Home » অর্থনীতি » আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায় দুর্নীতি

আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায় দুর্নীতি

ব্যবসায়ীদের নজর এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকেই

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

arms tradeট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রতি বছরই দুর্নীতির সূচক প্রকাশ করে। শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে এ নিয়ে বেশ হইচইও হয়ে থাকে। সম্প্রতি সংস্থাটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক প্রকাশ করেছে। সেটি হলো অস্ত্র ব্যবসায় দুর্নীতি। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রবল আশঙ্কা না থাকলেও এবং বিশ্বজুড়ে শান্তির স্লোগান জোরালো হলেও অস্ত্র বিক্রি কিন্তু কমেনি, বরং বাড়ছে। বিশ্বে ২০১২ সালে সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭৫৬ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কোনো একক বছরে অস্ত্র বিক্রির এটাই সর্বোচ্চ পরিমাণ। অস্ত্র বিক্রিতে যে ব্যয় হয়েছে তা বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) .৫ ভাগ। অর্থাৎ বিশ্বে প্রতিটি ব্যক্তির জন্য গড়ে প্রায় ২৪৯ ডলার করে ব্যয় হয়েছে অস্ত্রের পেছনে। আর কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বে অস্ত্র রফতানি হয়েছে ৮৫ বিলিয়ন ডলারের।

অস্ত্র বিক্রি বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এই খাতে দুর্নীতি। আমদানিকারক এবং রফতানিকারক উভয় দেশই দুর্নীতিতে জড়িত। টিআই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ দেশে প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই। বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে এসব তথ্য পেয়েছে টিআই।

গত জানুয়ারিতে ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং বাণিজ্য ও শিল্পে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত টিআই প্রতিবেদনটিতে প্রতিরক্ষা খাতের দুর্নীতি বন্ধে সরকারের করণীয় সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছে। তবে প্রধানত বিশ্বের অস্ত্র ব্যবসাকে আরো স্বচ্ছ করার লক্ষ্যেই এই সমীক্ষা চালানো হয়।

অস্ত্র ব্যবসায় অনেক আগে থেকেই ঘুষ কেলেঙ্কারি প্রচলিত রয়েছে। একদিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক গোপনীয়তা থাকায় ঘুষের থাবা সহজেই বিস্তৃত হয়ে পড়ে।

কেবল টিআই নয়, বিশ্বব্যাংক এবং স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটও অস্ত্র খাতে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী দুর্নীতির কথা জানিয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা খাতে বছরে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতি হয়ে থাকে। ঠিক এই পরিমাণ অর্থই ২০০৯ সালে ক্ষুধা মোকাবিলায় জি৮ দেশগুলো অনুন্নত দেশকে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক মার্ক পেম্যানের অভিমত হচ্ছে, ‘প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতি বিপজ্জনক, সিদ্ধান্তসূচক ও অপচয়মূলক। এই অর্থ পরিশোধ করে জনগণ, সেনাবাহিনী, কোম্পানি ও সরকারগুলো।’ তিনি বলেন, ‘অথচ বেশির ভাগ সরকারই এই দুর্নীতি প্রতিরোধে তেমন কিছুই করে না। ফলে জনগণের নজর থেকে দুর্নীতি গোপন করার বিপুল সুযোগের অবকাশ সৃষ্টি হয়। অথচ এই অর্থ আরো ভালো কাজে ব্যয় করা যেত।’

দুর্নীতি ঝুঁকি হ্রাস করার লক্ষ্যে টিআই ‘গভার্নমেন্ট ডিফেন্স অ্যান্টিকরাপশন ইনডেক্স’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ৮২টি দেশের অবস্থা যাচাই করে। এই ৮২টি দেশ ২০১১ সালে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের ৯২ ভাগ তথা ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল।

সমীক্ষা অনুযায়ী, শীর্ষ রফতানিকারকদের মধ্যে রয়েছে চীন, রাশিয়া ও ইসরাইল। তিনটি দেশের প্রতিরক্ষা খাতই বিবেচিত হয় অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে। আর শীর্ষ আমদানিকারদের মধ্যে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলো হচ্ছে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও তুরস্ক।

টিআই সমীক্ষায় দেশগুলোকে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। ছয় নম্বর গ্রুপে স্থান পাওয়া দেশগুলোকে দুর্নীতিতে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই গ্রুপের দেশগুলো হচ্ছে আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ক্যামেরুন, গণপ্রজাতান্ত্রিক কঙ্গো, মিশর, ইরিত্রিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন।

পাঁচ নম্বর গ্রুপে থাকা দেশগুলোকে ‘অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিগ্রস্ত’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, শ্রীলঙ্কা, ভেনেজুয়েলা, ইরান, ইরাক, নাইজেরিয়া, কাতার, উজবেকিস্তান ও জিম্বাবুয়ে।

আর যেসব দেশে দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা কম তাদের মধ্যে রয়েছে ব্রিটেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র দুটি দেশে দুর্নীতি হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। এই দেশ দুটি হলো অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি। উভয় দেশেই প্রতিরক্ষা নীতির ওপর শক্তিশালী পার্লামেন্টারি নজরদারি রয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও পোল্যান্ড দুর্নীতি প্রতিরোধে মোটামুটি মানে রয়েছে।

এই সমীক্ষা নিয়ে প্রশ্নও তোলা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানিএসব দেশে অস্ত্র দুর্নীতি প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা আছে বলে সমীক্ষায় বলা হয়েছে। কিন্তু উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কিন্তু তারাই অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস বিশ্বের অন্যান্য স্থানের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঠিকাদারেরা অনেক বেশি দুর্নীতি প্রতিরোধক ব্যবস্থার অধিকারী বলে জানানোর পাশাপাশি এটাও বলেছে যে, পশ্চিমা সরকারগুলো তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট হ্রাস করার প্রেক্ষাপটে অনেক ঠিকাদার এখন দুর্নীতিপ্রবণ মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দিকে নজর বাড়িয়েছে। ফলে পাশ্চাত্যের এসব দেশ নৈতিক দায়দায়িত্ব এড়াতে পারে কি না সে প্রশ্নটি করা যেতেই পারে।

দুর্নীতির সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘন। মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র কম যায় না। এসব দেশের অস্ত্র মানবাধিকার লঙ্ঘনে দেদারসে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৪ জুলাই প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ান প্রশ্ন করেছে, ‘ব্রিটিশ অস্ত্র কিভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী? মুখের ওপর বলা হয়, এটা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন। ইরাক থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত ব্রিটেন রাষ্ট্রটিই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। ওইসব স্থানে যে ভয়াবহ মাত্রায় নৃশংসতা চলছে, তার তুলনায় ইরানের ঘটনা আসলেই কি কিছু ? ব্রিটেনকে সৌদি আরবে জনতা নিয়ন্ত্রণকারী গোলাবারুদ কিংবা বাহরাইনে অ্যাসাল্ট রাইফেল সরবরাহ থামাতে কোনো নৈতিক প্রতিবন্ধকতা নেই কেন ? অবশ্য এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার প্রয়াস।’

পত্রিকাটি জানায়, ব্রিটেনের সব ধরনের রফতানির ১ দশমিক ২ শতাংশ হলো অস্ত্র এবং এই খাতটি দেশটির মোট চাকরির শূন্য দশমিক ২ শতাংশের জোগান দিয়ে থাকে। অর্থনৈতিকভাবে এটা অগ্রাহ্যযোগ্য। অর্থাৎ নিজ দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্যাচালো রাস্তায় নিজের অবস্থান ধরে রাখার জন্য দেশটি অস্ত্র ব্যবসায় রয়েছে।

আরেকটি তথ্যও মনে রাখা দরকার, ইউরোপের বৃহত্তম ঠিকাদার বিএই ( ইঊঅ) সিস্টেমস সৌদি আরব, চেক প্রজাতন্ত্র ও হাঙ্গেরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রশ্নবিদ্ধ পেমেন্টের জন্য ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে ফৌজদারি অপরাধ স্বীকার করেছে। জাস্টিজ ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে , ব্রিটেনভিত্তিক বিএই আমেরিকান সামরিক কোম্পানিগুলোকে টেক্কা দিয়ে যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার চুক্তি লাভের জন্য দালাল ও বিদেশি ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে ওইসব অর্থ প্রদান করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় ৭০ ভাগ দেশ দুর্নীতি প্রতিরোধক ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে অপচয় ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। এসব দেশের অর্ধেকেরই প্রতিরক্ষা বাজেটে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে ষোল আনা, তথ্য থাকলেও তা খুবই সামান্য। ৭০ ভাগ দেশে গোপন অস্ত্র কর্মসূচিতে সরকার কত ব্যয় করল, সে ব্যাপারে নাগরিকদের সাধারণ তথ্যও দেওয়া হয় না।

সমীক্ষায় দেখা যায়, মাত্র ১৫ ভাগ সরকারের গৃহীত প্রতিরক্ষানীতি তদারকির রাজনৈতিক ব্যবস্থা ব্যাপকভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর। ৪৫ ভাগ দেশে প্রতিরক্ষানীতি তদারকির কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নেই বা থাকলেও তা খুবই সামান্য। এসব দেশের অর্ধেকের প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় যাচাইবাছাই ন্যূনতম পর্যায়ে রয়েছে।

সমীক্ষার প্রধান লেখক অলিভার কভার মনে করেন, ‘এই সূচক দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করছে যে, এই খাতে দুর্নীতির ভয়াবহ ঝুঁকি রয়েছে। আরো দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়টা দুর্বলভাবেও উপলব্ধি করা হয়, উদাহরণ হিসেবে সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির কথা বলা যেতে পারে, যেখানে দুর্নীতি গভীরে শিকড় গেড়ে থাকতে পারে। আমাদের সূচক এসব ঝুঁকি বুঝতে এবং মোকাবিলা করতে সবার জন্য সহায়ক হবে।’ কভার আরো বলেন, ‘সরকারগুলোর উচিত এই খাতকে স্বচ্ছ রাখা। আর আমাদের প্রতিবেদন তাদেরকে স্বচ্ছতা অর্জনে বাস্তবসম্মত পথ দেখাবে। আর তা করা হলে সৈন্য ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা পাবে এবং সরকারের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বাঁচবে।’

আমাদের প্রতিবেশি ভারতও কিন্তু নানাভাবে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক নিরাপাত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষক সিমন ওয়েজম্যান জানিয়েছেন, অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের শীর্ষ স্থান অক্ষুণ্ন রয়েছে। এমনকি দ্বিতীয় স্থানে থাকা দেশটির সঙ্গে তার ব্যবধানও অনেক। ২০০৮২০১২ সময়কালে চীনের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি অস্ত্র আমদানি করেছে ভারত। আগামী দিনগুলোতে ভারতের অস্ত্র আমদানির এই হার অব্যাহত থাকবে বলেও প্রাপ্ত তথ্যে মনে হচ্ছে। ২০১২ সালে বিশ্ববাজারের ১২ শতাংশ অস্ত্র কিনেছে ভারত। আর চীন কিনেছে ৬ শতাংশ, পাকিস্তান ৫ শতাংশ। ২০১২ সালে প্রতিরক্ষা খাতে ভারত ব্যয় করেছে ৪৬.১ বিলিয়ন ডলার।

ভারতের সামরিক বাহিনী ফেব্রুয়ারিতে ইতালির একটি কোম্পানির কাছ থেকে ৭৫০ মিলিযন ডলারের হেলিকপ্টার ক্রয় চুক্তি স্থগিত করেছে। এই চুক্তিটি নিয়ে দেশটির জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে ইতালির ফিনমেকানিকা ভারতীয় কর্মকর্তাদের বিপুল ঘুষ দিয়ে চুক্তিটি করিয়ে নিয়েছিল। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।।