Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

সাক্ষাৎকার – সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

সুন্দরবন ধ্বংস করার যে প্রকল্প নেয়া হয়েছে তা আত্মহনন ছাড়া আর কিছুই নয়

rejwana hasanসৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, খ্যাতিমান পরিবেশবাদী এবং ২০১২ সালে এশিয়ার নোবেল বলে খ্যাত ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প স্থাপনের বিষয়ে বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। আর সাম্প্রতিক জাহাজ ভাঙা শিল্প স্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই উদ্যোগগুলোকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

রিজওয়ানা হাসান: এ দুটো বিষয়ই আমাদের জন্য খুবই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। একে ইতিবাচকভাবে নেয়ার কোনো উপায় নেই। সরকার এই উভয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বপক্ষে কেবলমাত্র অর্থনীতির যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে। কিন্তু আমার ধারণা, অর্থনৈতিক হিসাবটা সরকার খুব ভালোভাবে কষেনি। কারণ এমন কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যা শেষ বিচারে গিয়ে আমাদের একমাত্র সুন্দরবনকে ধ্বংস করে দেবে। কাজেই সুন্দরবন ধ্বংসের বিষয়টিকে আমরা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে এবং এমন কর্মকাণ্ড হচ্ছে তা বলতে পারছি না। আসলে দুটো সিদ্ধান্তই সরকারের অবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে হয় এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন রক্ষায় সরকার যে কতোটা অবহেলা করছে এটা তারই বহিঃপ্রকাশ।

আমাদের বুধবার: কি ক্ষতি এর ফলে হতে পারে বলে আপনি মনে করছেন?

রিজওয়ানা হাসান: দুটো প্রকল্প এবং কর্মকাণ্ড থেকে দু’ধরণের ক্ষতিই হবে। একটির জবাব সহজে দিয়ে দেই। জাহাজ ভাঙা শিল্প ইতোমধ্যে সীতাকুণ্ডের কি নিদারুন ক্ষতি করেছে তা সবাই দেখছি। সেখানকার উপকূলীয় বন ধ্বংস হয়ে গেছে, উপকূলের পানি, বায়ু ও মাটি মারাত্মকভাবে দূষিত। উপকূলের মৎস্য ভাণ্ডার একেবারে শেষ হয়ে গেছে। এখানে শ্রমিকদের কথা উল্লেখই করলাম না। জাহাজ ভাঙা শিল্প এমনই এক শিল্প, যা উন্নত বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে এখন আর কেউ করছে না। তারা কিন্তু তাদের কিছু জাহাজ ভাঙে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং নিরাপদ পরিবেশে। আর ড্রাইডকে এই কাজটি করা হয়। অন্যদিকে আমাদের জাহাজ ভাঙা শিল্প একেবারেই উন্মুক্ত পরিবেশে চলছে। আর সুন্দরবনের পাশে এমন শিল্প যদি করা হয়, তা একেবারেই নদীর পাশে হবে। এখানে জাহাজের তেল, সীসা এবং অন্যান্য দূষিত দ্রব্যাদি সমস্ত কিছু পানিতে এবং মাটিতে মিশে ওখানকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন করবে। সুন্দরবনে যে ডলফিনসহ বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক ও অন্যান্য প্রাণী আছে, যে মৎস্য ভাণ্ডার তা একেবারে নষ্ট করে দেবে।

আর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সুন্দরবনের অতিসন্নিকটে হওয়ার কারণে নানা ক্ষতির কারণ হবে। এক. পশুর নদী থেকে পানি ওঠানো এবং ব্যবহারের কারণে সেখানে মিঠা এবং লবণাক্ত পানির ভারসাম্য নষ্ট হবে, দুই. কয়লা খনির ছাই গিয়ে সুন্দরবনের গাছগাছালি, পাখপাখালি এবং প্রাণী শ্বাসপ্রশ্বাসে তা গ্রহণ করবে। ফলে সেখানে সুন্দরবন ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাছাড়া কয়লা পরিবহনের জন্য সুন্দরবনের মধ্যদিয়ে যে লঞ্চ ও জাহাজ চলাচল করবে, তা ওখানকার নীরবতা ভঙ্গ করবে। ফলে পশুপাখি ও বন্য প্রাণীর অভয়ারন্য সুন্দরবন একেবারে শেষ হয়ে যাবে বলেই প্রথমে বন বিভাগ আপত্তি দিয়ে বলেছিল, এখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে তাতে সুন্দরবনের বন্য প্রাণী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

আমাদের বুধবার: এতো বিপজ্জনক বিষয় রয়েছে তা জেনেও সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে এগিয়ে গেল কেন?

রিজওয়ানা হাসান: আমার মনে হয় সরকার চতুর্দিকটা ভাবে না। শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক কোন লাভটি হবে এমন আশায় এসব কাজ করে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য রামপাল বাদেও কিন্তু বিকল্প স্থান দেখা হয়েছিল, যা কিছুটা দূরে। ওই দিকে হলে সুন্দরবন ক্ষতির সম্মুখীন হতো না। কিন্তু যাতায়াতের জন্য অপেক্ষাকৃত অন্ন্নুত বলে সরকার ওই স্থানটিকে বাদ দিয়ে দিল। অথচ যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করতে সরকারকে যে অর্থ বিনিয়োগ করতে হতো, তা করলে কিন্তু সুন্দরবন সম্পূর্ণভাবে রক্ষা পেয়ে যায়। সুন্দরবন রক্ষা করবো, নাকি যাতায়াতের জন্য কিছু অর্থ ব্যয় করবো এ দুটোর মধ্যে বিবেচনায় দেখা গেল সরকার সুন্দরবন ধ্বংস করাটাকেই মনে করলো তার আসল কাজ। আবার আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, ভারতীয় যে কোম্পানি এই কাজটি করবে, সে কোম্পানির পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার রেকর্ড যে কতোটা খারাপ সে সম্পর্কে আমাদের সরকার অবগত নয়। কাজেই মনে হচ্ছে, সবকিছু বিবেচনায় না নিয়ে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আমাদের বুধবার: আপনি বলছেন, ভারতীয় কোম্পানিটির অতীত রেকর্ড ভালো নয়। এ সম্পর্কে কিছু বলবেন

রিজওয়ানা হাসান: কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে ভারতের পরিবেশবাদীরা নানা আন্দোলন এবং মামলা মোকদ্দমা করে থাকে। সেখানে দেখা যায়, ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট বলছে, ওই কোম্পানি অর্থাৎ এনটিপিসি প্রকল্পের ছাইয়ের ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে অর্থাৎ এর ছাই ব্যবস্থাপনাগত দিকে তাদের রেকর্ড খুবই খারাপ। যেসব দামি, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং কলাকৌশল ব্যবহার করতে হয় এনটিপিসি তার কিছ্ইু করে না। এখানে আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা কোথা থেকে আসবে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা কোত্থেকে আসবে তা পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ রিপোর্টে নিশ্চিত করে উল্লেখ করা হয়নি বা বলাও হয়নি। কয়লা কোথা থেকে আসবে তা নিশ্চিত করার আগে, এর ব্যবস্থাপনাগত দিক কি হবে তাও নির্ধারণ করা যাবে না। ফলে এখানেও ত্রুটি রয়ে গেল।

আমাদের বুধবার: আপনারা কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছেন কিনা?

রিজওয়ানা হাসান: এ বিষয়ে স্থানীয় জনগণ অর্থাৎ যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে তারা আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। আইনগত পদক্ষেপের প্রাথমিক দিকে আদালত থেকে ইতিবাচক সমর্থন তারা পেলেও এই মুহূর্তে তা নড়বড়ে। কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংএর বাংলাদেশে সফরকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন জানালে আদালত তাতে সায় দেয়। দোষে পরিপূর্ণ পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণের ভিত্তিতে পরিবেশ অধিদফতর ছাড়পত্র দেয়ার যদি চেষ্টা করে তবে আমরা অবশ্যই সে ছাড়পত্রের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই করবো। এবং যদি সেই ছাড়পত্রে বর্তমান নির্ধারিত স্থানকে অপরিবর্তিত রেখে এটা হয়, তাহলেও আমরা কিন্তু ছাড়পত্রের বিরুদ্ধে আইনী লড়াইয়ে যাবো।

আমাদের বুধবার: সরকারের তাহলে কি করা উচিত?

রিজওয়ানা হাসান: সরকারের উচিত শুভ বুদ্ধির চর্চ্চা করা এবং এই দুটো উদ্যোগের বিরুদ্ধে যে জনমত আছে, বিশেষজ্ঞদের মতামত আছে, তাকে বিবেচনায় নিয়ে সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যর ব্যাপারে কেবল দেশী আইন নয়, দেশী বিশেষজ্ঞও নয় আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করে এই ধরণের আত্মহননকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। কারণ সুন্দরবন ধ্বংস করার যে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে তা আত্মহনন ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।