Home » প্রচ্ছদ কথা » ভারত থেকে খালি হাতে ফিরলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারত থেকে খালি হাতে ফিরলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে নিহত ফেলানির মতোই কাটাতারের বেড়ায় ঝুলে আছে আমাদের জাতীয় স্বার্থ, ন্যায্য অধিকার

আমীর খসরু

monmohanতিনদিনের ভারত সফরে গিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। উদ্দেশ্যে ছিল তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি এবং স্থল সীমান্ত বিষয়ে একটি সুরাহা করা। বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে একটা চমক দেখাবেন আসলে এটাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। মনের কথা তিনি চেপে রাখতে পারেননি। যখন দেখলেন ইতিবাচক সাড়া মিলছে না তখন আবদারের সুরেই বলে ফেললেন, ‘তিস্তার পানি বন্টন চুক্তিসহ এসব বিষয় না এগোলে আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে’। আগামী নির্বাচনে কি প্রভাব পড়বে অথবা আদৌ প্রভাব পড়বে না তা নিয়ে ভারতের কাছে ধর্না দেয়ার মধ্যদিয়ে দুটো বিষয় প্রমাণিত হয়। এক. সরকার কতোটা ভারত নির্ভর এবং দুই. উড়াল কূটনীতির আসল দশা। অবশ্য ভারতের কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা একজন বিজেপি নেতার উদ্ধৃতি দিয়েছে। ওই নেতা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন তো ভারতের উদ্বেগের বিষয় হতে পারে না।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিস্তার নদীর পানি বন্টন চুক্তি নিয়ে যাতে অতি শিগগিরই সমস্যার সমাধান হয়, সে লক্ষ্যে সাক্ষাত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশীদের সঙ্গে। অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে তিনি আর কার কার সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন তা প্রকাশিত হয়নি, জানাও যায়নি। ড. মনমোহন সাক্ষাতে বলেছেন, ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই পুরনো আশ্বাস। কিন্তু তিস্তার নদীর পানি বন্টন চুক্তি ব্যাপারে কোনো কথাই তিনি বলেননি। সালমান খুরশীদ জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের জাতীয় স্বার্থের কথা।

স্থল সীমান্ত চিহ্নিতকরণ চুক্তির বিলটি ভারতীয় পার্লামেন্টে উঠেছে। উঠিয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিজেপি এবং অন্য আরেকটি দল আসাম গণপরিষদ এতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। এই বিল পাস হতে গেলে দুইতৃতীয়াংশের সমর্থনের প্রয়োজন হয়। বর্তমান কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের তা নেই। এ কারণে ডা. দীপু মনি এবার ধর্না দিলেন বিজেপির কাছে। সাক্ষাত করলেন বিজেপি নেতা এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলীয় নেতা অরুন জেটলির সঙ্গে। কিন্তু কোনোই লাভ হলো না। কাজেই ‘শূণ্য হাতে ফিরে এলাম একা।’ এরপরে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার আহমেদ তারেক করিম সাক্ষাত করলেন বিজেপির কট্টরপন্থী নেতা, সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত এবং বিজেপির আগামী প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে। এ বিষয়টি নিঃসন্দেহে কৌতূহলের পাশাপাশি বিতর্কেরও সৃষ্টি করেছে।

ক্ষমতাসীন সরকার এবং এরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফরের দৌড়ে এবং এক দেশপ্রেমী কূটনীতিতে এগিয়ে থাকলেও ভারতের মতো একটি দেশের কূটনীতি এবং কূটকৌশলের কাছে যে একেবারে দুধ্যপোষ্য শিশু, তিস্তার নদীর পানি বন্টন নিয়ে যে কিছুই হবে না তার সবশেষ স্পষ্ট বার্তা ভারত তো দিয়েই দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারকে গত মধ্য জুনে। ১৮ এবং ১৯ জুন ঢাকায় বাংলাদেশভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত কর্মসূচি ছিল। বৈঠকে মূল আলোচ্যই ছিল তিস্তা নদীর পানি বন্টন চুক্তির চূড়ান্তকরণ বিষয়ে। কিন্তু বৈঠকের মাত্র একদিন আগে দিল্লি ঢাকাকে জানিয়ে দিল, ভারতের মন্ত্রী আসবেন না এবং বৈঠকও হবে না। সফরে বিশাল অভিজ্ঞতা কিংবা কূটনীতির কলাকৌশল জানার প্রয়োজন নেই, যেকোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরই বোঝার কথা ভারতের মনের কথাটা কি এবং কি বার্তা তারা দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু সরকার হয় বুঝতে পেরেছে অথবা ভারত এমন একটা কাজ করতে পারবে তা তাদের বিশ্বাসই হয়নি।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ঢাকা সফর করেন, তখন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জোর গলায় বলা হচ্ছিল, তিস্তা চুক্তি হবেই। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা শেষ পর্যন্ত এলেন না। ব্যস, চুক্তি হলো না। দিল্লি সফল ভাবে অথবা বোঝাপড়ার ভিত্তিতে মমতার উপরে দায় চাপালো। তখন ক্ষমতাসীনদের বাঘাবাঘা লোকজন, যাদের হায়ারে খেলতে আনা হয়েছে বড় বড় উপদেশ দেয়ার জন্য, তারাসহ সবাই ছুটলেন মমতার দরবারে। কিন্তু তাদের এতোটুকু বোধবুদ্ধি তখন কাজ করেনি যে, মমতাকে এই ইস্যুতে দিল্লি ব্যবহার করছে। মমতা পর্ব শেষ হওয়ার পরে শেষতক দিল্লি সরাসরি না জানিয়ে দিল জেআরসি বৈঠকে অংশগ্রহণ না করার মধ্যদিয়ে। এখন আবার তারই পুনরাবৃত্তি হলো মাত্র। দিল্লির মনোভাব আগেই বুঝতে পারা উচিত ছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা ভারতের কর্মকাণ্ড মেনে নিতেই পারছেন না, তাদের কষ্ট হচ্ছে। তাদের ধারণা ছিল ‘কাকাবাবু’ সব ঠিক করে দিবেন। কিন্তু জাতীয় প্রশ্নে এবং বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়াবলিতে দলমত নির্বিশেষে সব ভারতীয় রাজনীতিক, প্রশাসন, গোয়েন্দা, থিঙ্ক ট্যাঙ্কসহ সবাই যে এক এবং অভিন্ন এই বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করেননি বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা, এমনকি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেও।

তিস্তা শুষ্ক মৌসুমে পানি শূণ্য থাকে। আবার অতি বৃষ্টি হলে বন্যায় ভাসিয়ে দেয় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বড় একটি অংশ। এবারেও আমাদের একই অভিজ্ঞতা।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হয় এমন কিছু তারা করবেন না। তিনি এ কথা আগেও বহুবার বলেছিলেন। এবারে যখন তিনি এমন কথা দীপু মনিকে বলছিলেন, ঠিক তখনই ভারতীয় বিদ্যুৎ দফতর তিস্তা নদীর উপরে কয়েকটি পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বাধ নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সিকিমে একাধিক বাধ সরকারি উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছে এবং নির্মাণাধীন রয়েছে। সিকিমে একাধিক বাধ সরকারি উদ্যোগে করা হচ্ছে এবং এর পাশাপাশি ১২শ মেগাওয়াটের তিস্তা৩ এবং ৫শ মেগাওয়াটের তিস্তা৬ পানি বিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি কোম্পানি। আগামী অল্পকালের মধ্যেই এই তিস্তার উপরে আরো ৮টি বাধ নির্মাণের পরিকল্পনা ভারত সরকারের রয়েছে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণ, ছিটমহল, অপদখলীয় জমিসহ সীমান্ত সমস্যা ভারতের সঙ্গে রয়েছে স্বাধীনতার পর থেকেই। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে স্থল সীমানা সম্পর্কিত এক চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে বেরুবাড়ি দিয়ে দেয় বাংলাদেশ এবং সে সময় বাংলাদেশের পার্লামেন্ট তা চটজলদি অনুমোদন করে। কিন্তু ভারতের দিক থেকে এর পর থেকে নানা টালবাহানা চলতে থাকে। একবার রাজনৈতিক বিরোধিতা রয়েছে বলে বলা হচ্ছে, আরেকবার আদালতে বিষয়টি বিবেচনাধীন। এসব বলে পুরো বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এখন পর্যন্ত। কিন্তু আসল সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। এবারে শেষ পর্যন্ত বিল ভারতীয় পার্লামেন্টে উঠলেও বিজেপি আর আসাম গণপরিষদ তাতে আপত্তি জানান। অর্থাৎ সেই ঝামেলা আর সঙ্কট বাধিয়েই রাখা হলো। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখা যায়, তিনবিঘা করিডোরে যাবার পথটুকু পেতে কতো ঝক্কি ঝামেলাই না বাংলাদেশকে পোহাতে হয়েছিল।

গঙ্গার পানি বন্টনসহ অভিন্ন নদীর পানি বন্টন সমস্যাসহ দ্বিপাক্ষিক সমস্যাবলী সত্যিকার অর্থে কি কোনো সমাধান বাংলাদেশ পেয়েছে? গঙ্গার পানি চুক্তি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওইটুকু পাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ছাড় দিয়ে হয়েছে কতোটা?

অমিংমাসিত প্রশ্নগুলোর সমাধান না করেই বাংলাদেশ আগ বাড়িয়ে ভারতকে করিডোর, সমুদ্র বন্দর ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ নৌপথে অবাধ চলাচল, আশুগঞ্জআখাউড়া ব্যবহার করতে দেয়া, রেলসড়ক পথসহ কোন সুযোগসুবিধা না এই সরকার ভারতকে দিয়েছে? দেয়ার চুক্তিনামায় কি বাংলাদেশ আবদ্ধ হয়নি? চাওয়া মাত্র সুযোগসুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকার ভারতের চেয়েও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সুন্দরবন ধ্বংস হবে জেনেও রামপালে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশ বিনা বাক্যব্যয়ে রাজি হয়ে গেছে।

সব কিছু উজাড় করে দেয়ার পরেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে ফিরতে হলো খালি হাতে, শূণ্য ফলাফল নিয়ে। অতীতের মতো আশ্বাস ছাড়া কিই বা মিলেছে? কিন্তু ভারত তার স্বার্থে সবটুকুই কড়ায়গন্ডায় নিয়ে নিয়েছে। অথচ নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে নিহত ফেলানির মতোই কাটাতারের বেড়ায় ঝুলে আছে আমাদের জাতীয় স্বার্থ, ন্যায্য অধিকার।।