Home » আন্তর্জাতিক » আরও তিনশ ড্যাম নির্মাণের উদ্যোগ ভারতের

আরও তিনশ ড্যাম নির্মাণের উদ্যোগ ভারতের

মোহাম্মদ হাসান শরীফ, পপুলার মেকানিক্স ডট কম অবলম্বনে

DAMভাটি অঞ্চলের বাংলাদেশের উপরে কি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বরাবরের মতো। সে বিষয়টি তোয়াক্কা না করে ভারত এখন ড্যাম নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে। যতসংখ্যক ড্যাম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে সেটা কিংবদন্তি কাহিনীতে পরিণত হবে: আগামী দুই দশকে তারা ৩০০টি নতুন ড্যাম বানানোর কথা ভাবছে। সবগুলোই হবে হিমালয় পর্বতমালাকে কেন্দ্র করে সেখানেই উৎপত্তি এমন আন্তর্জাতিক নদীর উপরে। এত বিপুলসংখ্যক ড্যাম! ভাবতেই অনেকে শিউরে ওঠছেন!

ওয়াশিংটন ডিসির উইড্রো উইলসন সেন্টারের সাউথ অ্যান্ড সাউথইস্ট এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রোগ্রাম এসোসিয়েট মাইকেল কুগেলম্যান জানিয়েছেন, জ্বালানি সঙ্কট এমন একপর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, কর্মকর্তারা আর ড্যাম নির্মাণে বিরোধিতা কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবছেনই না। তারা কেবল জরুরিভিত্তিতে সমস্যাটির সমাধান কামনা করছেন।

ভারতের চাহিদা ঠিক কতটুকু তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। তবে কুলেগম্যানের মতে, ভারত সরকার হিমালয় অঞ্চলে প্রায় ২৯০টি ড্যাম নির্মাণ করতে চাচ্ছে। আর এর মাধ্যমে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশটির জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হবে। এক লাখ মেগাওয়াট বর্ধিত বিদ্যুৎ দেশটির জ্বালানি চাহিদার মাত্র প্রায় ছয় শতাংশ পূরণ করবে। কিন্তু তবুও এটা ভারতের বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।

ইন্টারন্যাশনাল রিভার্স ইন্ডিয়া প্রোগ্রামের সমন্বয়কালী সমির মেহতা মনে করেন, এতসংখ্যক ড্যাম নির্মাণ করলে তার প্রভাব কী হবে, তা জানার কোনো উপায় নেই। আবার এসব ড্যামের অনেকগুলোই হবে ৫০ ফুটের বেশি উঁচু। সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকাজুড়ে ৩০০ ড্যাম নির্মাণ মানে আনুমানিক প্রতি ২০ মাইলে একটি করে ড্যাম নির্মিত হবে। আর তা অর্থ হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে ঘন ড্যাম এলাকায় পরিণত হবে এই অঞ্চল। আর মেহতা বলছেন, প্রথম ৩০০ ড্যাম নির্মাণের পর আরো শত শত ড্যাম নির্মাণের কাজ চলতে পারে। কুলেগম্যান বলেন, সংখ্যাটা অনেক বেশি। এটাই চিন্তার বিষয়।

ভারত সরকার বলছে, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবিলায় কিছু একটা করা দরকার। জলবিদ্যুৎ ছাড়াও ভারত তার কয়লা উৎপাদনও বাড়াচ্ছে। কুলেগম্যানের মতে, দূষণের বিষয়টি বিবেচনা করলে, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। কিন্তু এটাও ভাবতে হবে, এতে পরিবেশগত ঝুঁকি থাকে। এটা বন ও ভূমির ক্ষতি করতে পারে।

ভারতে ড্যাম নির্মাণ নিয়ে সাম্প্রতিক সমীক্ষা পরিচালনাকারী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মহারাজ পণ্ডিত বলছেন, পরিবেশগত বিষয়ের ওপর খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। মেহতা দাবি করেছেন, ভারতীয় কর্মকর্তারা পলি জমার সমীক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছেন। এতে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। বিপর্যয় কেবল পরিবেশগতই হবে না, এমনকি নদী ও পলির অবস্থার পরিবর্তন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। কারণ ড্যামের পেছনে পলি জমে গেলে পানির প্রবাহ কমে যাবে। প্রবাহ হ্রাস মানে উৎপাদনও কমে যাওয়া। এর অর্থ হচ্ছে, ভারতীয় কর্মকর্তারা যতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করছেন, তা পূরণ হবে না। মেহতা বলেন, জলবায়ু, উজানের নদী, জীবিকা পরিবর্তন, পরিবেশগত ও প্রতিবেশগত বিরূপ প্রতিক্রিয়া তো রয়েছেই। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পানি জমিয়ে রাখতে হয়। এতে করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘিœত হয়। পরিণতিতে মাছ, বন্যপ্রাণীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

অধিকন্তু ভারতীয় কর্মকর্তারা ড্যামগুলোর আশপাশে বসবাসকারী লোকজনের কথাও ভাবেননি। এসব ড্যাম নির্মিত হলে ১৬ মিলিয়ন থেকে ৪০ মিলিয়ন লোখ বাস্তুচ্যুৎ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পণ্ডিত বলেন, কেবল চীনই ভারতের চেয়ে বেশি ড্যাম নির্মাণ করেছে। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ড্যাম রয়েছে চীনে। আর তারা সবচেয়ে বেশি লোককেও উৎখাত করেছে। ভারত অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। তাদেরও আরো বেশি লোককে সরাতে হবে।

তবে বিশ্বে চীনের পর একমাত্র বিলিয়ন মানুষের দেশ ভারতও একই পথে হাঁটতে চাচ্ছে। ড্যাম নির্মাণ বিপুল কর্মযজ্ঞ হলেও এগুলো কয়লা বা পারমাণবিকভত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চেয়ে অনেক শস্তা। গত ৬০ থেকে ৭০ বছরে চীন তাদের বেশির ভাগ ড্যাম নির্মাণ করেছে। এর মধ্যে বৃহত্তমটি হলো ইয়াংসি নদীতে নির্মাণ করা ৩২টি প্রধান টারবাইনসংবলিত ৫৯ বিলিয়ন ডলারের জর্জেজ ড্যাম।

তবে ভারত বিপুলহারে ড্যাম নির্মাণ করলে নানামুখী বিরোধিতার মুখে পড়বে। উচ্ছেদের শিকার লোকেরা যেমন বিরোধিতা করবে, তেমনি বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ ভাটির দেশগুলোও এতে আপত্তি জানাবে। ভারতের ড্যাম নির্মাণের ফলে এসব দেশও অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।।