এখন নতুন কৌশল নিয়েছে সীমান্ত হত্যার বিনিময়ে পাঁচ লাখ টাকা। জীবন এখন কতো শস্তা অর্থের বিনিময়ে হত্যার বৈধ অধিকার। অন্যান্য সীমান্ত সমস্যারও কোনো সমাধান হয়নি। সবে হয়ে যাওয়া উভয় দেশের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক কার্যকর হয়েছে কি?

বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি, নিষ্কন্টক হয়নি শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং বাংলাদেশী পণ্যে ভারতীয় বাধা। সব ধরনের বাধা তো রয়েই গেছে।

অথচ ভারতকে করিডোর, সমুদ্র বন্দর, নদী পথে নৌ চলাচল এবং পণ্য পরিবহন, আশুগঞ্জ, আখাউড়াসহ সরকার কি না দিয়েছে। সুন্দরবন বিনাশ প্রচেষ্টার আয়োজন রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে ওই দেশের স্বার্থেই। সদর দরজা কেন, ঘরের কোণের ছোট জানালার চিটকানি পর্যন্ত খুলে দেয়া হয়েছে।

কূটনীতিতে বিখ্যাত একটি উক্তি রয়েছে ডিপ্লোম্যাসি ইজ দ্য ফার্স্ট লাইন অফ ডিফেন্স। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কূটনীতিই হচ্ছে প্রধানতম সুরক্ষা এবং কৌশল। এই সুরক্ষা এবং কৌশল দেশটির জন্য, এর জনগণের জন্য, দেশটির ভবিষ্যতের লক্ষ্যে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্জনের জন্য।

দিন শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিশ্বে এখন একা, অসহায়, বন্ধুহীন। তবে সরকারের একট সান্ত্বনা, একটি মাত্র দেশ তো তাদের পক্ষে আছে।।