Home » শিল্প-সংস্কৃতি » ষাট দশকের বাংলা চলচ্চিত্র (পর্ব – ৪)

ষাট দশকের বাংলা চলচ্চিত্র (পর্ব – ৪)

ফ্লোরা সরকার

movie-60sমঞ্চ নাটক এবং চলচ্চিত্র এই দুইয়ের মাঝে প্রধান যে পার্থক্য তা হলো, প্রথমটি সংলাপ নির্ভর শিল্পমাধ্যম এবং দ্বিতীয়টি দৃশ্য নির্ভর শিল্পমাধ্যম। এই কারণে চলচ্চিত্রকে বলা হয়ে থাকে নাটকের মতো দৃশ্যকাব্য। চলচ্চিত্র দৃশ্য নির্ভর হবার কারণে সংলাপের পাশাপাশি চিত্রভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কয়েক মুহূর্ত্তের একটি শট বা চিত্র অনেক সময় শত শত সংলাপকেও ছাপিয়ে যেতে পারে। ছবির এই ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে তাই চিত্রগ্রাহকের ভূমিকা পরিচালকের পরেই স্থান পায়। কেননা চিত্রগ্রহণ নান্দনিক না হলে ছবিটিও নান্দনিক হয়ে উঠতে পারেনা। ষাটের দশকে এদেশে ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে যেসব যান্ত্রিক কলাকৌশল ব্যবহার করা হতো তা উন্নত দেশের তুলনায় খুব উন্নত না হলেও দক্ষ চিত্রগ্রাহক পেতে আমাদের কোন অসুবিধা হয়নি। আমরা একে একে পাই কিউ.এম.জামান (এদেশের প্রথম চিত্রগ্রাহক, মুখ ও মুখোশ দিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল), বেবী ইসলাম, অরুণ রায়, বদরে আলম, রফিকুল বারি চৌধুরী, আব্দুস সামাদ সহ আরো অনেক প্রতিভাবান চিত্রগ্রাহক। শুধু ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ এবং ‘নদী ও নারী’ ছবিতে দুজন বিদেশী চিত্রগ্রাহককে আমরা পাই,যথাক্রমে ওয়াল্টার লেসলি এবং উইলিয়াম..গুথ।

ছবির গতি ধরে রাখার জন্যে তাই চিত্রগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গতি আবার ভালো চিত্রনাট্য এবং পরিচালনার উপর নির্ভর করে। ষাটের দশকে ছবির এই তিনটি উপাদানের সঙ্গে আরো একটি ভালো উপাদান যুক্ত হয়েছিলো আর তা হলো দক্ষ কিছু অভিনেতা এবং অভিনেত্রী। সেই সময় তাই আমরা বেশকিছু ভালো সামাজিক ছবি নির্মিত হতে দেখি। যেসব ছবি নির্বিঘেœ নির্দ্বিধায় পরিবাররের সকল সদস্যকে নিয়ে দর্শক সিনেমা হলে দেখতে যেতেন। যেসব ছবির আবেদন আজও ফুরিয়ে যায়নি। আজ আমাদের আলোচনার কেন্দ্রভূমি সেই সময়ের সেসব সামাজিক ছবি। উল্লেখ্য সব ছবি নিয়ে এই সীমিত পরিসরে আলোচনা সম্ভব না বিধায় কয়েকটা ছবি নিয়ে আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হলো।

১৯৬৩ সালে আমরা পাই সালাউদ্দিন পরিচালিত “ধারাপাত” ছবিটি। চিত্রগ্রহণে ছিলেন বদরে আলম। শক্তিশালী অভিনেতা কাজী খালেক একজন স্কুল শিক্ষক। গণিতের শিক্ষক। শিক্ষকতা শুধু তার পেশা নয় প্রচন্ড নেশাও বটে। পারলে সমগ্র দেশব্যাপী তিনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন। বাড়ির কাজের মেয়েটিকেও পর্যন্ত অংক শেখান। ছবির শুরুতেই আমরা দেখতে পাই শিক্ষকের গ্রামের পাশ দিয়ে একটি ট্রেন চলে যায়। বাড়ির দরজায় শিক্ষকের স্ত্রী আর কন্যা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে শহরে চাকরি করতে যাওয়া শিক্ষকের ছেলের ফেরার আশায়। এই অপেক্ষা দিয়েই সমগ্র ছবির গল্পটি কেন্দ্রিভূত থাকে। এই অপেক্ষার মাঝেই শিক্ষক তার শিক্ষকতার কাজ করে যান। কিন্তু দেখা যায় যাকেই পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করতে চান, সেই অনাগ্রহ দেখায়। তার খুব কাছের এক ছাত্র তাকে জানায় লেখাপড়া করার চেয়ে বিড়ি কারখানায় কাজ করা বা এক মন দুধে দুই মন পানি মিশিয়ে ব্যবসা করাও অনেক ভালো। অর্থাৎ যে শিক্ষা তাদের জীবনে কোন কাজে আসবে না তার জন্যে তারা কেনো তাদের জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করবে। গণিতের মাস্টার হয়েও শিক্ষক তার জীবনের অংক মেলাতে পারেন না। তার চুড়ান্ত রূপ আমরা দেখি ছবির শেষ দৃশ্যে, যখন শিক্ষক জানতে পারেন শহরে কাজ করতে যাওয়া তার ছেলেটি আর কখনোই ফিরে আসবে না। ছেলের মৃত্যু দিয়েই হয়তো পরিচালক আমাদের বুঝিয়ে দেন গরীব দেশে শিক্ষা কতটা দুর্লভ। ১৯৬৪ তে আমরা চমৎকার দুটো ছবি পাই একটি সুভাষ দত্ত পরিচালিত “সুতরাং” এবং অপরটি সাংবাদিক ওবায়দুল হক পরিচালিত “দুই দিগন্ত”। ‘সুতরাং’ ছবিটি সেই সময় ফ্র্যাংফুট এশীয় চলচ্চিত্র উৎসবে দ্বিতীয় পুরষ্কার পেয়েছিল। এদেশের দুজন জনপ্রিয় শিল্পীর প্রথম আগমন এই ছবির মাধ্যমে কবরী এবং বেবী জামান। চিত্রগ্রহণে ছিলেন কিউ.এম.জামান। একটি বিষাদমধুর প্রেমের কাহিনী নিয়ে সুতরাং নির্মিত। ছবির শুরু এবং সমাপ্তি একই ভাবে চিত্রায়িত। শুরুতেই আমরা দেখি কর্মব্যস্ত শহরে ছবির নায়ক জবক্ষার খান (সুভাষ দত্ত) ঘুরে ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করে। একজনকে জিজ্ঞেস করে কটা বাজে, সময় শুনেই খান বলে উঠে, স্কুলে বাচ্চাদের (উল্লেখ্য খান শিশুদের স্কুলে আনানেয়ার কাজও করে) নিয়ে যাবার সময় হয়ে গেছে। তারপরেই সে দৌঁড়াতে থাকে এবং এই দৌঁড়ের মাঝেই অসাধারণ আবহসঙ্গীতের মাঝে শুরু হয় ছবির টাইটেল। একটি ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে প্রায় অনেকটা কাহিনী বলা হয়। গ্রামে যে মেয়েটির সঙ্গে তার সম্পর্ক সেই জরিনার (কবরী) সঙ্গে তার ভালোবাসার দৃশ্যেগুলো পরিচালকঅভিনেতা সুভাষ দত্ত এতো সরল আর প্রাকৃতিক করে তোলেন যে, তা যেমন অকৃত্রিম তেমনি গভীর মনে হয়। এখনকার নায়কনায়িকাদের মতো শরীরের উপর হুমড়ি খেয়ে পরার প্রয়োজন পড়ে না। জরিনার জন্যে তিল তিল করে জমানো টাকার যখন মাত্র পঞ্চাশ টাকা অবশিষ্ট এবং ছবির অন্যতম চরিত্র শওকত আকবর যখন সেই টাকা দিতে চায় খান তখন বলে -“না। এতে জরিনার ভালোবাসার অপমান হবে” ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশের জন্যে এরকম সংলাপ বাংলা ছবিতে খুব কম পাওয়া যায়। ছবির আরেকটি দিক আমাদের বিস্মিত করে। ছবির শেষের দিকে যে গান ব্যবহার করা হয় ( ‘এই যে আকাশ, এই যে বাতাস, ওরে মন ছুটে চল —’) তা আধুনিক এবং ভাটিয়ালির মিশেলে নির্মিত গান। সারা ছবিতে যেমন শহুরে এবং গ্রামের আমেজ মিলেমিশে থাকে এই গানটি যেন তারই ইঙ্গিত বহন করে। গানের এরকম ব্যবহরও বাংলা ছবিতে বিরল। ওবায়দুল হকের “দুই দিগন্ত ” ছবিটি ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের একটি সচিত্র প্রতিবেদন যেন। বেকার যুবক আনোয়ার হোসেনের বলিষ্ঠ অভিনয়ের মাধ্যমে, শির উঁচু করে থাকা, আত্মমর্যাদা আর আত্মসন্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোন যুবকের সার্থক চরিত্রায়ন দেখি ছবিতে। খলনায়ক এনাম আহমেদের চক্রান্তে একের পর এক চাকরি চলে গেলে, সত্যনিষ্ঠ নায়ককে বিচলিত হতে দেখিনা। অন্যদিকে নায়িকা সুমিতা ধনী এবং বিলাসি জীবন যাপন করলেও মানুষের মনুষ্যত্বকে ঠিক ঠিক চিহ্নিত করতে পারেন। ছবির ছোট্ট কয়েকটা সংলাপের মাঝে পরিচালক অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে তা চিত্রায়িত করেন

বাবা: অনেকদিনের কালচারে মানুষের রুচি যেমন মার্জিত হয়, তেমনি সভ্যতা আর খানদানে তার রক্ত পরিশুদ্ধ হয়। যাকে বলে রিফাইনমেন্ট অফ ব্লাড।

সুমিতা: কিন্তু আবক্ষা, এতে মানুষের ব্যক্তিসত্ত্বাকে অস্বিকার করা হয় নাকি? বংশের চেয়ে মানুষ বড়, এটাই তো পরম সত্য।

এনাম: সভ্য সমাজে মানুষের চেয়ে খানদানের মূল্যই বেশি।

সুমিতা: তাহলে সভ্য লোকের সন্তান অসভ্য হয় কেনো? ——-

এভাবেই নায়িকা একের পর এক আভিজাত্য তথা সামন্তপ্রথার অন্যতম এই উপাদানের প্রতি প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেন। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বর্তমান সময়েও সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণী, ‘দুই দিগন্ত’ ছবির বাবা এবং এনামের মতো তা বিশ্বাস করেন। শুধু বংশের স্থানে পুঁজি বা টাকা স্থলাভিষিক্ত হয়েছে মাত্র। কিন্তু ছবির শেষে আমরা দেখতে পাই পরিশ্রম আর আত্মমার্যা নিয়ে গড়ে উঠা জীবনই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। যে জীবন ফড়িং বা শালিকের মতো নয়। বিনোদনের মাধ্যমেও যে মানুষের জন্যে ভালো বার্তা পৌঁছে দেয়া যায় ‘দুই দিগন্ত’ ছবিটি সেটাই প্রমাণ করে। ১৯৬৮ সালে আমরা দেখি এদেশের অন্যতম প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত এবং বেবী ইসলামের অন্যবদ্য চিত্রগ্রহণে চিত্রিত “এতটুকু আশা” ছবি। ছবিটি দেখার সময় সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র সেই সংলাপটি মনে পড়ে, যেখানে রাতে ছেড়া কাপড় সেলাই করতে করতে সর্বজয়া তার স্বামীকে বলেন – “দু বেলা দু মুঠো ভাত আর বছরে দুটো কাপড়, আর কি চাই”। গ্রামীণ জীবনের পরিমিত ভোগের একটি সুখী চিত্র, অথচ এই সামান্য সুখটুকুও যাদের ভাগ্যে জোটে না। “এতটুকু আশা” ছবিতে দেখি গ্রামের হতদরিদ্র কৃষক কাজী খালেক অনেক কষ্টে নিজের জমিজমা বিক্রি করে বড় ছেলেকে লেখাপড়া শেখান। ছেলের মোটা বেতনে চাকরিও হয়। কিন্তু ধনী ঘরে বিয়ে হবার পর ছেলে তার বাবা আর ভাইবোনদের ভুলে যায়। এখানে যে বিষয়টি লক্ষ্য করার মতো তা হলো এই ভুলে যাবার বিষয়টি নিয়ে পরিচালক কোন বাড়াবাড়ি করেননি। শ্বশুরবাড়ির নতুন পরিবেশ আর বাস্তবতার মাঝে ছেলেটি যেন তার বাবা, ভাইবোনের প্রতি কর্তব্য কর্ম জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। যা অত্যন্ত বাস্তবোচিত মনে হয়। যে বাস্তব চিত্র আজও আমরা আমাদের সমাজে ঘটতে দেখি। শুধু তাই না বর্তমানের এই বাস্তবতা আরো বড় আকারে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার মাধ্যমে অধিকতর রূঢ় আকারে দেখা যায়। এই ছবিতেই আমরা সেই বিখ্যাত গানটি পাই, যে গান এদেশের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা আলতাফের মুখে শুনি – “তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়, দুঃখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়”। যে গানের প্রতিটি কলি সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের জন্যে আজও সত্য। ১৯৬৯ সালে “নীল আকাশের নিচে” ছবিটিও নারায়ন ঘোষ মিতা পরিচালিত এবং বেবী ইসলামের চিত্র গ্রহণে নির্মিত। এই ছবির মূল যে বৈশিষ্ট তা হলো পারিবারিক বন্ধন এবং স্নেহমমতা। যা বর্তমান সময়ে ক্রমশ বিলুপ্ত প্রায়। পিতৃমাতৃ হারা দুই ভাই দুজনকে যেন আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। শুধু তাই না, এদেশের চলচ্চিত্রে ‘ভাবী’ নামক চরিত্রটি করে যে অভিনেত্রী সেই সময়ে সবার মন জয় করে নিয়েছিলেন সেই রোজীর অন্যবদ্য অভিনয়ও দেখতে পাই। এদেশের ছবিতে ‘ভাবী’ চরিত্রটি একাধারে মা, বোন এবং অভিভাবকের ভূমিকায় আমরা দেখি। যা আজও একটি ‘আইকন’ বা ‘প্রতিমা’ হয়ে আছে।

এদেশের বাংলা ছবিতে যে বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র কখনোই ছবি নির্মিত হয়নি এবং আজও হয়না তা হলো কমেডি বা হাসির ছবি। বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রায় সব ছবিতে কমেডি নামক ভাঁড়ামো থাকলেও নির্ভেজাল কমেডি ছবি আমরা পাই না। একমাত্র ব্যতিক্রম “১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন”, এই ছবির পূর্বেও যেমন এই ধরণের ছবি নির্মিত হয়নি, পরেও না এবং আর হবে কিনা ভবিষ্যত জানে। ছবির পরিচালক সালাউদ্দিন। সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, সুমিতা দেবী, আনোয়ারা, সুজাতা, বেবী ইসলাম, খান জয়নুল এবং আলতাফের অনবদ্য অভিনয়ে অভিনীত ছবিটি আজও যেন আধুনিক। ছবিটি দেখলে মনে হয়না ১৯৬৬ সালে নির্মিত। তার প্রধান কারণ ছবিতে কোন বিরক্তিকর ভাঁড়ামো নেই, নেই কোন কৃত্রিম হাসির খোরাক। শুধুমাত্র সংলাপ আর চরিত্রদের কার্যপ্রণালীর মধ্যে দিয়ে মানুষকে প্রচন্ড ভাবে হাসাবার একটি সার্থক ছবি। সব থেকে যা চমকিত করে তা হলো ছবির চিত্রনাট্য ও সংলাপ এদেশের অন্যতম বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা খান জয়নুল কর্তৃক লিখিত। দুটো পরিবার, পাশাপাশি বাড়ি। একটি পরিবার বাড়িয়ালা অপরটি ভাড়াটিয়া। এই দুই পরিবারের ঝগড়া ফ্যাসাদকে কেন্দ্র করে ছবির কাহিনী আবর্তিত। প্রথম দৃশ্যেই আমরা দেখি বাড়িয়ালী সুমিতা তার বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে, খান জয়নুল (ভাড়াটিয়ার কাজের লোক) কাঁধে পানি ভরা কলসি নিয়ে ঢুকতেই সুমিতা বলে উঠে – “এই বজ্জাত দাঁড়া, আমাকে ভেঙচি কাটলি কেনো?” অর্থাৎ গায়ে পড়ে ঝগড়া করার যে চিরন্তন রেওয়াজ বাঙালির জীবনে প্রবাহমান, তারই একটি বাস্তব চিত্র। ভাড়া নিয়েও দুই পরিবারে ঝগড়া। শেষ পর্যন্ত সাব্যস্ত হয় বাড়িয়ালা ঝগড়া করলে ভাড়াটিয়া ভাড়া দেবেনা আর ভাড়াটিয়া ঝগড়া করলে ভাড়া দিতে হবে। কলহ থামাবার এক অভিনব প্রচেষ্টা। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে শুধুমাত্র ছবির সংলাপই দর্শককে হাসিয়ে দেয়। একটা ছোট্ট দৃশ্যের কথা বলা যাক। বাড়িয়ালী সুমিতা এবং ভাড়াটিয়া অনোয়ারা একদিন যার যার বাড়ির মুখোমুখি বারান্দায় বসে আছে। সুমিতা তার বাড়ির কাজের ছেলে আলতাফ, যে কিনা অতিশয় বোকা চরিত্রের তাকে চা নিয়ে আসতে বলে। সঙ্গে সঙ্গে আনোয়ারও তার কাজের ছেলে জয়নুলকে বলে চা নিয়ে আসতে। জয়নুল জানায় দুধ নেই। আনোয়ারা যে দুধচিনি ছাড়া চা পান করে তা মনে করিয়ে দেয়। সুমিতাও সঙ্গে সঙ্গে আলতাফকে জানায় দুধচিনি ছাড়া চা নিয়ে আসতে। কিছুক্ষণ পর দুজনই চা নিয়ে আসে। আলতাফ সুমিতাকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বলে – “ চিনিও দেইনি, দুধও দেইনি, চাও দেইনি”। সুমিতা চমকে উঠে, দর্শক হেসে গড়িয়ে পরে। কিন্তু ঝগড়া থেমে থাকেনা। একসময় পরস্পরকে গালাগাল দেয়ার পর্যায়ে জয়নুল বলে ইংরেজিতে গাল দিতে, এতে করে বাড়িয়ালা হেরে যাবে। অর্থাৎ ইংরেজির দাপটের খবর একটা বাড়ির কাজের লোকেরও অজানা থাকেনা। ছবির ক্লাইমেক্স শুরু হয় সুমিতার ভাই বেবী জামানের আগমন থেকে। তাকে ডেকে আনা হয় শুধু ঝগড়া করার লক্ষ্যে। জামান ঝগড়া দূরে থাক, উল্টো আনোয়ারার বোন সুজাতার প্রেমে পরে যায়। এই প্রেম দিয়েই শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের ঝগড়ার অবসান ঘটে। কী অসাধারণ পরিসমাপ্তি, একমাত্র ভালোবাসা দিয়েই যে এই বিশ্ব জয় করা যায়, পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার যেন আমাদের দৃষ্টি সেদিকে কেন্দ্রীভূত করেন।

এভাবেই ষাটের দশকে আমাদের রূপালী পর্দার সাদাকালো ছবির ভেতর একের পর এক রঙ্গীন জীবনের ছবির উপহার পাই। যেসব ছবি নির্মাণের পেছনে শুধু পরিচালক, চিত্রগ্রাহক আর শিল্পীদের আন্তরিক প্রচেষ্টাই ছিলো না। সেই সঙ্গে ছিলো ছবির পেছনে বিদ্যমান আরও কলাকুশলী, যারা ক্যামেরার পেছনে, লাইটের পেছনে, মেকআপ রুমে, ছবির প্রডাকশানে, এমনকি চা আনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। প্রত্যেকের ভেতর একটি সততাই সেদিন কাজ করতো, যে করেই হোক, ছবি ভালো এবং সুস্থ হতে হবে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রূপালী পর্দার রঙ্গীন ছবি সাদাকালো যুগের মতো আমাদের জীবন কি রাঙাতে পেরেছে?। সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবো আমাদের পরবর্তী এবং শেষ পর্ব।।

(চলবে…)

১টি মন্তব্য

  1. ১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বা এফ.ডি.সি. স্থাপিত হলেও, সক্রিয় ভাবে এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫৮-৫৯ সাল নাগাদ। মাত্র একটি শুটিং ফ্লোর নিয়ে এই সংস্থার যাত্রা শুরু হয়।
     
    বাংলার জগতে সুনিল হুমাউন নাই তো তাই মনে হয় এই ঢাকা,তার অলিগলি বা হয়তো এফদিসি নিয়ে কেউ তীক্ষ্ণতায় লেখা উপন্যাস পাঠ করাবে না আমাদের……খুব ক্ষতি হয়ে গেছে বাংলার।
    আপনার লেখাটা খুব বাজে মস্তিষ্কের পাঠক হয়েও বুঝতে পারলাম সহজেই……আমি বেক্তিগত ভাবে অনেকদিন ধরে এমন লেখা পড়ার জন্য খুজছিলাম,পেলাম এবং ভালো লাগলো খুব।