Home » আন্তর্জাতিক » আফ্রিকা দখলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র লড়াই

আফ্রিকা দখলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র লড়াই

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

US-Chinaবর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা যখন মুমূর্ষু, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আফ্রিকা সফরে বের হন। সপ্তাহব্যাপী সফর শুরু করেন সেনেগাল দিয়ে, শেষ হয় তানজানিয়ায়। আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং সেখানে বিনিয়োগ সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ছিল এই সফর। গত মে মাসে হোয়াইট হাউজ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বিষয়টি কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলা হয়েছিল।

তবে প্রশ্ন উঠেছিল, এই সফরই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট কি না বা ইতোমধ্যেই বেশ দেরি হয়ে গেছে কি না। কারণ ওবামার সফরের মাস দুয়েক আগে চীন প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং আফ্রিকা সফর করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র চায় না, চীন তার উল্লেখ করার মতো প্রতিদ্বন্দ্বি। তবে ওবামার সফরের প্রচ্ছন্ন লক্ষ্য যে চীন ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর নিবদ্ধ করে রাখার সুযোগে আফ্রিকায় চীনা বিনিয়োগ বেশ বেড়েছে। বর্তমানে তারা অনেক খাতে সম্পৃক্ত রয়েছে এবং তা কেবল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমিত নয়। বেশ কয়েকটি বেসরকারি চীনা প্রতিষ্ঠান আফ্রিকায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হুয়াই নামের একটি শীর্ষ স্থানীয় কোম্পানি একাই আফ্রিকায় ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে চার হাজার লোকের কর্মসংস্থান করেছে। গত দশকের ব্যবসায়িক অঙ্কও আফ্রিকার সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের প্রমাণ দিচ্ছে। ২০০০ সালে দুই পক্ষের বাণিজ্য যেখানে ছিল মোটে ৯ বিলিয়ন ডলারের, সেখানে ২০১২ সালে দাঁড়ায় দুই শ’ বিলিয়ন ডলারের। পরিমাণটা গত বছরের মার্কিন বাণিজ্যের (৯৫ বিলিয়ন ডলার) দ্বিগুণেরও বেশি।

আফ্রিকাও এতে উপকৃত হচ্ছে। তাদের সাহায্য আর সম্পদ অবকাঠামো দরকার। ফলে উদীয়মান পরাশক্তিটির আগ্রহকে স্বাগত জানানো খুবই স্বাভাবিক, বিশেষ করে বেইজিং যখন বিপুল অর্থ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ চিত্রেও আফ্রিকান দেশগুলোর অর্থনৈতিক সুবিধার কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির ১০টির মধ্যে পাঁচটিই আফ্রিকায়। দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া ও সিয়েরা লিয়ন এক্ষেত্রে নেতৃত্বে রয়েছে। এই অঞ্চলের উত্থানে চীনা প্রভাব অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্রেফ অর্থনৈতিক পরিভাষায় বলা যায়, মহাদেশটিতে প্রবেশের সময় চীন যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিল, তারা সেটা যথাযথভাবেই পূরণ করেছে।

তবে আফ্রিকানরা সবসময় মসৃণ পথেই চলে না। মাঝে মাঝে তারা বেশ বাঁকাও হয়। আফ্রিকার নবীনতম রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান থেকে প্রথম যে ব্যক্তিকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তিনি ছিলেন চীনা, নাম লিও ইয়িনচাই। চীনামালয়েশিয়ান তেল কোম্পানি পেট্রোডারের স্থানীয় প্রধান। তার বিরুদ্ধে ৮১৫ মিলিয়ন ডলারের তেল ‘চুরি’ করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। কঙ্গো কিভু অঞ্চলের দুটি ক্ষতিকর সামগ্রী ব্যবসায়ীকে বহিষ্কার করে। আলজেরিয়ান আদালত দুর্নীতির অভিযোগে দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে। গ্যাবন বৈষম্যপূর্ণ খনিজ চুক্তি বাতিল করেছে। কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার সংরক্ষণবাদীরা হাতির দাঁত ও গণ্ডারের শিং ব্যবসা থেকে বিরত থাকার জন্য চীনের প্রতি আহক্ষান জানিয়েছেন।

চীন কেবল মহাদেশটির বৃহত্তম অর্থনীতি দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গেই বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশিদারি করে থেমে থাকেনি, সেনেগাল, তানজানিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গেও বেশ বড় ধরণের ব্যবসা করছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত চীনা দৃষ্টি খনিজসম্পদসমৃদ্ধ আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুদান ও জাম্বিয়ায় সীমিত ছিল। এখন ইথিওপিয়া ও কঙ্গোতেও তা বিস্তৃত হয়েছে।

তবে এই ব্যবসাবাণিজ্য সবসময় সাবলীল গতিতে হয়নি বা হচ্ছে না। কোনো কোনো দেশের সঙ্গে চীনা সম্পর্ক আন্তর্জাতিক বিতর্কের সূচনা করেছে। বিশেষ করে সুদান ও জিম্বাবুয়েতে চীনা প্রতিশ্রুতি এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। চীনা প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক সফরের সময় আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মার্চে নাইজেরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ল্যামিডো স্যানুসি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত একটি মতামত প্রতিবেদনে অভিযোগ করেন যে, আফ্রিকা স্বেচ্ছায় নতুন ধরণের সাম্রাজ্যবাদের সামনে নিজের দরজা খুলে দিচ্ছে।

অধিকন্তু, আফ্রিকায় চীনা স¤পদ কূটনীতির নেপথ্যে রয়েছে নিজের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করা। আফ্রিকা থেকে চীন মূলত সংগ্রহ করছে খনিজ সম্পদ। আফ্রিকা থেকে চীনা আমদানির প্রায় ৮০ ভাগই হচ্ছে তেলসহ খনিজ সম্পদ। বাকিটা কিছু কাঠ, পাথর, কাচ ইত্যাদি। আর রফতানি করছে যানবাহন, যন্ত্রপাতি, বস্ত্র সামগ্রী, প্লাস্টিক ও রাবার, রাসায়নিক।

আর এর ফলেই আফ্রিকা মহাদেশের তেল সম্পদ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র কূটনীতিক সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো নাইজেরিয়া, সুদান ও দক্ষিণ আফ্রিকা। বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ২০১২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরকারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেছিলেন, ‘আফ্রিকায় বহিরাগতদের আগমন এবং নিজেদের জন্য সম্পদ লুটে নিয়ে যাওয়ার দিন অবসান হওয়া উচিত।’

এখানে রাখঢাক ছাড়াই চীনের কথা বলা হয়েছে। তবে ওবামার সফরে মার্কিনআফ্রিকা সম্পর্কে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। আগে আমেরিকানরা ব্যবসাবাণিজ্যের চেয়ে সাহায্য আর অনুদান দিতেই বেশি আগ্রহী ছিল। কিন্তু এবার ওবামার সঙ্গে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর সিইও, ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দও এসেছিলেন। এমনকি ইউএস এক্সপোর্টইমপোর্ট ব্যাংক, ইউএস ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি এবং ওভারসিস প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট কোঅপারেশনের প্রধানরাও ছিলেন।

ওবামার এই সফর যে অর্থনৈতিককেন্দ্রিক ছিল, সেটাও বোঝা গেছে সহজেই। তিনি আফ্রিকার ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন, তানজানিয়ার বিদ্যুৎ প্লান্ট পরিদর্শন করেছেন, আফ্রিকান সিইওদের সঙ্গে গোলটেবিলে অংশ নিয়েছেন। নতুন বিনিয়োগ তো টাটকা বাতাস নেওয়ার মতোই। বিনিয়োগ সবসময়ই আদরণীয়। তবে কোনো কোনো দেশ চীনের দিকেও ঝুঁকে আছে। আবার অনেক নেতার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস রয়েছে। ফলে হিসাবটি আর সহজ থাকছে না। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আফ্রিকান নেতারা কিভাবে তাদের কার্ডগুলো খেলেন সেটার উপর।

প্রতিযোগিতা কেবল চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমিত নয়। ব্রাজিল, রাশিয়া ও ভারত (ব্রিকস ক্লাবের সদস্যরাসহ), তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়াও এই পথ অনুসরণ করছে। ভারতের চুক্তির মূল্য চীন আফ্রিকান বাণিজ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশ, অনেকে মনে করছে এটা ৫০ ভাগে পৌঁছাবে। ফলে প্রতিযোগিতা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বহুমাত্রিক।।

(ওয়েবসাইট অবলম্বনে)