Home » বিশেষ নিবন্ধ » ৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৫)

৬০ দশক – রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব – ৫)

সামরিক শাসন এবং ‘বুনিয়াদী গণতন্ত্র’

আনু মুহাম্মদ

60'sএই অবস্থাতেই ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ করে সামরিক বাহিনী। ১৯৫৬ সালে প্রণীত সংবিধান বাতিল হয়ে গেল। মার্কিনপন্থী রাজনীতিবিদরাও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ধরে রাখতে পারলেন না। প্রথমে ৭ অক্টোবর ইস্কান্দর মির্জা দিয়ে শুরু হলেও ২৭ অক্টোবর সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে পূর্ণ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ভাবে সামরিক শাসনের অধীনে প্রবেশ করে। পাকিস্তানের ইতিহাসের বড় অংশ আসলে সামরিক বাহিনীর গোপন ও প্রকাশ্য তৎপরতার ইতিহাস। মাঝখানে কিছু বিরতি দিয়ে সামরিক শাসন কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। আইয়ুব খান তাঁর গ্রন্থে ক্ষমতাগ্রহণের পর্বের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে বোঝা যায় তাঁরা আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা গ্রহণের অনেক আগে থেকেই প্রকৃত ক্ষমতার অংশীদার ছিলেন। পাকিস্তান প্রায় পুরো ৬০ দশক আইয়ুব খান নেতৃত্বাধীন এই সামরিক শাসনের অধীনেই ছিল এবং বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় অধ্যায় রচিত হল এই প্রেক্ষাপটেই।

ক্ষমতা গ্রহণের পরই জেনারেল আইয়ুব খান পুরো শাসনব্যবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার ছাঁচে ঢেলে সাজাতে চেষ্টা করেন এবং রাজনৈতিক ভাবে পোক্ত অবস্থান নেবার জন্য সুদূরপ্রসারী কর্মসূচি নেন। এটা যে আইয়ুব খানের নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠী তাঁর মাধ্যমেই নিজেদের একচ্ছত্র ক্ষমতার স্থিতি দেখতে পেয়েছিল। তাছাড়া পুরো অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন বিরোধী যে সামরিক ও রাজনৈতিক বলয় তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছিল সেক্ষেত্রে পাকিস্তানে একটি স্থিতিশীল ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা খুব দরকার ছিল। আইয়ুব খান তাদের সেই চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শিক্ষা সংস্কার ও ভূমি সংস্কার এর উদ্যোগ নেবার পাশাপাশি আইয়ুব খান একটি শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করতে উদ্যোগ নেন যা তার ক্ষমতা কাঠামোকে বৈধতা দান করতে পারে। এই জন্য সূচনা করা হয় গণতন্ত্রের এক নতুন মডেল। তার নাম বেসিক ডেমোক্রেসি, বাংলায় বলা হতো বুনিয়াদী গণতন্ত্র বা মৌলিক গণতন্ত্র। ১৯৫৯ সালেই আইয়ুব খান চার স্তরের মৌলিক গণতন্ত্রের কাঠামো ঘোষণা করেন এবং এর পক্ষে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় প্রচার চালানো হয়। কিছুদিনের মধ্যেই রেডিও তে নিয়মিত অনুষ্ঠান চালু হয়েছিলো, ‘বুনিয়াদী গণতন্ত্রের আসর’।

১৯৫৬ সালে প্রণীত সংবিধানে পাকিস্তানে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সরকার গঠন করা হয়েছিল। সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে তা বাতিল করে ‘পাকিস্তানের জন্য উপযোগী’ মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় পরোক্ষ ভোটাধিকারের ব্যবস্থা চালু হল। বলা হলো, এই ব্যবস্থার অধীনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্য ও চেয়ারম্যান। সারাদেশের এই চেয়ারম্যানদের ভোটেই নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান তখন দুই্ ইউনিট। সমানসংখ্যক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সারাদেশে এই নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে ঠিক হয। ‘গণতন্ত্র রক্ষার ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করে ইউনিয়ন কাউন্সিলের এই চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের নাম দেয়া হয় ‘বেসিক ডেমোক্রেট’ বা ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’। গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত আইয়ুবী শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এই ব্যবস্থা বেশ কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার উপযোগিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লর্ড কর্ণওয়ালিস বলেছিলেন, ‘আমাদের এমন এক শ্রেণী সৃষ্টি করিতে হইবে যাহারা নিজেদের স্বার্থেই আমাদের টিকাইয়া রাখিবে।’ পাকিস্তানের স্বৈরশাসন পাকাপোক্ত করবার জন্য সেরকম এক শ্রেণী হিসেবেই মৌলিক গণতন্ত্রীদের গড়ে তোলা হয়েছিলো। গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত উন্নয়ন বরাদ্দ এদের মাধ্যমেই খরচ হতো। এই বরাদ্দ নিয়ে দুর্নীতি সেসময়ই বিস্তার লাভ করে। এই বরাদ্দ দেখা হয়েছে মৌলিক গণতন্ত্রীদের সমর্থন নিশ্চিত রাখবার জন্য একধরণের প্রণোদনা হিসেবে। যেকারণে এই উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে অডিট ব্যবস্থাও শিথিল রাখা হয়। খুবই ক্ষুদ্র ব্যতিক্রম বাদে গ্রামাঞ্চলে উদ্ভূত এই গোষ্ঠী আইয়ুব খানের অন্যতম প্রধান সমর্থন ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। অন্যদিকে একই কারণে এই ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’রা বা চেয়ারম্যান মেম্বররাই গ্রামাঞ্চলে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

সারা পাকিস্তানে এদের ভোটে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারী। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ছোট বোন ফাতেমা জিন্নাহ। সেসময়ে ফাতেমার জনসমর্থন থেকে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন হলে ফাতেমা জিন্নাহই বিজয়ী হতেন। ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে শুধু আওয়ামী লীগ সমর্থন দেয়নি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলও তাঁকে সমর্থন দেয়। আরও উল্লেখ করবার মতো বিষয় হচ্ছে যে, ‘ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম’ এই আইয়ুবী প্রচারণার জবাবে মাওলানা থানভী, মাওলানা মওদুদী এবং শর্ষিণার পীর তখন নারী নেতৃত্বের পক্ষে বিবৃতি দেন।।

(চলবে…)