Home » রাজনীতি » মাত্র এক রনি জেলে – অন্য রনিরা কোথায়?

মাত্র এক রনি জেলে – অন্য রনিরা কোথায়?

আবীর হাসান

ronyরনি জেলে। মারহাবা! মারহাবা! দেশে এখন অপার শান্তি। নিশ্চয়ই নিশ্চয়তা পাওয়া গেল আর সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে না! প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীনরা নিশ্চিত হয়েছেন, এখন দেশবাসী ক্ষমতাসীনদের অতীতের সব অপকর্ম ভুলে যাবে। সাংবাদিকরাও আর সাগররুনি হত্যাকাণ্ড, কামাল মজুমদারের সাংবাদিক প্রহার এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক হত্যানির্যাতনের প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করবেন না।

কিন্তু রনি যেদিন গ্রেফতার হলেন সেদিনই অনেক অশান্তির ঘটনা ঘটেছে দেশে; তার কয়েকটার কথা বলি লালমনিরহাটে নয় বছর বয়সী এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে শাওন নামের এক যুবক। শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে স্থানীয় লোকজন। কিন্তু শাওন পালিয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তিন বছরের শিশু আকবরকে অপহরণ করেছিল স্থানীয় এক যুবক, তাকে উদ্ধার করা হয়েছে রাজধানীর খিলগাঁও থেকে। গাজীপুরে জুয়েলারি ব্যবসায়ী রঞ্জিত সরকারকে খুন করে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় গৃহবধূ কাকলীকে যৌতুকের জন্য পিটিয়ে হত্যা করেছে তার স্বামী টিপু। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয়েছে একজন। নারায়ণগঞ্জের চারাগোপে দু’দল শ্রমিকের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছে ১০ জন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত হয়েছে ২০ জন। আড়াইহাজার উপজেলায় সংঘর্ষে আহত হয়েছে আটজন। নীলফামারীর জলঢাকায় ছাত্রলীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষে আহত হয়েছে ১০ নেতাকর্মী। কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাডহক ভিত্তিতে চাকরি প্রত্যাশি কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী রেজিস্ট্রারকে পিটিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনা নদীর বালু উত্তোলন বিরোধী আন্দোলনের আহ্বায়ক শাহেদকে অপহরণ করে মারধর করা হয়েছে। এও একদিনের আংশিক খবর।

আসলে একজন রনির জেলে আটকে রাখাতে শান্তি ফেরার কোনো উপায় নেই। তিনি সংসদ সদস্য হন আর যাই হন। আর সংসদ সদস্য তাকে যে জন্য বানানো হয়েছিল তিনি তো তাই করে চলেছিলেন। আর এটা তিনি করছিলেন আদর্শ অনুকরণেই কারণ তারা তো আর জেলে যান না। তবে শেষ দিকে দুটো কাজ (আসলে একটাই) বেগড়বাঁই করে ফেলেছিলেন। বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানোর মতো ব্যাপার। সাংবাদিক পেটানো। তারপরও জামিন তো পেয়ে গিয়েছিলেন। কেবল কান চুলকানো লেজটার মালিকের গোপন হুঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই যতো বিপত্তি ঘটে গেল। পরিস্থিতি সামাল দিলেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদ সদস্য রনি তাই জেলে গেলেন। মিডিয়াগুলো দু’দিন হইচই করলো সাংবাদিক হত্যা চেষ্টা মামলায় জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় জেলে গেছেন সংসদ সদস্য রনি। যারা পড়েছেন, দেখেছেন, শুনেছেন তারাও উত্তেজিত হয়েছেন নিঃসন্দেহে। বাহবা বাহবা!

তবে বলি কি উত্তেজনাকে একটু থিতু হতে দিন। চিন্তা করুন, কোনো সাংবাদিক হত্যানির্যাতনের বিচার হয়েছে বাংলাদেশে? এক খুলনাতেই তো বিভিন্ন সময়ে নিহত হয়েছেন চার সাংবাদিক স্থানীয় দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালু, পূর্বাঞ্চলের স্টাফ রিপোর্টার হারুনঅররশিদ খোকন, নিউ এজেরএর খুলনা ব্যুরো প্রধান মানিক সাহা এবং দৈনিক সংগ্রামের খুলনা ব্যুরো প্রধান শেখ বেলালউদ্দিন। বালু ও মানিক সাহা হত্যার বিচার শেষ হয়নি এখন পর্যন্ত। আর অন্য দুটো হত্যা মামলার বিচার হলেও প্রকৃত খুনিরা ধরাছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে। এছাড়া যশোর, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম কিংবা অন্যান্য জেলায় সাংবাদিক নির্যাতন, নিগ্রহ, লাঞ্ছনার যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর কোনোটারই প্রকৃত দোষী ধরা পড়েনি। আরও বড় উদাহরণ তো সাগররুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। রাজধানীতে এ রকম একটি হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে লোক ঠকানোর কলাকৌশল নিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী,তা অভিনব এবং তাতে বাধাগ্রস্ত করতে অবুঝ শিশু মেঘের দোহাই পেড়ে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যে সব কথাবার্তা বলেছিলেন সে সব নিশ্চয়ই পাঠক ভুলে যাননি। এখন সাগররুনির সহকর্মীরা কালেভদ্রে প্রেস ক্লাবের সামনে কর্মসূচি পালন করেন, আর কিছু হয় না। তবে ওই সূত্রে সরকারি পদে সাংবাদিক নেতা বসিয়ে দিলেই তো হয়।

কাজেই একলা রনি কারাগারে যাওয়া মানেই শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়। কারণ ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়প্রশ্রয়ে অসংখ্য রনি রয়েছে আমাদের সমাজে। আর তারা ফুলেফেপে উঠেছে নানা পন্থায়কৌশলে। আইনের শাসনের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন নয়। বড় বড় অপরাধ তো কম হয়নি বা হচ্ছে না দেশে মোটা দাগে একটু হিসাব করে দেখুন, বেশিদিন আগের কথা নয় ২০১০ সালের দুটো বড় ঘটনার কথা জানাই ফেব্রুয়ারি মাসে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময় আবুবকর নামের নিরীহ এক মেধাবী ছাত্র নিহত হন। সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার দূরের কথা কোনো আসামি ধরা হয়নি। ওই বছরই নাটোরে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় স্থানীয় আওয়ামী লীগছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ নূর বাবুকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের পর জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায় তারা, মামলা এখন হিমঘরে।

২০১১ সালে নরসিংদীর পৌর চেয়ারম্যান লোকমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক হইচই হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি হলো? স্মৃতি হাত হাতড়ান, উত্তর খুজুনসেখানকার সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী তো বহালই রয়েছেন। ২০১৩ সাল অর্থাৎ এই বছরের ঘটনাই দেখুন, নারায়ণগঞ্জে কিশোর ত্বকি হত্যাকাণ্ড নিয়ে যা চলছে তা কোনো সভ্য সমাজে ঘটতে পারে কিনা? এখন ত্বকির বাবা এবং নারী মেয়র পর্যন্ত জীবন সংশয়ে আছেন।

সভ্য সমাজ! আইনের শাসন! এগুলো আসলে আমাদের আপ্তবাক্য। আমাদের সরকারের শীর্ষ পদাধিকারীরাই এসবকে আমলে আনেন না। না হলে কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় এই সরকারের আমলে ৭৩ হাজার ৫’শ ৪১ জন বিভিন্ন মামলার আসামিকে খালাস দেয়া হয় কিভাবে? কিভাবে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি লক্ষ্মীপুরের তাহের পুত্র ক্ষমা পেয়ে যায়? এহ বাহ্য! সভ্যতার বিপরীতে অবস্থানকারী এই দেশটিতে গণপিটুনি, গুম আর ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা ঘটেই চলে সেখানে সম্ভবত আইনের শাসনের কথা বলাই বোকামি। বোকামি হলেও না বলে না বুঝে তো পারা যায় না। শীর্ষ পদাধিকারীরা সভ্যতার লেশমাত্রহীন সমাজের শিরোমনি হয়ে থাকতে লজ্জাবোধ করতে না পারেন কিন্তু সবাই তেমন বোধ নাও করতে পারেন। ২০১২ সালে সংসদে সন্ত্রাস দমন বিল পাস হয়েছে আর সে বছরই রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশে নিহতের সংখ্যা ৩১২।যে দেশে অসভ্যতার চরম সেখানে আরেক উদাহরণ হলো ধর্ষণ। ২০১২ সালে ধর্ষণ হয়েছে ৫১৬টি। ওই সময়েই ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ১৮৪, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ৬১ জন। এই যে গণপিটুনির ঘটনাগুলো কোথাও ডাকাত সন্দেহে, ছেলে ধরা সন্দেহে, আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সংবাদমাধ্যম বিভিন্ন সময় খবর দিয়েছে। যেমন শবেবরাতের রাতে সাভারে ৬ জন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে গণপিটুনিতে নিহত হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ ভিকটিমকে ছেড়ে দিয়েছে জংলি ভিড়ের (মব) কাজে। নোয়াখালী এবং গাজীপুরের দুটি ঘটনা এখানে প্রণিধানযোগ্য। ২০১২ সালেই গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে ১৩২ জন।

লেখার প্রথমদিকেই একটি শিশু ধর্ষণের ঘটনার কথা লিখেছি এ রকম ঘটনা ঘটছে আকছার। প্রতিদিন এবং একাধিক। একাধিক শব্দেও ভয়াবহতাটা বোঝা যায় না। ২০১১ সালে যৌন সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাস এবং নারী নির্যাতনের ঘটনা সংবাদপত্রের হিসাব অনুযায়ী ঘটেছে ৬৭২টি। যৌন সন্ত্রাসীদের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ২৯ জন নারী ও কিশোরী। এ সব ভিকটিমদের রক্ষা করতে না পেরে বাবা বা নানাদাদার মতো নিকটাত্মীয়রাও নিহত হয়েছেন যার সংখ্যা ১৩ জন। একজন শিক্ষকও নিহত হয়েছিলেন ওই যৌন সন্ত্রাসীদের হাতে। আত্মহত্যাও করেছেন কয়েকজন। এই যৌন সন্ত্রাসীরা তাদের অপকর্মে বাধা পাওয়ায় ৬ জনকে নিহত করে, আহত করে ৯১ জনকে এবং ১২ জনকে করে অপহরণ। এসব যৌন সন্ত্রাসীরা স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাসীনদের হয় আত্মীয়স্বজন অথবা আশ্রয়প্রশ্রয় প্রাপ্ত। যে কারণে খুব কম সংখ্যক ঘটনারই বিচার মিলেছে। এসব ঘটনার বিচার চাইতে গেলে বিড়ম্বনা বাড়ায় পুলিশ। দুর্বৃত্তদের কাছে খবর পাচার করে তারাই। ফলে ভিকটিমের অভিভাবকরা হয়ে পড়েন জিম্মি। রাজধানী ঢাকাতেও এখন এসব ঘটনা ঘটছে। র্খিলক্ষেতে গত ২১ জুন মনিরাকে হত্যা করে শ্বশুরবাড়ির লোকজন প্রকাশ্যে। সেই মামলায় গ্রেফতার নেই। তদন্ত কর্মকর্তা পর্যন্ত নেই। বাড্ডার জোড়া খুনের ঘটনার আসামি ধরা পড়েও জালিয়াতি করে জামিন নিয়ে এখন বহাল তবিয়তে রয়েছে। আর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে দুটি অসহায় মেয়ে। এ রকমটি হয় প্রধানত. রাজনৈতিক বিবেচনায় আর এর সঙ্গে ওই পথে অর্জিত অর্থবিত্তের প্রভাবে।

আইন দ্বারা শাসন (সঠিক হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনা। শাসন শব্দটি ঔপনিবেশিক বা রাজতান্ত্রিক) আসলে যে চান না দেশের প্রধান নির্বাহীই সেটার অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ রয়েছে সাগররুনি হত্যাকাণ্ডের মামলা ধামাচাপা দেয়ার ঘটনায়। আর সে কারণেই এদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে দেশিবিদেশি সমালোচনার মুখেও। ২০১১ সালের পর থেকে এ রকম ঘটনা গণমাধ্যমে কম এলেও যা এসেছে তাতেও দেখা যাচ্ছে ২০১২ সালে নিহত হয়েছে ১৮৪ জন, এ বছর প্রথম ছয় মাসে ৭০ জনের বেশি। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে গুম। গত বছর ইলিয়াস আলীসহ ২৪ জনের গুমের ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। এ বছর আবার গুম আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এখন তার প্রকোপ কমেনি।

অতএব একজন রনি জেলে বলে এসব আতঙ্ক দূর হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীও নিজেকে মহত্বের আসনে আসীন করতে পারছেন না, রনিকে জেলে পাঠিয়েও। কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় তার ঘনিষ্ঠজনদের কোনো বার্তা বা বিশেষ নির্দেশনা পাচ্ছে না। সোনার ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাকে পেটাতে পারে, নিরীহ ছাত্র খুন করতে পারে, সিলেটের এমসি কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাস পোড়াতে পারে তাতে কিছুই হয় না। ভবিষ্যতে আরো অনেক কিছুই দেখতে হবে নিশ্চয়ই।

আগে বড় হত্যাকাণ্ড, ছোট হত্যাকাণ্ড, গ্রাম্য অপরাধ, শহরে অপরাধ এসব শ্রেণীবদ্ধকরণ চলতো গণমাধ্যমেই। সাগররুনি হত্যাকাণ্ডের পর এর প্রকোপ একটু কমেছিল। কিন্তু অপরাধীরা রাষ্ট্রীয় ছাড় পেয়ে যাওয়ায় গণমাধ্যম এখন হিসাব দিতে দিতে স্থান সঙ্কটে পড়ে গেছে। একদিনের অপরাধ একটি বা দুটি পৃষ্ঠায় আর কুলাচ্ছে না। এসআই থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সবার একই বক্তব্য ‘অপরাধী ধরার চেষ্টা চলছে।’ আসলে যা চলছে অপরাধী ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা। কারণ, ক্ষমতাসীনরা মনে করছে, তারাই যে বড় ভোটব্যাংক।।