Home » বিশেষ নিবন্ধ » আধুনিককালের ঘটক – ভালোবাসার সুপার মার্কেট

আধুনিককালের ঘটক – ভালোবাসার সুপার মার্কেট

ইন্টারনেট অবলম্বনে আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

internet matchmakerকিভাবে সফল জুটি গড়বেন সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা প্রশ্নটির বিজ্ঞাননির্ভর উত্তর নিয়ে এসেছে বলে দাবি ইন্টারনেট ডেটিং সাইটগুলোর। কিন্তু তারা কি সত্যি সেটা পারছে? অন্যরা বাদ সাধবে জেনেও ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ায় মানুষ। আর এই অন্যদের মধ্যে মাবাবা, ধর্ম, বন্ধুসহ আমলাতন্ত্রও রয়েছে। তাদের সবার উদ্দেশ্য কমবেশি একই রকম। তারা মনে করে, জোড় বাঁধা মানুষগুলোর চেয়ে, আগের মানুষটিকে তারা বেশি চিনতো, জানতো।

তবে তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে ইন্টারনেটের দুনিয়াতেও পাওয়া যায় ঘটক। পুরনো ঘটকের সঙ্গে তুলনায়, অন্তত দু’ভাবে এই ঘটকরা আলাদা। প্রথমত. তাদের প্রথম উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন করা। দ্বিতীয়ত. যারা একক থেকে দ্বৈত হতে চান তাদের মনে ঘটকের নানা আচরণে বিরক্তি আসলেও সেটাকে অগ্রাহ্য করে তাদের অপেক্ষা করতে হয়। ইন্টারনেট ডেটিং সাইটগুলো তাদের গ্রাহকদের কাছে সাধারণত দুটো প্রতিশ্রুতি নিয়ে উপস্থিত হয়। একটি হলো তারা আসলে ঘটক বলতে যা বোঝায় তা নয়, এমনকি পথে ঘাটে ছড়িয়ে থাকা কোনো সুযোগ সন্ধানীও নয় তারা। সম্ভাব্য জীবন সঙ্গীনীকে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনেকের মধ্যে একজনকে বাছাইয়ের সুযোগ থাকছে এখানে। এছাড়া সমমনা একজনকে খুজে নেয়ার ক্ষেত্রে এবং চিরসুখী হওয়ার প্রত্যয়ে সব বাধার বিষয়টি যে তারা বাড়িয়ে তোলে তাও বিজ্ঞানসম্মত।

সঙ্গীনিকে বাছাই করার ক্ষেত্রে অনেক থেকে একজনকে পছন্দ থাকার সুযোগটি প্রশ্নাতীত। কিন্তু এটা কি প্রকৃতার্থেই ভালো কোনো ফল বয়ে আনছে? বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এই অ্যালগরিদম কী আসলেই ক্রিয়াশীল কিংবা বিয়ে পূর্ব সম্পর্কের ক্ষেত্রে (অন্তত ভালোবাসার নামে প্রতারণা) কী ভালো কিছু বয়ে আনতে পারছে? এই প্রশ্নগুলো দেখেছেন ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনরোগ বিশেষজ্ঞ দল প্রধান এলি ফিনকেল। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স ইন দ্য পাবলিক ইন্টারেস্টএ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। ১৯৯৫ সালে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি ঘটক সাইট ম্যাচ ডট কম এর পর্যালোচনা করেই এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। ড. ফিনকেল ও সহকর্মীরা বহু কোটি ডলারের ওই ঘটক সাইটটি বেশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যা আসলে প্রচণ্ড সন্দেহ উদ্রেককারী।

পাক্কা জীবনসঙ্গীর নীলনকশা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে গবেষকদের প্রথম পর্যবেক্ষণে তারা আসলে যে সব উপাত্ত যোগাড় করেছেন তা যথার্থভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হন।এমনকি তারা দেখাতে পারেনি এসব ঘটকসাইটের মাধ্যমে ধরাবাধা দুজনের অ্যালগরিদম ঠিকমতো কাজ করছে কিনা।

অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে এটি যথেষ্ট ঝামেলামুক্ত। জনগণের কাছ থেকে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বুদ্ধিভিত্তিক সম্পত্তিকে বাণিজ্যিক কারণে গোপন রাখছে। কিন্তু এদের মধ্যে কেন ইন্টারনেট ডেটিং সাইটগুলো নেই, সে বিষয়ের প্রশ্ন তোলার কারণ নেই। এখানে স্বাধীন বিজ্ঞাননির্ভর কোনো প্রমাণ নেই, যার ফলে জানা যাবে, জোড়া বেধে ফেলার পর তরুণতরুণীরা পুনরায় ওয়েবসাইটগুলোতে ঢু মারছে কিনা। আর এ বিষয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে, তা লিখেছে কোম্পানির ভেতরকার লোক, যারা আসলে কখনোই প্রকাশ করবে না তাদের কর্মীরা কম্পিউটার প্রোগামগুলো নিয়ে কিভাবে কাজ করছে।

কঠিন কাজ হলেও এটা নির্ভর করা সম্ভব যে, উপযুক্ত চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের বিচারেই একে অপরের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে কিনা তা খুঁজে দেখার বিষয়টি। কোনো সন্দেহ নেই, তারা সেটা করে। তারা যেটা করে সেটা হচ্ছে, বিষয়ভিত্তিক কিছু প্রশ্ন দিয়ে একটি আবেদনপত্র পূরণ করিয়ে নেয়া হয়। যা আসলে অনুমাননির্ভর, কিন্তু প্রমাণিত নয়। যদিও এটা ভালো যে, দুজনের মধ্যে মিল থাকলে তারা সফল দম্পতি হতে পারবেন। আর এই অংশটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই ২০১০ সালে প্রকাশিত নিউইয়র্কের হোবার্ট অ্যান্ড উইলিয়াম স্মিথ কলেজের ড. পোর্শিয়া ডাইরেনফোর্থের একটি নিবন্ধের দৃষ্টিআকর্ষণ করেন ড. ফিনকেল। অন্তত হাজার বিশেক মানুষের কাছে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন এবং তাদের ব্যক্তিত্বকে বোঝার চেষ্টা করেছেন ডেরেনফোর্থ। যে সব দম্পতির চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্বের মিল রয়েছে তাদের অন্যদের তুলনায় সুখী বলে নিজের গবেষণায় উল্লেখ করেন ডেরেনফোর্থ। কিন্তু সেই ব্যবধান যে অনেক বেশি তা কিন্তু নয়। সেই পরিমাণ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। ড. ফিনকেল বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দাবি করে, তাদের অ্যালগরিদম একটি সম্পর্ক তৈরি ও তা স্থায়ীকরণের সুযোগ তারা বাড়িয়ে দিতে পারে তখন আমি খুব একটা সমস্যা দেখি না। কিন্তু আমি তখনই আঁতকে উঠি যখন প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে দেখি, আমরা আপনার জন্য আপনার আত্মার সঙ্গীকে তুলে এনে খুঁজে বের করে দেব।

নিশ্চিতভাবে সঙ্গী খুজে নেয়ার ক্ষেত্রে অনেকগুলো পছন্দ থেকে বাছাই করে নেয়ার বিষয়টি জাদুকরি হলেও কিন্তু সেখানে কিছু বিষয় আছে যা আসলে যতোটা সহজ মনে হয়, আদতে ততোটা সহজ নয়।

কিছু ডেটিং সাইটের অ্যালগরিদমের অবশ্য উচ্চবাচ্য আমরাই সবার সেরাটা জানি এ ধরনের কোনো ভাব থাকে না। বরং তাদের ক্রেতা অর্থাৎ কোনো পুরুষ অথবা নারীকে তাদের পছন্দের নারী কিংবা পুরুষকে পছন্দ করার জন্য, ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত ওই ব্যক্তির তথ্য জানার সুযোগ দেয়। এটা অনেকটা যেন, সঙ্গী নির্বাচন করতে তাদের সুবিধা হয় এমন।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ আসলে ভাবে তারা সেটাই চায় যা তাদের অবশ্যই প্রয়োজন। এটা সত্য যে, প্রত্যেক ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে মূলত অনুমান শক্তিই কাজ করে। কিন্তু ইন্টারনেটে বসে একটি বই কিংবা ওয়াশিং মেশিন পছন্দ করেও সেটি সম্পর্কে মনের বদল ঘটলে সেটা যেমন অপরাধের বিষয় নয়, ঠিক তেমনি ইন্টারনেটে বসা পছন্দ করা জীবনসঙ্গী সম্পর্কেও মনের বদল ঘটলে, সেটাও প্রতারণা হবে না। এর ওপর গবেষণা বলছে, মানুষ আসলে কি চায়, সেই সম্পর্কে মানুষের আসলে অত ভালো ধারণা নেই। ফিনকেলের নিজস্ব একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন ইন্টারনেটে বসে ডেটিংয়ের জন্য সঙ্গী বাছাই করে, এবং শুরুতে যে সব আচরণ করে তা আসলে কখনোই তাদের প্রকৃত চাওয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে না বা সঙ্গতিপূর্ণ হয় না।

এছাড়া পছন্দের অনেক বেশি সুযোগ থাকাটাও একটা বড় সমস্যা। ক্রেতাদের পছন্দের ওপর তৈরি করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, চকোলেট থেকে শুরু করে কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া পর্যন্ত বিষয়গুলোতে তারা বেশ চিন্তায় পড়ে যায়, কোনটা ছেড়ে কোনটা গ্রহণ করবে। বরং ৩০ থেকে ৪০টি পছন্দের সুযোগ থাকলে সেখান থেকে একটি বাছাই করা যতটা কঠিন, কোনো পণ্যের পরিমাণ ছয় থেকে ১২ হলে সেটার মধ্যে একটি বাছাই করাটা ততোটাই সহজ। আর ইন্টারনেট ডেটিং সাইটগুলো তাদের ক্রেতাদের জন্য অল্পসংখ্যক পছন্দ কখনোই রাখে না বরং থাকে হাজারও সুযোগ। আর সমস্যাটা হয় এখানেই।

ভালোবাসার সুপার মার্কেট: বহু মানুষের ভিড় থেকে নিজের পছন্দের মানুষটি বেছে নেয়া কিন্তু সহজ বিষয় নয়। ইন্টারনেট ডেটিংয়ের প্রেক্ষাপটে, এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর ড. ফিনকেলের গবেষণায় নেই। কিন্তু স্পিডডেটিং এ বিষয়ে একটি উত্তর দিতে পারে। যেখানে তিনি খুঁজে পেয়েছেন, অনেক পছন্দের মুখে পড়ে যখন একজন ব্যক্তি কাউকে খুঁজে নেয়ার ক্ষেত্রে চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি কম গুরুত্ব দেয়, বরং পছন্দের মানুষ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাদের উচিত চিন্তা ভাবনার মধ্যদিয়ে পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নানা বিষয়ে বাস্তব ধারণা নেয়া। অন্যভাবে বলতে গেলে, পছন্দ করতে গিয়ে মানুষের মনের ক্ষমতাও কখনো নি®প্রভ হয়ে ওঠে।

. ফিনকেলের প্রতিবেদনে যে কথাটা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সেটি হলো, অন্য সবক্ষেত্রের মতো ইন্টারনেট হলেও ভালোবাসার সন্ধান পাওয়াটা চাট্টিখানি কথা নয়। এটা ব্যবহার করতে না জানাটা কোনো কারণ নয়। বরং সৌভাগ্যবান হলেও আপনার কাছের কোনো রেস্তোরাতেও আপনি পেয়ে যেতে পারেন প্রিয় মানুষটিকে। কিংবা পথের ধারে কাউকে এক পলকে ভালো লেগে গেলে, সে যদি অচেনাও হয় ছুটে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলুন। কিন্তু মাউস ক্লিক করে যদি ইন্টারনেট থেকে আপনি কাউকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন, তবে একদিন দেখবেন, কিউপিডের তীরটি ছুটে এসে আপনার বুকেই বিধবে।।